বাগেরহাটে বায়তুশ শরফের মাহফিলে ইছালে সাওয়াবের ইতিবৃত্ত।

-অধ্যাপক শাব্বির আহমদ

১২০৩ থেকে শুরু করে ১৭৫৭ খ্রিঃ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচশ বছর মুসলমান সুলতান- সুবেদার- নবাব- নাযিমগণ তৎকালীন বঙ্গ শাসন করলেও এদেশে তাঁরা ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আশানুরূপ ভূমিকা পালন করেননি। এতদঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটেছে মূলত আউলিয়ায়ে কেরামের অক্লান্ত সাধনা, ত্যাগ-তিতিক্ষা আর কুরবানির মাধ্যমে। ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর বঙ্গ দেশের শাসনভার চলে যায় কার্যত: ইংরেজদের হাতে। ইংরেজরা ক্ষমতায় আসায় হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজ শাসকদের আনুকূল্য লাভ করে। আর শাসনক্ষমতা হারিয়ে ক্রমেই পিছিয়ে পড়তে থাকেন মুসলমানরা। শুধু তাই নয়, ইংরেজগণ যেহেতু মুসলিম শাসকের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন, সেহেতু মুসলমানদেরকে তারা সবসময় শত্রুজ্ঞানে নিপীড়নের লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করতো। যার ফলে মুসলমানদেরকে শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখে দাবিয়ে রাখার কৌশল-ই ছিল ইংরেজদের তথাকথিত শাসন নীতি। এরই ফলশ্রুতিতে দু’শো বছরের ইংরেজ শাসনকালে এদেশের মুসলিম জমিদারগণ পরিণত হন ভিখারিতে। কালক্রমে এমন একটা সময় আসে, শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে পড়তে পড়তে মুসলমানগণ নিজেদের স্বকীয়তা, মর্যাদা এবং আভিজাত্য সবকিছু হারিয়ে ফেলে। এমনকি, গ্রাম-গঞ্জের মুসলমানগণ ভুলে যেতে থাকেন শরীয়ত ও ইসলামী জীবন বিধান। সুলতানি আমলে মসজিদ মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য এবং স্থানীয় মুসলমানদের মাঝে নামাজ- রোজা- হজ্ব, যাকাত এবং জরুরি মাসআলা- মাসায়েল শিক্ষা দেওয়ার জন্য আলেম-ওলামাদের বিশালাকার ‘লা-খারাজ’ (বিনা খাজনায়) সম্পত্তির জায়গীরদার নিয়োগ দেওয়া হতো। ‘ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এসব লাখারাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করলে অসংখ্য আলেম ওলামা ও ধর্ম প্রচারক অর্থনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় পড়ে যায়। বাজেয়াপ্তের মধ্যে অসংখ্য মসজিদ-মাদ্রাসা, খানকাহও ছিল। ফলে সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ইসলা-ে মর মৌলিক শিক্ষার মারাত্মক দৈন্যতা দেখা দেয়।

তাদের আচার-আচরণে, চাল-চলন ও পোশাক-পরিচ্ছদে এসে যায় হিন্দুয়ানী প্রথা ও নানান কুসংস্কার। অনেক মসজিদে আযান বন্ধ হয়ে যায়। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায ও রোযার কথাও ভুলে যায় অনেকে। আবার অনেকে তাসাউফ ও সূফীবাদের নামে পীর- দরবেশদের আল্লাহর অবতার বা বিশেষ “ঐশ্বরিক” ক্ষমতার অধিকারী বলে গণ্য করে তাদেরকে এবং তাদের মাযারে সেজদা শুরু করে দেয়। শরীয়তের আহকাম পালনকে গুরুত্বহীন মনে করে গান-বাজনা ও নৃত্যগীতিকে সূফী ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে গণ্য করতে থাকে। গ্রাম-লোকালয়ে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি মুসলমানদের জীবন-যাত্রায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। গ্রাম-বাংলায় হিন্দুদের পূজা-পার্বণে অনেক মুসলমান ঘরেও দেখা যেত উৎসব।

এই সময় ফকির লালন শাহ (১৭ অক্টোবর ১৭৭৪-১৭ অক্টোবর ১৮৯০) নামের এক বাউলের আবির্ভাব ঘটে। অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক লালনকে আউলিয়া দরবেশ অভিহিত করে কিছু লোক প্রচার শুরু করে। যে ব্যক্তি জীবনে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়েন নি, একটি রোজা রাখেন নি, যিনি চৈত্র-মাসের দোল পূর্ণিমাকে গ্রহণ করেছেন তার বাৎসরিক পূণ্যযজ্ঞের মাহেন্দ্র রজনীরূপে, যিনি যাপন করেছেন ইসলামের সঙ্গে গুরুতরভাবে সাংঘর্ষিক এক মুশরেকী জীবন, যার শিষ্য প্রশিষ্যদের আধ্যাত্মিক সাধনার শ্রেষ্ঠতম অনুপান গঞ্জিকা (গাঁজা)-তিনিও বনে যান একজন আউলিয়া!! স্মর্তব্য, বাউলেরা বরাবরই রাগপন্থী। কামাচার বা মিথুনাতত্মক যোগ সাধনই বাউল পদ্ধতি। বাউল সম্প্রদায় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকায় অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলিমও ধর্মবিবর্জিত বিকৃত যৌনাচারী পরনে সফেদ লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, হাতে গলায় চুড়ি, আর মাথায় গেরুয়াধারী সংসারত্যাগী এই মানুষগুলোকে সূফী-সাধকের আসনে বসিয়ে দেয়। বাউল তত্ত্ব কি, তা বুঝে নিতে ড. আহমদ শরীফের একটি উক্তিই যথেষ্ট। তিনি বলেছেন, “বাউল সাধনাকে মূলত আধ্যাত্মসাধনা বলা হলেও যৌনাচার এই সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ।” তাঁর ভাষায়, কামাচার বা মিথুনাত্মক যোগসাধনাই বাউল পদ্ধতি। বাউল সাধনায় পরকীয়া প্রেম এবং গাঁজা সেবন প্রচলিত। বাউলরা বিশ্বাস করে যে, কুমারী মেয়ের রজঃপান (ঋতুস্রাবের রক্ত) করলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি তৈরী হয়- নাউজুবিল্লাহ। তাই বাউলদের মধ্যে রজঃপান একটি সাধারন ঘটনা। একজন বাউলের একাধিক সেবাদাসী থাকে। বাউলরা তাদের বিকৃত ও কুৎসিত জীবনাচারণকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখার জন্য বিভিন্ন গানে মোকাম, মঞ্জিল, আল্লাহ, রাসূল, আনল-হক, আদম-হাওয়া, মুহাম্মদ-খাদিজা, হাসান-হোসাইনসহ বিভিন্ন আরবী পরিভাষা, আরবী হরফ ও বাংলা শব্দ প্রতীকরূপে ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্যবহার করে থাকে। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি ছেউড়িয়ায় মূল আস্তানা হলেও বাউলরা যশোর, খুলনা, রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন মাজার, মসজিদকে আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে অনৈসলামিক যতোসব কর্মকান্ড শুরু করে দেয়। যুগ যুগ ধরে চলতে থাকে তাদের এসব তৎপরতা। কুষ্টিয়ার কুমারখালি ছেউড়িয়ার লালন মেলার পর সবচেয়ে বড় মেলা বসতো বাগেরহাটে হযরত খানজাহান আলী (রাহ.)’র মাজার ও ষাট গম্বুজ মসজিদ এলাকায়। যুগ যুগ ধরে প্রতি বছর চৈত্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বার্ষিক এই মেলা অনুষ্ঠিত হতো। দূরদূরান্ত থেকে ডুগি-একতারা ও গাঁজার কল্কি নিয়ে ‘সাধক পুরুষ’ এর আগমন ঘটতো মেলাতে এবং বাউল শিল্পীরা লালনগীতি, পল্লীগীতি, ভাটিয়ালী, মারফতি গানের আসর জমাতো। মাজারের দীঘিরপাড়ে রাত ভর চলতো গান-বাজনা। মেলাকে কেন্দ্র করে দোকানীরা গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের বাহরী সম্ভার ও পসরা নিয়ে হাজির হতো মেলা প্রাঙ্গনে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভক্তবৃন্দের পদচারনায় মিলন মেলায়

পরিণত হতো হযরত খানজাহান (রাহ.)’র মাজার প্রাঙ্গন। বাউলদের অপতৎপরায় সুদীর্ঘকাল ধরে আযান-নামাজ বন্ধ ছিল বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদে।

আগেই বলেছি, এতদঞ্চলে যুগযুগ ধরে ইসলাম

এসেছে পীর, মাশায়েখ এবং আউলিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমে।

তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মুসলমানদের দুর্দিনেও এগিয়ে এসেছিলেন পীর, মাশায়েখ, আউ-ি লয়ায়ে কেরাম। ইসলাম ধর্মের প্রচার ও হিদায়েত কাজে তাঁরা ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলার গ্রামে- গ্রামে, পাড়া-মহল্লায়। মুসলমানদের ফিরিয়ে এনেছেন সঠিক পথে। তাঁদের বদৌলতে অনেক মসজিদে আবার শুরু হয়েছিল আযান, নামায-রোজা এবং শরীয়ত মোতাবেক শুরু হয়েছিল মুসলমানদের জীবন যাপন। এমন একজন পীর হলেন বায়তুশ শরফের প্রধান রূপকার মুজাদ্দেদে যামান আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.)। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে শিরক-বিদ’আত ও শরীয়তবিরোধী কর্মকান্ড প্রতিরোধ ও সংস্কার আন্দোলনের ডাক দেন তিনি। তারই অংশ হিসেবে ১৯৭৭ সালে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বড়হাতিয়ার ঐতিহাসিক ছিদ্দিক মিয়ার বলি খেলা ও গরুর লড়াই এবং চট্টগ্রামের ১২ আউলিয়ার অন্যতম লোহাগাড়ার দরবেশহাট সংলগ্ন শাহপীর আউলিয়ার মাজারে ওরশের নামে শরীয়ত বিরোধী অশ্লীল কর্মকান্ড বন্ধ করে মাহফিলে ইছালে সাওয়াবের প্রবর্তন করেন। ইলমে শরীয়ত ও তরিকতের খেদমতের আজা-ে মর পাশাপাশি বিভিন্ন সেবা ও সংস্কারমূলক কর্মকান্ডের বদৌলতে এই মহান মনীষীর সুনাম- সুখ্যাতি এসময় সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গদেশে ইসলাম প্রচারকদের অন্যতম হযরত খানজাহান আলী (রাহ.)’র মাজার প্রাঙ্গন এবং তাঁরই গড়া ষাট গম্বুজ মসজিদে আজান- নামাজ বন্ধের সংবাদ আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.)-কে ভীষণভাবে পীড়া দেয়। বলার অপেক্ষা রাখেনা, সুলতানি আমলে নির্মিত বিশাল এই মসজিদ ভারত উপমহাদেশে চিত্তাকর্ষক মুসলিম স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে বর্ণনা করে ইউনেস্কো। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে এ মসজিদটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। সরকারের প্রত্নতত্ত্ব ও যাদুঘর বিভাগ পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণের জন্য এই ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ এবং খানজাহান (রাহ.)’র মাজারের দায়িত্বভার গ্রহণ করে।

ধারনা করা পঞ্চদশ হয়, শতাব্দীতে ‘খান-উল-আজম উলুঘ খান ই জাহান (খানজাহান আলী নামে বেশি পরিচিত) মসজিদটি নির্মাণ করেন। ষাট গম্বুজ মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় ৮ক্স৫ ফুট পুরু। তুঘলকি ও জৌনপুরী নির্মাণশৈলী এতে সুস্পষ্ট। খানজাহান আলী ১৪৪০ সালের দিকে ভক্ত ও আশেকানদের নিয়ে বাগেরহাটে আসেন। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে রত ছিলেন। ১৪৫৯ সালের ২৩ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন (৮৬৩ হিজরি ২৬ জিলহজ্ব)। ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি মানব সেবার ব্রত নিয়ে তিনি এ অঞ্চলে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে তার শাসনকার্য পরিচালনা করেন। সুলতান নসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-৫৯) আমলে খান উল-আজম উলুঘ খান ই জাহান সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে ‘খলিফাবাদ’ একটি রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ ভন্ড দরবেশ ও বাউল সন্ন্যাসীদের কবল থেকে মুক্ত করে মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত করার সুদূর পরিকল্পনা নিয়ে যুগের মুজাদ্দিদ আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.) খুলনা বাগেরহাট এলাকার বিশিষ্ট ওলামা মাশায়েখদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি খুলনা বড় মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে অংশগ্রহণ করে ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ এবং খানজাহান (রাহ)’র মাজারের করুণ কাহিনী শুনে খুবই ব্যথিত হন। কারো সাথে বিরোধ কিংবা সংঘাতে না জড়িয়ে পরবর্তী বছর চৈত্র পূর্ণিমায় ওরশ ও মেলার সময় ষাট গম্বুজ মসজিদ চত্বরে তিনদিনব্যাপী ইছালে সাওয়াব মাহফিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। হুজুর কেবলা বুঝতে পেরেছিলেন ওরশ ও মেলার নামে যুগ যুগ ধরে চলে আসা শিরক- বিদআত, কুসংস্কার হুট করে বন্ধ করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি রাতারাতি পরিবর্তন আনাও সম্ভব নয়। তিনি যোগাযোগ শুরু করলেন ষাট গম্বুজ মসজিদ কেন্দ্রিক মেলা কমিটি ও মাজার কমিটির লোকদের সাথে। তাদের সাথে একাধিক বৈঠকের আয়োজন করে ওরশ ও মেলার নামে অনৈসলামিক যতোসব অপকর্ম তুলে ধরে এসবের কুফল সম্পর্কে বুঝাতে চেষ্টা করেন। অনেকেই সাড়া দিলেন, আবার অনেকেই আর্থিক লোভ সামলাতে না পেরে বিরোধিতা শুরু করলেন। হুজুর কেবলা উভয় কমিটির সদস্যদের ডেকে মেলা এবং ওরশ থেকে কতো আয় হয় তা জেনে সেই পরিমাণ নগদ অর্থ তাদের হাতে তুলে দেন প্রথম বছরের মাহফিলকে বাধাহীন ও নিষ্কন্টক করতে। এতে কমিটির লোকজন সন্তুষ্টচিত্রে সম্মতি দিলে ১৯৭৯ সালে যুগের মহান সংস্কারক আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.) শতাধিক আলেম ওলামাসহ বিরাট এক তৌহিদী কাফেলা নিয়ে তিনদিনব্যাপী ইছালে সাওয়াব মাহফিল আয়োজনের লক্ষ্যে ষাট গম্বুজ মসজিদ ও খানজাহান আলী (রাহ.)’র মাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বায়তুশ শরফের হুজুর কেবলার আগমনের খবর পেয়ে বাগেরহাট, খুলনা, বরিশাল, পিরোজপুরের বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষক সদলবলে উপস্থিত হলে বিশাল মাহফিলের রূপ পরিগ্রহ করে। ঐতিহাসিক ঐ সময়ে মরহুম হুজুর কেবলার সাথে ছিলেন এমন অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য মতে, হযরত খানজাহান আলী (রাহ.)’র স্মৃতিধন্য ষাট গম্বুজ মসজিদের করুণ দৃশ্য দেখে মরহুম হুজুর কেবলা অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তখন মসজিদে আযান- নামাজ কিছুই হতো না। ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জুতা পায়ে মসজিদে ঢুকে পড়তো। মসজিদের অভ্যন্তরে বাউল সন্নাসীরা আস্তানা গেড়ে বসে। তাদের আস্তানায় বাউল নারী পুরুষ গান-বাজনায় মত্ত থাকতো। মানতের উদ্দেশ্যে মসজিদের কিছু স্তম্ভের চুনা, পাথর ও ইট খুলে নিতো পুত্রসন্তান লাভ, বিয়ে ও ব্যবসায় উন্নতি লাভের আশায়। একশ্রেণীর ভন্ড ফকির নানা উপকারের কথা বলে এসব স্তন্তের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে টাকা ইনকাম করতো। শরাব আর গাঁজার বিদঘুটে গন্ধ লেগেই থাকতো। মসজিদের অভ্যন্তরে ছিল খড়কুট আর জঞ্জালের স্তুপ। মরহুম হুজুর কেবলা স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি নিজেও মসজিদের অভ্যন্তরের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কারের কাজে অংশ নিয়েছিলেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, মসজিদের অভ্যন্তরে মূল ফ্লোর পর্যন্ত পৌঁছতে কয়েক ফুট ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে হয়েছিল ঐ সময়। মরহুম হুজুর কেবলা (রাহ.) মেলা চলাকালীন তিনদিন মসজিদের গেইটে দ্বাররক্ষী হিসেবে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিয়েছিলেন, যাতে নামাজী ছাড়া কেউ ঢুকতে না পারে। তিনি মাহফিলে তদানীন্তন স্থানীয় এমপি, ডিসি, এসপি, টিএনও, ওসি, মেম্বার-চেয়ারম্যানসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাতেন। শিরক, বিদআত, নানা কুসংস্কারের স্থলে এতো সুন্দর ও সুশৃঙ্খল মাহফিলের আয়োজন দেখে আগত অতিথিরা বিমোহিত বিমুগ্ধ হতেন।

১৯৮৯ সালে প্রথমবার তিনদিনব্যাপী মাহফিলের দুইদিন ষাট গম্বুজ মসজিদ চত্বরে, একদিন খানজাহান আলী (রাহ.)’র মাজার এলাকায় আয়োজন করেন। তৃতীয়দিন হুজুর কেবলার নেতৃত্বে মাজারমুখী বিশাল কাফেলার কথা এখনো স্থানীয় লোকেমুখে রূপকথার কাহিনীর মতো। বঙ্গদেশে ইসলাম প্রচারে হযরত খানজাহান আলী (রাহ.)’র বিশাল অবদানের কথা তুলে মহান এই অলির মাজারকে শিরক, বিদআত মুক্ত রাখার জন্য মোতাওয়াল্লী পরিবারসহ স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা কামনা করে মরহুম হুজুর কেবলা সেইদিন আবেগঘন ও হৃদয়াগ্রাহী যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তা স্থানীয়দের মনোবৃত্তিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। মোতাওয়াল্লী পরিবারারের অনেকে প্রথম প্রথম শাহ আবদুল জব্বার (রাহ)’র মহৎ এই উদ্যোগকে ভালোভাবে না নিলেও তিনি হেকমত অবলম্বনের মাধ্যমে তাদের বশে আনেন। এদিকে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও আলেম সমাজ হুজুর কেবলার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করায় ধীরে ধীরে পরিস্থিতি অনুকূল হতে থাকে।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে এলাকার প্রভাবশালী মরহুম ছিদ্দিকুর রহমান ও মরহুম আবদুল বারিক সর্দারের আতিথেয়তা, এখলাছ আন্তরিকতা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

মুজাদ্দিদে জামান আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.) ষাট গম্বুজ মসজিদ আবাদ করেই ক্ষান্ত থাকেননি, তিনি নিজ খরচায় মসজিদের জন্য ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগ দেন এবং স্থানীয় লোকদের দিয়ে একটি মসজিদ কমিটিও গঠন করে দেন। শুধু তাই নয়, মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বায়তুশ শরফ আনজুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ এর উপর ছেড়ে দিতে হাইকোর্টে রীটও করেছিলেন মহান এই মুর্শিদ। তিনি মসজিদ সংলগ্নে প্রতিষ্ঠা

করেন ষাট গম্বুজ বায়তুশ শরফ

আদর্শ দাখিল মাদ্রাসা। ১৯৯৮ সালের ২৫ মার্চ

ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি প্রতিবছর চট্টগ্রাম থেকে বিশাল কাফেলা সহকারে বাগেরহাটের তিনদিনব্যাপী ইছালে সাওয়াব মাহফিলে অংশ নিতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর বায়তুশ শরফের মরহুম পীর সাহেব বাহরুল উলুম আল্লামা শাহ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (রাহ.) অত্যন্ত সুচারুভাবে মাহফিলের আঞ্জাম দেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ষাট গম্বুজ বায়তুশ শরফ আদর্শ দাখিল মাদ্রাসা আলিম স্তরে উন্নীত হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় বায়তুশ শরফ শাহ জব্বারিয়া এতিমখানা, হেফজখানা। মরহুম পীর সাহেব বাহরুল উলুম আল্লামা শাহ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (রাহ.)’র ইন্তেকালের পর করোনাজনিত কারণে দুই বৎসর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়নি। রাহবারে বায়তুশ শরফ আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভী (মা.জি.আ)’র নেতৃত্বে ২০২২ সাল থেকে বাগেরহাটের তিনদিনব্যাপী ইছালে সাওয়াব মাহফিল নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ২০২৬ সালের তিনদিনব্যাপী ৪৮তম ইছালে সাওয়াব মাহফিল ২,৩ ও ৪ এপ্রিল, রোজ বৃহস্পতিবার, জুমাবার ও শনিবার অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৬ সালের মাহফিল ছিল বিগত ছয়/সাত বছরের মধ্যে সবচেয়ে সফল এবং ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্য, বাগেরহাটের জেলা পরিষদের প্রশাসক ও ডিসিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। চট্টগ্রাম থেকে প্রায় এক হাজার বায়তুশ শরফের ভক্ত-মুরিদ মাহফিলে অংশ নেন।

বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও হযরত খানজাহান আলী (রাহ)’র মাজারকে কেন্দ্র করে যুগযুগ ধরে চলে আসা শিরক-বিদ’আতের আখড়ার মূলোৎপাটন করে ১৯৭৯ সালে মুজাদ্দিদে যামান আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রাহ.) যে ইমানী-রূহানী ইছালে সাওয়াব মাহফিলের সূচনা হয়েছিল সেই মাহফিলকে কেয়ামত পর্যন্ত যেন দায়েম-কায়েম রাখেন- তার জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ জানাচ্ছি।

লেখক পরিচিতিঃ

শিক্ষক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

প্রকাশনায়:

আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার ফাউন্ডেশন

বায়তুশ শরফ জিলানী মার্কেট, আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার রাহ, সড়ক (ডি. টি. রোড), ধনিয়ালাপাড়া,

চট্টগ্রাম-৪১০০।