১২ এপ্রিল ১৯৮৭ (রবিবার) বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ‘হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজের সর্বাত্মক প্রেম ও ব্যক্তি মানসের ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রবন্ধের ওপর এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব ড. শব্বির আহমদ পঠিত প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. বদিউর রহমান ও একই বিভাগের ড. মুহাম্মদ শাহজাহান এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. আবদুল করীম প্রমুখ।
উক্ত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বায়তুশ শরফের শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব। তাঁর সভাপতির ভাষণে সুফিয়ায়ে কেরামদের বিভিন্ন শ্রেণিবিন্যাসের কথা উল্লেখ করে বলেন। সম্পাদক
সুফিয়ায়ে কেরামের মধ্যে আল্লাহ তাআলার মা’রিফত হাসিল করার ব্যাপারে বিভিন্ন শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। মা’রিফতের সমুদ্রে সুফিয়ায়ে কেরামরা যে জাল নিক্ষেপ করেছেন, সে জালে কারও এসেছে পুঁটি মাছ, কারও এসেছে বিরাট বিরাট সামুদ্রিক মাছ, আবার কারও এসেছে মণি-মুক্তা। অর্থাৎ কেউ মা’রিফতের সমুদ্রে ডুব দিয়ে সামান্য কিছু পেয়েছেন, আবার কেউ মা’রিফতের নিগুড় তত্ত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। হযরত হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ এ মা’রিফতের সেই গভীর সমুদ্রে ডুব দিয়ে সেখান থেকে অজস্র মণি-মুক্তা হাসিল করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি মা’রিফতের সমুদ্রে নিজকে এমনভাবে হারিয়ে ফেলেছিলেন যে, পার্থিব কোন সুখ-শান্তি ও ধন-সম্পদের খেয়াল ছিল না তার মধ্যে বিন্দুমাত্র। তিনি খোদার কাছে স্বীয় অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়েছিলেন।
মাওলানা রুমী কতইনা সুন্দর কথা বলেছেন, ‘তুমি যদি সম্মানের শীর্ষে আরোহন করতে চাও তা হলে স্বীয় অস্তিত্বকে আল্লাহর কাছে বিলীন করে দাও।’ এ প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় হুযুর কেবলা কাদিরিয়া তরীকার প্রখ্যাত অলী সুলতান বাহ্-এর উল্লেখ করে বলেন, কাদিরিয়া তরীকার মধ্যে বাহু নামে একজন বিখ্যাত অলী ছিলেন। তিনি আল্লাহ শব্দের আলিফ-লামকে বাদ দিয়ে শুধু ‘হু’ ‘হু’ বলতেন। এতে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এত লম্বাছোড়া না বলে মূল উদ্দেশ্য ‘হু’ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলারই সন্তুষ্টি।
হযরত হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজের আনাল হক বলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলা বলেন, হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজের আনাল হক বলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এই যে, আমি হক (আল্লাহ)। অর্থাৎ আমি আমার কলবের আয়নার মধ্যে একমাত্র রব্বুল আলামীনকে দেখতে পাচ্ছি। আমি যে দিকে দৃষ্টি প্রদান করি শুধু হক (আল্লাহ) ছাড়া কিছুই দেখতে পাই না। গাছ-পালা পশু-পাখী, বৃক্ষলতা সব কিছুর মধ্যে আমি হক (আল্লাহ)-কে দেখতে পাচ্ছি। আমি আমার মধ্যে হক ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
হযরত হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ আনাল হক বলার পরে পরেই জাহেরি আলেমরা তাঁর বিরুদ্ধে কুফরি ফতোয়া জারি করেছিলেন এবং তাঁকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছিল। শাহাদাতের পূর্বে সে জামানার জাহেরি আলেমরা তাঁকে দোররা মেরেছিলেন। এতে তিনি বিন্দুমাত্র মনঃক্ষুণ্ণ না হয়ে উলটো হাসছিলেন। তৎকালীন সম্রাটের চাপে পড়ে প্রখ্যাত অলী হযরত জুনাইদ বাগদাদী তাঁকে দোররার পরিবর্তে ফুল মেরেছিলেন, এতে তিনি চিৎকার করে কেঁদে বলেছিলেন, ‘অন্যদের দোররার আঘাতে আমি যুতটুকু কষ্ট পাইনি এর থেকে বেশি কষ্ট পেয়েছি হযরত জুনাইদ বাগদাদী-এর ফুল নিক্ষেপের কারণে। এজন্য যে, অন্যান্য জাহেরি আলেমরা আমাকে চিনতে পারেনি বটে কিন্তু হযরত জুনাইদ বাগদাদী আমার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রয়েছে।’
শ্রদ্ধেয় হুযুর কেবলা হযরত হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ-এর আনাল হক বলাটা যে অযৌক্তিক ছিল না, এর সঠিক প্রমাণ পেশ করতে গিয়ে বলেন, আমরা সাধারণত দেখতে পাই, পানি যখন আগুনের প্রভাবে গরম হয়ে যায় তখন তার মধ্যে আগুনের তাসীর চলে আসে এবং আগুনের মতো পোড়াতে আরম্ভ করে। অনুরূপ হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ-এর মধ্যে যখন খোদায়ী তাসীর (প্রভাব) চলে আসছিল তখন হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ স্বীয় মানবীয় সত্তাকে হারিয়ে তাঁর মধ্যে খোদায়ী প্রভাব দেখতে পেয়েছিলেন। তাই তিনি বলেছেন, আনাল হক।
এ প্রসঙ্গে তাঁর নিজের ভাষ্য হচ্ছে, ‘আমি নিজে নিজকে আনাল হক বলছি না এবং আমার বন্ধুই আমাকে আনাল হক বলাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে খোদার প্রেম হচ্ছে এমন আগুন যা আল্লাহ ছাড়া সব কিছুকে জ্বালিয়ে দেয়। আল্লাহ পাক পবিত্র কালামে ইরশাদ ফরমায়েছেন, ‘আমি তাদেরকে (আমার মকবুল বান্দাদেরকে) দিগন্তের মধ্যে আমার নিদর্শনাবলি এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও এমন নিদর্শনাবলি প্রদর্শন করাব যাতে হক বা আলোর সত্তাই তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।’ পবিত্র কালামে আরও ইরশাদ হয়েছে,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
‘যারা আমার পথে চেষ্টা-সাধনা করে তাদেরকে আমি আমাদের সঠিক ফলসমূহ প্রদর্শন করাব। অর্থাৎ তাকে আমি মনজিলে মকসুদে পৌছিয়ে দেব।”
হযরত হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ যেহেতু অক্লান্ত শ্রম-সাধনার মাধ্যমে স্বীয় জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন তাই আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন অর্থাৎ খোদার সন্তুষ্টি তিনি অর্জন করতে সক্ষম, হয়ে ছিলেন। মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী কতই না সুন্দরভাবে বলেছেন, ‘আল্লাহর বিশেষ মকবুল বান্দারা খোদা নন বটে, কিন্তু খোদা হতে পৃথকও নন।’
গ্রন্থনায়: মাওলানা আবুল হায়াত মুহাম্মদ তারেক
Leave a Reply