আল্লাহর সন্ধানে অলীরাই পথের দিশারী

বায়তুশ শরফের শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলা শাহ সুফি আলহাজ হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল জব্বার সাহেব ৩০ অক্টোবর ১৯৯০ কক্সবাজার বায়তুশ শরফ মসজিদে আয়োজিত এক বিশাল মাহফিলে উপরোক্ত মন্তব্য করেন। ১১ রবিউস সানী হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী-এর ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ওই মাহফিলে কক্সবাজার জেলার বায়তুশ শরফ সিলসিলাভুক্ত সর্বস্তরের তরীকতপন্থি, স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বগণ উপস্থিত ছিলেন। মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পেশ করেন প্রবীন আলেম ও অনলবর্ষী বক্তা কক্সবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতীব আলহাজ হযরত মাওলানা মোবারক আহমদ সাহেব এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলার সর্বজনমান্য আলেম কক্সবাজার হাশেমিয়া আলিয়া মাদরাসার রেক্টর হযরত মাওলানা মোজহের আহমদ সাহেব।

মানব-জাতির প্রতি আল্লাহ তাআলার অসীম দয়া ও মেহেরবানি যে, তিনি আমাদেরকে গরু, ছাগল, কীট-পতঙ্গ প্রভৃতি না বানিয়ে আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের অন্তরের মধ্যে আল্লাহর মা’রিফত ও ভালোবাসা লাভ করার যোগ্যতা সুপ্ত রেখেছেন। তাছাড়া যুগে যুগে নবী-রাসুলের মাধ্যমে মানব-জাতিকে হিদায়তের পথ দেখিয়েছেন এবং তাঁদের অবর্তমানে হক্কানি আলেম-ওলামা ও পীর-মাশায়েখের মারফত মানুষকে হিদায়তদানের ব্যবস্থা করেছেন। বিশেষত আখেরি নবী তাজেদারে মদীনা হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা হলেন দুনিয়াবাসীর জন্য সবচেয়ে বড় রহমত এবং তাঁর উম্মত হিসেবে দুনিয়ায় মুসলমানরা পরম সৌভাগ্যবান।

এই সৌভাগ্যকে ধারণ ও লালন করার একমাত্র পথ হচ্ছে পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে আল্লাহর কিতাব কুরআন মজীদ ও রাসুল পাকের সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা এবং যুগের নানা ফিতনা-ফাসাদের সয়লাবে আল্লাহ ও রাসুলের পথে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন কোনো হক্কানি আল্লাহর অলীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। এটিই কুরআন ও হাদীসের নির্দেশিত এবং বুযুর্গানে দীনের অনুসৃত পথ।

বায়তুশ শরফের শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলা সমবেত ভক্তবৃন্দের উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ হিদায়ত দিতে গিয়ে মুসলিম সমাজ ও তরীকতপন্থিদের মধ্যে বিরাজমান বিভিন্ন দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে সকল মুসলমানকে পরস্পর একাত্ব ও ভাই ভাই হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের কারও কারও মধ্যে একটা ব্যাধি সংক্রমিত হয়েছে। যার ফলে প্রত্যেকে মনে করে যে, আমি আল্লাহর দীনের যে কাজ করে যাচ্ছি সেটিই সঠিক এবং একমাত্র কাজ। অন্যদের কাজের কোনো গুরুত্ব নেই। অথচ সত্য কথা হলো, আমাদের সমাজে বর্তমানে এমন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নেই যারা ইসলামের সকল কাজ সমান গুরুত্ব সহকারে একই সঙ্গে আঞ্জাম দেবেন বা দিতে পারবেন।

মূলত আল্লাহর পেয়ারা হাবীবই নিজের জীবনে ইসলামের সকল কাজ ও দিক-বিভাগকে গুরুত্ব অনুসারে সমান মর্যাদা দিয়ে আঞ্জাম দিয়েছেন, যা বর্তমান সময়ে কারও একার পক্ষে পুরোপুরি পালন করা সম্ভব নয়। এরপরও যখন আমরা নিজেদের কাজকেই একমাত্র ইসলাম বলে মনে করি তখন আমাদের মধ্যে মনের অজান্তে একপ্রকার গোঁড়ামি সৃষ্টি হয় এবং এই গোঁড়ামি আস্তে আস্তে রেষারেশী, অবিশ্বাস ও ভেদাভেদের সৃষ্টি করে। যা আল্লাহ ও রাসুল পাকের কাছে অত্যন্ত অপছন্দীয়। এ অবস্থায় আমাদের উচিত একমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে যারা কাজ করে যাচ্ছে, নিজের মতের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও তাদের কাজকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পরস্পরের পরিপূরক মনে করা। তাহলেই আমাদের জীবনে ইসলামের ঐক্য ও সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। যা দেখে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যেমন খুশি হবেন তেমনি দুনিয়াবাসীও আনন্দিত ও উপকৃত হবেন।

যারা সুফিয়ায়ে কেরামের অনুসৃত আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক সাধনার পথকে অস্বীকার ও সমালোচনা করেন এবং এ লক্ষ্যে আল্লাহর পবিত্র নামের যিকিরকে বেহুদা কাজ বলে মনে করেন তাদের লক্ষ করে তিনি বলেন, মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধি এবং কলবের নানা রোগ ও আবর্জনা দূর করার জন্য আল্লাহর পবিত্র নামের যিকির এক মহৌষধ। শুধু তাই নয়, আল্লাহর ভালোবাসা নিয়ে গোটা জীবনকে মধুময় এবং আল্লাহ ও রাসুলের পথে নিবেদিত করার সুন্দরতম প্রক্রিয়া, যা যুগে যুগে আল্লাহর অলী-বুযুর্গগণ অনুসরণ করেছেন। যারা শুধু কাজ করার দোহাই দিয়ে যিকিরের গুরুত্বকে উপেক্ষা করেন তারা সম্পূর্ণ ভুলে রয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে যিকিরও একপ্রকার কাজ। মানুষের পঞ্চইন্দিয়ের মধ্যে অন্ততপক্ষে মুখ ও কান এবং মানব দেহের আসল চালিকা শক্তি কলব এই যিকিরের সময় কাজে রত থাকে।

তিনি বলেন, যিকির দ্বারা মানুষের কাজ নিয়ন্ত্রিত না হলে সে কাজ বিপথগামী হতে বাধ্য। এজন্য কুরআন মজীদের স্থানে স্থানে আল্লাহ পাক যিকির করার হুকুম দিয়েছেন। একথা সত্য যে, যিকিরের এক অর্থ হল আল্লাহকে মনে মনে স্মরণ করা। কিন্তু দিলে আল্লাহকে স্মরণ করার সাথে সাথে মুখে তাঁর পবিত্র নাম উচ্চারণ করার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কুরআন মজীদে আল্লাহর নামের যিকির করার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাতে মুখে উচ্চারণ করাই উদ্দেশ্য। নচেৎ শুধু আল্লাহর যিকির করার কথায় বলা হতো। আল্লাহর নামের শর্তারোপ হতো না।

পীর সাহেব কেবলা আরও বলেন, কুরআন মজীদের অসংখ্য আয়াত দ্বারা যিকির করার গুরুত্ব প্রমাণিত আছে। এক আয়াতে আল্লাহ পাক ধৈর্য সহকারে যিকিরকারীদের সঙ্গদান করে তাদের মজলিসকে দামি বানানোর জন্যে আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় নবীকে হুকুম দিয়েছেন। (সুরা কাহাফ: ২৮ দ্রষ্টব্য)।

হাদীস শরীফে ক্ষেত্র বিশেষে আল্লাহর যিকিরকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ও শহীদ হওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কাজেই বুযুর্গানে দীনের প্রবর্তিত তরীকতের সাধনার এই শরীয়তসম্মত পথ যিকির ও অজীফাকে কোনো অবস্থাতেই অবহেলা করা উচিত নয়। পীর সাহেব কেবলা এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, বিভিন্ন ধরণের প্রচারণার মাধ্যমে আমাদের তরীকতের লোকদের মধ্যেও যিকির-আযকার সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এজন্য আমি কথাটিকে এত জোর দিয়ে উল্লেখ করলাম। ক্ষেতে যদি পোকার আক্রমণ দেখা দেয়, তাহলে গৃহস্থকে অবশ্যই কীটনাশক ছিটিয়ে সেই আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হয়। আসলে এ আলোচনা সে ধরণের একটি ব্যবস্থা মাত্র।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে পীর সাহেব কেবলা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি গোটা মুসলিম দুনিয়ার জন্য এক বেদনাদায়ক ক্ষত। এতদিন বায়তুল মুকাদ্দস গ্রাসকারী ইসরাইলই মুসলমানদের প্রধান শত্রু ও সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান ছিল, কিন্তু এখন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সমস্যার এক গভীর জটলা সৃষ্টি হয়েছে। যা সারা মুসলিম দুনিয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি ছাড়াও চিন্তার ক্ষেত্রেও নানা সমস্যার সৃষ্টি করেছে। আমাদের দেশে এই সংকটকে কেন্দ্র করে একদল ইরাকপন্থি হয়েছে, আরেকদল সউদিপন্থি। কিন্তু আমরা কোনো পন্থী নই। আমরা ইরাকের কুয়েত দখলকে যেমন নিন্দা করি তেমনি সউদি আরবসহ আরব বিশ্বে ইহুদি-নাসারা সৈন্যদের উপস্থিতিকেও নিন্দা করি। আমরা আল্লাহর কাছে সব সময় দোয়া করছি যাতে মুসলিম শাসকদের মধ্যে শুভবুদ্ধি ফিরিয়ে দেন। পারস্পরিক সমস্যা ও বিরোধ যেন নিজেরাই নিষ্পত্তি করেন এবং বিশেষ করে পবিত্র মসজিদুল আকসা ও মক্কা-মদীনা শরীফকে ইহুদি-নাসারাদের ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করেন। প্রকৃতপক্ষে মক্কা ও মদীনার সাথে আমাদের প্রাণ বাঁধা রয়েছে, এজন্য সব সময় আমাদের প্রাণ কাঁদে।

বায়তুশ শরফের শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলা কক্সবাজার বায়তুশ শরফে প্রতিবছর ঈসালে সওয়াব মাহফিল অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, আমরা হযরত বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী এবং সমস্ত আম্বিয়া, আউলিয়া ও মুমিন মুসলমানদের রুহে সওয়াব পাঠানোর নিয়তে এই মাহফিল করি। এ মাহফিল ফরজ ওয়াজিব নয়, সুন্নতে মুওয়াক্কাদাও নয়। একে সুন্নতে যায়েদাও বলা যাবে না। কাজেই নফলের মধ্যে গণ্য করতে হবে। তবে ওলামায়ে মুতাআখখিরীন বা পরবর্তী বুযুর্গ আলেমগণ এটিকে মুস্তাহসান বলেছেন। মুস্তাহাবের পরেই মুস্তাহসানের স্থান।

কোনো সুনির্দিষ্ট মৃত্যুদিবস পালন করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বুযুর্গানে দীনের জীবনী আলোচনা করা এবং তা থেকে শিক্ষা হাসিল ও দীনী ঈমানি উন্নতি লাভ করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আম্বিয়ায়ে কেরাম যেমন জিন্দা তেমনি আউলিয়ায়ে কেরামও জিন্দা। পার্থক্য হলো, নবী-রাসুলগণ সশরীরে জিন্দা এবং অলী বুযুর্গগণ রুহানিভাবে জিন্দা। কোনো কোনো বুযুর্গের লাশ বহু বছর পরেও অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কিন্তু এর ওপর ফতোয়া দেওয়া যাবে না। এটি বিশেষ কারামাত।

এ প্রসঙ্গে একটি সত্য ঘটনা উল্লেখ করা যায়, যা চট্টগ্রামের ওলামায়ে কেরামের শিরোমণি দারুল উলুম মাদরাসার প্রধান মুহাদ্দিস মরহুম হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আমীন সাহেব বর্ণনা করেছেন। তিনি একদিন ওলামায়ে কেরামের মজলিসে বয়ান করেছিলেন যে, এক দাগী কাফন চোর ছিল। সেই এলাকায় কোনো মুর্দার কাফন তার হাত হতে রক্ষা পেত না। যেভাবেই হোক রাতের গভীরে সে কবর খড়ে কাফন চুরি করে নিয়ে যেত। সে এলাকায় এক বর্গ লোক দারুণভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি মনে মনে বলছিলেন যে, আল্লাহ পাক তো দুনিয়ায় আমাকে অনেক ইজ্জত সম্মান দিয়েছেন। এর উসিলায় আমার একান্ত আশা হলো, আখেরাতেও ইজ্জত দেবেন, কিন্তু এই কাফন চোরের হাতে কি আমাকে বেইজ্জত হতে হবে? মৃত্যুর পর কাফন চোরের হাতে বেইজ্জত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনি একটি কৌশল চিন্তা করলেন।

একদিন তার বাড়িতে কাফন চোরকে দাওয়াত করে ভালো করে খাওয়ালেন। এরপর আলাপচারিতায় ওই ব্যক্তিকে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, ভাই! বর্তমানে একজন লোকের জন্য দামি কাফনের কাপড়ের দাম কত হবে? লোকটি অনেকটা বিব্রত হয়ে জবাব দিল না, এসব খবর তো আমি রাখি না। বুযুর্গ আবারো বিনয় করতে লাগলেন। লোকটি জবাবে বলল, হুযুর খামখা আমাকে লজ্জা দেবেন না। আপনার এ জিজ্ঞাসার হেতু কি আমার বুঝে আসছে না। এবার বুযুর্গ বিষয়টি খুলে বললেন, ভাই বলতে লজ্জা কিসের? লোকেরা আমাকে বলেছে যে, কোনো লোক মারা গেলে আপনি রাতে গিয়ে তার কাফন চুরি করে নিয়ে আসেন। লোকটি বিস্ময় প্রকাশ করে বারবার অস্বীকার করতে লাগল। বুযুর্গ বললেন, যা হোক এগুলো মানুষের মুখের কথা। এখন আপনি হোন বা অন্য কেউ, আল্লাহই ভালো জানেন। আমার মনের আরজু হলো, আমার কাফনের আন্দাজ মতো উৎকৃষ্ট মানের কাপড়ের দাম আপনার হাতে দেব। আপনি যেভাবেই হোক আমার মৃত্যুর পরে কাফন যাতে চুরি না হয় সে ব্যবস্থা করবেন।

লোভাতুর লোকটি খুশি মনে টাকাগুলো হাতে নিয়ে ওয়াদা করল এবং বাড়ি চলে গেল। কিছুদিন পর বুযুর্গের মৃত্যু হয়। যখন রাত এলো কাফন চোরের চোখে আর ঘুম আসে না। মন শুধু উসখুস করে। শেষপর্যন্ত পূর্বের সেই একই কাজে হাত দিল। খুব সন্তর্পনে কবরস্থানে গিয়ে একপাশ থেকে কবর খনন শুরু করল। কবর পর্যন্ত ছোট্ট একটি গর্ত হয়ে গেলে সে কাফন টেনে বের করার জন্য হাত ঢুকিয়ে দিল, কিন্তু তখন মৃত বুযুর্গ যেন চট করে উঠে বসলেন এবং ঝট করে লোকটির হাত ধরে ফেললেন। কবরের বাইরে থেকে লোকটি যখন বুঝতে পারল যে, কবরের ভেতরে আল্লাহর অলী তার হাত ধরে ফেলেছেন, তখন ভয়ে আতঙ্কে সে মৃত্যুবরণ করল। রুহের জগতে গেলে মানুষের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এজন্য আল্লাহর অলীর হাত থেকে কাফন চোরের ছাড় পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। এটি কোনো গল্প বা রূপক কাহিনী নয়। একটি সত্য ঘটনা যা একজন হক্কানি আলেম বর্ণনা করেছেন। এ ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আল্লাহর অলীরা জিন্দা। সাধারণভাবে তাঁরা সবাই রুহানিভাবে জীবিত। আবার অনেকে শারীরিকভাবেও জীবিত। যেমন শহীদগণ মৃত্যুর পর জীবিত থাকার কথা কুরআন মজীদের দ্বারা প্রমাণ রয়েছে। এগুলো আল্লাহর অলীদের কারামত। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, অলী-আল্লাহদের কারামত সত্য। কাজেই অলী-আল্লাহদের কারামতে বিশ্বাস করা ঈমান ও আকীদার অঙ্গ। এ কারণেই যুগে যুগে মুসলিম সমাজে অলী-বুযুর্গদের প্রতি ভক্তি-বিশ্বাস চিরন্তনভাবে বিদ্যমান রয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা একথার সাক্ষ্য যে, যারা অলী-আল্লাহদের প্রতি ভক্তি বিশ্বাসের পরিবর্তে খারাপ ধারণা পোষণ করেছে তাদের শেষ পরিণতি ভালো হয়নি। হাদীস শরীফও একথার সাক্ষ্য দেয়। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

مَنْ عَادَ لِي وَلِيًّا فَقَدْ نَاصَبَنِي بِالْمُحَارَبَةِ».

‘যে ব্যক্তি আমার কোনো অলীর বিরুদ্ধে শত্রুতা করেছে আমি

(খোদা) তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি।”

আল্লাহ ও রাসুল-এর পক্ষ হতে দুই প্রকার লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একপ্রকার লোক হলো সুদখোর। দ্বিতীয় প্রকার লোক, আল্লাহর অলীর বিরুদ্ধে শত্রুতাকারী। এর কারণ হলো, যারা ঈমান, তাকওয়া ও আমলের মাধ্যমে নিজের সম্পূর্ণ জীবনকে আল্লাহ ও রাসুলের জন্য এবং পবিত্র ইসলামের খেদমতে উৎসর্গ করেছেন তাঁদেরকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন এবং দুনিয়ার কোনো সনদ-সার্টিফিকেট না থাকলেও তাঁরা আল্লাহর বন্ধু-অলী। কাজেই এ শ্রেণির লোকের সাথে শত্রুতা করার মানে হলো ইসলাম, ঈমান, আল্লাহ পাক ও রাসুলে আকরাম-এর সাথে শত্রুতা করা।

অবশ্য এখানে খুব সতর্কভাবে মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়ায় শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ ও রকমারি প্রচারণার মাধ্যমে অলী বা বুযুর্গ হিসেবে খ্যাতি লাভ করাই আল্লাহ বন্ধু হওয়ার মানদণ্ড নয়, বরং যারা দুনিয়াবি যশ-খ্যাতির জন্য নিজের বুযুর্গি প্রচার করে বেড়ায় এবং মানুষকে আল্লাহর মা’রিফত ও ইসলামের পথ থেকে বিচ্যুত করে তারা চোর ডাকুর পর্যায়ভুক্ত। তারা আল্লাহ বন্ধু বা অলী হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। একথা সত্য যে, ভালো যেখানে আছে সেখানে মন্দ এবং ভেজালও থাকবে। বাজারে সবচেয়ে দামি জিনিস হলো স্বর্ণ। অথচ স্বর্ণের বাজারেই ভেজালের ছড়াছড়ি বেশি। ভেজাল অধিক বলে কি কেউ স্ত্রী-কন্যার জন্য স্বর্ণ খরিদ এবং ব্যবহার বাদ দিয়েছেন? কাজেই তাসাওউফ বা আধ্যাত্মিক সাধনার পথে চোর-ডাকুর উপদ্রব বেশি, এই অজুহাতে কেন খাঁটি আল্লাহঅলা পীরের সন্ধান বাদ দেব বা অযথা তাঁদের ঢালাওভাবে সমালোচনা করে ঈমান ও আমলের জন্য ক্ষতি ও বিপদ ডেকে আনব? সত্যিকার অলী-আল্লাহদের সাথে শত্রুতা পোষণের পরিণাম কত ভয়াবহ তা ইসলামী জাহানের অবিসংবাদিত দার্শনিক হযরত ইমাম গাযালী এ-এর একটি উক্তি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। তিনি বলেছেন যে, আমি আল্লাহর অলীদের সাথে শত্রুতা পোষণকারী ব্যক্তিদের খাতেমা বিল খাইর (দুনিয়া থেকে ঈমান নিয়ে বিদায়) না হওয়ার আশঙ্কা করছি।

আমাদের মধ্যকার শিক্ষিত সমাজ ভালো করেই জানেন যে, হযরত ইমাম গাযালী ছিলেন হিজরী পাঁচ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ আলেম, বক্তা ও দার্শনিক। নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভার বলে তিনি তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাগদাদের নেজামিয়া মাদরাসায় অধ্যক্ষের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং বাগদাদের শাসকবর্গের কাছেও তাঁর সমাদর ছিল অত্যন্ত বেশি। কিন্তু সেখানে তিনি মনের সান্ত্বনা পাননি। ফিকহ ও দর্শনের বিভিন্ন জটিলতা ও মারপ্যাচে তিনি পাকা উস্তাদ হলেও রুহের খোরাকের জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। একদিন হজে যাওয়ার নাম করে বাগদাদের যাবতীয় সম্মান ও মর্যাদার পদ ত্যাগ করে তিনি বেরিয়ে পড়েন নিরুদ্দেশে। ফিলিস্তিন, দামেস্ক, মিসর, মক্কা ও মদীনা প্রভৃতি অঞ্চলে দীর্ঘ ১০ বছর দীনহীন অবস্থায় ঘুরে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার সুউচ্চ আসন লাভ করেন এবং এরপর লেখা তার জগদ্বিখ্যাত কিতাবগুলোর মাধ্যমে সমগ্র দুনিয়া উপকৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হতে থাকবে। কাজেই ইমাম গাযালীর উল্লিখিত উক্তিকে হালকা হিসেবে গ্রহণ করলে ভুল হবে। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেক গভীর, যা শুধু চিন্তা ও উপলব্ধির মাধ্যমে বোঝা সম্ভব। সব কথা খুলে বলতে গেলে অনেকে তা না বুঝে ভুল ব্যাখ্যা করবে।

বায়তুশ শরফের পীর সাহেব কেবলা কক্সবাজার বায়তুশ শরফ মসজিদের জনাকীর্ণ মাহফিলে তরীকত সম্পর্কে আরও যেসব সমালোচনা হয় তার জবাব দিতে গিয়ে বলেন, অনেকে পীরের দরবারে মুরিদদের হাদিয়া-তোহফা আনাকে সমালোচনা করেন। আমি প্রশ্ন করবো যে, হাদিয়া-তোহফা দেওয়া নেওয়া কি শরীয়তে নিষিদ্ধ? আল্লাহর রাসুল তো ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের মধ্যে হাদিয়া-তোহফা বা উপহার-উপঢৌকন আদান প্রদান কর। তাতে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত হবে ও বৃদ্ধি পাবে।’

আমরা রাসুল পাক-এর সে সুন্নতের ওপরই আমল করি। আসলে যারা কোনো দিন হাদিয়া দেয়নি এবং নেয়ওনি তারা এর মাহাত্ম্য কিভাবে বুঝবে? তারা শুধু সমালোচনাতেই থাকবে। ডক্টর, প্রফেসর, চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী নামে পরিচিত হলেও ইসলামী সমাজ-দর্শনের এই সুন্দর দিকটির যৌক্তিকতা ও উপকার যে কত সুদূরপ্রসারী তারা তা কিভাবে বুঝবেন? আমাদের পীর সাহেব কেবলার (হযরত মাওলানা মীর মুহাম্মদ আখতার এ-এর) শিক্ষা অনুযায়ী আমরা হাদিয়া গ্রহণ করি বটে, কিন্তু যতক্ষণ তার বিনিময় দিতে না পারি ততক্ষণ সন্তুষ্ট হতে পারি না। তিনি তো বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে এক কাপ চা খাওয়াবে তাকে যদি আমি দশ কাপ চাও খাওয়াই তাতেও মনে হয় যেন সেই চায়ের হক আদায় করিনি।

একজন গরিব-অসহায় খেটে খাওয়া মানুষ একটি টাকা হাতে করে অনেক দূর থেকে এসে পীর সাহেব হুযুরের হাতে দিতে পারার কি যে আনন্দ তা কি যুক্তি দিয়ে বোঝানো সম্ভব? একবার নোয়াখালী থেকে এক লোক এসে আমাকে কিছু টাকা হাদিয়া দেওয়ার চেষ্টা করে। আমি তার অবস্থা সম্পর্কে জানতাম। একেবারে গরিব মানুষ। তাই টাকাগুলো না দেওয়ার জন্য বলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মনে হলো তার মাথার ওপর আসমান ভেঙে পড়েছে। পরে তা গ্রহণ করলাম এবং পরদিন যাওয়ার সময় গাড়ি ভাড়ার নাম করে এর চেয়ে অধিক দিয়ে দিলাম। এটিই হলো হাদিয়া দেওয়া ও নেওয়ার বেলায় আমাদের নিয়ম। কাউকে বিনিময় দেওয়া সম্ভব না হলে তার জন্য অন্তত দোয়া হলেও করা হয়।

আমাদের হযরত কেবলার ইন্তিকালের পর তাঁর কাছে পাঠানো অধিকাংশ চিঠির খামের ভেতর টাকা পাওয়া গেছে। কারণ তিনি মানুষ মনে কষ্ট পাবে এই ভয়ে হাদিয়ার টাকা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সেই টাকা হারাম না হালাল বা সম্পূর্ণ সন্দেহমুক্ত কিনা তা না জানার কারণে ব্যবহার করেননি। যারা হাদিয়া দেওয়া-নেওয়ার বিরুদ্ধে চোখ বুজে বদনাম রটান তারা এর মাহাত্ম্য কিভাবে বুঝবেন?

আমি বলছি না যে, আমার কাছে যেসব হাদিয়া-তোহফা দেওয়া হয়, তার সবটাই সন্দেহমুক্ত মাল। মূলত লোক যত গরিব হয় তার টাকাও তত হালাল হয়। লোক যত ধনী ও সম্পদশালী হয় তার টাকাও তত বেশি সন্দেহযুক্ত হয়। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্যে এলসিতে সুদী ব্যাংকের সাথে লেনদেন করতে হয়, ঘুষ দিতে হয়। কিন্তু আমি কি এসব সন্দেহযুক্ত মাল ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করি? এ জাতীয় টাকা কোথায় কিভাবে খরচ করতে হয় আল্লাহর রহমতে আমি তা জানি। আমার হযরত কেবলার কাছে অনেকে হাদিয়া হিসেবে টাকা-পয়সা দিত। আমরা দেখেছি যে, গরিব মুরিদদের দেওয়া দুয়েক টাকার হাদিয়া তিনি বিছানার পাশে বালিশের নীচে রাখতেন আর বলতেন, এগুলো নির্ভেজাল হালাল টাকা। রাসুল পাকের জিন্দেগিতেও আমরা দেখি যে, যার ইখলাস ও ভক্তি যত বেশি তার হাদিয়া ও দান তিনি যত সামান্যই হোক না কেন অধিক আগ্রহের সাথে গ্রহণ করেছেন। যারা সব কিছুকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেন তাদের এতটুকু কথা মনে রাখা উচিত যে, আল্লাহর অলীদের জ্ঞান তাদের জ্ঞানের চেয়ে কম নয়, বরং বেশি, তাহলেই অনেক প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন।

হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী এ-এর জীবনের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায়। তার চলাফেরার বাহন ঘোড়াটি ছিল সে যুগের সবচেয়ে উন্নত জাতের ঘোড়া। সে ঘোড়ার বাহনকে এ যুগের সর্বাধুনিক মডেলের কারের সাথে তুলনা করতে পারি। অনেকে সমালোচনার দৃষ্টিতে বলত যে, লোকটি সর্বশ্রেষ্ঠ অলী হওয়ার দাবি করে, অথচ রাজা-বাদশাহদের মতো সর্বোৎকৃষ্ট জাতের ঘোড়ায় চড়ে চলাফেরা করছে। যা হোক, একদিন তার কাছে ইউরোপ থেকে একজন ব্যবসায়ী রোগী আসল। সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, সবচেয়ে উন্নত জাতের সুঠাম সবল একটি ঘোড়ার কলিজা খেলেই তুমি সুস্থ হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। লোকটি তৎকালীন সভ্যতার কেন্দ্রভূমি বাগদাদে এসে খবর নিয়ে জানতে পারল, সেই পরিচয়ের একটি ঘোড়া বড়পীর সাহেবের কাছে রয়েছে। যা তিনি বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন। অনেক ভেবে-চিন্তে লোকটি বড়পীর সাহেবের খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি হতবাক করে দিয়ে বললেন, আমার এই ঘোড়া আসলে তোমার। তোমার জন্যই আমি এতদিন লালন-পালন করেছি। এখন তুমি নিয়ে যাও। আগন্তুক খ্রিস্টান সম্পূর্ণ বিস্মিত হয়ে আরজ করলো, অবস্থা যদি তাই হয় আমি কেন অন্ধকারে থাকব। আমাকে? আপনি গ্রহণ করুন। আমাকে মুসলমান বানিয়ে নিন। লক্ষ করুন, হযরত বড়পীর সাহেবের উন্নত জাতের ঘোড়া ব্যবহারের মধ্যে কি রহস্য নিহিত ছিল। এজন্য মাওলানা রুমী বলেছেন যে, علم حق در علم صوفی گم شود پید این سخن کی نزد مردم باور شود

‘শরীয়তের জ্ঞান সুফির জ্ঞানের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যায়; কিন্তু একথা সাধারণ আলেমদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।’

অনেকে বলে, বায়তুশ শরফের পীর সাহেব সুফি হয়েও কেন ‘কারে’ করে চলাফেরা করেন? তাহলে কি পীর হওয়ার কারণে আমাকে ঠেলাগাড়িতে করে চলাফেরা করতে হবে? দুনিয়ার বুকে আল্লাহর নাফরমানরা সবচেয়ে ভালো বাড়ি, গাড়ি ও সম্পদ ভোগ করবে এবং আর আল্লাহর বান্দারা সেগুলো ত্যাগ করে দীনহীন জীবন যাপন করবেন এটাই কি তারা বলতে চায়? দেখুন, এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক কি বলেন,

قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الحيوة الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيمَةِ كَذلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ .

‘হে নবী! আপনি বলুন, আল্লাহ তাআলা আরাম ও সৌন্দর্যের যেসব পবিত্র সামগ্রী আপন বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন তা তোমাদের জন্য কে হারাম করেছে? বলুন, এগুলো দুনিয়ার জীবনে ঈমানদারদের উপভোগের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, (তবে বেঈমানরাও তা ভোগ করতে পারবে) আখেরাতে তা ভোগ করার একমাত্র অধিকার থাকবে মুমিনদের।”

এ প্রসঙ্গে তিনি বায়তুশ শরফের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা মীর মুহাম্মদ আখতার-এর একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আমার হযরত কেবলা বলেছেন যে, ভবিষ্যতে তরীকতের খেলাফতের দায়িত্ব পালনকারী লোকদের মধ্যে তিনটি গুণ অবশ্যই থাকতে হবে। অর্থাৎ সব সময় ৩টি শব্দ তার চোখের সামনে ভাসতে হবে। একটি হলো منع, দ্বিতীয়টি جمع এবং তৃতীয়টি

قنع। এর তাৎপর্য হলো কেউ হাদিয়া-তোহফা দিতে চাইলে মানা নেই। গ্রহণ করতে হবে। তবে সম্পূর্ণ হারাম ও শরীয়ত বিরোধী হলে তা গ্রহণ করা নিষেধ।

দ্বিতীয় শব্দটির তাৎপর্য হলো, হাদিয়া নেওয়ার পরে তা জমা করে না রাখা। বরং হকদার লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া। বিভিন্ন এলাকার আলেমদের মধ্যে আমিও এভাবে আমাকে প্রদত্ত হাদিয়ার পাঞ্চাবি-লুঙ্গি প্রভৃতি বণ্টন করে দেওয়ার চেষ্টা করি। তৃতীয় শব্দটির অর্থ হলো সর্বাবস্থায় হাতে যা আছে তার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং বেশি পাওয়ার জন্য লোভ না করা। এটিই তাসাওউফের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা।

পীর সাহেব কেবলা পুনরায় তরীকতের যিকির-আযকারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, আল্লাহর অলীদের সকল কাজের মধ্যেই হেকমত নিহিত রয়েছে। তারা বিশেষ নিয়মে যিকির ও অজীফার যে পদ্ধতি বলেছেন তাতেও অসংখ্য হেকমত নিহিত রয়েছে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে আমাদের বুঝে উঠা সম্ভব হয় না। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

«أَنَا جَلِيْسُ مَنْ ذَكَرَنِي».

‘যে ব্যক্তি আমার যিকির করে, আমি তার সাথী হয়ে যাই।”

অর্থাৎ বান্দা যখন ধ্যানমগ্ন একাগ্র হয়ে একমাত্র আল্লাহকেই সমগ্র সত্তা দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা ও সাধনায় কায়মনোবাক্যে যিকির করে তখনই আল্লাহর দর্শন ও মিলনের স্বাদ উপভোগ করতে সক্ষম হয়। যেসব আল্লাহর অলী এই স্বাদ উপভোগ করেছেন তারা বলেছেন যে,

ذکر حبیب کم نہیں وصل حبیب سے۔ ‘মাশুকে হাকীকীর যিকির করা তার সাথে মিলন লাভের চেয়ে কম নয়।’

এ সময় যিকিরকারী বান্দা জীবনের সর্বোচ্চ দরখাস্তটি পেশ করেন, إِلهِي أَنتَ مَقْصُوْدِي وَرِضَاتُكَ مَطْلُوْنِ، تَرَكْتُ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا.

‘হে আল্লাহ! তুমিই আমার একমাত্র মকসুদ (তোমাকে পাওয়াই আমার একমাত্র লক্ষ্য)। আর তোমার সন্তুষ্টিই আমার একমাত্র কাম্য। এজন্য আমি দুনিয়া এবং দুনিয়ায় যা কিছু আছে সবকিছুর মায়া ত্যাগ করেছি। (সবকিছু তোমাকে পাওয়ার সাধনাতেই নিয়োজিত

করেছি)।’

তখন আল্লাহ পাক সে বান্দার ডাকে সাড়া দিয়ে এমন নেয়ামতে ভরপুর করে দেন, যা কোনো দিন চিন্তাও করতে পারেনি। এই নেয়ামত আল্লাহর ভালোবাসা ও আখেরাতের মুক্তির নেয়ামত। দুনিয়ার বিষয় সামগ্রী তো আখেরাতের নেয়ামতের তুলনায় কিছুই নয়। বস্তুত যিকির যখন এ ধরনের অনুভূতি ও উপলব্ধি নিয়ে করা হয়, তখন হাদীস শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী যিকিরের মর্যাদা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও দুই হাতে স্বর্ণ-রৌপ্য দান করার চেয়েও বেড়ে যায়। তবে একথা সত্য যে, ধানের সাথে যেমন চিটা থাকে তেমনি যাকিরীনের সাথে মাকিরীন (প্রতারকও) থাকে। তাই বলে যিকির ত্যাগ করা বা তার প্রতি অবহেলা দেখানো মোটেই উচিত নয়। কেননা কুরআন মজীদের স্থানে স্থানে এই যিকিরের জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

আজকাল সাধারণভাবে কুরআন মজীদের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে রাসুল পাক মুসলমানদের সামগ্রিক জীবনের উন্নত আদর্শ হওয়ার পক্ষে দলীল পেশ করা হয়। আয়াতটি হলো:

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ *

‘নিশ্চয় আল্লাহর রাসুলের জীবনে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।”

কিন্তু আয়াতের পরের অংশে যে আদর্শ বরণ করার যোগ্যতা ও গুণাবলির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা সচরাচর বলা হয় না। এই যোগ্যতা ও গুণাবলি হলো এই আদর্শ তারাই গ্রহণ করেত পারবে, জীবনকে ধন্য করতে পারবে,

لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيران

‘যারা আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার ও আখেরাতে উপস্থিত হওয়ার আশা রাখে এবং যারা বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করে (আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে)।’২

বস্তুত সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করা এবং এই স্মরণ করার অনুশীলন হিসেবে যিকির করা রাসুলের সত্যিকার উম্মত হওয়ার একটি সুন্দর অলংকার

ও গুণ। অন্যথায় ইখলাসে কমতি আসা এবং ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান। গভীরভাবে চিন্তা করলে যেকোনো লোকের পক্ষেই বোঝা সম্ভব যে, মানব-দেহের প্রাণশক্তি কলবকে সংশোধন ও তার মাধ্যমে গোটা জীবনকে সুন্দররূপে সাজানোর জন্যেই এই যিকির।

আউলিয়ায়ে কেরাম রুহানি ডাক্তার। রুহানি রোগ দূর করার জন্যেই তারা এই ব্যবস্থা দিয়েছেন। কোনো মানুষ ডিস্পেন্সারির সমস্ত ওষুধ খেয়েও ভালো হতে পারে না, অথচ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দুয়েকটি ট্যাবলেট খেলে অসুখ সেরে যায়, স্বাস্থ্য ভালো হয়ে যায়। আবার ডাক্তার যত বড় হন, তাদের প্রেসক্রিপশন বা ওষুধের তালিকাও তত কম হয়। চার আনা আট আনার টেবলেট দিয়েও জটিল রোগ ভালো হয়ে যায়। রুহানি ডাক্তার আউলিয়ায়ে কেরামও এভাবে মানব হৃদয়ের যাবতীয় রোগের চিকিৎসা করেন।

এ প্রসঙ্গে হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী-এর একটি ব্যবস্থাপত্রের ঘটনা খুবই শিক্ষণীয়, যা দাওরায়ে কাদিরিয়া হিসেবে পরিচিত।

একদিন বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী-এর খেদমতে এক লোক এসে বলল, আপনি বড়পীর সাহেব। এজন্য আপনার খেদমতে এসেছি।

আমি আরও অনেকের কাছে গিয়েছি। তারা বলে, নামাজ পড়, রোজা রাখ, যাকাত দাও। অথচ আমি এগুলো করতে পারব না। আমি একজন প্রতারক। আমার পেশা চলতে হবে, না হয় আমার সংসার চলবে না। আর আখেরাতও চাই। কোনো পথ থাকলে দেখান। আমি কিন্তু নামাজ-রোজা করতে পারব না। লোকটির বর্ণনা শুনে বড়পীর সাহেব বললেন, আমি তোমাকে কয়েকটি শব্দ শিখিয়ে দিচ্ছি, হাঁটতে বসতে সব সময় এগুলো পড়বে, আল্লাহু সমীউন, আল্লাহু বসীরুন, আল্লাহু আলীমুন, আল্লাহু কদীরুন। যার অর্থ যথাক্রমে আল্লাহ তাআলা শ্রবণকারী, আল্লাহ তাআলা সর্বদ্রষ্টা, সবকিছু দেখেন, আল্লাহ সবকিছু জানেন এবং আল্লাহ তাআলা অসীম শক্তিমান।

এই কয়েকটি শব্দ লোকটির পছন্দ হলো। এখন হাঁটা, বসা ও চলাফেরায় সেগুলো পড়তে লাগল। দৈনন্দিন কাজ-কর্মে একদিন এক পাওনাদার এসে তার কাছে টাকা দাবি করল। চিরাচরিত নিয়মে তখন নির্দ্বিধায় জবাব দিল, আজ যে আমার হাতে টাকা নেই। তোমার পাওনা আজ দিতে পারব না। এভাবে পাওনাদারকে বিদায় দিল। কিন্তু লোকটি কতদূর না যেতেই ডাক দিয়ে বলল, হে ভাই এসো! তোমার টাকা নিয়ে যাও। কারণ লোকটিকে বিদায় দেওয়ার পর যখন নিয়মিত যিকির শুরু করল তখনই যিকিরের প্রথম বাক্যটি তাকে বড় রকমের আঘাত করল। আল্লাহু সামী’উ (আল্লাহ তাআলা শ্রবণকারী)। সত্যিই আমি যে টাকা থাকা সত্ত্বেও নেই বলে জবাব দিলাম তা শুনেছেন আল্লাহ! আমি আল্লাহর সামনে কিভাবে মিথ্যা বলি?

আরেক দিনের ঘটনা, লোকটি গম বিক্রি করছিল এবং খুব চালাকির সাথে ক্রেতাকে ঠকাচ্ছিল। তবে তখনও ওই যিকির তার মনে ও মুখে জারি আছে। হঠাৎ তার মনে প্রশ্নের কাঁটা বিঁধে গেল। আল্লাহু বসীরুন (আল্লাহ তো সবকিছু দেখেন, দেখছেন), আমি কিভাবে প্রতারণা করছি। সাথে সাথে সংশোধন হয়ে গেলেন। আর বেশিদূর অগ্রসর হতে হয়নি। হযরত বড়পীর সাহেব ৬৯-এর দেওয়া এই যিকির তার জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিল এবং তিনি নামাজ-রোজা, যাকাতসহ শরীয়তের যাবতীয় হুকুম-আহকামের অনুগত ও পাবন্দ হয়ে গেলেন। আজকের দিনেও আপনারা লক্ষ করবেন যে, পীরের হাতে হাত দেওয়ার পর অনেক বিপথগামী লোকের জীবনের মোড় ঘুরে গেছে।

মূলত আউলিয়ায়ে কেরামের সকল কাজই এ রকমই হেকমতপূর্ণ। আমার হযরত কেবলা প্রায় সময় বলতেন, আমার মুরিদদের মধ্যে যাদের আমল-আখলাক ভালো, যারা ফরজ-ওয়াজিব পালন করে ইবাদত-বন্দেগিতে অগ্রসর, তারা আমার নাজাতের উসিলা হবে। আর আল্লাহ তাআলার কাছে আমি যদি সফলকাম হই, তাহলে আমার মুরিদানের মধ্যে যাদের ইবাদত ও বন্দেগিতে ত্রুটি-বিচ্যুতি, দুর্বলতা রয়েছে, ইনশাআল্লাহ তাদেরকে বাদ দিয়ে আমি যাব না। একে অপরের সহযোগিতায় এভাবেই আল্লাহর দরবারে পরিত্রাণের আশা করবো।

উল্লেখ্য যে, ১১ রবিউস সানী ১৪১১ হিজরী মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৯টা থেকে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা হযরত পীর সাহেব কেবলা কক্সবাজারে জনাকীর্ণ মাহফিলে গুরুত্বপূর্ণ হিদায়ত প্রদান করেন। যাতে তিনি তাসাওউফ ও তরীকত সম্পর্কে অনেক জটিল বিষয়ের ব্যাখ্যা ও সমাধান পেশ করেন। একথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করছি যে, কোনো মাহফিল বা বক্তৃতার স্বতন্ত্র পরিবেশ, ভাষার প্রায়োগিক তারতম্য, জোরালো বা নরমভাবে সম্বোধন শ্রোতাদের অনুভূতির প্রকাশ, মঞ্চের ওলামায়ে কেরামের একাগ্রতা সবকিছু লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তবুও এ ভাষণটি টেপরেকর্ড থেকে নয়, মাহফিলে বসে তৈরি নোট থেকে স্মরণশক্তির সহযোগিতায় সাজানোর চেষ্টা করেছি।

গ্রন্থনায়: ড. মাওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *