তিনি ছিলেন একজন আধুনিক আধ্যাত্মিক সাধক

পীর-মুর্শিদের এই দেশে যখন মানুষের মনে তরীক্বতপন্থীদের প্রতি অবজ্ঞার সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল ঠিক ঐ সময়ে হযরত মাওলানা আবদুল জব্বার সাহেব রহ. এর আবির্ভাব। তিনি তাঁর অসাধারণ ত্যাগ-তিতিক্ষা, জনসেবা এবং আর্ত মানবতার আশা-ভরসার কেন্দ্ররূপে বায়তুশ শরফকে প্রতিষ্ঠা করে পীর মাশায়েখদের মৌলিক কর্তব্য সম্বন্ধে দেশবাসীকে সজাগ করে তোলেন। তিনি শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে স্বীয় আধ্যাত্মিকতার সাধনা যেমন চালিয়ে গেছেন, তেমনি দু’হাতে অর্থ ব্যয় করে তিনি গড়ে তুলেছেন এতিমখানা, মাদ্রাসা, মসজিদ ও হাসপাতাল।

কত মানুষ যে তার দয়া, দান ও দোয়ার ভিত্তিতে নিজেদের ঈমানদার ব্যক্তি হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এর সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তিনি বাংলাদেশে পীর ও কামেল দরবেশদের মর্যাদা এতই ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন যে, যুক্তিবাদী আধুনিক বুদ্ধিজীবীরাও তাঁর সামনে গেলে একেবারে নির্বাক হয়ে যেতেন। ইসলামের আসন্ন বিজয় সম্বন্ধে তাঁর যুক্তি তর্কের ধার এতটাই সবল ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে তিনি ইসলামী আন্দোলনের তরুণ কর্মী এবং ছাত্রদের মধ্যে জযবা সৃষ্টি করে দিতেন

তিনি দেশের প্রাত্যহিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর চমৎকার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ যেমন করতে জানতেন তেমনি দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে অনৈসলামিক তৎপরতার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছিল সমসাময়িক ইসলামী চিন্তাবিদ, বিশ্লেষক, অধ্যাপক ও ঐতিহাসিকদের প্রতি তাঁর সমর্থন ও সহয়তা দানের ইচ্ছা। কোন ইসলামী আদর্শের লেখক বা বুদ্ধিজীবী পরিস্থিতির শিকার হয়ে বেকার হয়ে পড়লে তাঁর ব্যাকুলতার সীমা থাকত না। সাধারণত এসব সদগুণ তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যেই সম্পৃক্ত থাকায় তাঁকে সবসময় মনে হত তিনি কেবল একজন তরীক্বতপন্থী পীরের দায়িত্ব পালন করছেন না বরং তিনি একজন আধুনিক আধ্যাত্মিক হৃদয়ের মহান মানুষ বলেই বুদ্ধিজীবীদের কাছে প্রতিভাত হতেন। এ জন্যই দেখা যায় আধুনিক অনেক খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিক নির্দ্বিধায় তাঁর মুরীদ হওয়ার জন্য এগিয়ে এসেছেন। কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে তাঁর সেবামূলক উদ্যোগসমূহ খুবই সমর্থন পেয়েছিল এবং তাদেরকে তিনি তাঁর মহৎ প্রকল্পসমূহের সাথে যুক্ত করতে পেরেছিলেন তাঁর সামনে গেলে তাঁর সদা হাস্যময় উজ্জ্বল চেহারার জ্যোতি আগতদের মনে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ সৃষ্টি করত।

তিনি শরীয়তের বরখেলাফ প্রতিটি কাজের ব্যাপারে সর্বদা শিষ্য ও সহকর্মীদের সতর্ক করতেন। আল্লাহ্ ও রাসূলের আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট।

আমরা আগেই বলেছি দান, দয়া ও দোয়া নিয়ে তিনি বাংলাদেশের সবত্র মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি সফল হয়েছেন এবং মানুষের ব্যাপক সমর্থন এবং ভালবাসাও পেয়েছেন।

‘আঞ্জুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ’-এর মত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটির বীজ বপন করে গিয়েছিলেন তাঁর পীর কুতুবুল আলম শাহ্ সূফী হযরত মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতর সাহেব রহ.। এ প্রতিষ্ঠানটি মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার সাহেব রহ. এমনভাবে ফুলে-ফলে সুশোভিত করেছেন যে এটি হয়ে উঠেছে দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের নির্ভরতার কেন্দ্র। তাঁর মত পীরের আদর্শ মূলত ইসলামেরই উপকার সাধনে সহায়ক বলে আমরা তাঁর মৃত্যুর ক্ষতি অন্তরের অন্তস্থলেই অনুভব করি। এই ক্ষতি পূরণের সাধ্য আমাদের কোথায়? মহান আল্লাহর কাছে আমরা এই অলির মাগফিরাত কামনা করছি। আর প্রার্থনা করছি তাঁর সৎকর্ম ও সেবার আদর্শ যেন আমরা অনুসরণ করতে পারি।


কবি আল মাহমুদ

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি সম্পাদক, দৈনিক কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *