১৯৯২ সালে আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার লন্ডন সফরকালে বাংলাদেশি ভাইদের নিয়ে ঘরোয়া বৈঠকে প্রদত্ত হিদায়তী বয়ান। বয়ানটি বাংলাদেশ বিমানের সাবেক জি. এম. (মার্কেটিং) মরহুম ইউসুফ আলী সাহেবের কাছে সংরক্ষিত ভিডিও ক্যাসেট থেকে অনুলিখন করেন তাঁর দৌহিত্র হাফেজ আবু নোমান মোহাম্মদ ছফি উল্লাহ। -সম্পাদক
بِسْمِ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُوْلِهِ اللَّهِ ﷺ، أَمَّا بَعْدُ!
সর্বপ্রথম আপনাদের আমাদের সকলের শোকরিয়া আদায় করা উচিত, আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর পছন্দনীয় মনোনীত এবং গ্রহণযোগ্য মকবুল ধর্ম ইসলাম, যার কালিমা:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ
‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মদ তাঁর রাসুল।’
‘কালিমায়ে তাওহীদ’ আমাদেরকে নসীব করেছেন, আল-হামদু লিল্লাহ। আমরা জাতি হিসেবে মুসলমান আর আমাদের ধর্ম, সত্যধর্ম।
الْإِسْلَامُ حَقٌّ وَالْكُفْرُ بَاطِلٌ.
‘ইসলাম একমাত্র সত্যধর্ম এবং অন্য যত কুফরি আছে এগুলো সব বাতিল।’
আপনাদের এখানে বিভিন্ন ধর্মালম্বীর মানুষ বসবাস করে, এজন্য ধর্মের ভিত্তিটা আমাদের মজবুত রাখা দরকার। আমরা শেষনবী খাতিমুন নবিয়ীন হিসেবে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা-এর ধর্ম লাভ করেছি এবং দীনে ইসলাম ও তাঁর উম্মতের তালিকাভুক্ত হয়েছি। ইহুদি-নাসারা অর্থাৎ হযরত মুসা-এর ধর্ম ও হযরত ঈসা-এর ধর্ম যারা ধরে রেখেছে তারা মনে করছে তাদের দর্ম সঠিক। সে সম্পর্কে আপনাদের একটি কথা জেনে রাখা দরকার এবং আপনারা জানলে আপনাদের থেকে আমাদের দেশের আরও ভাই-বন্ধুরা যখনই প্রয়োজন হয় তাদের কাছে প্রকাশ করলে তাদেরকে জানিয়ে দিলে কাজে আসবে। তা হলো আমাদের নবীর পূর্বে যত নবী-রাসুল দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তাঁরা সবাই আল্লাহ তাআলার রাসুল এবং নবী ছিলেন, এর মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই। এর ওপর আমাদের ঈমান-বিশ্বাস। আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,
لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ *
‘আমরা তাঁর রাসুলগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না।
আল্লাহর রাসুল হিসেবে যতজন নবী-রাসুল দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন তাঁদের মধ্যে আমরা কোনো পার্থক্য করি না, তাঁরা সকলেই আল্লাহর নবী ও প্রেরিত রাসুল। যুগে যুগে নবীগণের কাছে আহকাম সংবলিত যত কিতাব এসেছিল সেগুলো ছিল সীমাবদ্ধ অল্পকিছু আহকাম সংবলিত সেসকল নবীর নুবুওয়াত শেষ হয়ে হওয়ার সাথে সাথে তাঁদের কিতাবের হুকুম-আহকামও শেষ হয়ে গিয়েছে। এজন্য আপনারা শুনে থাকবেন যে, মুসা তাওরাত কিতাবের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে তাঁর প্রতিনিধিগণকে বলে গিয়েছেন, ‘আমার পর একজন নবী আসবেন, তাঁর নাম হবে, আহমদ মুস্তাফা, মুহাম্মদ মুস্তাফা, তাঁর কিতাব হবে কুরআন, তোমরা তাঁর কিতাবকে মজবুতভাবে ধারণ করবে এবং তাঁর ওপর ঈমান আনবে।
এভাবে তাঁরা দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার পর নাসারাদের বড় বড় পাদরিগণ যাদেরকে রাহেব বলে এবং ইহুদিদের ধর্মগুরু যাদেরকে রবায়ের বা রিব্বি বলে অর্থাৎ তাদের ধর্মের নেতারা, তারা তাদের কিতাব ধারণ করে রেখেছে, মুসা এ-এর দীনও ইহুদিরা ধারণ করে রেখেছে। অথচ নামে ইনজীল ও তাওরাত কোনো সহীহ তাওরাত দুনিয়ার বুকে নেই এবং কোনো সহীহ ইনজীল দুনিয়ার বুকে নেই। এগুলো তারা জগা-খিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছে, আল্লাহর কথার সাথে নিজেদের মনগড়া কথা ঢুকিয়ে দিয়েছে, তারা যেটা বলে সেটাই ধর্ম। আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআন শরীফের মধ্যে এসবের আলোচনা করেছেন, নবী করীম-এর তোফাইলে তাঁর বদলতে আমরা পেয়েছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَبَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هُذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِّمَّا يَكْسِبُونَ . ‘অতএব তাদের জন্য আফসোস! যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লিখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে। অতএব তাদের প্রতি আক্ষেপ তাদের হাতের লেখার জন্য এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ তাদের উপার্জনের জন্য।”
তাফসীরে قويْلٌ )ওয়াইল) মানে আফসোস, দুঃখ তাদের জন্য বা কঠিন শান্তি তাদের জন্য বা দোজখ তাদের জন্য অর্থাৎ জাহান্নাম, যারা আল্লাহর কিতাবের মধ্যে নিজদের হাতে বানিয়ে লিখে তারপর বলে, ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ .
‘এবং তারা বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।’২
তাঁরা নিজ জাতিকে ধোঁকা দিয়েছে, তাদের কওমকে ধোঁকা দিয়েছে। রাতে নিজেদের হাতে লিখে দিনে বলে, এগুলো আল্লাহর কথা আমাদের কথা নয়। তাফসীরে আছে, তাদের ধর্মালম্বীর মধ্যে যারা বড় বড় ধনী ছিল, বড়। বড় পয়সাঅলা ছিল, বড় বড় সম্পদঅলা ছিল, তারা যদি কোনো অন্যায়-অবিচার করত, তাদের কিতাবের শান্তি যেন তাদের ওপর প্রয়োগ করা না হয় এজন্য তারা কিতাবঅলাদের সাথে যোগাযোগ করে ঘুষ দিয়ে বলত, আমাদের তো জাতির কাছে মান-সম্মান আছে, আমাদের ইজ্জত-সম্মান নষ্ট হয়ে যাবে, আপনারা আমাদেরকে এটকু রেহাই দিন, এই শাস্তি থেকে রক্ষ করুন যাতে আমাদের ইজ্জত-সম্মান বহাল থাকে। তাদের ধর্মগুরুরা ঘুষ খেয়ে দুনিয়ার স্বার্থে কিতাবের হুকুম পরিবর্তন করে, নিজেদের হাতে লিখে বলে, এটা আল্লাহর কিতাব। তারা এগুলো কেন করত? আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا
‘যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে।”
তারা কিতাবকে বিক্রি করেছে দুনিয়ার স্বার্থে, দুনিয়ার লোভে, দুনিয়ার সামান ভোগ করার জন্য। তারপর আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন فَوَيْلٌ لَهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِّمَّا يَكْسِبُونَ .
‘অতএব তাদের প্রতি আক্ষেপ তাদের হাতের লেখার জন্য এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ তাদের উপার্জনের জন্য।’
যারা নিজ হাতে লিখে আল্লাহর কিতাবের মধ্যে রদবদল করে তাদের জন্য ‘ওয়াইল’ এবং এই কাজ করে যা কামাই করেছে তার জন্যও ‘ওয়াইল’ অর্থাৎ ধ্বংস-বরবাদ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَلَا تَشْتَرُوا بِأَيْتِي ثَمَنًا قَلِيلًا
‘এবং আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে তুচ্ছমূল্য গ্রহণ কর না।’২
আমাদের নবী শেষনবী, সত্য নবী, যিনি সমস্ত নবীকে সত্যায়িত করেছেন, সমস্ত আসমানি কিতাবগুলোর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছেন।
তাওরাত-ইনজীলও আসমানি কিতাব, কিন্তু এগুলো তারা বিকৃত করে ফেলেছে, এগুলো আর সহীহ কিতাব নেই। মুসা দুনিয়া হতে বিদায় নেওয়ার পর তাদের মধ্যে এমন মতবিরোধ হয়েছিল যে, একদল দাবি করে আমাদের কিতাব সত্য, অপরদল দাবি করে আমাদের কিতাব সত্য। বর্তমান যুগে খ্রিস্টানরা যে বাইবেল প্রচার করছে সেটাও এক দলের সাথে অপর দলে বাইবেলের মিল পাওয়া যায় না। কারণ তারা নিজেরা তাদের আসমানি কিতাব রদবদল করে বিকৃত করে ফেলেছে, তাদের আসমানি কিতাবকে সহীহ কিতাব রাখেনি, এজন্য একটা বাইবেল আরেকটা বাইবেলের সাথে মিলে না।। আল্লাহর মেহেরবানিতে আমাদের আসমানি কিতাব সত্য। আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করছেন,
تَنْزِيلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعَلَمِينَ .
‘এটি সৃষ্টিকুলের রবের কাছ থেকে নাযিলকৃত।
যা আরশে মুয়াল্লায় আছে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন সেখান থেকে ২৩ বছরে সাইয়েদুল আম্বিয়া নবী করীম-এর দরবারে জিবরীল-এর মাধমে পাঠিয়েছেন। নুবুওয়াতের যুগে যে ৩০ পারা কুরআন ছিল, বিসমিল্লাহর বা থেকে শুরু করে আন-নাসের সিন পর্যন্ত আজকে দীর্ঘ চৌদ্দশত বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও একটি অক্ষর, নুকতা, যের, যবর, পেশ কোনো পরিবর্তন হয়নি, অবিকল যে আসামনি কিতাব ছিল এখনো সেভাবে আছে।
আল-হামদু লিল্লাহ। আমাদের দীন ইসলাম যেভাবে সত্য, আমাদের নবীও সত্য এবং আমাদের কিতাবও সত্য। আমাদের নবী সমগ্র দুনিয়াবাসীর জন্য, অন্যান্য নবীগণ এসেছিলেন বিশেষ গোত্র-বংশের জন্য, বিশেষ কিছু আহকাম নিয়ে, যেগুলো অসম্পূর্ণ ছিল। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর দীনকে তিনি সম্পূর্ণ করেছেন পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা এ-এর মাধ্যমে। বিদায় হজের দিন আরাফাত ময়দানে সোয়ালক্ষ সাহাবা নিয়ে তিনি হজ করেছিলেন। সে দিনেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই আয়াত নাযিল করেছিলেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
‘আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামতসমূহ পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম।”
এর মাধ্যমে বোঝা গেল যে অন্যান্য নবীগণের আহকাম ছিল সীমাবদ্ধ, তারা প্রেরিত হয়ে ছিলেন নির্দিষ্ট গোত্র ও কওমের জন্য, আর সাইয়েদুল আম্বিয়া যিনি সাইয়েদুল আউয়ালীন ও সাইয়েদুল আখিরীন অর্থাৎ সমস্ত নবীদের আগে ও সমস্ত নবীদের শেষ এবং তিনি রহমাতুল লিল আলামীন তথা গোটা জগদ্বাসীর জন্য রহমত, তিনি ‘বাশীর’ তথা সুসংবাদদাতা, তিনি ‘নাজীর’ তথা জাহান্নাম হতে সতর্ককারী এবং তিনি সমস্ত দুনিয়াবাসীর জন্য প্রেরিত হয়েছেন। যারা আল্লাহর কথা মানবে, তাঁর নবীর ওপর ঈামন আনবে, তাঁদের জন্য বেহেশতের সুসংবাদ। এর বিপরীতে যারা আল্লাহর কথা বিশ্বাস করবে না, তাঁর নবীর ওপর ঈমান আনবে না বা গ্রহণ করবে না তাদের জন্য জাহান্নাম এবং তাদের জন্য কঠিন আযাব আল্লাহ রব্বুল আলামীন প্রস্তুত করে রেখেছেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনুল করীমে ইরশাদ করেন,
إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَلَمِينَ .
‘এটি তো বিশ্ববাসীর জন্যে এক উপদেশ মাত্র।২
একথা আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদের ধর্ম পরিপূর্ণ ধর্ম এবং এই ধর্ম দুনিয়ায় প্রকাশ হওয়ার পর আর কোনো ধর্মের মূল্য নেই। অন্য যত ধর্ম আছে শেষনবী আসার পরে এগুলো সব বাতিল হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,
وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا
‘বলুন (হে নবী)! সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।”
পেয়ারে নবী আপনি মানুষকে জানিয়ে দিন, সত্য ধর্ম এসেছে এবং বাতিল-মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। সত্য ধর্ম আসার পর বিলুপ্ত হয়েছে, যার কোন মূল্য নেই। আর ইসলামই একমাত্র মনোনীত ধর্ম। আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ :
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলার নিকট মনোনীত দীন হলো ইসলাম।’২ আল্লাহ রব্বুল আলামীন আরও বলেন,
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ .
‘যে লোক ইসলামা ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করে কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তরর্ভুক্ত।”
ইসলাম প্রকাশ হওয়ার পর, সত্য ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত লাভ করার পর, কেউ যদি অন্য ধর্ম গ্রহণ করে আল্লাহ কখনও সেটা গ্রহণ করবেন না। তিনি বলেন,
فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ
‘কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না।
এই ধর্ম বিশ্বাস না করে, শেষনবীর ওপর ঈমান না এনে যদি কেউ অন্য ধর্ম অবলম্বন করে বা তালাশ করে, অনুসরণ করে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যায়, তার দুনিয়া-আখিরাত বরবাদ, নোকসান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ
‘এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ রব্বুল আলামীনের একথাগুলোর সার-সংক্ষেপ আমি আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরলাম। আপনারা এখানে যারা বসবাস করেন তাদের এগুলো যেনে রাখা দরকার যাতে করে অন্যরা আপনাদের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন।
এখানে আসার পর আমরা জানতে পারলাম কেউ কেউ প্রচার করছে যে, সকল ধর্মই সঠিক। ইহুদিরা তাদের ধর্মে সঠিক, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মে সঠিক, মুসলমানগণ তাদের ধর্মে সঠিক, এমনকি কাদিয়ানিরা গোলাম আহমদের উম্মত হয়ে তারা তাদের ধর্মে সঠিক। একথাগুলো আমরা এখানে এসে শুনেছি, এই ধরনের কথা কোনো মুসলমান বলতে পারেন না। ইসলাম দুনিয়ায় প্রকাশ পাওয়ার পর, কুরআন দুনিয়ায় আসার পর অন্য সকল ধর্মের কোনো মূল্য নেই। কাদিয়ানিরা কেন বলে সব ধর্ম সঠিক? কাদিয়ানিরা এজন্য বলে, তারা যে একজন মিথ্যা নবীর ওপর ঈমান এনেছে সে তো মিথ্যুক, সে মুসলমান নয়, তাই তারা বলতে পারে আমাদের ধর্ম ঠিক, আরও যত ধর্ম আছে সেগুলোও ঠিক। তাদের ধর্ম টিক রাখার জন্যই অন্যান্য ধর্মগুলোকে তারা সঠিক ধর্ম বলছে। নাউযূ বিল্লাহ!
আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআন শরীফে খাতামুন নবিয়ীন বলে শেষ করে দিয়েছেন। খাতামুন নবিয়ীন মানে নবীগণের শেষ, অর্থাৎ আমাদের নবী শেষনবী, তাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না। এজন্য গোলাম আহমদ কোনো নবী হতে পারে না। হাজার দলিল দিয়েও যদি প্রমাণ করে তবুও এগুলো সব শয়তানি যুক্তি, এই শয়তানি যুক্তি দিয়ে কুরআন শরীফকে তারা বিকৃত করে বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা তাদের মত করে করেছে যেন গোলাম আহমদকে নবী মানা হয়। এজন্য আমাদের শিক্ষিত ভাইদের জেনে রাখা দরকার, আল্লাহ রব্বুল আলামীন দুনিয়ায় যত নবী পাঠিয়েছেন ১ লক্ষ ২৪ হাজার বা তার অধিক, কোনো নবীর নাম আল্লাহ যুক্ত শব্দে রাখেননি অর্থাৎ দুই শব্দবিশিষ্টি নাম নয়। যেমন- ইবরাহীম, মুসা, ঈসা, ইদরীস, শুআইব এধনের যত নবী পাবেন সবার নাম এক শব্দে। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ , তাঁর নাম মুহাম্মদ বা আহমদ, তো আমরা দোয়া হিসেবে পড়ি। আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন, مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللهِ
‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল।”
কিন্তু ‘গোলাম আহমদ’ দুইশব্দ, যেমন- গোলাম ও আহমদ, দুইটা শব্দের দ্বারা। তাই পরিষ্কার বোঝা গেল যে, এটা কোনো নবীর নাম নয়। আল্লাহ যত বড় বড় নবী পাঠিয়েছেন সবার নাম একশব্দে। ইউশা, ইউনুস, সুলাইমান, দাউদ, যাকারিয়া, ইলিয়াস সব একশব্দে। তার মা-বাবা তার নাম রেখেছে গোলাম আহমদ যুক্তশব্দে, একথা দ্বারা প্রকাশ হল সে নবী নয়। তার যুগে যখন বড় বড় আলেমরা তার সাথে বহস করেছিল, সে তাদের বলেছিল যে, আমার নাম গোলাম আহমদ নয়, শুধু আহমদ। কুরআন শরীফে যে ‘আহমদ’ নাম আছে সেখানে আমার কথা বলা আছে। আমাদের এক উস্তাদ ঠাট্টাচ্ছলে বলতেন, ‘আমার দারার নাম বশির আহমদ, আমার বাবার নাম নজির আহমদ, আমার নাম ফুরকান, এসব নাম পবিত্র কুরআনুল করীমে উল্লেখ আছে। সুতরাং আমার দাদা নবী, আমার বাবা নবী এবং আমিও নবী।’
তাছাড়াও গোলাম আহমদ কাদিয়ানী বলত, ‘আমি আমার নাম থেকে গোলাম শব্দটি বাদ দিয়েছি, আমি আহমদ তাই আমিই নবী।’ ভারতবর্ষের একজন বড় আলেম মাওলানা আতাউল্লাহ বুখারী সাহেব তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার নাম হতে ‘আতা’ শব্দটি কেটে দিচ্ছি, তাই আমি ‘আল্লাহ’, আর আমি আল্লাহ বলছি, আমি তোমাকে নবী করে পাঠাইনি।’ এজন্য এগুলো মিথ্যা, নিজেদের মিথ্যা প্রচার করার জন্য তারা সব ধর্মকে সঠিক বলে প্রচার করছে, মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। আপনারা তাদের ধোঁকায় পা দেবেন না, এগুলো মনে রাখবেন।
আমরা এই সফরে আসার আগে সন্দেহ করতাম এখানে অইসলামী পরিবেশ, অইসলামী রাষ্ট্র, বাংলাদেশের ভাইয়েরা যারা আছেন, তারা কি ঈমান-আমলে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছেন, আল্লাহই জানেন। তারা নামাজ-দোয়া, দীন-ধর্ম ঠিক রাখতে পারছেন তো। আল্লাহর মেহেরবানিতে যেখানেই গিয়েছি অধিকাংশ ভাইদের পেয়েছি তারা আমাদের সাথে নামাজ পড়ে এবং বলেছেন, আমরা মসজিদে যাই, জুমা পড়তে যাই, এটি একটি আনন্দের বিষয়, আল-হামদু লিল্লাহ। নবী করীম হাদীস শরীফে বলেন, الدُّنْيَا مَزْرَعَةُ الْآخِرَةِ».
‘দুনিয়া হলো আখিরাতের ক্ষেত।১
আমাদের আসল জিন্দেগি পরকালের জিন্দেগি, যেখানে হাশর, নশর, পুলসিরাত, বেহেশত আমাদের জন্য প্রস্তুত করা আছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন পরীক্ষা করার জন্য। তিনি ইরশাদ করেন,
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيُوةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ
‘যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়। ‘২
আমি হায়াত ও মওত মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছি, কেন? এই মৃত্যুর পর যে হায়াত তাদের দেওয়া হবে, হায়াত শেষ হলে মৃত্যু এসে যাবে, মৃত্যু আমি তৈরি করে রেখেছি, কিন্তু কেন? আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। কিসের পরীক্ষা? তোমরা এই দুনিয়ায় আমার তৈরি করা বিছানো বিছানায় থাকছ, এই জমিনের ওপর বসবাস করছ, এগুলোর সৃষ্টিকর্তা কে? সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আমি। তিনি ইরশাদ করেন,
امَّنْ خَلَقَ السَّمَوتِ وَالْأَرْضَ:
‘বল তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল।”
বলেন, এ আসমান জমিন কে সৃষ্টি করেছেন বল? আমি ছাড়া আর কে? তিনি
وَالَهُ مَعَ اللهِ
আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ আছে কি?
আমার সাথে কোনো সৃষ্টিকর্তা আছে, থাকলে বল। আমি এই জমিন সৃষ্টি করেছি,
وَالْأَرْضَ فَرَشْنَهَا فَنِعْمَ الْهِدُونَ . ‘আমি ভূমিকে বিছিয়েছি। আমি কত সুন্দরভাবেই না বিছাতে সক্ষম।
এত সুন্দর করে দুনিয়ায় পাহাড়-পর্বত, সাগর উঁচু-নিচু করে বিছিয়ে রেখেছি, এরকম বিছানোর ক্ষমতা আর কারও নেই। তাহলে তোমরা কি করবে, আমার বন্দেগি করবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ .
‘আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই।’২
আমি অগণিত মাখলুক সৃষ্টি করেছি, কিন্তু মানুষ এবং জিনজাতিকে সৃষ্টি করেছি তারা যেন আমার ওহদানিয়ত তথা একত্ববাদকে স্বীকার করে এবং আমার তাওহীদকে স্বীকার করে এর ওপর মজবুত থেকে তাদের জীবনটা যেন আমার বন্দেগির মধ্যে অতিবাহিত করে।
আল্লাহ তাআলা নবী করীম-কে দুনিয়ায় তাঁর যে রেসালাত ও নুবুওয়াতের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং দুনিয়াবাসীর জন্য তাঁকে নমুনা-স্বরূপ করছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ .
‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।
দুনিয়াবাসীর জন্য আমার নবীর জীবন আদর্শ জীবন। আমার নবীর স্ত্রী-সন্তান ছিল, তিনি সমাজের দায়িত্ব পালন করেছেন। গরিব, এতিম ও অসহায় সকলের খোঁজ-খবর নিয়েছেন এবং একটা ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করে তার আইন প্রয়োগ করে, একটা ইসলামী সমাজ দুনিয়াবাসীর জন্য নমুনা-স্বরূপ রেখে গিয়েছেন। তিনি হলেন আদর্শ মানব, তাঁর জীবন আদর্শ জীবন। তাঁর সেই আদর্শকে সামনে রেখে আমরা যদি নিজেদের জীবনকে অতিবাহিত করতে পারি, তাহলে কি হবে? আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ . ‘যে ব্যক্তি রাসুলের হুকুম মান্য করবে সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল। ১
দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য, পানাহার করার জন্য আমাদেরকে চাকরি করতে হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হয়, কিন্তু দীন ও ঈমানকে মজবুত করে অটলভাবে ধারণ করতে হবে, আল্লাহর রাসুলের অনুকরণ-অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ রাসুলের অনুকরণ-অনুসরণ করে আমরা যত কাজ করবো সবগুলো ইবাদতের মধ্যে শামিল হবে, আল্লাহর বন্দেগি হিসেবে গণ্য হবে আল-হামদু লিল্লাহ। আমরা যে পেশাব-পায়খানা করি, এটাও যদি আল্লাহর নবীর অনুকরণ-অনুসরণ মেনে সুন্নত তরীকা মতে করি তাহলে পেশাব-পায়খানা করাটাও ইবাদত। আমরা যে বিয়ে-শাদি করি, এই বিয়ে-শাদি, বাড়ি-ঘর, স্ত্রী-সন্তান যদি শরীয়াসম্মত হয়, তাহলে এই বিয়ে-শাদি করাটা, আমাদের বাড়ি-ঘর, বউ-সন্তান এগুলো সব ইবাদত, আল-হামদু লিল্লাহ।
আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করি সেখানে যদি ধোঁকা না দেই, মিথ্যা না বলি, অন্যায় না করি, শরীয়তের সীমালঙ্ঘন না করি, তাহলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সেটাও ইবাদত এবং নবী করীম-এর সুন্নত। নবী করীম নিজে ব্যবসা করেছেন, সাইয়েদুনা আবু বকর সিদ্দীক ব্যবসা করেছেন, হযরত ওসমান ব্যবসা করেছেন, এগুলো খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত। বড় বড় অলী-মনীষীগণও ব্যবসা করেছেন। অবশ্য মানুষ ব্যবসার সাথে মিথ্যা-ধোঁকা যোগ করে এগুলো নষ্ট করে ফেলে। ধোঁকা দেওয়া আল্লাহর রাসুল-এর নিষেধ। তিনি বলেন,
وَمَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا».
‘যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’২
এক মুমিন আর এক মুমিনকে ধোঁকা দিতে পারে না, আর যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। নবী করীম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ রীতিমত আদায় করেছেন। কালিমা পড়া মুমিনের জন্য ইসলাম গ্রহণ করার পর সর্বপ্রথম দায়িত্ব হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। নবী করীম ইরশাদ করেন,
إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلَاتُهُ». ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেবেন।১ নেবেন।”
এজন্য আমরা যেখানেই থাকি না কেন নামাজ ঠিক রাখতে হবে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,
إِذَا نُودِيَ لِلصَّلُوةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ .
‘জুমার দিনে যখন নামাজের আযান দেওয়া হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে ত্বরা কর এবং বেচাকেনা বন্ধ কর।’”
যখন নামাজের জন্য আযান দেবে (এটি জুমার নামাজের কথা) তখন বেচা-কেনা রেখে দাও। তারপর তিনি ইরশাদ করেন,
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلوةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ
تُفْلِحُونَ
‘অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো ও আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।
নামাজ শেষ হয়ে গেলে অফিসে চলে যান, ক্ষেতে চলে যান, দোকানে চলে যান। আল্লাহ বলছেন, এই ব্যবসা-বাণিজ্য করে উপকৃত হও, লাভবান হও, কিছু কামাই-রোজগারে ব্যবস্থা করো। এগুলো আল্লাহর ফযল, আল্লাহ মেহেরবানি করে মানুষের জন্য সুযোগ করে দিয়েছেন, তোমরা এগুলো তালাশ করো। কিন্তু মসজিদের বাইরে গেলে আবার আল্লাহকে ভুলে যেয়ো না। তিনি ইরশাদ করেন,
وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ .
‘আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।
আজকে আমরা যোহরের নামাজ কসর হিসেবে দুই রাকআত পড়েছিলাম, সেখানে এক ভাই বলেছিলেন, হুযুর দুই রাকআত কসর কেন পড়লেন, এখানে তো কোনো অসবিধা নেই? আমি বললাম, আল্লাহ কসর কেন দিয়েছেন, আল্লাহ কসর দিয়েছেন মানুষকে আসান করার জন্য, সহজ করার জন্য, মুসাফিরের জন্য কসর, মুকিমের জন্য নয়। যারা বাড়ি-ঘরে নিজ নিজ দেশে থাকে, তাদের জন্য নামাজ কসর নেই। কসর হচ্ছে, চার রাকআত বিশিষ্ট ফরজ নামাজের দুই রাকআত আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন মুসাফিরের জন্য, মুকিমের জন্য নয়, মানুষের স্বার্থে, মানুষের উপকারার্থে। সফরের মধ্যে মানুষের অসুবিধা থাকে, তখন নৌকায়, জাহাজে, বাসে, প্লেনে ইত্যাদিতে সফর করতে হয়। আল্লাহ সহজ করে দিয়েছে, চার রাকআতবিশিষ্ট ফরজ নামাজের দুই রাকআত কমিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يُرِيدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তিনি তোমাদের জন্য
কষ্ট কামনা করেন না।”
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন,
وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ
‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।’২
আল্লাহর চেয়ে দয়াবান আর কে আছেন? আল্লাহর চেয়ে অধিক দয়াবান দুনিয়ায় আর কেউ নেই। আল্লাহর দয়া মুসলিম অমুসলিম সবার জন্য। এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন ‘ইবাদ’ অর্থাৎ সমস্ত বান্দা, সমস্ত বান্দাদের ওপর আল্লাহ দয়াবান। এজন্য কোনো বেনামাযির সাথে আল্লাহর শত্রুতা নেই, দুশমনি নেই। সমানভাবে তারা দুনিয়ায় উপকৃত হচ্ছে। তারা দুনিয়ায় নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা চেষ্টা করছে, কষ্ট করছে, তাই তারা সাইন্সে, বিজ্ঞানে উন্নতি লাভ করবে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন,
وَ أَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى
‘মানুষ তা পায় যার জন্য সে চেষ্টা করে।’
এখানে আল্লাহ ‘ইনসান’ দ্বারা মানুষের কথা বলছে, ঈমানদার-বেঈমানের কথা বলেননি। এই দুনিয়ার ওপর মানুষ যেটার জন্য চেষ্টা-কষ্ট করবে ফল পারে, সে যেটার জন্য মেহনত করবে তার ফল ভোগ করবে। এই দুনিয়ায় অমুসলমান আরাম-আয়েশে উন্নতি করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে তাই তারা উন্নতি করছে, আল্লাহ তো বাধা দিচ্ছেন না। আল্লাহ দুনিয়াকে বানিয়েছেন দুনিয়া আবাদ হওয়ার জন্য আর মানুষকে বানিয়েছেন দুনিয়া আবাদ করার জন্য। আদম সন্তানকে সৃষ্টি করছেন দুনিয়া আবাদ করার জন্য, দুনিয়া যতটুকু আবাদ করা যায়।
ক্ষেতের জন্য জমিন পরে আছে, আপনি যে ক্ষেত করবেন, যত প্রকার ক্ষেত করবেন, যত রকমের করবেন তত বেশি ক্ষেতের ফল লাভ করবেন। আমরা বাংলাদেশের মানুষ ভাত কিভাবে খাব, জায়গা-জমিন, নিজের ছেলে-মেয়ে, ভাই-বন্ধু এগুলোর চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত, আমাদের বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা এগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমরা কি আবিষ্কারের কথা চিন্তা করেছি, আমরা কি এগুলোর জন্য বিবেক-বুদ্ধি খাটাচ্ছি, চিন্তা করলে হচ্ছে না কেন? যারা চেষ্টা করছে তারা কিছু বানাতে পারছে। গাড়ি বানাতে না পারলে অন্ততপক্ষে টেম্পু তো বানাচ্ছে। টেম্পু বানানোর চিন্তা করেছে বলেই তো রাস্তায় চালাতে পারছে, যাত্রী উঠাচ্ছে। এতকাল ধরে চিন্তা করেনি এজন্য পারেনি। এটা একটা উদাহরণ-স্বরূপ বললাম।
আমাদের মিলিটারিরা এতদিন ধরে ব্রিটিশ আমলের অস্ত্র দিয়েই চালাত, এখন দেশ স্বাধীন হয়েছে নিজেরা অস্ত্র বানাচ্ছে, আবিষ্কার করছে। আমরা চট্টগ্রামে মিলিটারিদের এক অস্ত্র প্রদর্শনীতে গিয়েছিলাম, আমাদেরকে কিছু অস্ত্র দেখিয়ে তারা বলেছেন, এগুলো আমরা তৈরি করেছি। তাই বোঝা যায়, বুদ্ধি খাটালে, চিন্তা-ভাবনা করলে কিছু না কিছু করা যায়। এরা চাঁদে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছে, তাই তারা চাঁদে পৌঁছতে পেরেছে। আমাদের দেশের সাথে আল্লাহর কি শত্রুতা আছে যে বাঙালি জাতি চেষ্টা করলে পারবে না, চিন্তা করলে, গবেষণা করলে কোনো বাধা আছে। কুরআনে বাধা নেই, শরীয়তে বাধা নেই, ধর্মেও বাধা নেই। এজন্য যে যতদূর কষ্ট করবে সে ততদূর ফল ভোগ করবে। এটাই হলো দুনিয়ার নিয়ম। আরবিতে প্রবাদ আছে:
مَنْ جَدَّ فَوَجَدَ.
‘যে চেষ্টা করে সে পায়।’
আল্লাহ রব্বুল আলামীন তিনি রহমানির রহীম, তিনি সমস্ত মাখলুকের পালনকর্তা তিনি আর-রহমান, তিনি আর-রহীম। তাঁর দয়া শুধু ঈমানদারের জন্য নয় বেঈমানদারদের জন্যও, শুধু মুসলমানদের জন্য নয় কাফেরদের জন্যও। তিনি দুনিয়ার জন্যও রহমত আখিরাতের জন্যও রহমত। তাঁর আম রহমত সমস্ত দুনিয়াবাসীর জন্য প্রশস্ত করে দিয়েছেন। নবী করীম ইরশাদ করেছেন,
لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِّنْهَا شَرْبَةً
ماء.
‘আল্লাহ তাআলার নিকট যদি এই দুনিয়ার মূল্য মশা বা মাছির একটি পাখার সমানো হতো তাহলে তিনি কোনো কাফেরকে তার (দুনিয়ার) এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।”
এই গোটা দুনিয়া আল্লাহ তাআলার কাছে যদি একটা মাছির পাখার ন্যায় মূল্য হত এক ঢোক পানিও আল্লাহ কাফের-বেঈমানকে পান করাতেন না। তাহলে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলার কাছে এগুলোর কোনো মূল্য নেই।
এগুলো ছেড়ে দিয়েছেন ঈমানদার, বদকার, কাফের, মুশরিক, চোর-ডাকাত সবাই এখান থেকে খাচ্ছে। তিনি তাঁর দস্তরখানা এমনভাবে বিছিয়ে দিয়েছেন, যার ইচ্ছা খাও। আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, ‘কিন্তু তোমরা আমার জমিনে বাস করে, আমার নেয়ামত খেয়ে যদি আমার হুকুমের সীমালঙ্ঘন কর, আমার নবী ওপর ঈমান না আন, আমার কুরআনকে বিশ্বাস না কর, তাহলে একথা মনে রেখ, তোমাদের হায়াত সীমাবদ্ধ, আমি হায়াতের রশি ছেড়ে দিয়েছি, তোমরা দুনিয়ায় খাচ্ছ, চলছ, আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্রে দৌড়াচ্ছ, যখন আমি টান দেব আমার কাছে চলে আসতে হবে। তিনি ইরশাদ করেন,
إِلَّا مَنْ تَوَلَّى وَكَفَرَ فَيُعَذِّبُهُ اللهُ الْعَذَابَ الْأَكْبَرَ إِنَّ إِلَيْنَا إِيَابَهُمْ لَ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا
حِسَابَهُم
‘কিন্তু যে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও কাপের হয়ে যায়, আল্লাহ তাকে মহা-আযাব দেবেন। নিশ্চয় তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট। অতঃপর তাদের হিসাব-নিকাশ আমারই দায়িত্ব। আমার হুকুম যারা মানবে না, নবীর ওপর যারা ঈমান আনবে না, কুরআনকে যারা বিশ্বাস করবে না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর নবীকে বলছেন,
إِنَّمَا أَنْتَ مُذَكِّرُ لَسْتَ عَلَيْهِمْ بِمُصَيْطِرٍ
‘আপনি উপদেশ দিন, আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, আপনি তাদের শাসক নন।”
হে নবী! আপনার দায়িত্ব হলো পৌছিয়ে দেওয়া, উপদেশ দেওয়া, নসিহত করা। আমি আপনাকে দারোগা বানিয়ে পাঠাইনি যে, আপনি ধরে-বেঁধে তাদেরকে আমার হুকুম মানাবেন, নামাজ পড়াবেন, মসজিদে পাঠাবেন। এ দায়িত্ব আপনার নয়, আপনার দায়িত্ব শুধু আমার হুকুম পৌঁছিয়ে দেওয়া। নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই আমার কাছে তাদের আসতে হবে, আমি যখন তাদের হায়াত ধরে টান দেব মৃত্যু তখন তাদেরকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। তারপর আমি হিসাব নেব, আমার নেয়ামত খেয়ে, আমার জমিনে বাস করে, সুখ-শান্তি ভোগ করে তুমি কী কাজ করে এসেছ। তিনি বলেন,
لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
‘কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ।’২
কে নেক কাজ করে এসেছে, কে বদ কাজ করে এসেছে তার পরীক্ষা আমি নেব এবং তাকে আমি জিজ্ঞাসা করবো। তিনি বলেন,
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ .
‘এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
তোমরা দুনিয়ায় বেপরওয়াভাবে আমার ভয়-ডর ছেড়ে দিয়ে, আমার নীতি বাদ দিয়ে চলতে পারবে, আমি সময় দেব, ঢিল দেব, আমি মানুষের মত হঠাৎ করে গোসসা বা রাগ করে টান দেব না। আল্লাহ রব্বুল আলামীন রহমানুর রহীম, তিনি এ রকম হঠাৎ করে ধরবেন না, হঠাৎ করে শাস্তি দেবেন না, হঠাৎ করে শ্বাস বন্ধ করে দেবেন না, হঠাৎ করে আজরাইলকে পাঠিয়ে দেবেন না। তাঁর নিয়ম হচ্ছে, তিনি ইরশাদ করেন, وَأَمْ لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ .
‘বস্তুত আমি তাদেরকে ঢিল দিয়ে থাকি, নিঃসন্দেহে আমার কৌশল সুনিপূণ।”
كُلُوا وَ تَمَتَّعُوا قَلِيلًا إِنَّكُمْ مُجْرِمُونَ .
‘(কাফেররা) তোমরা কিছুদিন খেয়ে নাও এবং ভোগ করে নাও। তোমরা তো অপরাধী।’২
তোমরা অল্প কিছু সময় দুনিয়ায় খানা খাও, মজা নাও, ফুর্তি কর। কিন্তু তোমরা যে নাফরমান, আমার বিরোধী, আমার রাসুলের বিরোধী সেটা আমি জানি, তারপরও তোমাদেরকে সুযোগ দেব, এরপর যখন সময় আসবে:
سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ )
‘আমি তাদেরকে ক্রমান্বয়ে পাকড়াও করবো এমন জায়গা থেকে, যার সম্পর্কে তাদের ধারণাও হবে না।”
কোন দিক থেকে ধরা আসবে, গ্রেফতার আসবে তোমরা টেরও পাবে না। কত বড় বড় নেতা, বড় বড় প্রেসিডেন্ট, বড় বড় মিনিস্টার, বড় বড় ধনী টান দিলে কেউ আর থাকতে পারবে না। কেউ এক্সিডেন্টে, কেউ প্যারালাইসড হয়ে একেকজনের একেক অবস্থা, আবার কারও হার্ট অ্যাটক, কোনো না কোনোভাবে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে। আমাদের দেশে আমরা শুনতাম, জনগণ শ্লোগান দিচ্ছে, ‘একনেতা একদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ।’ আবার কয়েকদিন পর শুনি, ‘একনেতা একদেশ একরাতেই কারবার শেষ।’ এটা কারও সমালোচনা নয়, আমাদের উপদেশ গ্রহণ করার জন্য।
কোনো প্রেসিডেন্ট, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে ক্ষমতা থাকলে কেউ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে চাইত না। কিন্তু পারে না, আল্লাহ টান দিয়ে যেতেই হবে। তাই এই সময়টা যদি তোমরা নবীকে আদর্শ মেনে জীবন-যাপন করো, তোমাদের এ কূল-ওইকূল অর্থাৎ দুনিয়া আখেরাতে তোমরা কামিয়াব ও সাফল্য লাভ করবে এবং তোমাদের জিন্দেগির মূল্যটা যে উদ্দেশ্যে আমি পাঠিয়েছি আমার বন্দেগি করার জন্য সেই বন্দেগিতে পরিণত হবে। উদাহরণ-স্বরূপ আমরা পূর্ব-পশ্চিম পার্থক্য করে যদি পেশাব-পায়খানা করি, নবী করীম ইরশাদ করেন,
فَلَا تَسْتَقْبِلُوا الْقِبْلَةَ، وَلَا تَسْتَدْبِرُوهَا».
‘(ইন্ডিনজা করার সময়) তোমরা কেবলার দিকে মুখ করবে না কিংবা কেবলার দিকে পিঠ দেবে না।”
এটি বুখারী শরীফের হাদীস। মানুষের একটা অপবিত্র কাজ, তার জরুরত পূরণ করা যা সবসমসয় করতে হয়, পূর্ব-পশ্চিম হিসাব রেখে, রাসুলের যে নিষেধ কেবলামুখী এবং কেবলার দিকে পিঠ দিয়ে না করে যদি তার বিপরীত করি, তাহলে এই পেশাব-পায়খানা করাটাও ইবাদতে পরিণত হয়, সুন্নতে পরিণত হয়, বুখারী শরীফের হাদীসের ওপর আমল করা হয়। আল-হামদু লিল্লাহ। মুসলমান তথা উম্মতে মুহাম্মদী এত ভাগ্যবান, পেশাব-পায়খানার মতো কাজও রাসুলের নীতি মোতাবেক করলে ইবাদত হয়ে যাবে।
এছাড়া কত বড় বড় ভালো কাজ আছে যেগুলো আমরা করি, যদি শরীয়তের সীমার ভেতর থেকে করি তাহলে সবগুলো ইবাদত হবে। মাতা-পিতার খেদমত, আমার স্ত্রী-সন্তানের খেদমত, আত্মীয়-স্বজনের খেদমত এগুলোও ইবাদত। কিন্তু আল্লাহর ফরজ-ওয়াজিব ঠিক রাখতে হবে, শরীয়তের সীমাও ঠিক রাখতে হবে। এই কাজগুলো দুনিয়ার কাজের সাথে সাথে দীনী কাজে পরিণত হয়ে যাবে। মানুষ করতে জানলে দুনিয়ার কাজ দীনী কাজ হয়ে যায। আমাদের বুযুর্গানে দীনগণ উপদেশ দিয়ে বলতেন, ‘দুনিয়াকে দীন বানানো যায় মানুষের নিয়ত অনুযায়ী।’ সুবহানাল্লাহ।
ঘরের মধ্যে আমরা সবাই জানালা-খিড়কি দিয়ে থাকি আলো-বাতাসের জন্য, না আমি বলবো, আলো-বাতাসের জন্য নয়, কী জন্য? যেন আমি নামাজের ওয়াক্তে আযান শুনতে পারি এজন্য আমি জানালা-খিড়কি দিয়েছি। জানালা-খিড়কি থাকলে আলো-বাতাস তো এমনিতেই আসবে, সেই সাথে নিয়তের কারণে ইবাদতও হবে। আমরা দুনিয়ার জন্য করি, নিয়তটা যদি দীনের দিকে থাকে এটি ইবাদত হয়ে যাবে। আল-হামদু লিল্লাহ। মুসলমান করতে জানলে ছোট-বড় সকল কাজ ইবাদতে পরিণত হয়। নবী করীম ইরশাদ করেন, لَا يَأْكُلْ أَحَدُكُمْ بِشِمَالِهِ، وَلَا يَشْرَبُ بِشِمَالِهِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْكُلُ بِشِمَالِهِ،
وَيَشْرَبُ بِشِمَالِهِ».
‘তোমাদের কেউ যেন বাম হাতে না খায় এবং বাম হাতে পান না করে। কেননা শয়তান বাম হাতে খায় এবং পান করে।১
অমুসলমানরা বাম হাতে কেন পানাহার করে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে রাসুল এও ইসলামের বিরোধিতা করতে গিয়ে বাম হাতে পানাহার করে। আমরা অনেকেই তাদের অনুকরণে বাম হাতে পানহার করি, এটা শয়তানের কাজ। হাদীসে পরিষ্কার আছে, শয়তান বাম হাতে খাওয়া-দাওয়া করে। এখন আমরা যদি বাম হাতে খাওয়া-দাওয়া করা থেকে বিরত থাকি এবং ডান হাতে খাওয়া-দাওয়া করি, তাহলে শরীয়তের হুকুম মান্য করা হবে এবং শরীয়তের হুকুম বাস্তবায়ন করলে আমাদের খাওয়া-দাওয়া ও পানাহার ইত্যাদি ইবাদতে পরিণত হয়ে যাবে।
আমরা বরতনে বা প্লেটে খাই, কেউ কেউ কিছু খায় কিছু রেখে দেয়, এটা শরীয়তে নিষেধ। এতে করে আল্লাহর নেয়ামতের বেকদরি করা হয়, আল্লাহর নেয়ামতের মূল্যায়ন করা হয় না। আল্লাহর নেয়ামতের কদর করা উচিত। এজন্য নবী করীম খাবার পর আঙুল ও বরতন চেটে খাবার নির্দেশ দিয়েছেন। কেন নির্দেশ দিয়েছেন? আল্লাহর নিয়ামতের কদর করার জন্য। আমরা যেগুলো খাচ্ছি সেগুলো আল্লাহর নেয়ামত, আমাদের বানানো নয়, সবগুলো আল্লাহর বানানো, আল্লাহর তৈরি করা, আল্লাহর সৃষ্টি। তাই মুছে খেলে আল্লাহর নেয়ামতের কদর করা হয়, আর না মুছে খেলে আল্লাহর নেয়ামতের বেকদর করা হয়।
যে খাবারগুলো বরতনে থেকে যায় শয়তান সেগুলো চেটে চেটে খেয়ে নেয়। এজন্য নবী করীম ইরশাদ করেন, (খাবার পর যদি মুছে না খাও) আল্লাহর নেয়ামত তোমাদের বিরুদ্ধে নালিশ করবে এবং যে প্লেট-বরতনগুলোতে তোমরা খেয়েছ এগুলো আল্লাহর মাখলুক, এগুলোও তোমাদের বিরুদ্ধে নালিশ করবে। আর যদি তুমি আল্লাহর নেয়ামতগুলো পরিষ্কার করে মুছে খেয়ে নাও তাহলে এই মাসুম, বেগোনাহ মাখলুক তোমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। নবী করীম ইরশাদ করেন, الْقَصْعَةُ فَتَقُولُ: اللَّهُمَّ أَعْتِقْهُ مِنَ النَّارِ كَمَا أَعْتَقَنِي مِنْ يَدِ الشَّيْطَانِ».
‘বরতনে বলে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর যেভাবে সে আমাকে শয়তানের মুখ লাগানো হতে রেহাই দিয়েছে।”
দেখুন! একটা ছোট কাজ এগুলো আমরা কোনো কাজও মনে করি না, যদি উম্মতে মোহাম্মদী করতে জানে, তাহলে এই সামান্য কাজগুলোও ইবাদতে পরিণত হয় এবং একটা মাসুম আল্লাহর মাখলুক বরতন-প্লেট আমাদের জন্য দোয়া করে, যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করে। যা হোক এগুলো তো ছোট ছোট বিষয় যা আপনাদের সামনে আলোচনা করলাম। এগুলো চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সময় মতো নামাজ আদায় করা। বিশেষ করে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ ও ওয়াজিব ঠিক রাখবেন, নবী করীম ইরশাদ করেন,
أَرَأَيْتُمْ لَوْ أَنَّ نَهْرًا بِبَابٍ أَحَدِكُمْ يَغْتَسِلُ مِنْهُ كُلَّ يَوْمٍ خَمْسَ مَرَّاتٍ، هَلْ يَبْقَى مِنْ دَرَنِهِ شَيْءٌ؟» قَالُوا : لَا يَبْقَى مِنْ دَرَنِهِ شَيْءٌ، قَالَ: فَذَلِكَ مَثَلُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ، يَمْحُو اللَّهُ بِهِنَّ الْخَطَايَا».
‘বলতো যদি তোমাদের মধ্যকার কারও দরজার সামনে যদি একটি নদী থাকে আর সে ব্যক্তি পাঁচবার তাতে গোসল করে, তবে তোমরা কী বলো, তার (শরীরে) কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকতে পারে কি? তারা বললো, কোনো ময়লাই থাকতে পারে না। তিনি বললেন, এমনটিই হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের উপমা, এগুলোর দ্বারা আল্লাহ তাআলা পাপসমূহ মোচন করে দেন।’২
যারা কালিমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ পড়ে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাদের জন্য এই নামাজ একটা নহরের ন্যায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে পাঁচবার গোসল করার মতো তাদের অনিচ্ছায় ছোট-খাট যেসব গোনাহ হয়ে যায়, সেগুলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার করে দেন। সুবহানাল্লাহ! আল-হামদু লিল্লাহ। আল্লাহ পাক-কে স্মরণ করার জন্য, আল্লাহকে ইয়াদ করার জন্য, আল্লাহর দীনকে তাজা রাখার জন্য এবং আমাদের ঈমানকে তাজা রাখার জন্য শরীরের খাদ্যের মতো রুহের খোরাক হিসেবে আল্লাহ নাম-কালাম, যিকির-আযকার ইত্যাদি করতে হবে। দুনিয়ার বুকে যত নেয়ামত ভোগ করছি এগুলো শরীরের খোরাক, আর নামাজ-কালাম, যিকির-আযকার, তিলাওয়াতুল কুরআন হলো আত্মার খোরাক। শরীর ও রুহ বা আত্মা এ দুটো নিয়েই বনি আদমের জীবনের গাড়ি। তাই দুটোরই খোরাক দরকার। এই দুটোর মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারব।
গাড়ির যেমন চাকা চারটি, মোটর সাইকেলে চাকা দুইটি। গাড়ি চলার জন্য যেমন পেট্রোল, ডিজেল দরকার, চাকার জন্যও তেমন হাওয়ার দরকার। গাড়ির দুই চাকার মধ্যে এক চাকায় হাওয়া আছে অপর চাকায় যদি না থাকে অথবা হাওয়া আছে কিন্তু পেট্রল-ডিজেল যদি নেই, এই গাড়ি যেমন আমাদেরকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। তদ্রূপ আমাদের জীবনের গাড়িও যদি আমরা শুধু একটাকে চালাই আর অন্যটাকে অনাহারে রাখি, তাহলে কবরে গিয়ে এক্সিডেন্ট করবে, হাশরে গিয়ে এক্সিডেন্ট করবে, পুলসিরাতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করবে, বেহেশত পর্যন্ত আমরা যেতে পারব না।
আর যদি নামাজ-কালাম, যিকির-আযকার, তিলাওয়াতুল কুরআন দ্বারা রুহ বা আত্মাকে খোরাক দেই, তাহলে এ গাড়ি আমাদেরকে কবর, হাশর, পুলসিরাত ইত্যাদি পার করে জান্নাত পর্যন্ত নিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। তাই জাহেরি শরীরের খোরাকের সাথে সাথে শরীরের বাতেনি তথা আত্মার খোরাকেরও ব্যবস্থা করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে তওফিক দান করুন। আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।
গ্রন্থনায়: হাফেজ আবু নোমান মোহাম্মদ ছফিউল্লাহ
Leave a Reply