চুনতির পবিত্র সীরাতুন্নবী মাহফিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর হতেই চলে আসছে এই মাহফিল। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পেয়ারা হাবীবের আশেক ও প্রেমিকদের পবিত্র সম্মেলন। ১৯ দিনব্যাপী এই নুরানি মাহফিলের শেষদিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণির ওলামা-মাশায়েখ, ধর্মপ্রাণ জনগণ ছাড়াও সারা দেশ থেকে বহু আলেম ও বিজ্ঞজনের সমাগম হয় সীরাত ময়দানে। রবিউল আউওয়ালের শেষ তারিখ সারারাত ধরে চলে সমাপনী অনুষ্ঠান। শেষরাতে মুনাজাতে শামিল হওয়ার জন্যে লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিতি এক স্বর্গীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে চুনতির সবুজ-শ্যামল পাহাড় বেষ্টিত মাহফিলকে।
ফজর নামাজের পরই আশেকে রসলদের এই মাহফিল শেষ হয়। চট্টগ্রাম শহর হতে কক্সবাজার যাওয়ার পথে প্রায় মধ্যখানেই আরাকান রোড ঘেঁষে অবস্থিত চুনতি ইউনিয়ন। বহু অলী-আল্লাহর নিবাস এই চুনতি। চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসার গৌরবময় ঐতিহ্য চুনতির আধ্যাত্মিক মর্যাদাকে আরও মহিয়ান করেছে বিভিন্নভাবে। তাই চুনতির প্রাকৃতিক দৃশ্য, অনুচ্চ সবুজ টিলা ও গাছ-গাছালি যেমন যেকোন মানুষের নয়ন জুড়ায়, তেমনি তার রুহানি আকর্ষণ ও পরিবেশ প্রশান্তি দেয় আল্লাহ ও রাসুলপ্রেমে জ্বলন্ত মানব-হৃদয়ে। সেই প্রশান্তির অন্বেষায় ছুটে যায় হাজার হাজার ব্যথিত-আশাহত মানুষ।
৩০ রবিউল আউয়াল ১৩১১ হিজরী মোতাবেক ২০ অক্টোবর ১৯৯০ ছিল এ বছরের সীরাত মাহফিলের সমাপনী দিবস। এ মাহফিলকে এ বছর অধিকতর আধ্যাত্মিক ভাবরসে আপ্লুত করে চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফের শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলার গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ। মাহফিলের নিয়ম মোতাবেক পীর সাহেব কেবলার জন্য নির্ধারিত আলোচ্য বিষয় ছিল ইলমের প্রকারভেদ: শরীয়ত ও মা’রিফতের দৃষ্টিতে একটি পর্যালোচনা। আলোচক হিসেবে বিষয়বস্তুটি ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তাই শ্রোতাদের সমূহ প্রত্যাশা ছিল কল্পনাতীত। আলোচনা শেষে শ্রোতাদের মনে হয়েছে, যেন দীর্ঘক্ষণ আধ্যাত্মিকতার সাগরে সাঁতার কেটে, ডুব দিয়ে অনেক মণি-মুক্তো আহরণ করেছি।
দুঃখের সাথে আবারো বলছি, এই মাহফিলে এবছর শরিক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। যা লিখছি, উপস্থিত শ্রোতাদের বর্ণনা এবং খুব দুর্বল ও অনেক অস্পষ্ট ক্যাসেট থেকে। তবুও এ স্বতন্ত্র বইখানি লেখার প্রবল আগ্রহ অসাধ্য সাধনে ব্রতী করেছে। প্রথমেই দীনী মাহফিলসমূহের নিয়ম অনুসারে সমবেত কণ্ঠে হাজার হাজার ভক্ত প্রাণের দরুদ ও সালামের গুঞ্জরণে রাসুল পাক -এর প্রেম ও মহব্বতে শিহরিত হয় সীরাত মাহফিল। এরপর ওলামা, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, যুবক ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সম্মুখে বায়তুশ শরফের পীর সাহেব কেবলা তার আলোচনা শুরু করেন এভাবে:
চুনতির শাহ সাহেব কেবলা প্রতিষ্ঠিত এ সীরাত মাহফিলে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় আল্লাহ পাকের দরবারে শোকরিয়া আদায় করছি আল-হামদু লিল্লাহ।
কোন বক্তব্য বা আলোচনা রাখার উদ্দেশ্যে নয়, বুযুর্গানে দীনের মজলিসে হাজির হওয়া এবং ওলামায়ে কেরামের সাহচর্য লাভের উদ্দেশ্যেই আমি আজ উপস্থিত হয়েছি। চুনতি আলিয়া মাদরাসার সম্মানিত আসাতেযায়ে কেরাম (শিক্ষক মহোদয়গণ) ছাড়াও চট্টগ্রাম এবং ঢাকার অনেক ওলামা উপস্থিত আছেন এই মাহফিলে। তাঁদের দোয়া লাভ করাই আমার উদ্দেশ্য। মাহফিল কর্তৃপক্ষ আমাকে আলোচনার জন্য একটি বিষয় ঠিক করে দিয়েছেন। প্রথমেই বিষয়টির দিকে আপনাদের সবার মনোযোগ আকর্ষণ করছি, ইলম বা জ্ঞানের প্রকারভেদ: শরীয়ত ও মা’রিফতের দৃষ্টিতে একটি পর্যালোচনা।
আমরা প্রায় সময় শরীয়ত, তরীকত, হাকীকত ও মা’রিফত এই চারটি পরিভাষার কথা শুনি। কিন্তু এগুলোর প্রকৃত অর্থ ও ভাবধারা কী এবং পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক বা তফাৎ কী ধরণের তাও অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়। কিন্তু পরিভাষাগুলো এতই ব্যাপক অর্থপূর্ণ যে, বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে একেকটি পরিভাষার জন্য কয়েক ঘণ্টা করে সময় লেগে যাবে। আসলে শরীয়ত, তরীকত, হাকীকত ও মা’রিফত হলো শাখা-প্রশাখা। ভিন্ন কোনো জিনিস নয়, গোড়ায় সবগুলোই এক। সেই গোড়া হলো ইসলাম। এই মূল কথাটি বোঝার পর এবার আসুন পরিভাষাগুলো নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করি।
শরীয়ত সাধারণ অর্থে কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রণীত আইন-কানুনকেই বলা হয়। বুযুর্গানে দীন বলেছেন যে, শরীয়তের দুটি ধারা আছে।
একটি ঊর্ধ্বমুখী, অপরটি নিম্নমুখী। অপর এক বুযুর্গ বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে দিয়ে বলেছেন যে, শরীয়তের ঊর্ধ্বমুখী যে ধারা তার ইলম বা জ্ঞানকে বলা হয় ‘ইলমে শরীয়ত’। আর যে ধারাটি নিম্নমুখী তাকে বলা হয় ইলমে আসরার। এটি হযরত ইমামে রব্বানি মুজাদ্দেদে আলফে সানী এ-এর উক্তি, যা মকতুবাত শরীফে বিধৃত রয়েছে। সাধারণ অর্থে ইলমে শরীয়ত বলতে ফিকহের মাসআলা-মাসায়েল বা শরীয়তের হুকুম-আহকাম ও পারস্পরিক লেনদেনের আইন-কানুনকে বোঝানো হয়। কাজেই ইলমে শরীয়তকে আমরা সহজে বুঝি। কিন্তু ইলমে আসরার সম্পর্কে অনেকেই ওয়াকেবহাল নই।
তরীকত, হাকীকত ও মা’রিফতের সম্মিলিত ভাবধারাটি ইলমে আসরার পরিভাষার মধ্যে নিহিত। বাংলায় রহস্য, ভেদ ও গূঢ়তত্ত্বকে বলা হয় আসরার। কাজেই ইলমে আসরার মানে শরীয়তের গূঢ়তত্ত্ব বা ভেদের জ্ঞান। তার মানে যেটি প্রকাশ্য নয়, বরং ভেতরে গোপন রয়ে গেছে। সাধারণ কথায় একটি উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি বুঝতে পারি। একপ্রকার শুকনো সুমিষ্ট ফলের সাথে আমরা প্রায় সবাই পরিচিত, নাম তার আলু বোখরা। দেখতে খেজুরের মতো, কিন্তু স্বাদে অতুলনীয়। আলু বোখরার বাইরের বাখলটির স্বাদই স্বতন্ত্র। সাধারণ লোক যারা এ ফলটি সম্পর্কে অভিজ্ঞ নয়, তারা বাখলটি খেয়ে বীচিটি ফেলে দেয়। কিন্তু যারা বয়স্ক বা একটু অভিজ্ঞ তারা জানে ভেতরে কঠিন আন্তরণের মধ্যে একটি শাশ বা সার আছে, যার স্বাদই স্বতন্ত্র। তবে তা উদ্ধার করতে একটু কষ্ট আছে, কায়দাও জানা চাই। শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করতে হয়। তখন বীচিটি ফেটে যায় এবং ভেতরকার নরম শাশটি বেরিয়ে পড়ে।
এবার মুখে দিয়ে দেখুন, কি আশ্চর্য রকমের স্বাদ। অর্থাৎ আলুবোখরার ভেতরের এক মজা আর বাইরের এক মজা। বাইরের বাখলা এবং তার স্বাদকে যদি শরীয়তের সাথে তুলনা করি। তাহলে ভেতরের শাশ ও তার স্বাদকে বলতে হবে মা’রিফত বা ইলমে আসরার। আমরা ভেতরে-বাইরে না বলে পেট ও পিঠ নামেও আখ্যায়িত করতে পারি। অর্থাৎ একটিকে যদি বলি ইসলামের পিঠ, অপরটিকে বলতে হবে পেট। এবার আসুন একটি হাদীসের সাহায্যে বিষয়টি অনুধাবন করি। হযরত রাসুল পাক ইরশাদ করেছেন,
أُنزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ، لِكُلِّ آيَةٍ مِّنْهَا ظَهْرٌ وَبَطْنٌ».
‘কুরআন মজীদ সাত প্রকার কিরাআত সহকারের নাযিল করা হয়েছে। আর কুরআনের প্রত্যেক আয়াতের পিঠ আছে এবং পেটও আছে।”
উল্লেখিত উদাহরণটি সামনে রাখলে এ হাদীসের মর্মবাণী বুঝতে কারও পক্ষে কষ্ট হবে না। এখন আমরা শরীয়তকে জাহেরি জ্ঞান এবং মা’রিফতকে বাতেনি জ্ঞান বলতে পারি। ‘যারুন ওয়া বানুন’ হাদীস শরীফের এ দুটি পরিভাষার আলোকেই আমরা তা বলছি। এ হাদীস সিহাহ সিত্তায় বর্ণিত এবং সকল মুহাদ্দিস এক বাক্যে তার অকাট্যতা স্বীকার করেছেন। কাজেই কেউ যেন একথা না বলে যে, বায়তুশ শরফের পীর সাহেব মনগড়া কথা বলে যাচ্ছেন।
অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগবে যে, এতদিন শুধু কুরআন শরীফের আয়াতসমূহের অর্থ ও ব্যাখ্যা আছে বলেই শুনে আসছি। তার পিঠ বা পেট কিংবা জাহেরি ও বাতেনি অর্থের কথা শুনিনি। এ প্রশ্নের জবাব হিসেবেই আমি কথাটি জোর দিয়ে বলছি। নবী করীম ফরমায়েছেন, হযরত আলী সম্পর্কে
«أَنَا مَدِينَةُ الْعِلْمِ وَعَلِيٌّ بَابُهَا ».
‘আমি জ্ঞানের নগরী আর আলী হলো তার দরজা বা প্রধান ফটক।’২
যেসব গবেষক শরীয়তের তত্ত্বজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেছেন তারা বলেছেন যে, হযরত নবী করীম হলেন সর্বপ্রকার জ্ঞানের কেন্দ্র। যেমন তিনি নিজেই ইরশাদ করেছেন, ‘আমাকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জ্ঞান-ভাণ্ডার দান করা হয়েছে।’
এখন এই বিশাল জ্ঞান-ভাণ্ডারের দরজা হযরত আলী কেন হলেন? ১ম, ২য় ও ৩য় খলীফার মতো সম্মানিত সাহাবী ও রাসুল পাক-এর ঘনিষ্ঠ খলীফাদের পর চতুর্থ খলীফাকে জ্ঞানের নগরীর দরজা হিসেবে আখ্যায়িত করার তাৎপর্য কোথায়? গবেষকরা বলেছেন, যদি নবী করীম-কে জ্ঞানের দালান হিসেবে কল্পনা করা হয় তাহলে চার খলীফা হবেন তার চারটি প্রধান খুঁটি। তার মানে শরীয়তের ইলম চার খলীফা সমান সমান পেয়েছেন। তবে মা’রিফতের জ্ঞানের ফটক হলেন হযরত আলী। এজন্যই দুনিয়ার সমস্ত তরীকতের গোড়া মনে করা হয় হযরত আলী-কে। সুফিয়ায়ে কেরাম তাঁকেই বেলায়তের বা মা’রিফতের জ্ঞানের প্রধান গেইট বলে মনে করেন। ঐতিহাসিক বাস্তবতাই এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, হযরত আলী-এর বংশ থেকেই বেলায়তের সিলসিলা জারি হয়েছে। দুনিয়ার বুকে উম্মতে মুহাম্মদীতে যত সুফি, অলী, দরবেশ ও বুযুর্গ এসেছেন তাদের অধিকাংশই সাইয়েদ বংশের। তাঁদের মধ্যে আবার অধিকাংশ হচ্ছেন হযরত হাসান-এর বংশের। তবে হযরত হুসাইন-এর বংশ হতে সংখ্যার দিক থেকে অলী-আল্লাহ কম হলেও সম্মান ও মর্যাদায় তাঁরা সবার শিরোমণি। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন জগদ্বিখ্যাত বুযুর্গ হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী।
আম্বিয়ায়ে কেরামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও আমরা এ ধরনের একটি বংশচিত্র দেখতে পাই। হযরত ইবরাহীম এ-এর দুই ছেলের মধ্যে হযরত ইসহাক-এর বংশ হতেই সর্বাধিক নবী-রাসুল জন্মগ্রহণ করেছেন। কিন্তু হযরত ইসমাঈল-এর বংশ হতে সংখ্যায় কম হলেও নবীকুল শিরোমণি খাতামুন নাবিয়ীন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা-এর জন্ম, তাঁর বংশসূত্রকে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী করেছে। কেননা দুনিয়ার সমস্ত নবী-রাসুল শেষনবীর জন্যই প্রতীক্ষিত ছিলেন সর্বোতভাবে। বিষয়টি অতিসুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যক্ত করেছেন হযরত ইমাম শরফুদ্দীন আল-বুসীরী এ কাসিদায়ে বুরদায়:
غَرْفًا مِّنَ الْبَحْرِ أَوْ رِشْفًا مِّنَ الدِّيَمِ وَكُلُّهُمْ مِّنْ رَّسُوْلِ اللَّهِ مُلْتَمِسٌ
‘নবী-রাসুলদের প্রত্যেকেই রাসুলুল্লাহ-এর কাছে সমুদ্রের এক অঞ্জলি কিংবা মহাসাগরের এক ফোটা পানির ভিখারি।”
আসুন আমরা মূল আলোচ্য বিষয়ে ফিরে আসি, ইলমে শরীয়ত ও ইলমে মা’রিফত নিয়ে আমাদের আজকের আলোচনা। এতক্ষণের আলোচনায় বিষয়টি আমাদের সামনে অনেকখানি পরিষ্কার হয়ে গেছে। আরেকজন আল্লাহর অলী এ সম্পর্কে বলেছেন যে, উস্তাদের কাছে বা মাদরাসায় পড়াশোনার মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন করা হয় তাকে বলা হয় ইলমে দিরাসত।
আর সেই ইলমের ওপর আমল করার দরুণ বাস্তব কাজ এবং সুদৃঢ় বিশ্বাস ও ইয়াকীনের ফলে যে রহমত পাওয়া যায় আর সেই রহমতের আলোকচ্ছটায় মানুষের মনে যে অপঠিত জ্ঞানের উদয় হয় তাকে বলা হয় ইলমে ওয়ারাসাত। হাদীস শরীফে যেমন ইরশাদ হয়েছে,
مَنْ عَمِلَ بِمَا يَعْلَمُ وَرَّثَهُ اللَّهُ مَا لَمْ يَعْلَمْ».
‘যে ব্যক্তি ইলম পড়ে সে ইলমের ওপর আমল করবে। আল্লাহ তাআলা তাকে এমন ইলম দান করবেন যা সে পড়েনি বা শিখেনি।”
এ হাদীসের বাস্তব নমুনা আমরা অনেক অলী-আল্লাহর জীবনে দেখতে পাই। অন্য দেশের কথা বাদ দিন। ভারতবর্ষে এমন অনেক অলী-আল্লাহ আছেন, যারা মাদরাসায় বেশি পড়েননি বা জাহেরি ইলমের চর্চা অধিক করেননি। অথচ বাতেনি ইলমের দ্বারা জ্ঞানের এমন সমুদ্রে পরিণত হয়েছেন, যার ফলে যেকোনো জটিল বিষয়ে সমাধান ও ফয়সালা দিতে সক্ষম। এ ধরনের একজন অলী-আল্লাহ ছিলেন হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী । তিনি বড় ধরনের নাম করা মুহাদ্দিস, মুফাসসির বা আলেম ছিলেন না। কিন্তু জাহেরি ইলম শিক্ষা করার পর আল্লাহ ও রাসুল-এর মহব্বতের বদৌলতে, আল্লাহর যিকির ও সাধনার মাধ্যমে শরীয়তের হুকুম-আহকাম পালনের মধ্য দিয়ে এমন জ্ঞানের অধিকারী হন, যার কারণে ভারতবর্ষের বড় বড় মুহাদ্দিস, মুফতি ও আল্লামা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মাওলানা রুমী এ তত্ত্বটির দিকে ইঙ্গিত করেই বলেছেন,
علم حق در علم صوفی گم شود یا این سخن کی نزد مردم باور شود
‘শরীয়তের জ্ঞান সুফির জ্ঞানের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু একথা সাধারণ আলেমদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’
ভারতবর্ষের আরেকজন বিশিষ্ট অলী-আল্লাহ ছিলেন ফুরফুরা শরীফের পীর সাহেব হযরত মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী। তাঁর একজন খলীফার নাম ছিল রুহুল আমীন। চব্বিশ পরগনায় তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিকী-এর খলীফা ছিলেন। এক মজলিসে আবু বকর সিদ্দিকী তাঁকে বললেন, রুহুল আমীন! তুমি হাদীস বয়ান করো। তিনি সবিনয়ে আরজ করলেন, হুযুর! আমি তো আলেম নই। আমি কিভাবে হাদীস বয়ান করি? আমি যে একজন জাহেল। হযরত আবু বকর সিদ্দিকী আবারো বললেন, রুহুল আমীন! তুমি হাদীস বয়ান করো। এরপর রুহুল আমীন সাহেব দাঁড়িয়ে এমনভাবে ওয়াজ ও হাদীস বয়ান শুরু করলেন যে, গোটা মজলিস বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল। বস্তুত এটিই ইলমে আসরার-গৃঢ়তত্ত্বের জ্ঞান। কোনো মাধ্যম ব্যতিরেকে সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে আসে এ জ্ঞান। সে অর্থে একে ইলমে লাদুনীও বলা হয়। সে সম্পর্কে আমরা একটু পরে আলোচনা করবো।
আজকের এ মাহফিলে হযরত মাওলানা মোবারক আহমদ সাহেব উপস্থিত আছেন। আমি তাঁর কাছ থেকে অনেকবার শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, আমরা অনেক সময় বহু জটিল প্রশ্ন নিয়ে (চট্টগ্রাম) শহরে মাওলানা আখতার সাহেব (বায়তুশ শরফের প্রতিষ্ঠাতা)-এর কাছে গিয়েছি। কিন্তু বলার আগেই তিনি এমনভাবে আমাদের জবাব দিয়েছেন যাতে আমরা বিস্মিত ও অভিভূত হয়েছি। এ প্রসঙ্গে আমি আমাদের পীর সাহেব কেবলা মাওলানা শাহ সুফি মীর মুহাম্মদ আখতার এ-এর দুয়েকটি সূক্ষ্ম তত্ত্বজ্ঞানের দৃষ্টান্ত পেশ করছি যাতে ইলমে আসরার সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অধিকতর পরিষ্কার হয়ে যায়।
একদিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, মাওলানা আবদুল জব্বার! কুরআন মজীদে যে শয়তানের চরিত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে, সে সব সময় মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয়। কুমন্ত্রণা কি আসলেই খারাপ? সরল অর্থে এ
বক্তব্যটি মোটেই বোধগম্য হবে না। কারণ আমরা সবাই জানি যে, শয়তানের কুমন্ত্রণা আসলে খারাপ জিনিস। এর দ্বারাই মানুষ গোমরাহ হয়। কিন্তু পীর
সাহেব কেবলা বললেন যে, وسوسہ نہ دیا برا ہے )কুমন্ত্রণা না দেওয়াটাই খারাপ)।
কারণ আল্লাহ তাআলা তাকে সে কাজেই নিয়োজিত করেছেন। যাতে মানুষকে পরীক্ষা করা যায়। ভালো এবং মন্দে পার্থক্য হয়। বেহেশতী ও দোযখীর মধ্যে তফাৎ হয়ে যায়। নচেৎ ভালো-মন্দ সব একাকার হয়ে যেত। কাজেই কুমন্ত্রণা
দেওয়াটা খারাপ নয়, বরং না দেওয়াই খারাপ। তবে وسوسہ پزیر ہونابرا ہے )কুমন্ত্রণা গ্রহণ করাটাই হলো খারাপ কাজ)। আরেক দিনের ঘটনা, কুরআন মজীদের আয়াত:
وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ
‘যে ব্যক্তি কুফরি করে আল্লাহ তার ইবাদত-বন্দেগির বা ঈমানের কোনো পরওয়া করেন না। আল্লাহ পাক সম্পূর্ণ বেনেয়াজ-অমুখাপেক্ষী।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আল্লাহর এ অমুখাপেক্ষীতা কি দুনিয়ার মানুষের মতো। দুনিয়ার লোকেরা যেকোনো অবাধ্য লোকের বিরুদ্ধে শান্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। ধরুন কোনো চাকর মনিবের অবাধ্যতা করছে। মনিব অবশ্যই তার বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেবে, চাকরিচ্যুত করবে। পিতা হলে অবাধ্য পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে আল্লাহর শান আলাদা। তিনি হামীদ প্রশংসিত। কারণ তিনি অবাধ্য বান্দার বিরুদ্ধে শান্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে খাওয়া-পরা বন্ধ করে দেন না, বরং শেষপর্যন্ত হিদায়তের পথে আসার জন্য চরম ধৈর্য সহকারে অবকাশ দেন। এভাবে মনিবের জন্যই প্রযোজ্য হয় হামীদ বিশেষণ।
আমার উপস্থাপিত দৃষ্টান্তগুলো খুব সহজ মনে হলেও এর তাৎপর্য অনেক গভীর। বুযুর্গানে দীনের কথা বাহ্যিক দৃষ্টিতে খুব সহজ। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে তাতে জ্ঞানের অনেক খোরাক পাওয়া যায়। যেমন আমার পীর সাহেব কেবলা বলেছেন যে, ‘কোনো বিজ্ঞ লোক কোনো জ্ঞানের কথা বললে তা তিন অবস্থা থেকে খালি নয়। প্রথম হলো শ্রোতার যদি ওই জ্ঞান জানা থাকে তাহলে বিজ্ঞজনের মুখ থেকে শোনার কারণে সে সম্পর্কে তার মনে আর সন্দেহ থাকে না। অথবা যদি ভুলে গিয়ে থাকে বিজ্ঞলোকের মুখে শোনার ফলে তা স্মরণ হয় কিংবা না জানলে জানা যায়।’
লক্ষ করুন! কথাগুলো কত সহজ ও সরল। কিন্তু আমরা অনেকেই চিন্তা করে দেখি না। যার ফলে আমাদের অন্তরে অহমিকার আবরণ পড়ে যায়। উদাহরণ-স্বরূপ মাদরাসায় কিছুদিন লেখাপড়ার পর কিংবা সাধারণ জ্ঞান আহরণের ফলে অনেকের মনে অহমিকার সৃষ্টি হয়। তখন মনে করে, ওয়াজ মাহফিলে বা জ্ঞানের আলোচনায় যাওয়ার কি দরকার? সব তো আমার জানা, মাওলানা সাহেব কি কুরআন-হাদীসের বাইরে কিছু বলবেন অর্থাৎ প্রকারান্তরে তিনি দাবি করতে চান যে, কুরআন-হাদীস আমার জানা আছে। এ ধরনের মাহফিলে বসার ও ওয়াজ শোনার কি দরকার? তাদের জ্ঞানের অহমিকা রোগের চিকিৎসার জন্য আমার পীর সাহেব কেবলার উল্লিখিত সহজ-সরল কথাটি মহৌষধ হিসেবে কাজ দেবে। অর্থাৎ জ্ঞানী লোকের আলোচনা শুনলে, পূর্ব থেকে সে জ্ঞান জানা থাকলে তা পাকাপোক্ত হবে, ভুলে গেলে স্মরণ হবে কিংবা না জানলে জানা যাবে।
এখানে আমার হযরত কেবলার আরেকটি আধ্যাত্মিক উক্তির বর্ণনা দিতে চাই। বিষয়টি একটু জটিল। তাই শিক্ষিত ভাইদের পূর্ণ মনযোগ সহকারে শুনতে হবে। হাদীস শরীফে বর্ণিত, ‘আপনারাও বহু ওয়াজ মাহফিলে আলেমদের কাছে শুনেছেন যে, আল্লাহ তাআলা শবে কদর বা শবে বরাতের রাতে কিংবা প্রতিদিন শেষরাতে দুনিয়ার নিকটতম (প্রথম) আসমানে নাযিল হন এবং দুনিয়াবাসীকে ডাক দিয়ে বলেন, কোনো গোনাহ মাফ চাওয়ার লোক কি আছ? আমি তাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত আছি। কোনো রিযিক সন্ধানকারী কি আছ? আমি অকাতরে তাকে রিযিক দান করার অপেক্ষায় আছি। তখন শেষরাতে উঠে যে বান্দা আল্লাহর সে ডাকে সাড়া দেন আল্লাহ পাক তার জীবনকে দানে ও রহমতে ভরে দেন।”
গভীরভাবে লক্ষ করুন, হাদীস শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ পাক প্রথম আসমানে নাযিল হন বা অবতীর্ণ হন। প্রশ্ন হলো, আল্লাহ পাক নিরাকার। তার কোনো দেহ নেই। অথচ অবতীর্ণ হওয়া বা নেমে আসার জন্য দেহ বা আকারের প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহ পাক তো তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আল্লাহ পাক নাযিল হওয়ার অর্থ হচ্ছে, ওই বিশেষ সময়ে তিনি বান্দাদের মধ্যে অকাতরে রহমত বণ্টন করেন। কিন্তু এ হাদীসের ব্যাখ্যায় আমাদের হযরত কেবলা যা বলে গেছেন আমি এ পর্যন্ত কোনো কিতাবে তা পাইনি। তিনি বলেছেন যে, আল্লাহ তাআলা প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে এক এক শানের মধ্যে থাকেন, كُلِّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ । এর মধ্যে দুটি প্রধান শানের পরিচয় হলো শানে জালালী ও শানে জামালী।
শানে জালালীর অবস্থায় আল্লাহর শক্তি, পরাক্রমশালিতা ও প্রতিপত্তির প্রকাশ ঘটে বিশ্বচরাচরে। তুফান, বন্যা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রভৃতির প্রকাশ ঘটে তখনই। কিন্তু শানে জামালীতে শুধু দয়া, রহমত, ক্ষমা, অনুগ্রহ ও ধৈর্যের প্রকাশ ঘটে গোটা সৃষ্টির ওপর। এ হিসেবে হাদীসে উল্লিখিত বিশেষ সময়ে আল্লাহ পাক শানে জালালী হতে শানে জামালীতে এসে যান। এটিই হাদীসের মর্ম। নিঃসন্দেহে এ ব্যাখ্যা, তত্ত্বকথা, ইলমে ওয়ারাসত বা ইলমে আসরারের মধ্যে শামিল।
এবার আসুন, সরাসরি কুরআন মজীদ হতে এর দৃষ্টান্ত গ্রহণ করি। হযরত মুসা ও হযরত খিজির-এর ঘটনা কম বেশি সবার জানা আছে।
কুরআন মজীদের ১৫ পারার শেষ ও ১৬ পারার শুরুতে সুরা কাহাফের ৬০ থেকে ৮২ আয়াতের মধ্যে দীর্ঘ ২২টি আয়াতে এই ঘটনা বর্ণিত। হযরত মুসা এ ছিলেন আল্লাহর একজন বড় মুরসাল গয়গাম্বর। কয়েকজন শ্রেষ্ঠ পয়গম্বরের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর ওপর তাওরাত কিতাব নাযিল হয় এবং তাঁর হাতেই আল্লাহ তাআলা সে যুগের সর্ববৃহৎ শক্তি ফেরাউন ও তার বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে নীল নদে ডুবিয়ে শান্তি দান করেন। অপরদিকে হযরত খিজির ছিলেন আল্লাহর একজন অলী। ইলমে আসরার বা তত্ত্বজ্ঞানের রত্নভাণ্ডার দিয়ে আল্লাহ পাক তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলেন। উভয়ের মধ্যকার ঘটনাটি পর্যালোচনা করলে মা’রিফতের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব আমাদের সামনে পরিষ্কার রূপে ফুটে ওঠবে।
একদিন হযরত মুসা এ কোনো জনসমাবেসে ওয়াজ করছিলেন। তাঁর আলোচনা এতই তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ ছিল যে, শ্রোতারা সম্পূর্ণ অভিভূত হয়ে পড়েন। শ্রোতাদের মধ্যে একজন বিস্ময় সহকারে জিজ্ঞাসা করেন, হুযুর! আপনার চেয়ে বড় আলেম কি এ যুগে অন্য কেউ আছেন? প্রশ্ন যেমন সহজ, এর উত্তরও ছিল সহজ। কারণ হযরত মুসা সেই যুগে আল্লাহর মনোনীত পয়গম্বর। তাঁর ওপর নাযিল হয়েছে তাওরাত কিতাব। মানুষকে হিদায়তের গুরু দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত। এ দায়িত্ব পালনের জন্যে তাঁকে দেওয়া হয়েছে অসাধারণ জ্ঞান। তাই সহজভাবে জবাব দিলেন, না, আমিই এযুগের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। পয়গাম্বরের জমানায় পয়গাম্বরের চেয়ে বড় জ্ঞানী আর কে হতে পারে?
সকল জ্ঞানের আসল উৎস মহান আল্লাহ পাকের কাছে সেই মুহূর্তে মুসা -এর জবাবটি পছন্দ হলো না। এ সম্পর্কে ‘আল্লাহ তাআলায় ভালো জানেন’ এ ধরনের জবাব দিলেই বোধোয় ভালো হতো। সাধারণ বিবেচনায় মনে হয় জবাবটিতে ভুল রয়ে গেছে। কিন্তু না, ‘ভুল হয়নি’- এই ভুলের মধ্যেই নিহিত ছিল জ্ঞানের বিরাট ভাণ্ডার। জ্ঞানীর কোনো কাজই জ্ঞান ও হিকমত থেকে খালি নয়। আল্লাহর এতবড় একজন পয়গাম্বরের জবাব সাধারণ ভুলের মতো অনর্থক কিছু হতে পারে না। বড় লোকদের এ ধরনের অনেক ভুলই আমাদের জন্য অনেক কল্যাণের দ্বারোদঘাটন করেছে।
হযরত ওমর-এর কথা আপনারা জানেন। প্রথম যুগে মাহে রামাযানে রাত্রীবেলা স্ত্রী সহবাস নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু একদিন ভুল হয়ে যায় হযরত ওমর এ-এর। তিনি বিচলিত হয়ে চলে আসেন রাসুল পাকের দরবারে। আল্লাহর নবী অপেক্ষা করেন আসমানি ফয়সালার জন্য। অহীর মাধ্যমে ফয়সালা আসল, ‘এখন থেকে রামাযানে তোমরা স্ত্রীর সাহচর্য লাভ করতে পারবে।’ যদি হযরত ওমর-এর ওই ভুল না হতো তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত রামাযানে রাত্রীকালীন স্ত্রীর সাহচর্য হয়তো হারাম থেকে যেত এবং তা মেনে চলা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হতো না। মূলত হযরত ওমর-এর সেই ভুল উম্মতের অফুরন্ত কল্যাণের উসিলা হয়েছিল।
আমাদের মা হযরত আয়িশা সিদ্দিকা-এর গহনা হারানো যাওয়ার ঘটনাও কেউ কেউ জানেন। বনি মুস্তালিকের যুদ্ধ হতে ফেরার সময় কাফেলা এক স্থানে রাত্রীযাপন করে। রাতের বেলা হযরত আয়িশা-এর গহনা হারিয়ে যায়। গহনা খুঁজতে খুঁজতে ভোর হয়ে গেল, উপস্থিত হলো ফজর নামাজের সময়। কিন্তু আশপাশে পানি ছিল না অযু জরার জন্য। নবী করীম সহ সবাই দারুণ বিচলিত হয়ে পড়লেন নামাজের জন্য। পানি না পেলে অযু কিভাবে করবেন? অযু ছাড়া নামাজও বা কিভাবে আদায় করবেন? হযরত আবু বকর সিদ্দিক তো দস্তুরমত চটে গেলেন মেয়ের ওপর এই ভুলের জন্য। কিন্তু না, পরক্ষণে মেয়ের এ ভুল উম্মতের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ বয়ে আনল। অহী নিয়ে আসলেন হযরত জিবরীল। ‘যদি নামাজের সময় উপস্থিত হয় এবং নাগালের মধ্যে পানি পাওয়া না যায় পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নেবে।”
আল্লাহর কত বড় অনুগ্রহ। হযরত আয়িশা-এর একটি ভুলই ছিল এই অনুগ্রহের উসিলা। এজন্য বড়জনদের ভুল ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা মুখর হওয়া উচিত নয়। কেননা মনীষীরা বলেছেন যে, خطائے بزرگان گرفتن خطاست )বড়( লোকদের ভুল ত্রুটি ধরাটাই হলো ভুল)। যারা বড় বড় আলেমদের সামান্য ভুল দেখে চিৎকার শুরু করেন তাদের জন্য এর মধ্যে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। ছোট্ট কুয়ায় মৃত কবুতর পড়লেও পানি নাপাক হয়ে যায়। কিন্তু বিরাট সমুদ্রে অসংখ্য মৃত পঁচা গরু পড়লেও পানি নাপাক হয় না। কাজেই চিন্তা করে দেখুন।
বস্তুত হযরত মুসা এ-এর সেই ভুল জবাব কোনো দোষণীয় বিষয় ছিল না। এরপরও আল্লাহ পাক তাঁকে তত্ত্বজ্ঞানের সন্ধান দেওয়ার জন্য বললেন, অমুক জায়গায় আমার একজন বান্দা আছেন, যিনি এ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং তাঁকে আমি তত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী করেছি। একথা শোনার সাথে সাথে আল্লাহর নবীর মনে প্রবল আগ্রহ শুরু হলো। তিনি সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন ইলম তলবের জন্য। লক্ষ করুন, আল্লাহর একজন জলীলুল কদর পয়গাম্বর। এরপরও জ্ঞানের সংবাদ শুনে তা আহরনের জন্যে অধীর হয়ে পড়লেন। আমাদের মধ্যে যারা সামান্য ইলম হাসিলের পর অহমিকায় ভোগেন তাদের জন্য বিরাট শিক্ষা রয়েছে এ ঘটনায়।
যা হোক, আল্লাহর ইশারা অনুযায়ী তিনি সফরের প্রস্তুতি নিলেন। সঙ্গে তাঁর একজন খাদেম এবং পোটলার মধ্যে একটি ভুনা মাছ নিলেন। তাঁরা যাত্রা শুরু করলেন মা’রিফতের ইলমের সন্ধানে। হ্যাঁ, ইলমে মা’রিফতের জন্য চেষ্টা করতে হয়, সাধনার পথ অতিক্রম করতে হয়। সফর করতে হয় এবং কোনো আহলুল্লাহর সাহচর্য পেতে হয়। যাত্রার শুরুতে এবং পুরো পথে হযরত মুসা ও তাঁর খাদেমের মধ্যে যে কথাবার্তা হয় তা সুরা কাহাফে এভাবে বর্ণিত,
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِفَتْهُ لَا أَبْرَحُ حَتَّى ابْلُغَ مَجْمَعَ الْبَحْرَيْنِ أَوْ أَمْضِيَ حُقُبًا
‘আর সেই সময়টিও স্মরণীয়, যখন মুসা স্বীয় খাদেমকে বললেন, আমি অনবরত চলতে থাকব যে পর্যন্ত না দুইটি সাগরের সঙ্গমস্থলে পৌঁছি অথবা এভাবে দীর্ঘকাল পর্যন্ত চলতে থাকব।”
হযরত মুসা তাঁর খাদেম ইউশাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলেন এবং সাথে নিলেন একটি ভাজা মাছ। এ মাছটি যেখানে নিখোঁজ হয়ে যাবে তার আশে-পাশেই আল্লাহর ওই খাস বান্দাকে পাওয়ার কথা। অতঃপর তারা দু’জনেই সমুদ্রের উপকুল দিয়ে চলতে লাগলেন। যেতে যেতে এমন এক স্থানে পৌঁছলেন যেখানে একপ্রকাণ্ড পাথর ছিল। সেখানে উভয়ে পাথরের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। হঠাৎ ইউশা জাগিয়ে দেখতে পেলেন যে, ভোনা মাছটি জীবিত হয়ে থলে থেকে লাফিয়ে সমুদ্রের মধ্যে পড়ে গেল। আল্লাহর কুদরতে মাছটি সমুদ্রের পানিতে যতদূর চলল, ততদূর পানির ভেতরেই একটি ছিদ্র হয়ে গেল।
সেই সময় হযরত মুসা ছিলেন ঘুমন্ত। আল্লাহর শান, এমন একটি আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে গেল, কিন্তু হযরত মুসা এ জাগ্রত হওয়ার পরে তা বলতে ইউশা ভুলে গেলেন। আবার তারা চলতে আরম্ভ করলেন, দিনরাত চলার পর ভোর হলে হযরত মুসা খাদেমকে বললেন, এবার হাটতে হাটতে ক্লান্তি অনুভব করছি। নাস্তা আনো। হযরত মুসা সেই মাছের ঘটনার পূর্বে কোনো ক্লান্তি অনুভব করেননি। যেহেতু মাছ জীবিত হয়ে সমুদ্রে নিখোঁজ হওয়ার স্থানটি ছিল তার নির্দেশিত স্থান, সেহেতু সেই স্থান অতিক্রম করার পরই তার ক্লান্তি অনুভব হতে লাগল। ঘটনাটি কুরআন মজীদে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে,
فَلَمَّا بَلَغَا مَجْمَعَ بَيْنِهِمَا نَسِيَا حُوتَهُمَا فَاتَّخَذَ سَبِيلَهُ فِي الْبَحْرِ سَرَبًا فَلَمَّا جَاوَزَا قَالَ لِفَتْهُ اتِنَا غَدَاءَنَا لَقَدْ لَقِينَا مِنْ سَفَرِنَا هُذَا نَصَبَا قَالَ أَرَعَيْتَ إِذْ أَوَيْنَا إِلَى الصَّخْرَةِ فَإِنِّي نَسِيتُ الْحُوتَ وَمَا أَنْسَنِيهُ إِلَّا الشَّيْطَنُ أَنْ اذْكُرَهُ ۚ وَاتَّخَذَ سَبِيلَهُ فِي
الْبَحْرِ عَجَبًا قَالَ ذَلِكَ مَا كُنَّا نَبْغِ فَارْتَنَا عَلَى آثَارِهِمَا قَصَصَانِ
‘অতঃপর (চলতে চলতে) যখন তাঁরা সাগরদ্বয়ের সঙ্গমস্থলে পৌঁছলেন তখন তাঁরা নিজেদের মাছটির কথা ভুলে গেলেন এবং মাছটি সাগরের মধ্যে নিজের পথ ধরে চলে গেল। অতঃপর যখন উভয়ে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলেন তখন মুসা তাঁর খাদেমকে বললেন, আমাদের নাশতা আন। আমাদের তো এই সফরে যথেষ্ট কষ্ট হয়েছে। খাদেম বলল, দেখুন! যখন আমরা সে পাথরটির নিকট অবস্থান করেছিলাম তখন আমি ওই মাছের কথা ভুলে যাই এবং শয়তানই আমাকে তার কথা উল্লেখ করতে ভুলিয়ে দিয়েছিল। সেই
বললেন, মাছটি আশ্চর্যজনকভাবে সাগরের মধ্যে পথ ধরল। মুসা এটি সেই স্থান আমি যার অনুসন্ধান করছিলাম। অতঃপর তাঁরা উভয়ে নিজেদের পদচিহ্ন লক্ষ করে ফিরে চললেন।”তাঁরা সেই সমুদ্র সঙ্গমস্থলে এসে দেখতে পেলেন, গভীর সমুদ্রে পানির ওপর আল্লাহ এক বান্দা আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। তিনি ছিলেন হযরত খিজির এ। হযরত মুসা তাঁকে সালাম করলেন। তিনি বললেন, এই দেশে সালাম কোথেকে আসল? হযরত মুসা বললেন, আমি এ দেশীয় নই। আমি মুসা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বনী ইসরাঈলের নবী মুসা? জবাব দিলেন, হ্যাঁ। তারপর হযরত মুসা এ বললেন, আমি কি এই উদ্দেশ্যে আপনার সঙ্গী হতে পারি যে, আপনি আল্লাহ প্রদত্ত আপনার বিশেষ তত্ত্বজ্ঞান হতে আমাকে কিছু শিক্ষা দেবেন। কুরআন মজীদের ভাষায়:
فَوَجَدَا عَبْدًا مِّنْ عِبَادِنَا آتَيْنَهُ رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِنَا وَعَلَّمْنَهُ مِنْ لَدُنَا عِلْمًا قَالَ لَهُ مُوسَى هَلْ اتَّبِعُكَ عَلَى أَنْ تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًان
‘অনন্তর তারা আমার বান্দাগণের মধ্য হতে জনৈক বান্দাকে পেলেন, যাঁকে আমি আমার খাস রহমত দান করেছিলাম এবং আমি তাঁকে আমার সন্নিধান হতে এক বিশেষ ইলম শিখিয়েছিলাম। মুসা তাঁকে বললেন, আমি কি আপনার সঙ্গে এই শর্তে থাকতে পারি যে, আপনাকে যে রুশদের ইলম শেখানো হয়েছে তা হতে আপনি আমাকেও শেখাবেন?”
উল্লেখিত আয়াতদুটিতে দুটি পরিভাষা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর অর্থবহ। একটি مِنْ لَدُنَا عِلْمًا )মিলাদুন্না ইলমা) আমার সান্নিধ্য হতে বিশেষ জ্ঞান। সরাসরি আল্লাহর নিকট হতে আসে এই জ্ঞান। যাকে আমরা ইলমে লাদুনী বলি। এর অপর নাম মা’রিফতের জ্ঞান। হযরত খিজির এই বিশেষ তত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী ছিলেন বলে স্বয়ং আল্লাহ পাক ঘোষণা দিচ্ছেন। যে কারণে হযরত মুসা-এর ন্যায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ পয়গাম্বর তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার চেষ্টা করছেন।
পরবর্তী আয়াতে এই জ্ঞানের অপর নাম দেওয়া হয়েছে রুশদের ইলম। রুশদের ইলম যাদের আছে তাদের বলা হয় মুরশিদ। আর যাদের কাছে শরীয়তের জাহেরি ইলম বিদ্যমান, তাদেরকে আলেম ও মুআল্লিম নামে অভিহিত করা হয়। শরীয়তের পরিভাষায় যেমন আলেম, মুআল্লিম, মুফতি, মুহাদ্দিস, ফকীহ প্রভৃতি বিদ্যমান, তেমনি এই রুশদের জ্ঞানের জগতেও অলী, দরবেশ, সুফি, গাউস, কুতুব, আবদাল প্রভৃতি বিদ্যমান রয়েছে। হযরত মুসা এ রুশদের জ্ঞানের জন্যই হযরত খিজির-এর কাছে আবেদন রাখলেন। হযরত মুসা এ-এর মুখে আবেদনমূলক জিজ্ঞাসা শুনে হযরত খিজির বিশেষ তাওয়াজ্জুহ দিয়ে অন্তদৃষ্টিতে দেখলেন যে, এই জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয় ধৈর্য মুসা এ-এর হবে না। কারণ মুসা এ ছিলেন সেই যুগে জাহেরি ইলমের সর্বশ্রেষ্ট ভাণ্ডার। জাহেরি ইলমের স্বভাবই হলো, তর্ক ও আপত্তি বা ই’তিরায। যেখানে আসরার বা বাতেনি ইলমের বৈশিষ্ট্য হলো ই’তিরাফ বা সহজে মেনে নেওয়া, স্বীকার করে নেওয়া। জাহেরি ইলম যত বেশি হয়, ই’তিরায বা তর্ক ও আপত্তির মাত্রাও তত অধিক হয়।
কাজেই হযরত খিজির অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, না, আপনি তো বড় পয়গাম্বর। আপনি আমার সাহচর্যে থাকবেন বলছেন সত্য। কিন্তু আপনি তো আমার কাজে আপত্তি করবেন। উত্তরে মুসা বললেন, না, কোনো বিষয়ে আমি আপত্তি করবো না। এভাবে একবার, দুইবার, তিনবারে হযরত খিজির সম্মত হলেন। সুরা কাহাফের বর্ণনা অনুযায়ী খিজির এ বললেন,
وَكَيْفَ تَصْبِرُ عَلَى مَا لَمْ تُحِطْ بِهِ خُبْرًا قَالَ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ صَابِرًا وَلَا أَعْصِى
لك أمران
‘আপনি তো আমার সঙ্গে থেকে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না। (কারণ হলো) আপনি এমন বিষয়ে কিভাবে (প্রশ্নবাদ না করে) ধৈর্যধারণ করবেন যে বিষয় আপনার জ্ঞানসীমার বাইরে? মুসা বললেন, ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। আর আমি কোনো কাজেই আপনার আদেশের ব্যতিক্রম করবো না।”
লক্ষ করুন, কত পাক্কা ওয়াদা তিনি করলেন। এরপর মা’রিফতের জ্ঞান লাভের বিশেষ পদ্ধতি ও নিয়ম বাতলে দিয়ে হযরত খিজির বললেন,
قَالَ فَإِنِ اتَّبَعْتَنِي فَلَا تَسْتَلْنِي عَنْ شَيْءٍ حَتَّى أُحدِثَ لَكَ مِنْهُ ذِكْرانُ
‘যদি আপনি আমার সাথে থাকতেই চান তবে কোনো বিষয়েই আমাকে প্রশ্ন করবেন না। যে পর্যন্ত আমি স্বয়ং সে সম্পর্কে কিছু উল্লেখ না করি।’২
তরীকত ও মা’রিফত সম্পর্কে বর্তমানে অনেক সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষিত ভাইদের মধ্যে এই সন্দেহ প্রবল। কুরআন মজীদের এ ঘটনাটি তাদের জন্য বিরাট দলীল। অনেকে বলেন, তাসাউফ কুরআন-হাদীসের মধ্যে নেই। ইসলামের বাইরের জিনিস। দেখুন, কুরআন শরীফের ঠিক মাঝখানে বর্ণিত সুরা কাহাফের এ ঘটনা কি ইসলামের বাইরের জিনিস? কাজেই এ আলোচনা গভীর মনযোগ সহকারে অনুধাবন করা উচিত।
এতে মনের অনেক রোগ দূর হবে। ইতঃপূর্বেও আমি এ সম্পর্কে বিভিন্ন কিতাব হতে চয়ন করে বাংলায় দুটি কিতাব লিখেছি। একটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দৃষ্টিতে পীর-আউলিয়ার গুরুত্ব অপরটি ইলমে তাসাউফের হাকীকত। এ দুটি কিতাবে আপনারা এ বিষয়ে আরও বিশদভাবে জানতে পারবেন।
যা হোক, হযরত মুসা ৪৯ পাকাপোক্ত ওয়াদার পর হযরত খিজির এ-এর সঙ্গে রওনা হলেন। সমুদ্রের কিনারা ধরে তারা চলতে লাগলেন। সমুদ্র পার হওয়ার জন্য কোনো নৌকার খোঁজ পেলেন না। অবশেষে একটি নৌকা নিকট দিয়ে যেতে দেখলেন। তাঁরা নৌকার মাঝিকে ডাক দিলেন। মাঝি হযরত খিজির-কে চিনতে পেরে বিনাভাড়ায় নৌকায় তুলে নিলেন। নৌকা সাগর বক্ষে চলছে। এমন সময় নৌকার মাথায় বসে একটি চড়ুই পাখি সমুদ্রের মধ্যে একবার, দুইবার ঠোট মারল। তা দেখে খিজির বললেন, হে মুসা এই চড়ুই পাখির ঠোট লেগে সমুদ্রের যতটুকু অংশ এসেছে, আমার ও আপনার ইলম আল্লাহর অসীম ইলমের তুলনায় ততটুকুও হবে না। তখন হযরত খিজির নৌকাটিকে ছিদ্র করে দিলেন।
হযরত মুসা এ-এর প্রতিবাদী কণ্ঠ সোচ্চার হয়ে ওঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, আপনি কি নৌকার আরোহীদের ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য নৌকাটিকে ছিদ্র করে দিলেন? আপনি বড় গুরুতর কাজ করেছেন। খিজির পুরনো ওয়াদা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, আমি কি আপনাকে বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না! মুসা বললেন, ভুলবশত যা করে ফেলেছি তার জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন না। এ ব্যাপারে আমার প্রতি অধিক কঠোরতা অবলম্বন করবেন না। প্রথম দফা মাফ হলো।
উভয়ে আবার পথ চলতে লাগলেন। একস্থানে গিয়ে দেখেন, একটি ছেলে অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করছে। খিজির সেই বালকটিকে হত্যা করলেন। হযরত মুসা অনেক চেষ্টা করলেন, ধৈর্য ধারণ করবেন। কিন্তু কিভাবে নীরব থাকা যায়। একটি নির্দোষ বালককে হত্যা করা হলো। এ ধরনের জঘন্য কাজকে কিভাবে নীরবে সমর্থন করা যায়। তিনি আপত্তি জানিয়ে বললেন, আপনি কি একটি নিষ্পাপ প্রাণকে কোনো প্রাণের বিনিময় ব্যতীত অন্যায়ভাবে মেরে ফেললেন? নিঃসন্দেহে আপনি বড় অন্যায় কাজ করেছেন। এবার শক্ত ভাষায় হযরত খিজির বললেন, আমি কি আপনাকে বলিনি যে, আপনি আমার সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না। হযরত মুসা এবারও সংকোচিত হয়ে বললেন, এবারও আমার ভুল হয়ে গেল।
যা হোক এরপর যদি আমি আপনাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি, তাহলে আমাকে আপনার সঙ্গে রাখবেন না। নিঃসন্দেহে আপনি আমার পক্ষ হতে আপত্তির শেষসীমানায় পৌঁছে গেছেন। উভয়ের মধ্যে এবারও আপোষ হয়ে গেল। তাঁরা পথ চলতে লাগলেন। একপর্যায়ে তারা একটি গ্রামে গিয়ে উপনীত হলেন এবং গ্রামবাসীকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানালেন। গ্রামবাসী তাদের মেহমানদারি করতে অস্বীকার করল। ইতোমধ্যে তারা ওই গ্রামে একটি দেয়াল দেখতে পেলেন, যা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। হযরত খিজির হাতের ইশারায় দেয়ালটিকে খাড়া করে দিলেন।
এবার হযরত মুসা বলে উঠলেন, আমরা দূর দেশের মুসাফির। থাকা-খাওয়ার নূন্যতম ব্যবস্থা করার জন্যে গ্রামবাসীদের প্রতি অনুরোধ জানালাম। কিন্তু তারা সেই মানবীয় কর্তব্যটুকু পালন করল না। আমরা ক্ষুধার্ত রইলাম। এ অবস্থায় ওই গ্রামের একটি দেয়াল পড়ে যাচ্ছে দেখে আপনি খাড়া করে দিলেন। ইচ্ছা করলে এর বিনিময়ে হলেও কিছু মুজরি নিতে পারতেন? তখন খিজির সাফ জবাব দিয়ে বললেন, এবার আপনার ও আমার সঙ্গ ভঙ্গ হলো। এখন থেকেই আপনার ও আমার মধ্যে বিচ্ছেদ।’
শুরু থেকে আপনারা লক্ষ করেছেন যে, হযরত মুসা ধৈর্য সহকারে হযরত খিজির-এর সঙ্গে থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি। ইলমে জাহেরি ধৈর্য ধরতে দেয়নি। নচেৎ আল্লাহর একজন পয়গাম্বর যাত্রার শুরুতে যে ওয়াদা করেছেন তা রক্ষা করার জন্য তার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু জাহেরি ইলমের প্রাবল্যে একের পর এক প্রশ্ন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। এখন আর একসঙ্গে চলার অবকাশ রইল না। হাদীস শরীফে নবী করীম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ পাক মুসা-এর ওপর রহমত করুন। তিনি যদি আরও ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারতেন তাহলে কুরআন মজীদের মাধ্যমে দুনিয়াবাসী মা’রিফতের আরও অনেক গূঢ়-রহস্য জানতে পারত।
এবার হযরত মুসা এ ফিরে যাচ্ছেন আপন এলাকায়। কিন্তু খিজির বললেন, আমার সঙ্গে থাকতেই যিনি এত আপত্তি করলেন, দূরে গিয়ে আরও কত প্রশ্নই না তাঁর মনে জাগবে। জাতিকে হিদায়তের দায়িত্ব তো তাঁর ওপর অর্পিত। কওমের কাছে গিয়ে উলটা-সিধা বললে সমাজ ও জাতি দুঃখে পড়বে। তাই চিন্তা করলেন যে, এসব ঘটনার অন্তর্নিহিত রহস্যের জট খুলে দেবেন। তাই বললেন, আমি আপনাকে সেসব বিষয়ের গূঢ়-রহস্য বলে দিচ্ছি, যার ওপর আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেননি।
প্রথমে আসুন নৌকার প্রসঙ্গ। নৌকাটি ছিল কতিপয় দরিদ্র লোকের। যদ্বারা তারা নদীতে মজুরি করত এবং তার আয় দিয়ে তাদের সংসার চলত। আমি নৌকাটি খুঁতযুক্ত করতে চাইলাম। কারণ তাদের সম্মুখভাগে এক রাজা ছিল, যে প্রতিটি নিখুঁত নৌকা জোরপূর্বক কেড়ে নিত। আমি নৌকাটি ছিদ্র করে দিয়ে জালিম রাজার হাত থেকে গরিব মালিকের জন্য নৌকাটি রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি।
তারপর বালকের প্রসঙ্গ। বালকটি অনিবার্যভাবে কাফের হতে চলছিল, অথচ তার পিতা-মাতা ছিল মুমিন। আমার আশঙ্কা হলো যে, ছেলের অবাধ্যতা ও কুফরের প্রভাব পিতা-মাতার ওপর পড়বে। তাই আমার ইচ্ছা হলো, আল্লাহ তাআলা এই ছেলের পরিবর্তে অন্য সুসন্তান দান করুন, যা পবিত্রতায় তার চেয়ে উত্তম এবং মহব্বতে অধিকতর ঘনিষ্ঠ হয়। বর্ণিত আছে যে, সেই ছেলের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা ওই পিতা-মাতাকে দুটি সন্তান দান করেছিলেন যারা পরবর্তীকালে আল্লাহর অলী হয়েছিলেন।
এরপর তৃতীয় প্রসঙ্গ ছিল প্রাচীর খাড়া করার। এ ঘটনার রহস্য ছিল, প্রাচীরটির মালিক ছিল দুটি এতীম ছেলে। তাদের পিতা ছিলেন খুবই নেক্কার লোক। তিনি এ দুটি শিশুর জন্য কিছু ধন-সম্পদ প্রাচীরের নীচে পুঁতে রেখেছিলেন। আপনার রব স্বীয় অনুগ্রহে ইচ্ছা করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পন করুক, এরপর সেই ধন-সম্পদ নিজেরাই উদ্ধার করুক, যাতে কোনো কারণে বেহাত না হয়। এ কাজ আমি মনগড়াভাবে করিনি, বরং আল্লাহর নির্দেশেই করেছি। এ হলো সেসব বিষয়ের গোপন রহস্য যে বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেননি। জাহেরি দৃষ্টিতে এসব কাজ শরীয়ত বিরোধী ও মানুষের কল্যাণের পরিপন্থী মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল আল্লাহর আনুগত্য ও আল্লাহর বান্দাদের খেদমতের কাজ।’
আজকের আলোচনার শেষপর্যায়ে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। যা বিশ্ববিখ্যাত কবি হযরত মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী ও তাঁর পীর-মুরশিদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী ছিলেন প্রথম জীবনে একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও বাগ্মী। তাঁর খ্যাতি ছিল দেশজোড়া। অনেক কৃতি ছাত্র হাজির হতো কৌনিয়ায় তাঁর দরসে। এর মধ্যে আল্লাহর একজন অলী খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন আধ্যাত্মিক ইলমের আমানত সোপর্দ করার উপযুক্ত পাত্র। গর্ভবতী মহিলারা সন্তান প্রসবের আগে যেভাবে ছটপট করে, আল্লাহর অলীরাও দুনিয়া থেকে বিদায়ের পূর্ব মুহূর্তে আল্লাহর দেয়া তত্ত্বজ্ঞানের ভাণ্ডার অর্পণ করার জন্যে সেভাবে অস্থির হয়ে উঠেন। তখন চতুর্দিকে খুঁজে বেড়ান উপযুক্ত পাত্র।
একদিন মাওলানা রুমী এ ছাত্রদের নিয়ে দরসে মশগুল ছিলেন একান্তভাবে। এমন সময় সেখানে এক পাগলবেশী লোক এসে উপস্থিত। অনেকক্ষণ ছাত্রদের পড়াশোনার দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এরা? মাওলানা রুমীএ বিরক্তির সুরে জবাব দিলেন, ایں علمیست که تونی دانی )এগুলো হচ্ছে জ্ঞান, যা তুমি জান না)। আগন্তুক নিরুত্তরভাবে সরে গেলেন সম্মুখ হতে। দরসের কাজ শেষ হলো। সামান্য বিরতি। ছাত্ররা কিতাবপত্র রেখে বাইরে অবসর নিচ্ছে আগন্তুক ধীর পদক্ষেপে আসলেন কিতাবের কাছে। পাশে ছিল পানির হাউজ। অমনি কিতাবগুলো ধরে ছুঁড়ে মারলেন হাউজে। শুরু হলো হৈহল্লোড়। ছাত্ররা চড়াও হলো পাগলের ওপর।
মাওলানা রুমী বললেন, তুমি এ কি কাজ করলে, আমার এতদিনের জ্ঞানের সঞ্চয় ভাসিয়ে দিলে পানিতে? আগন্তুক বললেন, ধৈর্য ধরুন, অপেক্ষা করুন। এরপর হাত দিয়ে হাউজ থেকে কিতাবগুলো বের করে নিলেন। শুকনো ঝকঝকে অক্ষত কিতাবগুলো দেখে ছাত্র-শিক্ষক বিস্মিত। মাওলানা রুমী জিজ্ঞাসা করেন, এ কি কাণ্ড? জবাব দিলেন,این علمیت کہ تو نمی دانی এ হচ্ছে এমন রহস্য জ্ঞান যা আপনার জানা নেই)।
সেই আগন্তুক ছিলেন মাওলানা রুমীর অধ্যাত্মিক জগতের মুরশিদ হযরত শামসে তাবরিযী। এই ঘটনার পর হতেই মাওলানা রুমীর মধ্যে এক আমূল পরিবর্তন আসে, আসে এক রুহানি বিপ্লব। সেই বিপ্লবের ফলশ্রুতিতেই জন্ম নেয় মসনবী শরীফের মতো আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বিশ্বজনীন ভাণ্ডার, দিওয়ানে শামসে তাবরিযীর মতো অমূল্য গ্রন্থ। কিন্তু হযরত শামসে তাবরিযীর সাথে মাওলানা রুমীর সম্পর্কে কি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল।
ইতিহাস জবাব দেয়। মাওলানার ছাত্রদের অভিযোগ ছিল, শামসে পাগলা মাওলানাকে বিভ্রান্ত করেছে। এই দলে মাওলানার এক ছেলেও শামিল ছিলেন। সন্দেহ করা হয় যে, হযরত শামসে তাবরিযীকে তারা সেই অভিযোগে শহীদ করেছিলেন। আল্লাহ পাক আমাদেরকে জাহেরি ও বাতেনি ইলম দিয়ে সমৃদ্ধ করুন। আমাদের অন্তরসমূহ পরিষ্কার করে দিন এবং আল্লাহ ও রাসুল পাকের প্রেম ও মহব্বত দিয়ে আমাদের জীবনকে উদ্ভাসিত করুন। আমীন।
গ্রন্থনায়: ড. মাওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
Leave a Reply