শাহ আবদুল জব্বার (রাহ.)’র সংস্কার আন্দোলনের স্বার্থক প্রতিফলন ঐতিহাসিক জবলে সীরত।

-অধ্যাপক শাব্বির আহমদ

প্রাসঙ্গিকতাঃ

মধ্যযুগে ঔপনেবেশিক আমল থেকেই মূলত জমিদারী প্রথার শুরু। ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো।

খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা আনয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবরের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যেই বিগত বছরের জমির খাজনা পরিশোধ করতে হতো। পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ ভূমির মালিক বা জমিদাররা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। সাথে প্রজাদের মনোরঞ্জনের জন্য গরুর লড়াই, বলিখেলাসহ বিভিন্ন খেলাধূলার আয়োজন করা হতো।

এসময় একশ্রেণীর কৃষক নির্দিষ্ট ষাঁড় গরুকে আলাদাভাবে লালন পালনের মাধ্যমে মোটাতাজা করতো শুধু লড়াইয়ের জন্য। জমিদারদের পাইক পেয়াদা ও গোমস্তারা শুকনো মৌসুমে গ্রামের হাট-বাজারে ঢোল পিটিয়ে নির্ধারিত তারিখে ষাঁড়ের লড়াই দেখার আমন্ত্রণ জানাতো। মালিকগণ তাদের ষাঁড়গুলোকে বিভিন্ন রঙিন কাপড়, ঘুংগুর, দোয়াল দিয়ে গেঁথে দু’দিকে দু’জন রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে এসে লড়াইর মাঠে লেলিয়ে দিয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়ে জাহেলিয়াত যুগের আদিমতায় মেতে উঠতো। কোন একটা ষাঁড় পরান্ত না হওয়া পর্যন্ত চলতো রক্তাক্ত ও পৈশাচিক এই লড়াই। যে ষাঁড়টি প্রথম স্থান পেত সে পুরষ্কার গরুর গলায় বেঁধে বাজারে বাজারে দেখানো হতো ঢোল তবলার তালে তালে।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল বলিখেলা। প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্লবীরেরাই ছিলেন বলিখেলার প্রধান আকর্ষণ। বর্তমানে পেশাদার বলির (কুস্তিগীর) অভাবে বলিখেলার তেমন আকর্ষণ না থাকলেও এটি এখনও বেঁচে আছে চট্টগ্রামের লালদিঘীর মাঠে অনুষ্ঠিত জব্বারের বলীখেলার বদৌলতে। বলীখেলা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নাম। এর আভিধানিক নাম হচ্ছে মল্লযুদ্ধ বা কৃষ্টি প্রতিযোগিতা। তখনকার বলীরা নিজেদের বলী পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতো। চট্টগ্রামে আজও বহু বাড়ির পরিচিতিতে বলীর নাম যুক্ত আছে। যেমন ওয়ালীবলীর বাড়ি, সফরআলী বলীর বাড়ি। দক্ষিণ চট্টগ্রামের নামজাদা বলী ছিলেন আনক্যা বলী, গইন্যা বলী, মিরা বলী, আছদ আলী বলী, বদু বলি, আহমদ ছফা বলী, ইয়াকুব বলী, সুলতান বলী, লোহাগাড়া চরম্বার সাহাব মিয়া বলি, বড়হাতিয়ার ছোয়াইন্যা (সোবহান হাজী) বলি প্রমুখ।

গরুর লড়াই আর বলিখেলা উপলক্ষে আয়োজিত মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে গ্রামের মৃৎশিল্পী, হস্তশিল্পীরা বিভিন্ন পণ্যের পসরা বসাতো। তবে মেলাগুলো মদ, জুয়া, হাউজিসহ নানা অশ্লীল ও অসামাজিক কর্মকান্ডে কলুষিত হয়ে পড়তো। প্রতাপশালী জমিদারদের তত্বাবধানে চলে আসা এসব অশ্লীল কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো কোন সুযোগই ব্রিটিশদের আজ্ঞাবহ জমিদার নির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের ছিলনা তখন। দেশের অন্যান্য স্থানের ন্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের অনেক স্থানে বৈশাখী মেলার নামে গরুর লড়াই আর বলিখেলার আয়োজন করা হতো, তন্মধ্যে অবিভক্ত সাতকানিয়া মাদার্শার মক্কার এবং বড়হাতিয়ার ছিদ্দিক মিয়ার বৈশাখী মেলা তথা গরুর লড়াই আর বলিখেলা ছিল অন্যতম। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও আরাকান অঞ্চল থেকে আসা নামি-দামি বলীরা এই দুই মেলায় কুস্তি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন।

এবার আসা যাক মূল আলোচনায়ঃ

লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়ায় বায়তুশ শরফ আনজুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় পাঁচ দশক ধরে চলে আসা ঐতিহাসিক ‘জবলে সীরত’ নিয়ে। ২০২৬ সালের ২৪ ও ২৫ এপ্রিল ঐতিহাসিক জবলে সীরত মাহফিলের সুবর্ণ জয়ন্তী (৫০ বছর পূর্তি)। বায়তুশ শরফের প্রধান রূপকার, হাদিয়ে যামান আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.) এর হাত ধরে জবলে সীরতের যাত্রা- এই সরল বাক্যটি বেশ আর কম সর্বমহলে জানা থাকলেও কি রকম জটিল ও বৈরী পরিবেশের মধ্যদিয়ে এই মাহফিলের উৎপত্তি এবং বিকাশ হয়েছিল লোকশ্রুতি ছাড়া স্বচ্ছ ইতিহাস অন্তত যাদের বয়স পঞ্চাচের নীচে তাদের নেই বললে চলে। আমার পরম সৌভাগ্য-১১/১২ বছরের বাল্যবয়সী হলেও একেবারে শুরু থেকেই এই মাহফিলের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের জ্যান্ত সাক্ষী। সেইদিনের উত্তাল প্রতিরোধ সংগ্রামের স্মৃতি হৃদেেয়র মণিকোঠায় এখনো অমলিন। সেই বাল্য স্মৃতি থেকেই আজকের এই প্রয়াস। ব্যক্তি পরিচয় অতিক্রম করে প্রাতিষ্ঠানিকতার বিস্তৃত আবহে নিজেকে মেলে ধরে আদর্শিক জীবনের মাইলফলক হয়ে উঠা একটি নাম আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ:)। চিন্তার উনয়ন, চেতনার নবায়ন, অপরিসীম ত্যাগ ও জ্ঞান-সাধনার নান্দনিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে তিনি হয়ে উঠেন বাংলার জমিনে দ্বীনের প্রদীপ্ত শিখা হিসেবে।

শুদ্ধচারিতার নীরব সংগ্রামে তিনি ছিলেন একজন সাহসী সৈনিক। তাঁর চিন্তায় প্রখরতা ছিল, জ্ঞান গরিমায় ছিল বৈচিত্র্য। সমসাময়িক আর দশজন পীর এবং ওলামা মাশায়েখরা

চিরাচরিত কায়দায় যে জিনিসটিকে দেখতেন এবং ভাবতেন, সেই দেখা ও ভাবনায় তিনি তুলনাহীন মেধা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁর কর্মমুখর জীবনের পরতে পরতে।

অসাধারণ প্রজ্ঞা, অতুলনীয় কর্মশক্তি, ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা ও চারিত্রিক মাধুর্যতা দ্বারা তিনি সমসাময়িক আলেম-ওলামাসহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমেদ্বীন, পীর-এ কামেল, মসজিদ ভিত্তিক সমাজসেবার অন্যতম পুরোধা, শিরক-বিদআত- এর বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। বাড়ির অনেকটা দোরগোড়ায় বড়হাতিয়া ছিদ্দিক মিয়ার বলি খেলা ও গরুর লড়াইয়ের অন্তরালে দীর্ঘ ৪০ বৎসর ধরে চলে আসা মদ, জুয়া, হাউজিসহ অশ্লীল কর্মকান্ড বায়তুশ শরফের মরহুম পীর আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ:) এর জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক ছিল। স্থানীয় আলেম-ওলামাসহ এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝে ব্যাপক প্রভাব থাকলেও অনৈসলামিক এই কর্মকান্ড বন্ধে সরাসরি প্রতিরোধ সংগ্রামে না গিয়ে তিনি মরহুম ছিদ্দিক মিয়ার পরিবারের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে গরুর লড়াই ও বলিখেলার নামে অশ্লীলতায় ভরা এই মেলা বন্ধ করার লক্ষ্যে সময়-সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ১৯৭৬ সালে জমিদার ছিদ্দিক মিয়া ইন্তেকাল করলে তাঁর ছেলেরা বাবার জানাযার নামাজ পড়ানোর জন্য আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ:)-কে আহবান জানান। জমিদার ছিদ্দিক মিয়ার অন্তিম যাত্রার মুহুর্তে প্রত্যুৎপন্নমতি ক্ষমতাসম্পন্ন এই মর্দে মুজাহিদ কি কৌশলী ও দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন কেউ ভাবতেই পারেননি! জমিদার ছিদ্দিক মিয়ার সন্তানদের মাঝেও কয়েকজন ছিলেন এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। জানাযার পূর্ব মুহুর্তে অকুতোভয় দুঃসাহসী মর্দে মুজাহিদ হুজুর কেবলা আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.) মরহুম ছিদ্দিক মিয়ার দুই পরিবারের সকল সন্তানদের বাবার কফিনের সামনে আসার আহবান জানালে সকলেই উপস্থিত হন। ছিদ্দিক মিয়ার সন্তানদের উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, “আমার জানা মতে, আপনাদের আব্বা খুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন, আলেম-ওলামাদের অত্যন্ত কদর করতেন। তিনি যে উদ্দেশ্যেই গরুর লড়াই আর বলিখেলার আয়োজন করুন না কেন, তা আজ শরীয়তবিরোধী অসামাজিক কার্যকলাপে রূপান্তরিত হয়েছে। এই মুহুর্তে মরহুম ছিদ্দিক মিয়ার সন্তান হিসেবে বাবার কফিনকে সামনে আপনারা সত্য-মিথ্যার এক মহাসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনাদের বাবাকে জাহান্নামের দগ্ধ আগুন থেকে যদি মুক্তি দিতে চান তাহলে এক্ষণই আপনাদের বাবার কফিন ছুঁয়ে উপস্থিত মুসল্লিদের স্বাক্ষী রেখে আগামীতে গরুর লড়াই ও বলিখেলা হতে দেবো না-মর্মে শপথ গ্রহন করতে হবে, নতুবা আমি জানাযা পড়াবো না; অন্য কোন মৌলভীকে দিয়ে পড়ান।”

ছিদ্দিক মিয়ার সন্তানদের সামনে এমন মুহুর্তে দু’টি বিষয় ছিল স্পর্শকাতরঃ একদিকে খেলা আর মেলার মাধ্যমে ইহজাগ-তিক যশ-খ্যাতি ও বিনা পুঁজিতে বিপুল অর্থকড়ি হারানোর ভয়, অন্যদিকে নিজের জন্মদাতা বাবাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির মোক্ষম সুযোগ। স্মর্তব্য, মা-বাবার কফিনের সামনে সাধারণত সন্তানরা এতোই আবেগপ্রবণ থাকে, যেকোন দাবী দাওয়া পূরণে নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনা। কালবিলম্ব না করে মরহুম ছিদ্দিক মিয়ার সন্তানগণ বলে উঠলেন, “হুজুর। আমাদের বাবা জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হোক-সন্তান হিসেবে আমরা তা চাইনা। আমরা বাবার কফিন ছুঁয়ে শপথ করছি, গরুর লড়াই ও বলিখেলা আর হতে দেবো না।” উপস্থিত মুসল্লীদের উপস্থিতিতে সন্তানদের কাছ থেকে অঙ্গিকার পেয়ে আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার (রাহ.) যথারীতি জানাযার নামাজের ইমামতি করলেন।

সুদীর্ঘ ৪০ বৎসর ধরে চলে আসা ছিদ্দিক মিয়ার গরুর লড়াই আর বলিখেলা বন্ধে বায়তুশ শরফের প্রধান রূপকার আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.) এর সুক্ষ্ম, দুরদর্শী, বিজ্ঞোচিত ও দুঃসাহসিক ভূমিকার কথা তখনকার সময়ে সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসা কুঁড়ায়। রূপকথার কাহিনীর মতো আলোচনা চলে এখনো। যামানার এই মুজাদ্দিদ মেলার নামে অনৈসলামিক কর্মকান্ড বন্ধে করেই ক্ষান্ত থাকেননি, বড়হাতিয়া মগদীঘি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রাস্তার পশ্চিমে যে পাহাড়ি টিলায় গরুর লড়াই ও বলিখেলার জুয়ার আসর এবং অশ্লীল নৃত্যগানের রঙ্গলীলা চলতো সেখানে ১৯৭৭ সালের ১১-১২ বৈশাখ সূচনা করলেন দুইদিনব্যাপী ‘জবলে সীরাত’ (সীরাতের পাহাড়) মাহফিল।

তিক্ত হলেও সত্য, কফিনের সামনে আবেগঘন মুহূর্তে মা-বাবার পক্ষে সন্তানরা যেকোন দাবী দাওয়া পূরণে নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও আবেগ কেটে গেলে অনেক সন্তানকে আবার স্বরূপে আবির্ভূত হতে দেখা যায়। মরহুম ছিদ্দিক মিয়ার কয়েকজন সন্তানকেও একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গিয়েছিল। গরুর লড়াই আর বলিখেলার অন্তরালে জুয়া, হাউজি, নৃত্যাসর থেকে বিপুল অংকের টাকা আদায়ের লোভ সামলাতে না পেরে ছিদ্দিক মিয়ার কয়েকজন সন্তান এবং এলাকার বখাটে ও মাস্তান প্রকৃতির কিছু লোক মিলে গরুর লড়াই আর বলিখেলা পুনরায় চালুর অপচেষ্টা চালালে এলাকায় এক সংঘাতময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। আর এই পর্বটিও আমার চোখে দেখা, যা এখনো স্মৃতির মানসপটে জ্বলজ্বল করে। একদিকে হযরত শাহ আবদুল জব্বার (রাহ.)’র নেতৃত্বে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলিম তৌহিদি জনতা, অন্যদিকে স্থানীয় কিছু প্রভাশালীর নেতৃত্বে বখাটে ও মাস্তানের দল। মরহুম ছিদ্দিক মিয়ার কয়েকজন ছেলের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে গরুর লড়াই আর বলিখেলা পুনঃ আয়োজনের ঘোষণা আসলে গোটা এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করে। শিরক- বেদআতসহ অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপোষহীন মহান মনীষী শাহ আবদুল জব্বার (রাহ.)’র নির্দেশনা পেয়ে স্থানীয় এশায়াতুল উলুম মাদ্রাসা, কুমিরঘোনা আখতরুল উলুম মাদ্রাসা, মালপুকুরিয়া মাদ্রাসা ও চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার সমন্বয়ে গড়ে উঠে সমাজবিরোধী অনৈসলামিক কর্মকান্ড প্রতিরোধ কমিটি। বায়তুশ শরফের মরহুম হুজুর কেবলার পক্ষে সেদিনের প্রতিরোধ সংগ্রামে সিপাহসালারের ভূমিকা পালন করেছিলেন এশায়াতুল উলুম মাদ্রাসার তদানীন্তন অধ্যক্ষ মরহুম মাওলানা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সেদিন তাঁর অগ্নিশর্মা নেতৃত্ব এখনো হৃদয়ে দাগ কাটে। নিজস্ব বাহিনী নিয়ে ‘বিশেষ অস্ত্র’ হাতে বড়হাতিয়ার সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম মাওলানা আবদুল ওয়াহাবের সদর্প অংশগ্রহণ প্রতিরোধ সংগ্রামীদের ব্যাপক অনুপ্রেরণা জোগায় এবং মুহুর্তেই তারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। যুদ্ধের এই ময়দানে লস্করের পাড়ার মাওলানা ফজলুল হক, চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদরাসা থেকে আসা মাওলানা নুরুল ইসলাম হায়দরি, মাওলানা ওমর, সাবেক লোহাগাড়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা নুরুল আবছার চৌধুরী, মাওলানা মমতাজুর রহমান মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ মুসা, লোহাগাড়ার আলতাফ মিয়ার ছেলে মাওলানা আবু সুফিয়ান, রশিদের ঘোনার আবুল কাসেমদের বীরত্বের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। কুমিরাঘোনা আখতরুল মাদ্রাসার বেশ কয়েকজন শিক্ষক-ছাত্রদের জিহাদি জজবা এখনো স্মৃতিতে দেদীপ্যমান। বিশেষ করে মাথায় গামছা বেঁধে বল্লমহাতে ক্বারী মাওলানা রহমত উল্লাহ, মাওলানা মুহাম্মদ আব্বাস (রাহ.) এর নেতৃত্বে বাঁশখালীর মাওলানা ওমর, মাওলানা আনোয়ার, মাওলানা ইউসুফ আরমানীর সাহসিকতার কথা উল্লেখ না করলে নয়। চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার তদানীন্তন ইংরেজির অধ্যাপক কুমিল্লা নিবাসী সুঠামদেহী জনাব আবদুল গফুর স্যারের নেতৃত্বে মাদ্রাসার নির্মাণাধীন পাঁচতলা ভবনের সেন্টারিং এর কাঠ-বল্লম এবং রড নিয়ে সেদিনের বড়হাতিয়ামুখী বিশাল বিপ্লবী কাফেলায় বায়তুশ শরফের সম্মানিত রাহবার আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভীসহ আমারও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। তখন আমরা জামাতে হাস্তুমের (বর্তমান ৭ম শ্রণী) ছাত্র। বিশাল মিছিলের সম্মুখভাগে ছিলেন মাদ্রাসার সিনিয়র ছাত্ররা, সাথে যোগ দেয় এলাকাবাসীও। সেইদিন প্রতিরোধ কাফেলায় ঝাড় তোলা টগবগে যুবক গৌরস্থানের মাওলানা নুরুল ইসলাম হায়দরী, রশিদেরঘোনার আবুল কাসেমসহ অনেকেই আজ পরপারের বাসিন্দা। লেখার কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আরো অনেকের নাম উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি।

দুপুর দুইটায় আমরা পৌঁছার পূর্বেই মগদীঘি স্কুল মাঠে উল্লেখিত মাদ্রাসা সমূহের ছাত্র শিক্ষক ও স্থানীয় ধর্মপ্রাণ তৌহিদি জনতার বিশাল উপস্থিতি দেখতে পাই। চুনতি মাদ্রাসা থেকে আসা বিশাল মিছিল দেখে উপস্থিত সবার মাঝে নতুন করে প্রাণের স্পন্দন দেখা দেয়। গরুর লড়াই আর বলিখেলার আয়োজকরা জবলে সীরতের পশ্চিম দিকে অবস্থান নেয়। এমন টানটান উত্তেজনাকর মুহূর্তে হঠাৎ পশ্চিম দিক থেকে ঢোল-তবলা আর বিয়ারিং পার্টির বাজনার আওয়াজ ভেসে আসলে প্রতিরোধকারীদের মাঝে দেখা দেয় চরম উত্তেজনা এবং মুহুর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যার হাতে যা ছিল তা নিয়ে আয়োজকদের ধাওয়া দেয়। ধাওয়া খেয়ে ঢোল তবলা আর মাইক ফেলে পশ্চিমে চাকফিরানি পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়। এসময় প্রতিরোধকারীরা বেতুয়া পাড়া, নাথ পাড়া, লস্কর পাড়া, দেওয়ান পাড়ায় গরুর লড়াই আর বলিখেলার পক্ষের লোকদের খুঁজতে থাকলে এ সমস্ত এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করে। কিছুক্ষণ পর পরিত্যক্ত ঢোল তবলা নিয়ে প্রতিরোধকারীরা মগদীঘি স্কুল মাঠে বিজয়বেশে ফিরে আসে। আর এ সময়ে আধুনগরের সাবেক চেয়ারম্যান, প্রখ্যাত ওয়ায়েজ মাওলানা শফিক আহমদ বিশাল এক লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হন। উল্লেখ্য, ঐ সময়ে জমিদার মাওলানা শফিক আহমদের নেতৃত্বে শোষক ও অত্যাচারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গড়ে উঠা সাতগড়ের লাঠিয়াল বাহিনী মুর্তিমান এক আতংকের নাম ছিল।

এভাবেই বায়তুশ শরফের মরহুম হুজুর কেবলা আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.) এর নির্দেশে সেইদিন বিনা রক্তপাতে প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি বড়হাতিয়ার ছিদ্দিক মিয়ার গরুর লড়াই আর বলিখেলা পুনঃ আয়োজনের খায়েশ চিরতরে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। তারপর থেকে প্রতিবছরই ১১-১২ বৈশাখ জবলে সীরত মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। চুনতির হযরত শাহ সাহেব হুজুর (রাহ.) প্রবর্তিত ১৯ দিনব্যাপী মাহফিলে সীরাতুন্নবী (সা.) এর বক্তাদের বিষয়বস্তু প্রণয়নের ন্যায় শুরুর দিকে জবলে সীরাত এর বক্তাদেরও বিষয়বস্তু নির্ধারণ করতেন চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার তদানীন্তন নাজেমে আ’লা আল্লামা আবুল বারকাত মুহাম্মদ ফজলুল্লাহ (রাহ.)। তাঁর রচিত “ধন্য ধন্য ধন্য তোমরা বড়হাতিয়ার অধিবাসী” শিরোণামের গজলটি তখনকার সময়ে খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.) প্রবর্তিত মাহফিলে জবলে সীরত পরিচালনার ভার ২০২১ সাল থেকে তাঁরই সুযোগ্য সন্তান, বর্তমান বায়তুশ শরফের রাহবার আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভী (মা.জি.আ) এর স্কন্ধে। রাহবারে বায়তুশ শরফের নেতৃত্বে ২৪ ও ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ইং ৫০তম জবলে সীরত মাহফিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে উক্ত মাহফিলের সর্বাঙ্গীন সফলতা কামনা করছি।

লেখক পরিচিতিঃ

শিক্ষক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

প্রকাশনায়:

আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার ফাউন্ডেশন

বায়তুশ শরফ জিলানী মার্কেট, আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার রাহ, সড়ক (ডি. টি. রোড), ধনিয়ালাপাড়া,

চট্টগ্রাম-৪১০০।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *