১৯৯০ সালে আল-আসরারের বিশেষ সংখ্যার কাজ যখন পুরোদমে চলছিল এবং আমরা বায়তুশ শরফ ও বায়তুশ শরফের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুল আলম শাহ সুফি মীর মুহাম্মদ আখতার সম্পর্কিত কিছু মৌলিক তথ্য পাঠক-সমাজের কাছে উপহার দিতে সচেষ্ট, তখন ৭ জানুয়ারি ১৯৯০ নোয়াখালীর চরজব্বার (রামগতি) ইউনিয়ন পরিষদে অনুষ্ঠিত এক মহতী মাহফিলের মাধ্যমে কিছু মূল্যবান তথ্য আমাদের সামনে আসে।
চরজব্বারে নির্মাণাধীন বায়তুশ শরফ মসজিদের প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক মাহফিলে পীর সাহেব কেবলা ৯-এর ভাষণের মাধ্যমেই আমরা এ তথ্য লাভ করতে সক্ষম হই। অন্য কোনো আলেম বা মনীষীর মাধ্যমে এসব অমূল্য তথ্য হস্তগত হওয়া সম্ভব নয়। তাই সেই ভাষণটির সারসংক্ষেপ বিজ্ঞ পাঠক-পাঠিকাদের খেদমতে টেপরেকর্ড থেকে লিপিবদ্ধ করে পেশ করা হলো। সম্পাদক
নোয়াখালীর চরজব্বার ইউনিয়নে বায়তুশ শরফ মসজিদের প্রাঙ্গণে প্রদত্ত ভাষণে পীর সাহেব কেবলা চট্টগ্রাম মসজিদ বায়তুশ শরফ প্রতিষ্ঠালগ্নের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফের সুন্দর নামটি চয়ন করেছেন আমার পীর-মুরশিদ কুতুবুল আলম শাহ সুফি হযরত মাওলানা মীর মুহাম্মদ আখতার। তিনি জীবনে ২৯ বার হজ করার পর ১৯৭১ সালের শুরুতে শেষ হজে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। আরাফাত থেকে মিনা গিয়ে সেখানেই তিনি হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন এবং আল্লাহর ঘরের পাশে জান্নাতুল মুআল্লায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। তখন আমিসহ আরও ৬ জন তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম। তিনি আল্লাহর ঘরকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। এজন্য প্রতিবছর হজের মৌসুম এলে তিনি হজে যাওয়ার জন্য পাগলের মতো হয়ে যেতেন।
পাকিস্তান আমলে হাজীদের কোটা নির্ধারিত থাকায় পুরোনো হাজীকে হজে যাওয়ার সুযোগ কম দেওয়া হতো। এমন পরিস্থিতিতে তিনি মিসর, লেবানান বা অন্য কোনো বাইরের রাষ্ট্রে চলে যেতেন এবং সেখান থেকে পবিত্র হজে গমন করতেন। এভাবে তিনি জীবনে ২৯ বার হজ করেন। তার হজ-সফরের সম্বল ছিল একটি টিনের বাক্স আর একটি চামড়ার ব্যাগ। তাতে ব্যবহারের অল্পকিছু কাপড় থাকত আর ছোট বাক্সটিতে থাকত কাফনের কাপড়। তিনি সবসময়ই কাফনের কাপড় সঙ্গে রাখতেন। বাক্সের মধ্যে মক্কা শরীফের অল্প মাটিও রাখতেন। তিনি আমাদের বলতেন, ‘মক্কা-মদীনার মাটি যদি নসিব নাও হয় তাহলে যেখানে আমার মৃত্যু হয় অন্তত সেখানেই এ মাটিখানি আমার কবরে দিয়ে দিয়ো।’ তাঁর এই মহব্বত ও খুলুসিয়তের বরকতেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে চিরতরে মক্কা শরীফে রেখে দিয়েছেন।
তিনি যখন বায়তুশ শরফ মসজিদে সর্বপ্রথম জুমা পড়ান তখনও মসজিদের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। তিনি (বাড়ি থেকে) বায়তুশ শরফ আসলে মসজিদের সামনেই একটা রুমে বসতেন। পরে সেখান থেকে চলে যেতেন। সেদিন মসজিদে জুমা পড়ে তিনি এ রুমে গেলেন আর আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করছি যে, আমি যদি নাও থাকি, তোমরা এই ঘরে বসে আল্লাহ আল্লাহ করতে পারবে।’ ইঙ্গিত হিসেবে তিনি একথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি যে, তিনি বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমি আমার দায়িত্ব তোমাকে দিয়ে গেলাম। আমি যেখানেই থাকি না কেন আমার রুহ বায়তুশ শরফের সাথে থাকবে।’ একথা বলে তিনি চলে গেলেন। এরপর আর বায়তুশ শরফে আসার সুযোগ হয়নি তাঁর।
বায়তুশ শরফ প্রতিষ্ঠার পেছনে আল্লাহর এই মকবুল অলীর খুলুসিয়তের কথা বলছি, তিনি যখন বায়তুশ শরফ মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তখন আমরা কেউ জানতাম না। অথচ নিয়ম ছিল যে, তিনি যখন কোনো কাজের উদ্যোগ নিতেন আমাকে চট্টগ্রাম পাঁচলাইশ ওয়াজেদিয়া আলিয়া মাদরাসা থেকে লোক মারফত ডাকতেন। এরপর আমাকে বলতেন, ‘একটা কাজ শুরু করা হয়েছে কিংবা ওই দিকে সফরের নিয়ত রয়েছে, তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবে।’ এসব কাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাকে সাথে রাখতেন। সেই সময় আমি সপ্তাহে দুই-তিনবার (চট্টগ্রাম) শহরে আসতাম। তাঁর সাথে জুমার নামাজ আদায় করতাম। অথচ তিনি যে বায়তুশ শরফ মসজিদের ভিত্তি দিয়েছেন তা আমাকেও জানাননি।
আমি প্রথম যে-বার বায়তুশ শরফ মসজিদ প্রতিষ্ঠার সংবাদ পাই, তখনকার ঘটনা ছিল, একদিন তিনি কোথাও সফরে যাচ্ছেন। তখন নিজ বাড়ি থেকে (পূর্ব মাদারবাড়ি) বের হয়ে গন্তব্যের বিপরীত দিকে গাড়ি ফেরানোর জন্যে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন। কিছুদূর গিয়ে বর্তমানে যেখানে চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফের গেইট সেখানে এসে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিলেন। তাকিয়ে দেখলাম, একটি দালান কিছুদূর উঠেছে এবং সামনে কিছু ইট রয়েছে। এই প্রথম আমি বায়তুশ শরফ মসজিদ দেখতে পাই। মসজিদের কখন ভিত্তি দেওয়া হয়েছিল তা আমি জানতাম না। তবে যতদূর মনে পড়ে, পীর সাহেব কেবলা ইঙ্গিতে এতটুকু বলতেন যে, ‘একটা কাজ শুরু করা হয়েছে, আল্লাহর কাছে দোয়া করবে।’ স্পষ্টভাবে মসজিদ নির্মাণের কথা বলেননি।
মূলত গোপনভাবে আল্লাহর জন্য কাজ করাটাই তিনি পছন্দ করতেন। পবিত্র হজে যাওয়ার আগেও তিনি প্রচার করতেন না। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই বলতেন। আখতারাবাদ (কুমিরাঘোনা) মাহফিলের বেলায়ও তাঁর এই নিয়ম ছিল। চট্টগ্রাম শহর থেকে দূরে (কক্সবাজার যাওয়ার মাঝ পথে) এক নিভৃত পল্লীতে বায়তুশ শরফের এই বার্ষিক মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই মাহফিলে ওয়াজ-নসিহত আর যিকির-আযকারের তা’লীমই দেওয়া হয়। প্রতিবছরই এই বিশাল মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে সকল কাজ প্রতিবছর নির্দিষ্ট তারিখে করার ব্যাপারে এখতেলাফ রয়েছে বিধায় তিনি এই মাহফিল প্রতিবছর নতুন নতুন তারিখে করতেন। তাঁর নিয়মে আমরাও ভিন্ন ভিন্ন তারিখে মাহফিল করে থাকি।
এছাড়া কোনো হ্যান্ডবিল, পত্রিকা, পোস্টার, মাইকিং কিছুই নেই। তিনি শুধু এক সপ্তাহ আগে মসজিদে ঘোষণা করতেন, ‘আগামী অমুক তারিখে ইনশাআল্লাহ আখতারাবাদ (কুমিরাঘোনা) মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। মাহফিলের কামিয়াবির জন্য সবাই আল্লাহর দরবারে দোয়া করবেন।’ সেই একই নিয়মেই তা এখনো অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর রুহে ব্যাথা পাবেন এজন্য আমরাও মাহফিলের জন্য কোনো প্রচার করি না। তবে যেহেতু সারা দেশে আমাদের তরীকত ছড়িয়ে পড়েছে, সেজন্য পূর্বের তুলনায় মাত্র দুই-চার দিন আগে আমরা মসজিদে মাহফিলের তারিখ ঘোষণা দিই। কারণ বিদেশেও অনেক লোক মাহফিলের তারিখ কখন ঘোষণা হবে তার জন্য অপেক্ষায় থাকেন এবং শুধু আমাদের দোয়ার জন্য এই মাহফিলে শরিক হন।
বলছিলাম, বায়তুশ শরফের কথা। দেখুন এত গোপনীয়ভাবে বায়তুশ শরফের ভিত্তি দেওয়া সত্ত্বেও আজ সারা দেশে এর নাম কত ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং হচ্ছে। তিনি যেহেতু এ মসজিদকে আল্লাহর দরবারে মঞ্জুর করেছেন এজন্য আজ চতুর্দিকে এর ডঙ্কা বাজছে।
ইখলাসের ওপর কাবা শরীফের ভিত্তি ও পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণের পেছনেও আল্লাহর মহান পয়গাম্বর হযরত ইবরাহীম -এর ইখলাস ও ঐকান্তিকতার ভূমিকা রয়েছে যে কারণে দিন-দিন এর শান বৃদ্ধি পাচ্ছে। হযরত মাওলানা রুমী এ সেই স্মৃতিচারণ করে বলেছেন,
کعبه را کش ہر دمی عربی فزود و ☆ آن از اخلاصات ابراهیم بود
‘যতই দিন-কাল অতিক্রান্ত হচ্ছে ততই কাবা শরীফের শান, মরতবা ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর আল্লাহর ঘরের যিয়ারতকারী হাজীর সংখ্যা বাড়ছে। এর কারণ হলো হযরত ইবরাহীম নিখুঁত ইখলাসের ভিত্তিতে পবিত্র কাবা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছেন।
কাবাঘর নির্জন মরুভূমির পাহাড়-ঘেরা এক নীচু জমিতে অবস্থিত ছিল।
তখন চতুর্দিকে হারাম শরীফের আরও পাশ ঘেঁষে পাহাড় ছিল। এখন অবশ্য পাহাড় কেটে চৌহদ্দি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সফা-মারওয়া পাহাড় এখন হারামের ভেতরে। হযরত ইবরাহীম আপন সন্তান হযরত ইসমাঈল-কে সাথে নিয়ে নির্জন প্রান্তরে একান্ত ইখলাসের সাথে একাজ করেছিলেন। তাই আল্লাহ পাক তাঁর এই খেদমতকে কবুল করেছেন। এমনকি কাবাঘর নির্মাণের সময়ই আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম-এর সাহায্যের জন্য ফেরেশতাদের
মাধ্যমে একটি পাথর পাঠিয়ে দেন যা কাবা শরীফ নির্মাণের সময় সিঁড়ির কাজ দিত। কাবা শরীফের দেয়াল যতই উপরে উঠত ততই পাথরখানি আপনা আপনি উপরে উঠে যেত।
আল্লাহর ঘর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর আল্লাহ পাক হযরত ইবরাহীম
-কে নির্দেশ দিলেন, ‘হে ইবরাহীম! এখন দুনিয়ার মানুষকে আমার ঘর তওয়াফ করতে আসার জন্য ডাক দাও। হযরত ইবরাহীম আরজ করলেন, আমি যত বড় চিৎকার দিয়ে ডাক দেই না কেন তা তো তোমার ঘর-বেষ্টিত পাহাড়ও অতিক্রম করতে পারবে না। আল্লাহ পাক বললেন, ‘তুমি ডাক দাও, সে ডাকের আওয়াজ পৌছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।’ তখন হযরত ইবরাহীম যেহেতু আল্লাহর প্রতি একান্ত তাওয়াক্কুল ও ইখলাস নিয়ে ডাক দিয়েছিলেন। সেহেতু তাঁর আওয়াজ দুনিয়ার সর্বত্র আগত-অনাগত সব মানুষের কানে পৌঁছে গেছে। এমনকি যারা মায়ের পেটে বা পিতার পিঠে ছিল তারাও রুহের জগতে সে ডাক শুনতে পেয়েছে। ডাক শুনে আদম-সন্তানের মধ্যে যারাই লাব্বাইক বলে সাড়া দিয়েছিল জীবনে তারাই আল্লাহর ঘরে গিয়ে হজ করার পরম সৌভাগ্য লাভ করেন। হযরত ইবরাহীম-এর সেই ডাকের জবাব হিসেবে হাজীগণ হজের সময় কুরবানি দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বলতে থাকেন,
لبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَوَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ».
‘আমি হাজির! ইয়া আল্লাহ! তোমার বান্দা তোমার দরবারে উপস্থিত। সমস্ত প্রশংসা ও সকল অনুগ্রহ-নেয়ামত, যাবতীয় রাজ্য ক্ষমতা একান্ত তোমারই, তোমার কোনো শরিক নেই।”
পবিত্র হজের বিশাল রুহানি যিয়াফতের মেজবান হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। আর হযরত ইবরাহীম হচ্ছেন আহ্বানকারী। এজন্য পবিত্র হজে গমনকারীরা স্বয়ং আল্লাহ তাআলার মেহমান। হজ ও ওমরা পালনকারী প্রত্যেকেই আল্লাহর মেহমান। এই ঘটনায় আমাদের জন্য শিক্ষনীয় হলো, হযরত ইবরাহীম ইখলাসের সাথে আল্লাহর ঘর নির্মাণ ও সেই ঘর যিয়ারতের জন্যে ডাক দেওয়ার কারণে আবহমানকাল ধরে সেই ডাকের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে দুনিয়ার সর্বত্র। সেই ঘরের সম্মান আর মর্যাদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনের পর দিন। বায়তুশ শরফ মসজিদের বেলায়ও আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহর অলীর খুলুসিয়তের বদৌলতে অতি-গোপনভাবে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হলেও আজ সারা দেশে এ মসজিদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর প্রতি সর্বশ্রেণির সকল মানুষের ভক্তি ও আকর্ষণ বিদ্যমান রয়েছে। আপনারা যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের অজান্তেই বায়তুশ শরফ মসজিদ প্রতিষ্ঠার মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, সেটাও এই আকর্ষণের অন্যতম প্রমাণ। এই মসজিদ প্রতিষ্ঠার ফলে এর সাথে আমাদের এক ঈমানি মহব্বত কায়েম হয়ে গেছে।
সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য পূরণের মাধ্যম মসজিদ
প্রদত্ত ভাষণের একপর্যায়ে মসজিদের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর বুকে প্রথম যে ঘরটি নির্মিত হয় সেটি ছিল মসজিদ। অর্থাৎ মক্কা নগরীতে অবস্থিত আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ শরীফ। বরকত ও হিদায়তের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে এই ঘর। মসজিদের মাধ্যমেই মানুষ সৃষ্টির পেছনে আল্লাহর মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায়। মসজিদের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে সেজদার স্থান। এ সেজদার আদি তত্ত্বকথা অত্যন্ত সুগভীর। আল্লাহ পাক যখন জগতকে সৃষ্টি করার মনস্থ করলেন তখন আপন নূর থেকে সৃষ্টি করলেন সৃষ্টির সেরা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা -এর নূরকে। সৃষ্টির পর সেই নূর গগনচুম্বী মিনারের মতো হয়ে উপরে উঠতে থাকে। শেষপর্যন্ত আল্লাহর আরশ পর্যন্ত উত্থিত হয়ে সেই নূর আল্লাহর কুদরতের পায়ে সেজদায় নত হয়। সাথে সাথে খুশি হয়ে মহান আল্লাহ বলেন,
لِهَذَا خَلَقْتُكَ وَسَمَّيْتُكَ مُحَمَّدًا».
‘সেজদার জন্যেই আমি আপনাকে সৃষ্টি করেছি এবং মুহাম্মদ (প্রশংসিত) নামে আপনার নামকরণ করেছি।’
বোঝা গেল যে, জগৎ সৃষ্টির মূলে রয়েছেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা, আর তাঁকে সৃষ্টি করার আসল উদ্দেশ্যও হচ্ছে আল্লাহকে সেজদা করা, আল্লাহর দাসত্ব করা। অন্য কথায় সেজদার মাধ্যমেই মানব-সৃষ্টির পেছনে আল্লাহর উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে। আর সেজদার জায়গার নাম হলো মসজিদ। বস্তুত মসজিদ হলো মানব-সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণ করে দেওয়ার মাধ্যম। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
الْمَسْجِدُ لِلصَّلَاةِ وَلِذِكْرِ اللَّهِ وَتِلَاوَةِ الْقُرْآنِ».
নামাজ, আল্লাহর যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে প্রাণবন্ত থাকবে মসজিদ। অবশ্য ইবাদতের অন্য কোনো নির্দিষ্ট ঘরকে মসজিদ বলা হলেও উম্মতে মুহাম্মদী-এর জন্য এর ব্যাপকতা অনেক বেশি। হাটে, পথে, বিলে যেখানেই থাকুক না কেন, বান্দা যখন আল্লাহর কাছে সেজদানত হয় তখন আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য তার নসীব হয়। হযরত রাসুলে করীম ইরশাদ করেন, ‘মানুষ যখন সেজদায় নত হয় তখনই আল্লাহ পাকের সর্বাধিক ঘনিষ্টতা ও সান্নিধ্য অর্জিত হয়।’
এটি হচ্ছে প্র্যাক্টিক্যাল বা আসল নৈকট্য। আমার পীর সাহেব কেবলা ফরমায়েছেন, তরীকতে দাখিল হয়ে পীর-মুরশিদের হাতে হাত দিয়ে যিকির-আযকার প্রভৃতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে কলবকে পবিত্র করা, যাতে সে কলব আল্লাহর কুদরতের পায়ে সেজদায় নত হয়। এটিই হলো তরীকতের সারবস্তু। বান্দা যখন আল্লাহর কুদরতের পায়ে সেজদায় পড়ে যায় তখন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকে না। আল্লাহর সান্নিধ্য ও মিলন লাভের এই দুর্লভ সুযোগ বান্দা লাভ করে মসজিদে নামাজের ভেতর দিয়ে।
হযরত নবী করীম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ الْمُصَلِّيَ يُنَاجِي رَبَّهُ».
‘মুসল্লী আপন প্রভুর সাথে মনের ভাব বিনিময় করে।১
এ কারণে তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
‘নামাযির সামনে দিয়ে যাতায়ত করা গোনাহ কতখানি তা যদি তুমি জানতে, তাহলে প্রয়োজনে চল্লিশ বছরও দাঁড়িয়ে থাকতে হলে তাও তোমার জন্য উত্তম হতো।’
অন্য এক রেওয়ায়তে বর্ণিত হয়েছে,
‘মুসল্লীর সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়াতে যে গোনাহ হয় তা থেকে বাঁচার জন্য তোমার মাটি কেটে ভেতরে ঢুকে যাওয়াই উত্তম।’
প্রশ্ন জাগে, দৃশ্যত এত ছোট কাজের জন্য এত বড় গোনাহ কেন হবে! এর কারণ হলো, উপরের হাদীস অনুযায়ী বান্দা যখন নামাজে দণ্ডায়মান হয় তখন স্বয়ং আল্লাহ তার সম্মুখে হাজির হয়ে যায়। বান্দা আপন প্রভুর সাথে মনের ভাব বিনিময় করে। কাজেই এ অবস্থায় কেউ যদি মুসল্লীর সামনে দিয়ে চলে যায় তাহলে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আল্লাহ আর বান্দার মধ্যে পর্দা বা আড়াল সৃষ্টি হয়। এ কারণেই জঘন্য পাপ হয়ে যায়। নামাজে আমরা সুরা ফাতিহা পড়ার সময় বলি,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
‘রব্বুল আলামীন! আমরা তোমারই ইবাদত করছি এবং তোমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।
আরবি ব্যাকরণে ১৩ (ইয়য়াকা) হচ্ছে সম্বোধনবাচক সর্বনাম। যিনি সামনে থাকে তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমরা তোমারই ইবাদত করছি। কিন্তু তোমার যথাযথ ইবাদতের শক্তি যেহেতু আমার নেই, সেহেতু এই শক্তিদানের জন্য তোমার দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করছি। কোনো আল্লাহঅলা বুযুর্গ বলেছেন, নামাজ পড়লে অন্যকিছু পাওয়া না গেলেও নামাজের মতো নামাজ হলে অন্তত আল্লাহকে পাওয়া যায়।
ملتا ہے کیا نماز میں سجدے میں جاکے دیکھ لے ہو گا خدا کے سامنے سر کو جھکا کے دیکھ لے
‘নামাজের মধ্যে কি পাওয়া যায় একটু মাথা নত করে দেখে নাও। দেখবে যে, তুমি স্বয়ং আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়েছ একটু মাথা ঝুকিয়ে অবলোকন কর।’
স্বয়ং নবী করীম ইরশাদ করেছেন,
الصَّلَاةُ مِعْرَاجُ الْمُؤْمِنِينَ».
‘নামাজ মুমিনদের জন্য মি’রাজ।’
মি’রাজের অভিধানিক অর্থ সিঁড়ি যা দিয়ে উপরে উঠা যায় অর্থাৎ আরশে নামাজের সিঁড়ি দিয়েই আল্লাহর দর্শন লাভ করা যায়। নবী করীম আযীমে গিয়ে, হযরত মুসা এ তুর পাহাড়ে গিয়ে, হযরত ইবরাহীম নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে, হযরত ঈসা শূলির উপরে, হযরত ইউনুস মাছের পেটের ভেতরে, হযরত ইউসুফ কুয়োর মধ্যে, হযরত যাকারিয়া গাছের ভেতরে আল্লাহর দিদার বা মি’রাজ লাভ করেন। অথচ উম্মতে মুহাম্মদী সমুদ্রে কত বড় সৌভাগ্যবান। আমরা দুর্বল হলেও ফিতনা-ফাসাদের জমানায় হলেও আমাদের মূল্য কত অধিক! আল্লাহর দর্শন লাভের মতো সার্বজনীন সুযোগ উম্মতে মুহাম্মদী-কে দেওয়া হয়েছে নামাজের মাধ্যমে। হায়, আমরা যে নিজের মূল্য বুঝলাম না।
উম্মতে মুহাম্মদী-এর অতুলনীয় সৌভাগ্য
হযরত ঈসা কত বড় পয়গাম্বর। অথচ তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছেন, ইয়া আল্লাহ! আমাকে যদি নবী না বানিয়ে হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা -এর উম্মত করে পাঠাতেন তাহলে কতইনা উত্তম হতো। আল্লাহ পাক সেই দোয়া কবুল করেছেন। তাই আখেরি জমানায় হযরত ঈসা পুনরায় দুনিয়ায় আসবেন। তখন তিনি যতদিন দুনিয়ায় থাকবেন উম্মতে মুহাম্মদী হয়েই থাকবেন, নবী হয়ে নয়। হযরত মাওলানা আবদুর রহমান জামী এ পরম সৌভাগ্যের জন্য অন্তর মিশিয়ে কত সুন্দর কথাই না বলেছেন,
بریں نازم که هستم امت تو ہو گنهگارم و لیکن خوش نصیبم
‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি এজন্যই বড় গৌরবান্বিত যে, আমি আপনার উম্মত। আমি গোনাহগার হলেও বড়ই সৌভাগ্যবান।’
আল্লাহর নবী মি’রাজে গিয়ে আমাদের জন্য আল্লাহর দরবার হতে উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন এই নামায়। অর্থাৎ দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মাধ্যমে মি’রাজ লাভের সুযোগ এনে দিয়েছেন আমাদেরকে।
আল্লাহর এই মহান সৌভাগ্য লাভের জন্য মসজিদের সাথে জড়িত হওয়া এবং তাতে নিজের অর্থ, শক্তি ও শ্রম দিয়ে শরিক হওয়া কত বড় সৌভাগ্যের কাজ! কিয়ামতের দিনও এ চেষ্টা নাজাত লাভের উসিলা হবে ইনশাআল্লাহ।
খানায়ে কাবার বেহেশত যাত্রা
কিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক খানায়ে কাবাকে নির্দেশ দেবেন, হে কাবাঘর! তুমি যে অবস্থায় আছ সে অবস্থায় চলে এসো এবং বেহেশতে চলে যাও। তখন কাবাঘর বলবে, আমার সন্তানদের তথা দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মসজিদগুলোকে ছেড়ে তো বেহেশতে যেতে পারব না। তখন আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার সমস্ত মসজিদকে কাবাঘরের সাথে বেহেশতে যাওয়ার হুকুম দেবেন। তখন মসজিদগুলো বলবে, হে আল্লাহ! আমরা তো প্রথমে অস্তিত্বহীন মাটি ছিলাম, কিন্তু তোমার বান্দারাই নিজের সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে আমাদেরকে তৈরি করেছে, আমাদের মধ্যে তোমার ইবাদত-বন্দেগি করে আমাকে মসজিদের মর্যাদা দিয়েছে। আমরা তাঁদেরকে ছেড়ে কিভাবে একা বেহেশতে যেতে পারি?
মূলত মসজিদ নির্মাণ করা এবং মসজিদের সাথে সম্পর্ক রাখা ব্যক্তির ঈমানদারিরই পরিচায়ক। যেমন- হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, অর্থাৎ ‘কোনো মানুষকে যদি দেখ যে, সে মসজিদের দেখাশোনা করছে, যত্ন নিচ্ছে, তাকে তোমরা ইমানদার বলে সাক্ষ্য দিতে পার।’ এই মসজিদসমূহের পরিচালনার জন্য অনিবার্য প্রয়োজন হলো মাদরাসা। মাদরাসা ও মসজিদ একটি অন্যটির পরিপূরক। মসজিদ ও মাদরাসার জন্য যা কিছু দান করা হয়, তাকে আল্লাহ তাআলা বহুগুণ বৃদ্ধি করে কিয়ামতের দিন বান্দার কাছে ফেরৎ দেবেন।
হযরত নবী করীম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় করবে তা আল্লাহ তাআলা এমনভাবে লালিত-পালিত করে বৃদ্ধি করেন, যেমনটি নিজেদের মেষ-পালকে তোমরা লালন-পালন করে বৃদ্ধি কর। এরপর বিরাট ও বিশাল আকারে কিয়ামতের দিন তোমাদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে।’ কুরআন মজীদেও আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন,
وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِّنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ نْ
‘তোমরা নিজেদের জন্য (আল্লাহর রাস্তায়) যা দান করবে তা আল্লাহর কাছে মজুদ পাবে।”
যে পরিমাণ ও আকারে দিয়েছিলে শুধু কি সে পরিমাণই পাওয়া যাবে? আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ পাক বলেন,
هُوَ خَيْرًا وَ أَعْظَمَ أَجْرًانُ
‘যা প্রতিদানে মিলবে তা অনেক উত্তম এবং সওয়াব ও প্রতিদানের দিক থেকে অনেক বড়।
অলী-আল্লাহদের কথা
চরজব্বার ইউনিয়নে প্রদত্ত ভাষণে বায়তুশ শরফের পীর সাহেব কেবলা আরও বলেন, অলী-আল্লাহদের নিয়ত যেমন নিখুঁত, তেমনি তাঁদের কথাও মানুষের অন্তরস্পর্শী। কারণ তাঁদের কথা হচ্ছে কুরআন-হাদীসের সারনির্যাস। অনেকে বলেন, আমরা পীরের কথা মানি না, কুরআন-হাদীসই মানি। এ ধরনের লোকদেরকে প্রশ্ন করা যায় যে, তাহলে আপনি দুধকে স্বীকার করতে রাজি, দুধের দ্বারা তৈরি রসগোল্লা, দধি ও সন্দেশ মানতে রাজি নন। আল্লাহর অলীদের কথায় রুহ থাকে, উপদেশ থাকে। তাই আমরা ওয়াজের সময় বেশি বেশি তাঁদের কথার উদ্ধৃতি দেই।
ভণ্ড পীর
আলোচনার একপর্যায়ে পীর সাহেব কেবলা ভণ্ড পীর ও মারফতিদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তারা নাকি বলে যে, নামাজের দরকার নেই, মা’রিফত থাকলেই হবে। আর আমাদেরটা নাকি শরীয়ত, মা’রিফত নয়। আমি এক কথায় বলতে চাই, শরীয়ত, মা’রিফত, তরীকত ও হাকীকত সবকিছুর মূল হচ্ছে হাবীবে খোদা। কাজেই আল্লাহর হাবীবের আনিত কুরআন ও হাদীস তথা শরীয়ত ছাড়া কোনো দিন মা’রিফত, তরীকত, হাকীকত কিছুই হবেনা। যেমন দুধের অস্তিত্ব না হলে দই, মিষ্টি, মাখন, সন্দেশ প্রভৃতি কোনো কিছুরই অস্তিত্ব কামনা করা যাবে না। হযরত শেখ সা’দী কত সুন্দর বলেছেন,
خلاف پیمبر کے رہ گزید کہ ہر گز بمنزل نخواهد رسید
‘যে কেউ পয়গাম্বর-এর প্রদর্শিত পথভিন্ন অন্য পথ অবলম্বন করবে কোনো দিনই সে মনযিলে মকসুদে পৌঁছতে পারবে না।’
পীরকে সেজদা করা বা মুরীদের সেজদা নেওয়ার তীব্র সমালোচানা করে তিনি বলেন, তারা বলে, যেহেতু পীরের মধ্যে খোদা ঢুকে গেছে, সেহেতু পীরকে সেজদা করা হয়। আমি বলবো, দুনিয়ার সব পীরকেও যদি একত্রিত করা হয়, তাতে সবাই মিলে হাবীবে খোদা-এর এক লোমের পরিমাণও হবে না। পীরের মধ্যে যদি খোদা ঢুকে থাকে তাহলে সাইয়েদুল আম্বিয়ার মধ্যে আরও ভালোভাবে ঢোকা উচিত ছিল এবং সাইয়েদুল আম্বিয়াকে সেজদা করাই সাহাবায়ে কেরামের কর্তব্য ছিল। অথচ সাহাবায়ে কেরামের কেউই কখনও হযরত নবী করীম-কে সেজদা করেননি। আসলে এসব মা’রিফত নয়, মারে…পথ। এরা মূর্খ, ভণ্ড, অজ্ঞ, আল্লাহকে পাওয়ার পথে ওত পেতে থাকা ডাকু।
আমার পীর সাহেব কেবলা বলেছিলেন, তারা বলে থাকে যে, আমরা পীরকে সেজদায়ে তাহিয়া করি। অর্থাৎ সম্মানসূচক সালামের স্থলে সেজদা করি। ইসলামে সালাম দেওয়া ও নেওয়ার নিয়ম আছে। কোনো মুসলমান অন্য মুসলমানের সাথে সাক্ষাৎ করলে সালাম দেওয়া সুন্নত এবং সেই সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব।
অনুরূপভাবে কারও মৃত্যুর সংবাদ শুনলে إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِرْجِعُونَ )ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) পড়া, কেউ হাঁচি দিয়ে الْحَمْدُ )আল-হামদু লিল্লাহ) বললে برحمك الله )ইয়ারহামু কুল্লাহ) বলে তার জবাব দেওয়া, রোগগ্রস্ত লোকদের দেখতে যাওয়া এবং কেউ মারা গেলে তার সম্মানে জানাযা পড়া কর্তব্য, সালাম বিনিময়ের নিয়ম সম্পর্কে কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে,
وَإِذَا حُمِّيْتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا
যদি তোমাদেরকে সালাম দেওয়া হয়, তাহলে তার চেয়ে উত্তম ও সুন্দরভাবে তোমরা সালামের জবাব দাও অথবা যেভাবে সালাম দিয়েছে তার সমান।”
উদাহরণস্বরূপ কেউ যদি সালাম দিতে গিয়ে বলে, السَّلَامُ عَلَيْكُمْ )আ সালামু আলাইকুম) তাহলে জবাবের সুন্দর পদ্ধতি হচ্ছে, وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ الله )ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ) বলা। আর যদি সালামের সময় বলে, السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ )আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ(, 22 ) وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ الله وَبَرَكَاتُهُ 204 5919 RC সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু)। যদি সালাম দানকারীর মতো হুবহু জবাব দেয় তাতেও আদায় হয়ে যাবে। এখন যদি কুরআনে বর্ণিত সালামের জন্যই পীরকে সেজদায়ে তাহিয়া করা হয় তাহলে সেই সেজদা দেওয়া ও নেওয়ার নিয়ম হবে, কুরআনের হুকুম অনুযায়ী। মুরিদ পীরের পায়ে একটি সেজদা করলে, জবাবে পীরকে মুরীদের পায়ে দুটি সেজদা দিতে হবে। এটা হবে উত্তম পদ্ধতি। তা না হলে অন্তত একটা সেজদা হলেও প্রদান করতে হবে। অন্যথায় আল্লাহর আদেশ অমান্য করা হবে।
আসল কথা হলো, আল্লাহ পাক মানব-দেহে দুটি অংশ নিজের কুদরতের হাতে তৈরি করেছেন। কলব আর কপাল। দেহের বাকি অংশ ফেরেশতাদের মাধ্যমে তৈরি করেছেন। ফেরেশতাদের তৈরি অংশ বা অঙ্গগুলো দীনী ও দুনিয়াবি কাজের জন্য সমানভাবে ব্যবহার করা জায়েয। কিন্তু আল্লাহর বানানো অংশ দুটি আত্মা ও কপাল গায়রুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই।
আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তওফিক দান করুন। আমীন।
গ্রন্থনায়: ড. মাওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
Leave a Reply