বাংলাদেশের অভ্যন্তর পেরিয়ে চিন্তা ও গবেষণার জগতে বিশ্বব্যাপী ভিন্নধারার আধ্যাত্মিক চেতনা সৃষ্টির অন্যতম পুরোধা হলেন বায়তুশ শরফের প্রধান রূপকার হাদীয়ে যামান আল্লামা শাহ মুহাম্মদ আব্দুল জব্বার রহ.। মসজিদভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা, মানবসেবার অনন্য নযীর তিনি স্থাপন করেছেন। তাঁর চিন্তার উৎকর্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গির দূরদর্শিতা, হৃদয়ের উদারতা ও অনুভবের গভীরতা প্রচলিত সূফীবাদ- পীর-মুরীদি ব্যবস্থাপনা এবং দরবার সম্পর্কে সাধারণ চিন্তাশীল মানুষের চিন্তার রাজ্যে আমূল পরিবর্তন এনেছে। ত্বরিকত চর্চায় নিজেকে খানকাহর কোণে আবদ্ধ না রেখে দ্বীনের চর্তুমুখী মানবিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে যথাযথ খেদমত আঞ্জাম দেয়ার অগ্রসৈনিক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে আল্লাহ্ স্মরণের পাশাপাশি ভারসাম্যপূর্ণ জাগতিক চিন্তার সমন্বয়ের নিপুণ কারিগর ছিলেন। ব্যতিক্রমী ও অতুলনীয় গবেষণার জগতে বিচরণকারী হিসেবে তিনি সাফল্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেন।
তিনি রাসূল সা. এর সুন্নাতের অনুসরণে রাব্বুল ইয্যতের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিরলসভাবে রূহানী শক্তি দিয়ে সমাজ তথা রাষ্ট্রের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ পুরুষ ছিলেন। আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কুরআনে “আহলুয যিকর” তথা “জ্ঞানের অধিকারী” যাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন তার সকল মাহাত্ম্য অর্জনে তিনি সদা সচেষ্ট ছিলেন। “যিকর” শব্দটি কুরআনে যে কয়টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখে ছিলেন। ত্বরিকতের নিয়মিত যিকরের পাশাপাশি “যিকর” শব্দের অন্যান্য উদ্দেশ্যগুলোর বাস্তবায়নে সূক্ষ্ম দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির সুফল জাতি ভোগ করছে। আল্লাহ্ তাআলা আল-কুরআনে যিকর শব্দটি কুরআন অর্থে ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ্ বলেন, নিশ্চয় আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি আর অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক। (সূরা হিজর-৯) পাশাপাশি আল্লাহ্ ‘যিকর’ শব্দটি সালাত, জুমুআ, তাসবীহ, আল্লাহ্ স্মরণ ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহার করেছেন। আল-কুরআনে ব্যবহৃত যিকর শব্দটির সামগ্রিক অর্থের মাহাত্ম্য যে মানব সন্তানের মাঝে বিদ্যমান, আল্লাহ্ তাআলা তাঁকে “আহলুয যিকর” বা জ্ঞানবান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ্ বলেন, অতঃপর তোমরা জ্ঞানী ব্যক্তির নিকট থেকে জানতে চাও, যদি তোমরা না জান (সূরা আম্বিয়া-৭) আল্লাহ্র এই ঘোষণার বাস্তবায়নে যিকর শব্দের ব্যাপকতা উপলব্ধি করে সারা জীবন তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। দ্বীনি শিক্ষার প্রচার প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। ‘ইকুরা’ থেকে পাঠ শুরু করে ‘যিকর’ এর মাহাত্ম্য ও মহত্ত্বের যথাযথ জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ঈমানদারগণকে “ওয়াসজুদ ওয়াকতারিব” (সিজদা কর ও আল্লাহ্র নিকটবর্তী হও) পর্যন্ত পৌঁছানোর সহজ পথ তিনি দেখিয়ে গেছেন। আল্লাহ্র ‘যিকর’ (জ্ঞান) অর্জন করার মানসে তিনি অনেক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই মাদরাসাগুলোতে ‘যিকর’ তথা আল-কুরআন বা ইসলামী শরীয়াহ বিষয়ক জ্ঞান চর্চা চলছে প্রতিনিয়ত। মাদরাসাগুলো থেকে ‘আহলুয যিকর” বা জ্ঞানী লোক তৈরি হচ্ছে। তাঁরা আজ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে আলোকিত করছে।
হাদীয়ে যামান শাহ্ সূফী হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ. যেখানেই তাঁর কদম রেখেছেন সেখানেই ইলমে দ্বীন ও আধ্যাত্মিকতার লাইট হাউজ স্থাপিত হয়েছে। যার আলোতে সমাজ আলোকিত হয়। একজন সত্যিকার ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া হিসেবে প্রত্যেক নবী-রাসূলগণের সুন্নাতকে তিনি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি আল্লাহ্র কাছে যা দোয়া করেছেন আল্লাহ্ তা কবুল করেছেন। এ জন্য বায়তুশ শরফের প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা কুতবুল আলম আল্লামা শাহ্ মীর মোহাম্মদ আখতর সাহেব রহ. বলেন: মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার হলেন, মুসতাজাবুদ দোয়া (যার দোয়া আল্লাহ্ কবুল করেন)। কুরআনের ঘোষণা: তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। অবশ্যই যারা আমার নিকট চাওয়ার ক্ষেত্রে অহংকার করে তারা অচিরেই হীনভাবে জাহান্নামে প্রবেশ করবে (সূরা গাফির-৬০) বড়পীর শায়খ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদের জিলানী রহ. বলেন, আল্লাহ্র কাছে দুয়া করার বিশেষ আদব হলো, দু’হাত বিস্তৃত করা। শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করা এবং রাসূল সা. এর উপর দরূদ পাঠ করা। অতঃপর আল্লাহর নিকট নিজের প্রয়োজনের কথা বলা (আল-গুনইয়াহ ১/৪০)। হুজুর কেবলা রহ. এর প্রত্যেক দুয়াতে এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান ছিল।
-ড. মুহাম্মদ ওয়ালী উল্লাহ্ মঈন
গবেষক, প্রাবন্ধিক ও প্রভাষক, ইসলাম শিক্ষা বিভাগ,
চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, খুলশী, চট্টগ্রাম।
Leave a Reply