বায়তুশ শরফের শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলা হযরত মাওলানা আবদুল জব্বার সাহেব পবিত্র হজের সফরে ২২ এপ্রিল ১৯৯৫ একদিনের যাত্রাবিরতি করেন ঢাকা বায়তুশ শরফ মসজিদে। চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ১০০ হাজীর সঙ্গী কাফেলাটি আগের দিন রাতেই বায়তুশ শরফে পৌঁছেন। এ সুযোগে আনজুমনে ইত্তেহাদ ঢাকা মহানগরী শাখা ওই দিন বিকেলে বায়তুশ শরফ মসজিদে এক মহতী দীনী মাহফিলের আয়োজন করে। মাহফিলের শেষভাগে শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলা যে গুরুত্বপূর্ণ নসিহত পেশ করেন দেশ ও জাতির বর্তমান সংকটময় অবস্থা, দীন ইসলামকে রক্ষার তাগিদ, ইসলামী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ও তার বিচ্যুতি কোথায়? ইসলাম প্রচারে আউলিয়ায়ে কেরামের ঐতিহাসিক অবদান, মানব-জীবনে তরীকত ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রয়োজনীয়তা, মানবসেবার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পন্থা, যিকিরের ফযীলত ও দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিক নির্দেশনা দেন। অতিসহজ সরল ও আবেগময় ভাষার অল্প সময়ের এ ভাষণটি সময়ের দাবিকে সামনে রেখে দেশের বিদগ্ধ মহলের সামনে উপস্থাপন করছি। -সম্পাদক
হামদ ও সালাতের পর
সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম,
বেরাদরানে ইসলাম!
আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ
শারীরিক অসুস্থতা ও সফরের ক্লান্তি নিয়ে আপনাদের সামনে যে উপস্থিত হতে পেরেছি তার জন্য মহান রব্বুল আলামীনের দরবারে লাখো-কোটি শোকরিয়া জানাচ্ছি। তাঁর মহান দরবারে একান্ত আরজ, তিনি যেন এ সফর কবুল করেন। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল-এর দরবারে হাজির হওয়ার তওফিক যেন তিনি দান করেন। আমার সাথে চট্টগ্রামস্থ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ১০০ হাজী সাহেবান আছেন, তাঁদেরসহ এ মজলিসে আপনাদের উপস্থিতি আল্লাহ পাক কবুল করুন। আসরের নামাজের পর থেকে মজলিস শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম মূল্যবান আলোচনা পেশ করেছেন। একটু আগে যিনি বয়ান করলেন চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদরাসার শায়খুল হাদীস মাওলানা নেছারুল হক সাহেব যিনি দীর্ঘ ৪০ বছর পবিত্র হাদীস শরীফের শিক্ষকতা করে আসছেন এবং অবসর জীবনে বর্তমানে চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফ আদর্শ আলিয়া মাদরাসায় কামিলে ক্লাশ নেন। তাঁদের আলোচনার পর আর কথা বলার প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া আমি ডায়বেটিক রোগী, শরীর দুর্বল, কাল ভোরেই আমাদের ফ্লাইট। প্রস্তুতির জন্যও হাতে সময় দরকার। এরপরও যেহেতু উদ্যোক্তাদের পক্ষ হতে জানানো হয়েছে যে, আমি কিছু বলবো, তাই সংক্ষেপে দুয়েকটি কথা আরজ করবো।
কিন্তু আপনাদেরকে কি কথা বলতে হবে বা বলবো তা এ মুহূর্তে মোটেও আমার জানা নেই। জানি না আল্লাহর ইচ্ছায় কি কথা বলতে পারব। ইসলামের স্বার্থে উপস্থিত ভাইদের উপকারার্থে দুই-চারটি কথা বলার তওফিক দান করার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাই। হযরত নবী করীম এক হাদীসে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, ‘সাপ যেমন গর্ত থেকে বের হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং সবশেষে পুনরায় সে গর্তে প্রবেশ করে তেমনি ইসলামও মদীনা শরীফ থেকে বের হয়ে জাহেলিয়াতের প্রাচীর ভেদ করে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু পরিশেষে পুনরায় সাপের গর্তে ফিরে আসার মতো মদীনায় ফিরে যাবে।’
অপর এক হাদীসে নবী করীম ইরশাদ করেছেন,
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى لَا يُقَالَ فِي الْأَرْضِ: اللَّهُ اللَّهُ».
‘যতদিন দুনিয়ার বুকে মানুষ আল্লাহকে ডাকবে, আল্লাহ আল্লাহ করার মানুষ যতদিন থাকবে ততদিন আল্লাহ পাক চন্দ্র, সূর্যের আলো বন্ধ করবেন না, ততদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে না।”
পৃথিবীতে মুসলমানের সংখ্যা অনেক। ইসলাম দুনিয়ার অনেক দেশে এখনো ছড়িয়ে আছে। আল্লাহ আল্লাহ বলার লোকও অনেক আছে। কিন্তু গভীরভাবে বর্তমান পরিস্থিতির মূল্যায়ন করলে এক ভয়াবহ চিত্রই আপনাদের সামনে ফুটে উঠবে। বুঝতে পারবেন যে, হযরত রাসুলে পাক-এর ভবিষ্যদ্বাণী কার্যকর হতে যাচ্ছে। অথচ আমাদের সংবিৎ নেই। বিশ্বব্যাপী অমুসলিম শক্তি একত্রিত হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের উৎখাত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ইউরোপ থেকে শুরু করে আরবে, ভারত উপমহাদেশে এবং বাংলাদেশেও অমুসলিম শক্তিসমূহ ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়েছে। অথচ এই শত্রুদের ব্যাপারে আমাদের ভূমিকা অত্যন্ত দুর্বল। ইহুদি-নাসারারা ইসলাম ও রাসুলুল্লাহর চির দুষমন ছিল। কিয়ামত পর্যন্ত তারা এ দুশমনিতে রত থাকবে। এটা শুধু হাদীসের কথা নয়, কুরআন মজীদে আল্লাহর স্পষ্ট ঘোষণা: ‘ইহুদি-খ্রিস্টানেরা কোনদিনও তোমাদের বন্ধু হবে না।’ কাজেই
لا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصْرَى أَوْلِيَاءَ .
‘তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর না।১
আপনারা বলুন, সারা বিশ্বে আমরা কি আজ আল্লাহর এ নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করছি না? আরবের একটি দেশের কথা বলি। দীর্ঘদিন যেখানে বসবাসরত একজন বাংলাদেশি আমাকে দুঃখ করে বলছিল, সকাল বেলা অযু, নামাজ শেষে যখন টেলিভিশন খুলি প্রথমে সে দেশের রাজার ছবি ভেসে আসে। এর সাথেই টিভির পর্দায় ভেসে আসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ছবি। আমেরিকা আর আমরা পরম বন্ধু। জানের জান একথাই বোঝানো হয় এর মাধ্যমে। আমেরিকর নাম উচ্চারণ করলেই সে দেশের পুলিশ চোখ রাঙিয়ে দেখে।
শুধু আরবে নয়, আমাদের দেশেও এসে গেছে। সারা দুনিয়ায় তারা মুসলমানদেরকে লাকড়ির মতো জ্বালাচ্ছে। আর এখানে সাহায্যের নামে শোষণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তারা জানে যে, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। এখানে কুরআন, ইসলাম, আল্লাহ ও রাসুলের ঘর মসজিদ-মাদরাসার কদর বেশি, প্রভাব অত্যন্ত বেশি। তাই সুপরিকল্পিতভাবে আমাদেরকে ঈমানহারা করার জন্য এবং জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও স্বাধীনতাকে বিনষ্ট করার জন্য এরা দারিদ্র্য মোচন, অশিক্ষা দূরীকরণ, সাহায্য ও ত্রাণ প্রভৃতি সাইন বোর্ড নিয়ে এসেছে।
তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করি, বসনিয়ায় যে লাখে লাখে মানুষ মারা হচ্ছে তাদের জন্য তোমরা সাহায্য নিয়ে যাও না কেন? সোমালিয়ায় তারা এ ধরনের শোষণ তৎপরতার মাধ্যমে কিছু লোককে প্রথমে খ্রিস্টান বানায় এরপর দেশের ভেতরে পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে মীমাংসার নামে সামরিক অভিযান চালায়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এবং ফিলিস্তিনে এভাবেই তাদের ষড়যন্ত্র কার্যকর করেছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের পরিস্থিতি ঘটানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
কক্সবাজার, চকরিয়া, কুতুবদিয়া প্রভৃতি অঞ্চল সফর করে আমি অবাক হয়ে যাই। কিভাবে একটি স্বাধীন দেশের ভেতর বাইরের দুনিয়া থেকে এনজিও এসে নিজেদের ইচ্ছামত রাস্তাঘাট, স্কুল নির্মাণ করছে। তাহলে দেশের সরকার থাকার কি অর্থ দাঁড়ায়। এক মহিলা আমাকে বলল, ওরা আমাকে খ্রিস্টান হওয়ার জন্য প্ররোচণা দিচ্ছে, বলছে, খ্রিস্টান হলে প্রথম কিস্তি ৩০ হাজার টাকা দেবে, পরে আরও দেবে।
এ ধরনের ষড়যন্ত্র গ্রাম থেকে নিয়ে উপরের মহল পর্যন্ত সমানে চলছে। আপনারা কিছুদিন আগে লক্ষ করেছেন যে, সরকারি মহলের এক বেটি কুরআনের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। অমুসলমানদের ষড়যন্ত্র তো আছেই এসব মুসলমান নামধারীও ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। বিদেশিরাই যে এদের মদদ যোগাচ্ছে তার প্রমাণ এর আগেও আপনারা দেখেছেন। একটি কুলাঙ্গার নষ্টা মেয়েকে এখন পশ্চিমা জগতে নিয়ে পালা হচ্ছে।
কেউ হয়তো বলবেন যে, হুযুর সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। আমার কথাগুলো নিছক কোনো রাজনৈতিক কথা নয়। আমি ইসলামের কথাই বলছি। আমি কোনো দল করি না। আমি ইসলামের পক্ষে আছি এটিই যথেষ্ট। ইসলাম আল্লাহর ধর্ম। যারা ইসলামের জন্য কাজ করছে, আমি মনে করি যে, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকেই কাজ করছেন। আমি তাদের সব কথায় একমত হতে না পারলেও অনেক কথায় একমত আছি।
বাবরি মসজিদ, ভারতীয় বিশ্বকোষে রাসুলুল্লাহর অবমাননা, সালমান রুশদী প্রসঙ্গ প্রভৃতি ইস্যুতে আমি মাঠে নেমেছি। ভবিষ্যতেও নামব ইনশাআল্লাহ। আমি সবসময় ইসলামের পক্ষেই থাকব। আজ যে বিষয়টি সম্পর্কে আপনাদের সতর্ক করে দিতে চাই তা হল আমাদের দেশের ভেতর পরিচালিত গভীর ষড়যন্ত্র। সোমালিয়ার মতো কিছু লোককে খ্রিস্টান বানানোর পর বাংলাদেশেও তারা ভাইয়ে ভাইয়ে একদিন গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেবে।
আমরা যখন এসব কথা বলি তখন একশ্রেণির লোক বলে যে, হুযুররা শুধু ফতোয়া দিতে জানে। আমাদের জন্য কি করেছেন তারা? মহিলাদের জন্য তারা কোথায় চাকরির ব্যবস্থা করেছেন? আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্পর্কে কই তাদের কোনো তৎপরতা তো নেই। আপনি পেটের জন্য চিন্তিত। অথচ আমার কাছে আমার ঈমান, বিশ্বাস, স্বাধীনতা ও স্বকীয় ঐতিহ্যের মূল্য অনেক বেশি! খাদ্যের জন্য চাকরির জন্য নিজের ঈমান ও বিশ্বাসকে জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশিদের তল্লীবাহক হচ্ছেন এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কি আছে?
আমার কাছে খাদ্য, পেট ও সম্পদের চেয়ে ঈমানের মূল্য অনেক বেশি। ওলামায়ে কেরাম গোটা জাতির ঈমান তথা স্বকীয় চিন্তা-বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য কি না করেছেন। অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে মসজিদ, মাদরাসা, ওয়াজ-নসিহত প্রভৃতি ধরে রেখেছেন। আপনার ছেলে-সন্তানদের ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য জান-প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। আপনারা কয়জন আলেমকে দেখবেন অর্থশালী। তারা কি ব্যবসায় নেমে যেতে পারেন না। অথচ মসজিদ, খানকায় মাদরাসায় জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। ঈমান ও ইসলামের খেদমত করে যাচ্ছেন। হযরত নবী করীম ইরশাদ করেছেন, ‘এমন এক সময় আসবে যখন ঈমান রক্ষা করা অনেক কঠিন হবে। হাতের তালুতে জ্বলন্ত কয়লা রাখার মতো অসহ্য হবে।’ আজ এ ধরনের পরিস্থিতিতেই ওলামায়ে কেরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
আমরা না খেয়ে থাকব, মরে যাব তবুও ঈমান হরণ হতে দেব না। মক্কার উচ্চবংশীয় সাহাবায়ে কেরাম ঘর-বাড়ি, সহায়-সম্পদ ছেড়ে মদীনায় হিজরত করেছিলেন ইসলামের ও ঈমানের দাবি পূরণ করার জন্য। যদি ধন-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্যর মূল্য বেশি হত তাহলে তারা কি হিজরত করে অভাবী হতেন? নবী করীম বলেছেন, ‘দীন ও ঈমান রক্ষার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে যে, ইমানদাররা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেবে।’ পরিস্থিতির বাস্তব মূল্যায়ন করলে আজ আমরা এ ধরনের অবস্থারই সম্মুখীন। হাদীস শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী, ঈমান রক্ষার জন্য যদি হাতে না পারো অন্তত ঈমানের রশিকে দাঁতে কামড়ে ধর। গাছের পাতা খেয়ে থাক, তবুও ঈমান ও ইসলামকে জলাঞ্জলি দিয়ো না।
আমাদের দেশে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ঈমান ধ্বংসের এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাই সে কথাগুলো আপনারা বোঝার জন্য জোর দিয়ে উল্লেখ করলাম। আপনারা হয়তো লক্ষ করেছেন যে, শিক্ষা খাতে যে বিদেশি সাহায্য দেওয়া হচ্ছে তাতে সম্প্রতি বলে দেওয়া হয়েছে, এ সাহায্য মাদরাসাগুলোতে যেতে পারবে না। এবার বুঝতে পারেন ষড়যন্ত্রের এবং সাহায্যের নামে ভাওতাবাজদের আসল উদ্দেশ্য কি? সারা দুনিয়ায় তারা মুসলমানদের ধ্বংস করেছে। এদিকে বৈঠক-আলোচনার প্রহসন করছে। আর এখানে এসে বাংলাদেশিদের জন্য দরদে গদগদ হয়ে কুম্ভিরাশ্রু ঝরায়। এগুলো সবই মিথ্যা, ভণ্ডামী ও ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।
তারা গণতন্ত্রের দোহাই দেয়। ঈমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে বলার লাইসেন্সই কি গণতন্ত্র? ইসলামী গণতন্ত্রের যা আছে তা পশ্চিমা গণতন্ত্রের নেই।
পশ্চিমা গণতন্ত্র প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। এ গণতন্ত্রে ভালো-মন্দ শিক্ষিত-মুখ সব মানুষ এক সমান। মনে করুন, বেনামাযি, সন্ত্রাসী সব এক হয়ে ভোট দিল এবং জোর করে ভোট নিল। তার মাধ্যমে যারা নির্বাচিত হয়ে আসলে তাদের কি ইসলাম অনুমোদন দিতে পারে? এ গণতন্ত্র থাকলে বাংলাদেশে নামাজ থাকবে কি থাকবে না এ বিষয়েও ভোট হতে পারে। তখন হয়তো নামাজের বিরুদ্ধেই রায় দেওয়া হবে।
আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে কমিউনিস্টদের সভায় এক হাতে ভাতের বাসন আরেক হাতে কুরআন তুলে ধরে বলা হয়েছিল, কুরআন চাও না ভাত চাও। সভায় উপস্থিত দলীয় লোকেরা জবাব দিয়েছিল, ‘ভাত চাই।’ আমার এসব কথাকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বোঝার চেষ্টা করলে ভুল হবে। আমি ঈমানের কথা বলছি। বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে আপনাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।
আমি যে রাজনীতি মোটেও পছন্দ করি না সে কথা বলছি না। তবে কোনো দলের সাথে আমি জড়িত নই। ইসলামকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যারা দলীয় কাঠামোতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তাদের মধ্যে অনেক দল আছে। আমি তাদের প্রচেষ্টাকে খাটো করে দেখতে চাই না। এ ধরনের প্রচেষ্টার প্রয়োজন আছে এবং তা জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যদি দাবি করা হয় যে, এটিই একমাত্র জিহাদ তাহলে ভুল হবে এবং অনেক ভুলের জন্ম দেবে। ওলামায়ে কেরাম যেমন বিভিন্ন মাদরাসা ও মসজিদকে কেন্দ্র করে ইসলামের খেদমত করে যাচ্ছেন এবং বিভিন্ন হক্কানি পীর-বুযুর্গ খানকাকেন্দ্রিক ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত। রাজনীতির ময়দানেও ইসলামের নামে বিভিন্ন দল থাকা স্বাভাবিক। যদি পারস্পরিক রেষারেষি না থাকে তাহলে কোনো সমস্যাই হবে না, বরং কাজ বেশি হবে। তবে জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
আমি ওয়াদা করে বলছি, যদি জাতীয় প্রয়োজনে সকল ইসলামী দল ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে আমিও তাদের সাথে যোগ দেব। ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ব। এর আগ পর্যন্ত এ দেশে এবং ভারতবর্ষে বুযুর্গানে দীন যে ধারায় কাজ করেছেন, আমিও সে ধারায় ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত থাকতে চাই। নিঃসন্দেহে একাজও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব যে, ইসলাম কেবল প্রচলিত অর্থে জিহাদ বা তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং নবী করীম-এর চরিত্র মহানুভবতা দেখেই অধিকাংশ মানুষ আকৃষ্ট হয়েছে।
অনুরূপভাবে ভারতবর্ষেও ইসলামের প্রচার প্রসার হয়েছে সুফি-দরবেশদের দ্বারা। তাঁদের অমায়িক ব্যবহার ও সুন্দর চরিত্রের মধ্যেই মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য দেখতে পেয়েছে। এরপর হাজার হাজার মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। কাজেই আউলিয়ায়ে কেরাম আত্মশুদ্ধির পথ ধরে যে নীরব জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছেন তাকে অবমূল্যায়ন করা ইতিহাসকে অস্বীকার করার শামিল হবে। কেননা পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ মিলে বর্তমানে প্রায় ৪৫ কোটি মুসলমান। তারা পীর-আউলিয়ার অক্লান্ত পরিশ্রম ও দাওয়াতী কার্যক্রমের ফসল। আউলিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতী কার্যক্রমের মূলনীতিও গ্রহণ করা হয়েছে পবিত্র কুরআন মজীদ হতে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,
ادْعُ إِلى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ قُ
‘আপনি হিকমত এবং উত্তম উপদেশ সহকারে মানুষকে আপনার প্রভুর পথে আহ্বান করুন।”
তাদের মধ্যে কেউ কেউ পীর-আউলিয়ার নীরব জিহাদকে বুঝতে না পারার কারণে সমালোচনা করে। একটি কথায় হয়তো অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন না, তবুও বলতে হয়, যদি দলের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব না দিয়ে আউলিয়ায়ে কেরামরা ইসলাম প্রচারের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যেভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তা যদি অনুসরণ করা হতো তাহলে এত সংঘাত ও হানাহানি হত না। আমরা রাসুলুল্লাহ-এর সহনশীলতার আদর্শকে ভুলে গেছি। তিনি জানের শত্রু কাফেরদের প্রতি যে উদারতা দেখিয়েছেন তা আমাদের সম্মুখ থেকে এখন অনেক দূরে। এ অবস্থা দেখেই অনেক বিজ্ঞ লোক মন্তব্য করেছেন যে দলীয় ইসলাম আর নবীর ইসলাম এক নয়।
একদিনের ঘটনা, নবী করীম-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে মেহমানের বেশে এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ-এর মেহমান হয়। খাওয়া-দাওয়ার পর ওই ব্যক্তিকে মসজিদে নববীতে থাকতে দেওয়া হয়। ঘটনাচক্রে রাতে লোকটির পেটব্যথা শুরু হয়ে যায় এবং ভোর হতে না হতেই বিছানাপত্র নষ্ট করে লোকটি পালিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ মসজিদে এসে অবস্থা দেখে বুঝতে পারলেন মেহমানের অসুবিধা হয়েছে। তিনি লোকটিকে খুঁজে উপস্থিত করার হুকুম দিলেন। সাহাবীরা তাকে সন্ধান করার জন্য বেরিয়ে পড়লে লোকটি মসজিদ নষ্ট করার মর্মান্তিক পরিণতির কথা ভেবে প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়তে থাকে।
শেষ পর্যন্ত তাকে ধরে যখন মসজিদে নববীতে উপস্থিত করা হয় তখন লোকটি বিস্মিত বিহবল হয়ে দেখে যে, মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ নিজ হাতে বিছানাপত্র ধরে পরিষ্কার করছেন। লোকটিকে ডেকে তিনি বিনয়ের সুরে বললেন, ‘ভাই তুমি আমার মেহমান ছিলে। রাতে আমি তোমার দেখাশোনা করিনি। কাজেই আমাকে ক্ষমা কর। তোমার প্রয়োজনের সময় আমি সাড়া দেইনি। এজন্য কিয়ামতে আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত কর না।’
আরেকদিন এক বেদুইনকে মসজিদে নববীতে পেশাব করতে দেখে রাসুলুল্লাহ সাহাবীদের বললেন, ‘তোমরা তাকে বাধা দিও না, পেশাব শেষ করতে দাও।’ এরপর সে পেশাব পরিষ্কার করা হয় এবং তাকে এ ধরনের আচরণ ভবিষ্যতে না করার জন্য বুঝিয়ে বলা হয়। আমার প্রশ্ন এ ধরনের সহনশীলতা কি আমাদের মাঝে আছে?
আমরা জানি ইসলাম এক। কিন্তু এই ইসলামের চার মযহাব এবং আধ্যাত্মিক লাইনে চার তরীকা ইসলামসম্মত বলে স্বীকৃত। আল্লাহর কাছে এগুলো মকবুল। তাহলে আমরা কেন শুধু আমার দলই হক ও সত্যের ওপর আছে অন্যরা বাতিল এ ধরনের অহমিকার আশ্রয় নেব। ইসলামের আদেশ-নিষেধ ও হুকুম-আহকাম রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনকে ইসলামী রাজনীতি বলা হয়। কিন্তু সবাই জানেন যে, শুধু আইন-কানুন জারি করলে ইসলাম হয়ে যাবে না। মানুষ যেন অন্তর দিয়ে ইসলামের বিধি-নিষেধ মেনে চলে তার জন্য মানুষের নৈতিক সংশোধন ও চারিত্রিক উন্নতি বিধানের প্রয়োজন। এ কাজটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে আনজাম দেন আধ্যাত্মিক সাধকরা। এ দিক থেকে বিবেচনা করলে মানুষের নফস ও চরিত্র সংশোধনের এ চেষ্টাও জিহাদ হিসেবে গণ্য, বরং হাদীস শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী এটিই জিহাদে আকবর (শ্রেষ্ঠতম জিহাদ)। কারণ কারও চরিত্র সংশোধন, ব্যক্তিত্ব গঠন ও যোগ্যতার বিকাশ না হলে যুদ্ধ-বিগ্রহ করে সাময়িক বিজয় লাভ করলেও সে বিজয়কে ধরে রাখা সম্ভব হবে না। বিষয়টি একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে সবার কাছেই এর গুরুত্ব পরিষ্কার হয়ে পড়বে।
বুযুর্গানে দীন মানুষের নফসানি রোগ-ব্যাধির সংশোধনের জন্যে যেসব খাত বর্ণনা করেছেন তার মধ্যে একটি হলো যিকির। যিকির মানে আল্লাহকে স্মরণ করা। আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ ও ওয়াজিব ইবাদতের পর বিশেষ নিয়মে যিকির করা মুস্তাহাবের মধ্যে গণ্য। ইবাদত-বন্দেগি ও আত্মিক উন্নতির ক্ষেত্রে যিকিরের ভূমিকা হলো ক্ষেতে সার দেওয়ার ন্যায়। যিকির করা মানে ঈমানের গোড়ায় সার দেওয়া। এই আত্মাকে সংশোধন করার কোনো প্রক্রিয়া দুনিয়ার কোনো জ্ঞানী-মনীষী ও বিজ্ঞানী আবিষ্কার করতে পারেননি। অথচ এই কলবের ভালো-মন্দের ওপর সবকিছু নির্ভর করে। হাদীস শরীফে হযরত নবী করীম ইরশাদ করেছেন,
أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً: إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ».
‘মানব দেহের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা রয়েছে। তা যদি সুস্থ থাকে তাহলে সমস্ত দেহটাই সুস্থ থাকবে। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায় তা হলে পুরো শরীরটাই নষ্ট হয়ে যাবে। সাবধান! মনে রেখ, এটিই হলো কলব।”
দেহের পরিচর্যার জন্য আমরা ভাত-মাংস খেয়ে মুখে পেটে শান্তি পাই। কিন্তু আত্মার শান্তি কোথায়? আল্লাহ পাক তার জবাব দিয়ে বলেন,
الا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ .
‘সাবধান! আল্লাহর যিকিরের দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’২
পীর-বুযুর্গদের বাতলানো পন্থায় যিকির করতে করতে যখন যিকির অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তখন সবসময় আল্লাহর কথা স্মরণে আসে। আল্লাহ ভালোবাসায় মন তৃপ্ত থাকে। বিশেষত চরম বিপদে-আপদে, মৃত্যুর সময়, সাকরাতের সময় আল্লাহর কথা স্মরণে আসে। মূলত যিকিরের দ্বারা মুরদার কলব জিন্দা হয়ে যায়। যার কলব জিন্দা হয়েছে তার তো মৃত্যু নেই। সে শুধু এ জগৎ থেকে পর জগতে ইন্তিকাল করেন এবং স্থানান্তরিত হন। এ ধরনের যাকিরীন বান্দাই আল্লাহর পরম সান্নিধ্য লাভ করেন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,
أَنَا جَلِيْسُ مَنْ ذَكَرَنِي».
‘যে ব্যক্তি আমার যিকির করে আমি তার সাথী হয়ে যাই।১
আপনারা বলুন, জীবনে এর চেয়ে বড় সম্পদ আর কি হতে পারে? পরিশেষে আমি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি আল্লাহর মাখলুকের সাথে সম্পর্ক উন্নত করার পরামর্শ দিচ্ছি। কেননা আল্লাহর বান্দাদের বিশেষ করে গরিব-দুঃখী অসহায়দের খেদমত করার মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত। এজন্যই তরীকত বা আধ্যাত্মিক সাধনার অপর নাম খেদমতে খালক। হযরত শেখ সা’দী অতিসুন্দর বলেছেন,
طریقت بجز خدمت خلق نیست و به تسبیح و سجاده و دلق نیست؟
তরীকত-আধ্যাত্মিক সাধনা আল্লাহর সৃষ্টির সেবা ছাড়া অন্য কিছু নয়। তসবীহ, সাজ্জাদা ও ছেড়া জামা বহন করার নাম তরীকত নয়।
গ্রন্থনায়: ড. মাওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
Leave a Reply