খাগড়াছড়িতে প্রদত্ত হুযুর কেবলার ভাষণ

২৫ নভেম্বর ১৯৯১ খাগড়াছড়িতে গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এতে প্রদত্ত ভাষণের বিশেষ অংশ। সম্পাদক

রাসুল পাক-এর শানে দরুদ ও সালামের উপহার দিয়ে যখন আলোচনার সূত্রপাত করেন তখন জনতার সমবেত কণ্ঠে খাগড়াছড়ির কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানগুলো গুলজার হয়ে ওঠলো। বিশাল প্যান্ডেলে বৈদ্যুতিক বাতির রওশনিতে মদীনায়ে মুনাওয়ারার একটি ঝলক যেন আশেকে রাসুলদের হৃদয়মন চমকে দিল। রাসুল পাকের শানে, চিন্তা ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে সমবেত কণ্ঠে সালাম ও দরুদ পেশ করে প্রথম থেকেই হৃদয়মনকে পবিত্র করার, চিন্তা-বোধশক্তিকে শানিত করার এবং বক্তা ও শ্রোতার মাঝে আত্মিক বন্ধন সৃষ্টি হওয়ার সুন্দর ব্যবস্থার চেয়ে উত্তম কোনো বৈজ্ঞানিক পন্থা বক্তৃতাশিল্পে আবিষ্কৃত হয়েছে কিনা জানা নেই।

যা হোক, দীনী ও ঈমানি চেতনা নিয়ে রাত ৮টায় শুরু হলো বায়তুশ শরফের পীর সাহেব কেবলার আলোচনা। কয়েক দিক থেকে এ মাহফিলের গুরুত্ব অনেক। কারণ শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী হত্যার ভয়ে এলাকার জনগণ আতঙ্কিত। বিকেল ৪টার পর যাতায়াত বন্ধ। এক সময়কার প্রাণচাঞ্চল্য ভরা খাগড়াছড়ি এখন নিষ্প্রভ। তবে উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে আগের তুলনায় প্রচুর। ঈদগাহ ময়দানের দেয়ালটিও গত বছরের। একটি জেলা সদরের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে। নেই শুধু মানুষের মনে নিরাপত্তার গ্যারান্টি। তাই মাহফিলে লোক সমাগমের ব্যাপারে শঙ্কিত ছিলেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু রাতের মাহফিলে চার-পাঁচ হাজার লোকের উপস্থিতি তাদের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত করল।

ঈদগাহ ময়দানের বিরাট প্যান্ডেল ভর্তি হয়ে কুয়াশার মাঝেও অনেক লোক দাঁড়ানো। রাত ১০টা পর্যন্ত তাদের উপস্থিতি বাড়তেই থাকল ক্রমান্বয়ে। আলোচনার শুরুতে পীর সাহেব কেবলা বললেন, আপনাদের ভক্তি-মহব্বতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই আমি শারীরিক অসুস্থতা ও ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করে আজ হাজির হয়েছি। সবকিছুর চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেছে। অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর পরও অনেক বয়স্ক লোক আমাকে স্মরণ রেখেছেন, আজকে দেখা করে অনেকে তাদের মনের আবেগ প্রকাশ করেছেন, এজন্য আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া আদায় করি। আল-হামদু লিল্লাহ।

আজকের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আলোচ্য বিষয় আমার মনে হাজির নেই।

আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় মুখ দিয়ে যা আসে তাই আরজ করবো আপনাদের সামনে। আপনাদের মাঝে আমি আসতে না পারলেও অনেক ওলামা-মাশায়েখ আসেন, তাঁদের ওয়াজ শোনেন। আমিও দুই-চার কথা আলোচনা করতে চাই। এ ধরনের আলোচনাকে দীনী পরিভাষায় বলা হয় ওয়াজ। এ ওয়াজের রেওয়াজ অনেক দিনের পুরনো। নবী করীম-এর ওয়ারিস হিসেবে আলেম ও পীর-বুযুর্গগণ এ সিলসিলা জারি রেখেছেন। আল্লাহর সমস্ত পয়গাম্বর দুনিয়ায় এসেছেন মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকার জন্যে, ভুল পথ হতে ফিরিয়ে আনার জন্যে তাঁদের মৌখিক প্রচেষ্টার নামই ওয়াজ। আল্লাহর নবী ও আদিষ্ট ছিলেন এ ওয়াজের জন্য। মানুষকে মারধর করে সৎপথে আনার দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল না। কুরআন মজীদে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

فَذَكِّرُهُ إِنَّمَا انْتَ مُذَكِّرُ لَسْتَ عَلَيْهِمْ بِمُضَيْطِرٍ إِلَّا مَنْ تَوَلَّى وَكَفَرَ فَيُعَذِّبُهُ اللَّهُ الْعَذَابَ الْأَكْبَرَ إِنَّ إِلَيْنَا إِيَابَهُمْ ، ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا حِسَابَهُمْ )

‘আপনি হলেন উপদেশদানকারী ওয়ায়েজ। আপনি তাদের ওপর দারোগা নন (যে জোর জবরদস্তি করে হিদায়ত করতে হবে), তবে যারা আপনার ওয়াজ শোনবে না এবং কুফরি করবে, তাদের বিরুদ্ধে স্বয়ং আল্লাহই কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন। তিনি তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবেন। তারা তো ভুলে গেছে যে, তাদেরকে একমাত্র আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে এবং আমিই তাদের কৃতকর্মের চুলচেরা হিসেব নিকেশ করবো।”

পীর-মাশায়েখ ও হক্কানি আলেমগণের ওয়াজ-নসিহতের পক্ষে কুরআন মজীদের এ আয়াত অত্যন্ত মজবুত দলীল। ওয়াজের গুরুত্ব ও মর্যাদা পরিষ্কার ফুটে ওঠেছে এ আয়াতে। এরপর মানুষের ওপর আল্লাহর অসীম দান ও নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ধন-সম্পদ, সুখ-শান্তি, পরিবার-পরিজন, নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব প্রভৃতির কথা বাদ দিন, আলো-বাতাস, জীব-জন্তু, গাছ-পালা, উদ্ভিদ প্রভৃতি নেয়ামতের কথাও আপাতত দূরে রাখুন, এই যে আমার দেহ, এ দেহের যে বাহু, যে হাত, হাতের আঙুলগুলো, এগুলো নিয়ে চিন্তা করলেই আল্লাহর অপার অনুগ্রহের প্রতি বান্দার মাথা অবনত হয়ে যায়। সারা জীবন দিয়েও আল্লাহর এ দানের শোকরিয়া আদায় করা কি কারও পক্ষে সম্ভব?

আর এক হাতের সামান্য পাঁচটি আঙুল, এ আঙুল না থাকলে কাজ চলে না, আহার চলে না, জীবন অচল। আল্লাহ পাক যদি কেবল হাড় দিয়ে আঙুল তৈরি করতেন, তাহলে শক্ত কাঠের মতো হয়ে অকেজো হয়ে পড়তো। যদি শুধু গোশত দিয়ে তৈরি করতেন তাহলে নরম তুলতুলে অকেজো প্রমাণিত হতো। হাড় দিলেও তা যদি বাঁকা বা বাহুর মতো লম্বা হাডিড হতো, তাতেও আঙুল দিয়ে কোন কাজ হতো না। ছোট ছোট পরিমিত ও টুকরা হাড় জোড়া লাগিয়ে দিয়েছেন। গিট দিয়ে সেগুলো ইচ্ছা মতো নড়া-চড়া করে সব কাজ করা যায়।

আহার-বিহার, গাড়ি চালনা, বিমান পরিচালনা, হাল-চাষ, এমনকি পরনের কাপড় সবই এ আঙুলের কাজ। এ হাতে অপর ৫টি আঙুলে মুরব্বির গুরুত্ব লক্ষ করুন। বৃদ্ধাঙ্গুলটি অন্য চারটির চেয়ে বেঁটে। দেখলে পছন্দ হয় না। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখুন এ মুরব্বীর সাহায্য ছাড়া কোনো কাজই হয় না। আল্লাহর অনুপম সৃষ্টি রহস্যের একটি ছোট্ট উদাহরণ দিলাম। বিচিত্র কলাকৌশলে গড়া মানুষের দেহ, বিশ্বপ্রকৃতি, আকাশ-বাতাস সবকিছুতেই দেখতে পাবেন আল্লাহর অতুলনীয় সৃষ্টি কৌশলের নিদর্শন। فقتبْرَكَ اللهُ أَحْسَنُ المين )ফতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকীন)।

পীর সাহেব কেবলা এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের ওপর আল্লাহ তাআলার এত বিশাল নেয়ামতের দাবি কী? তিনি চান আমরা তাঁর আনুগত্য করি। আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা সমগ্র জীবন আল্লাহর রাসুল-এর সুন্নত অনুযায়ী পরিচালনা করি। অনেকে ইসলামী শাসন কায়েমের কথা বললে নাক ছিটকায়, ভয় পায়। দেখুন, এ বিশাল সৃষ্টি আল্লাহর। আল্লাহর দেয়া নিয়ম-বিধান অনুযায়ী সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে। তাই কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম অশান্তি নেই। কিন্তু আমরা মানুষ হয়ে আল্লাহর দেয়া সীমিত স্বাধীনতার অপব্যবহার করছি বিধায় আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অশান্তি নেমে এসেছে। ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে, সমাজে রাষ্ট্রে কি ধরণের শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে হযরত রাসুল পাক-এর মদীনার জীবন ও খোলাফায়ে রাশেদার শাসনকাল তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

আসলে ইসলামী হুকুমত সম্পর্কে অজ্ঞতাই এ জাতীয় ভয় ও আতঙ্কের জন্য দায়ী। যারা ইসলামী হুকুমতের কথা জনগণের সামনে বলেন, তাদেরও সঠিক ধারণার অভাব, আর যারা শোনেন ইসলাম সম্পর্কে তাদের অবস্থা অন্ধের মতো। এক জন্মান্ধকে খাওয়ার পর দুধ পান করার আবদার জানিয়ে দুধের সঠিক পরিচয় হিসেবে বক এবং বকের পরিচয় দিতে গিয়ে হাত ও পাঞ্জা দেখানোর পর অন্ধ যেভাবে প্রাণ নিয়ে ভাগছিল আমাদের অবস্থাও সে রকম হয়েছে। ইসলামী হুকুমত সম্পর্কে জনসাধারণের অবস্থা জন্মান্ধের মতো। আমরা তাদেরকে ইসলামী হুকুমতের অতিউপাদেয় দুধ পান করানোর কথা বলে প্রথমে দুধ বকের মতো সাদা, আর বক হাতের বাঁকানো পাঞ্জার ন্যায় বলে বোঝাচ্ছি। তখন আন্ত হাত আর বাঁকানো পাঞ্জা গলায় ঢুকলে প্রাণনাশের আশঙ্কায় পালিয়ে যাচ্ছে ইসলামী হুকুমতের দাবি থেকে।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, আল্লাহর এত নেয়ামত ভোগ করার পর আমাদের কি উচিত নয়, আল্লাহর আইন ও তাঁর প্রিয় নবীর সুন্নত অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। খাবো আল্লাহর, আর গান গাইব ব্রিটিশ-আমেরিকার এ কেমন ইনসাফ?

তিনি বলেন, দেশে যদি ইসলামী হুকুমত হয় তাহলে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিডিআর, সরকারি চাকরিজীবী সবার চাকরি ও নিয়মিত কাজ ইবাদত-বন্দেগিতে পরিণত হবে। এতে দুনিয়াও পাওয়া যাবে আখেরাতও লাভকরা যাবে। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে যোদ্ধা ইসলামী রাষ্ট্র ও মুসলিম জনগণের জান-মালের হেফাজত ও শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার কাজে নিয়োজিত, ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তে রাতে এক ঘণ্টা পাহারা দেওয়া কোনো বুযুর্গের সারা রাত জেগে নফল ইবাদতের চেয়ে বেশি সওয়াবের কাজ।’ এ থেকেই ইসলামী রাষ্ট্রে অন্যান্য কাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করুন।

আলোচনার উপসংহারে বায়তুশ শরফের পীর সাহেব কেবলা বলেন, আল্লাহর হুকুম মেনে চললে আমাদের জীবনের সমস্ত কাজই আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে গণ্য হবে। পায়খানা-প্রস্রাবের সামান্য উদাহরণ দিচ্ছি। পাহাড়ি এলাকার মানুষ সাধারণত ঝোপে-ঝাড়ে প্রয়োজন সারতে অভ্যস্ত। রাসুলে পাকের নির্দেশ, ‘তোমরা যখন পায়খানা-প্রস্রাবে যাবে তখন কেবলাকে মুখ বা পিঠ দিয়ে বসবে না।’ অর্থাৎ পশ্চিম বা পূর্ব দিকে মুখ করে পায়খানা-প্রস্রাব সারবে না। সবমানুষকেই এই প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারাতে হয়। কিন্তু যদি রাসুলে পাকের নির্দেশের কথা স্মরণ করে উত্তর দক্ষিণমুখী হয়ে বসা হয়, তাহলে পায়খানা-প্রস্রাবের সময়টিও আল্লাহর ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।

তিনি ব্যবসায়ী শ্রেণিকে ধোঁকা-প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকারও উপদেশ দিয়ে বলেন, আমানতদার, সত্যবাদী ব্যবসায়ী হাশরের ময়দানে আল্লাহর নবীদের, সিদ্দীকদের এবং শহীদ ও নেককার বুযুর্গদের সাথী হবেন। হাদীস শরীফে রাসুলে পাক আরও ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর বান্দার রিযিকের দশ ভাগের নয় ভাগ ব্যবসার মধ্যে রেখে দিয়েছেন। দুনিয়ায় যত সৎকাজ হয়েছে মসজিদ, মাদরাসা, জনকল্যাণমূলক কাজ তা অধিকাংশই ব্যবসায়ীদের অর্থ ও সাহায্যে হয়েছে। এজন্য ব্যবসায়ীর মর্যাদা ও গুরুত্ব এত অধিক।

আরব থেকে আসা ব্যবসায়ীরাই বাংলাদেশসহ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশে ইসলাম প্রচার করেছেন। আপনারাও খাগড়াছড়িতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে উপজাতীয় ভাইদেরকে আল্লাহর পথে আসতে অনুপ্রাণিত করতে পারেন। তখন আপনারা শুধু ব্যবসায়ী নন, মুবাল্লিগ ও মুজাহিদের মর্যাদাও লাভ করবেন। আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তওফিক দিন। আমীন।

গ্রন্থনায়: ড. মাওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *