আল্লাহর বন্দেগি ও দাসত্বে নিজকে বিলিয়ে দিন

চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত লোহাগাড়া থানাধীন আমিরাবাদ বটতলী মোটর স্টেশনে মুহতরম পীর সাহেব হযরত মাওলানা আবদুল জববার সাহেব-এর প্রদত্ত ভাষণের অংশ বিশেষ। সম্পাদক

আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীনের অসীম দয়া ও মেহেরবানি যে, শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি এ ধরনের একটি দীনী ও ঈমানি মজলিসে উপস্থিত হওয়ার, ঈমানদারদের চেহারা দেখার, তাদেরকে সালাম দেওয়ার এবং তাদের সালাম নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এজন্য আল্লাহ পাকের শোকরিয়া আদায় করছি, আল-হামদু লিল্লাহ।

দূরের-কাছের অনেক ওলামা, বয়স্ক ও তরুণ আজকের মাহফিলে উপস্থিত হয়েছেন। ইতঃপূর্বে কয়েকজন বিজ্ঞ আলেমের মুখে আপনারা বয়ান শুনেছেন। দায়িত্ব হিসেবে আমিও দুয়েকটি কথা আরজ করার চেষ্টা করবো। প্রথমেই মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য নিয়ে চিন্তা করার অনুরোধ জানাই প্রত্যেকের কাছে। মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী? আল্লাহ পাক কেন আমাদের দুনিয়ায় সৃষ্টি করে পাঠিয়েছেন? যুগ যুগ ধরে মানব-জাতির কাছে এ প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছে, অনেকে পথহারা হয়েছে। নানা পথ-মত ও মতবাদের জন্ম দিয়েছে। আল্লাহ পাকের শোকর যে, আমাদেরকে তিনি এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়ার তওফিক দান করেছেন। কুরআন মজীদে স্বয়ং আল্লাহ পাক এ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলেছেন,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ .

‘আমি জিন ও মানব-জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত ছাড়া অন্য কিছুর জন্যে সৃষ্টি করিনি।”
প্রশ্ন উঠতে পারে এ ইবাদত কেন? কেন আমরা আল্লাহর ইবাদত করবো? তিনি আমাদের কি উপকার করেছেন যে, তাঁর হুকুম-আহকাম মেনে চলতে হবে? এ বিষয়েও সামান্য চিন্তা করলে আমরা বুঝতে পারব যে, আমাদের গোটা জীবনে আল্লাহর তাআলার দয়া, অনুগ্রহ ও রহমত ছাড়া আর কিছুই নেই। তাঁর অফুরন্ত দয়া ও রহমত গণনা করে শেষ করা যাবে না।

আসমান ও জমিনের সবকিছুই মানুষের ভোগ ও ব্যবহারের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, খোদ মানুষের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে চিন্তা করুন। দেখবেন যে, মানুষ আসলে কিছুই না, এই যে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষ-বাস, নেতৃত্ব-সরদারি, সংসার জীবন নিয়ে ব্যস্ত মানুষ তাদের সবার গোড়ার কথা চিন্তা করলে দেখবেন যে, মানুষ কত তুচ্ছ, অসহায়! অথচ আল্লাহ পাক তাদেরকে সম্মানিত করেছেন, সৃষ্টিসেরা মখলুকাতের মর্যাদা দিয়েছেন। এ মানুষকে যদি আল্লাহ পাক লালন-পালন না করতেন, তাহলে তার অস্তিত্বই কল্পনা করা যেত না। তিনি মানুষকে অত্যন্ত অসহায় অবস্থা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুন্দররূপে লালন-পালন করেছেন, তাঁর ইবাদত করা কি আমাদের ওপর কর্তব্য নয়? আল্লাহ পাক সে কথাটিই অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন মানব-জাতিকে,

يَأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ )

‘হে মানব-জাতি! তোমরা ইবাদত করো তোমাদের প্রতিপালকের, যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে তাদেরকেও। আশা করা যায় যে, তোমরা দোযখ হতে মুক্তি পাবে।” অতিসহজ ও সরল ভাষায় আহ্বান করা হয়েছে, হে মানুষ! যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, শুধু তুমি বা তোমরা নও, তোমাদের পূর্বে যারা অতীত হয়েছে, তোমাদের মাতা-পিতা, দাদা-দাদী পূর্বপুরুষ সবাইকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করো, তাঁর আদেশসমূহ পালণ করো এবং নিষেধসমূহ বর্জন করে চলো। একমাত্র তাঁরই দাসত্ব করো। এটিই সঠিক পথ। এ পথ ধরে চললেই তোমাদের জীবন সফল ও সার্থক হবে। আখেরাতে দোযখ হতে মুক্তি এ পথেই আসবে। যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুন্দররূপে লালন-পালন করেছেন, তাঁর ইবাদতে রত থাকাই তো আমাদের কর্তব্য। মানব-জাতিকে আল্লাহ পাক কিভাবে লালন-পালন করেছেন, তা কি একবারও চিন্তা করে দেখেছেন? শুধু এখন নয়, অসহায় শৈশব অবস্থায় কিভাবে মায়ের দুধ ও আদর-মমতা দিয়ে বড় করেছেন, তার কি কোনো তুলনা হয়? তারও আগে যেদিন হতে আল্লাহর হুকুমে পিতার পিঠ হতে মায়ের গর্ভে শুক্রবিন্দু স্থিতিলাভ করেছে তখন হতেই শুরু হয়েছে আল্লাহ পাকের লালন-পালনের কাজ। মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ ১০ মাস ১০ দিন মানুষকে লালন-পালন করা এবং দৈহিক পূর্ণতা দিয়ে দুনিয়ায় পাঠানো কোনো মা-বাপ বা বৈজ্ঞানিকের দ্বারা কি সম্ভব? সচরাচর নিয়ম হিসেবে আমি ১০ মাস ১০ দিনের কথা বললাম নচেৎ আট-নয় মাসেও শিশু জন্মলাভ করে। আবার ১৮ মাস পর্যন্ত কোনো কোনো মনীষী মাতৃগর্ভে ছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। একফোটা নাপাক পানি হতেই মানুষের সৃষ্টি। পিতার ঔরস হতে উৎক্ষিপ্ত একফোটা নাপাক পানি মায়ের গর্ভে স্থিত হলো, এরপর ধাপে ধাপে অতিহিকমতের সাথে মানুষকে তৈরি করা হলো। কত আশ্চর্যপূর্ণ এই সৃষ্টি-কৌশল। আল্লাহ পাক মানব-জাতিকে তাদের আসল পরিচয় তুলে ধরে বলছেন,

وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَلَةٍ مِنْ طِينٍ ثُمَّ جَعَلْنَهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ تَمَكِينٍ ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَمًا فَكَسَوْنَا الْعِظْمَ لَحْمًا ثُمَّ انْشَانَهُ خَلْقًا أَخَرَ فَتَبْرَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَلِقِينَ

‘আর আমি মানুষকে মাটির সারাংশ (খাদ্যসার) হতে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তাকে বীর্য হতে সৃষ্টি করেছি, যা এক সুরক্ষিত স্থানে ছিল। অতঃপর আমি সেই শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করলাম। অনন্তর আমি উক্ত জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করলাম। অতঃপর উক্ত মাংসপিণ্ডকে হাড়সমূহে পরিণত করলাম। উক্ত হাড়সমূহকে মাংসে জড়ালাম, তারপর (আমি রুহ দান করে) তাকে অনন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুললাম। সুতরাং কেমন মহিমান্বিত সেই আল্লাহ যিনি সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্তা?”

আল্লাহর হুকুমে পিতার পিঠ হতে শুক্রবিন্দু মায়ের গর্ভে স্থিত হওয়ার পর ৪০ দিন অতিবাহিত হলে তা জমাট রক্তে পরিণত হয়। পরবর্তী ৪০ দিন যাওয়ার পর তা মাংসপিণ্ড বা গোশতের টুকরায় পরিণত হয়। আরও ৪০ দিন পর সেই গোশতের টুকরা হাড়িতে পরিণত হয়ে যায়। অতঃপর আরও ৪০ দিন পরে সেই হাড়ির ওপর গোশত আচ্ছাদিত করা হয়। এরপরই রুহ ফুঁকা হয় এবং মানব-শিশুর পূর্ণ আকৃতি পায়।

চিন্তা করুন, আল্লাহর কোনো কুদরতের কারখানাতে এক ফোটা নাপাক পানি জমাট রক্ত হয়ে যায়, আবার সেই রক্ত গোশতে পরিণত হয়। আবার গোশতের ভেতর হাড় তৈরি হয়। একখণ্ড গোশত হতে আবার হাডিড তৈরি হওয়া কি জ্ঞান বুদ্ধিতে ধরে? তাও কোনো একখণ্ড হাড় নয়, বরং মানুষের শরীরে যত প্রকার হাডিড আছে; ছোট, বড়, লম্বা, খাটো, মাথার খুলির হাডিড, মুখের চোয়ালের হাড় পায়ের নলা, আঙুলের ফাক এবং ৩৬০ মোকামের, গিরার হাডিড সবই সেই একখণ্ড গোশত থেকে মায়ের পেটের ভেতরেই আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর কুদরত বোঝার সাধ্য কারও নেই। قَبْرَكَ اللهُ أَحْسَنُ الْخَدِقِينَ )ফতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকীন)।

সত্যিই গোশতের ভেতর যদি হাডিড না থাকত তাহলে কোনো কিছু ধরা বা কোনো কাজ করা সম্ভব হতো না। আবার যদি মানব শরীরে শুধু হাডিড হতো তাহলেও কোনো কাজ করা যেত না। আবার যদি সব হাডিড সোজা করত তাহলে বাকা করা যেত না, যদি সব বাঁকা করা হতো পাজরের হাড়র ন্যায়, তাহলে সোজা করা যেত না।

পাঁচটি আঙুলের কথাই চিন্তা করুন। হাতের পাঁচটি আঙুল যদি আল্লাহ পাক এক সমান করতেন, তাহলে দুনিয়ার কাজ সমাধা হতো না। পাঁচটির মধ্যে একটি আঙুল খাটো করেছেন যার নাম বৃদ্ধাঙুল। কিন্তু খাটো হলে কি হবে? সেই আঙুলই সবার মাথায় হাত দেয়, সবাইকে পরিচালনা করে। অন্যান্য আঙুল পরীক্ষা করে দেখুন, নিজের পাশের আঙুলটির মাথায় ও হাত দিতে পারে না।

অনুরূপভাবে বাহুর কথাই চিন্তা করুন। লম্বা হাড় জড়িয়ে আছে গোশত। এ বাহুর জোরেই মানুষ সমস্ত কাজ করে। ব্যবসা-বাণিজ্য, সরদারি নেতৃত্ব, ড্রাইভারি, চাষাবাদ, জাহাজ-বিমান চালনা সবকাজই এই বাহুর জোরে হয়। কাজেই কারও ধন-দৌলত না থাকুক, আল্লাহ পাক যে এ হাত, এ বাহু, হাতের এ আঙুল দিয়ে অফুরন্ত নেয়ামতের ভাগী করেছেন, তার শোকরিয়া আদায় করা কি মানুষের পক্ষে সম্ভবপর হবে? প্লাস্টিক বা সোনা-রুপোর আঙুল লাগালেও কি দুনিয়ার এত কাজ করা যাবে? মানুষের ওপর আল্লাহ তাআলার এসব নেয়ামতের কথা চিন্তা করেই হাদীস শরীফে বলা হয়েছে,

‘দুনিয়ার ব্যাপারে তুমি তোমার চেয়ে ছোট লোকদের দিকে তাকাও,

তাহলে আফসোস আসবে না।’ যারা পঙ্গু বিকলাঙ্গ তাদের তুলনায় সুস্থ মানুষকে শরীরের সুস্থতার যে নেয়ামত দেওয়া হয়েছে তার মূল্য তো অনেক বেশি। যারা জুতা-সেন্ডেল কিনে পায়ে দিতে পারে না, যাদের পা নেই তাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, কি বিরাট নেয়ামত আল্লাহ পাক দিয়েছেন। দীনের ব্যাপারে হাদীস শরীফের নির্দেশ হলো, ‘যারা তোমার চেয়ে উত্তম তাদের দিকে তাকাও।’ নেককার বুযুর্গ লোকদের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করো। হায়! তাঁরা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে কিভাবে মশগুল অথচ আমি অবহেলায় ডুবে আছি। তাতে ইবাদত-বন্দেগির কারণে মনে অহংকার সৃষ্টি হবে না।

আসুন, আমরা পূর্বের কথায় ফিরে আসি। শুক্রবিন্দু হতে জমাট রক্ত, জমাট রক্ত হতে গোশতের টুকরা এবং গোশতের টুকরাকে হাড়সমূহে পরিণত করার পর তার ওপর গোশত ও চামড়া জড়িয়ে দেওয়া হলো। অতিসুন্দর সৃষ্টি। পৃথিবীর অন্য কোনো সুন্দরের তুলনা নেই মানুষের সমকক্ষ হওয়ার।

শুধু রূপে নয়, গুণেও সুন্দর। মান-সম্মানে, মর্যাদায় আল্লাহর ফেরেশতাদের চেয়েও সম্মানী আশরাফুল মাখলুকাত। দুনিয়ায় মানুষ আল্লাহর খলীফা বা প্রতিনিধি। কত বড় কথা। এত সূক্ষ, সুন্দর ও হিকমতপূর্ণ প্রক্রিয়ায় আমাদেরকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার বাজারে পাঠিয়েছেন। কাজেই গভীরভাবে চিন্তা করুন, আমাদের দায়িত্ব কি?

দুনিয়ায় পাঠিয়ে কি এমনিতেই ছেড়ে দিয়েছেন? এখানে সুখ-শান্তিতে বসবাস করার সমস্ত আয়োজন তিনি সম্পন্ন করেছেন। পৃথিবীকে বানিয়েছেন স্থিতিশীল ও বিছানা। আর আকাশকে বানিয়েছেন ছাদস্বরূপ।

وَالْأَرْضَ فَرَشْنَهَا فَنِعْمَ الْيُهِدُونَ .

‘আর আমি জমিনকে বিছানা বানিয়েছি। কত সুন্দর এই বিছানা। কত উত্তম এই বিছানা তৈরিকারী!”

শোয়া, থাকা, হাঁটা, চলা, চাষ-বাস, বাজার-সদাই, কল-কারখানা, গাড়ি-ঘোড়া চালনা, ঘর-বাড়ি, দালান-কোঠা তৈরি সব কাজই হচ্ছে জমিনে। কারণ আল্লাহ পাক জমিনকে মানুষের জন্য বিছানায় পরিণত করেছেন। যদি এ রকম না হতো! জমিন যদি অতিশয় নরম হতো! যেমন পলিমাটি বা ভেজা কাদা মাটির অবস্থা হয় অথবা যদি সবখানে শীলাপাথর কিংবা তামার ন্যায় শক্ত হতো! তাহলে কেউই নরম মাটির ওপর দাঁড়াতে পারতাম না, মাটির ভেতর ঢুকে ধ্বসে যেত সবকিছু। অথবা রৌদ্রতাপে শক্ত মাটি উত্তপ্ত হলে তার ওপর দাঁড়ানোর শক্তি হতো না কারও। মাটি দিয়ে ঘর-বাড়ি তৈরি করা বা চাষাবাদ করা সম্ভব হত না কারও পক্ষে।

মাটিকে বর্তমান অবস্থায় রেখেও যদি আল্লাহ পাক স্থির করে না দিতেন তাহলে কি অবস্থা হতো একবার চিন্তা করে দেখুন। ভূমিকম্পে বা ভূ-চালের কথা একবার চিন্তা করুন।

ভূমিকম্প কয় ঘণ্টা চলে? ঘণ্টা নয়, কয়েক মিনিটও স্থায়ী হয় না। এক মিনিটকে ৬০ ভাগ করে মাত্র তিন-চার সেকেন্ড বা আট-দশ সেকেন্ড এই ভূমিকম্প চলে। তাতে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। দোকানদার তার মালামাল ফেলে, ক্ষুধার্ত লোক মুখের গ্রাস ফেলে পালিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে, ধনী লোকেরা অট্টালিকা ছেড়ে বিচলিত হয়ে বেরিয়ে আসে ঘরের বাইরে, মুহূর্তে দুনিয়া জোড়া থরথরে কম্পনে হুঁশ হারিয়ে ফলে লোকেরা, ভয়ে চোখ উলটে যায়। অথচ বছরের পর বছর আল্লাহ তাআলা এই জমিনকে স্থিতিশীল রেখেছেন বলেই আমরা তাতে ঘর-সংসার, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছি! একথাই স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ পাক জিজ্ঞাসা করছেন,

امَّنْ جَعَلَ الْأَرْضَ قَرَارًان ‘যে খোদা এ পৃথিবীকে শান্ত স্থিতিশীল করে রেখেছেন, তিনি কি তোমাদের প্রভু নয়?”

একমাত্র তাঁর ইবাদত করাই কি তোমাদের কর্তব্য নয়? এই জমিন যাতে স্থিতিশীল থাকে, নড়াচড়া করতে না পারে তার জন্য পাহাড়-পর্বতকে পেরেক হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন,

وَالْجِبَالَ أَوْتَادًا

‘আল্লাহ পাক পাহাড়-পর্বতকে পেরেক করে দিয়েছেন।’২

পূর্বের চেয়ে বর্তমানে ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হয়। কারণ পাহাড় কাটা হচ্ছে বেপরোয়াভাবে। জমিনের যদি পেরেক না রাখে বা উঠিয়ে ফেলা হয়, তাহলে অবশ্যই নড়চড় হয়ে যাবে। ভূমিকম্প, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসবে না কেন? কারণ মানুষই তো প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে এসব ডেকে আনছে। আল্লাহ পাক বলেন, وَجَعَلَ خِلْلَهَا انْهَرَان
‘এ মাটি আর পাহাড়-পর্বতের মাঝে মাঝে আমি নদ-নদী বসিয়ে দিয়েছি।”

পানির অপর নাম জীবন। এ পানির ব্যবস্থা করেছি তোমাদের জীবন যাপনের জন্য। তোমাদের ক্ষেতের ধান, গম, মূলা-বেগুন ফলমূল বেড়ে উঠছে এ নদ-নদীর বরকতে! এগুলো সবই আল্লাহর ব্যবস্থাপনা। কাজেই তোমরা একমাত্র আল্লাহ তাআলার বন্দেগি ও দাসত্ব করো। এ হলো দুনিয়ায় তোমাদের জীবিকার সুন্দর ব্যবস্থাপনার নমুনা।

ভাইয়েরা! একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন। একটু আগেই মায়ের পেটে ১০ মাস ১০ দিনে কিভাবে আল্লাহ তাআলা মানব-শিশুকে এক ফোটা নাপাক পানি হতে মানুষে পরিণত করেন, তার বর্ণনা দিয়েছি। সেই মাতৃগর্ভে মানব-শিশুর জীবিকার ব্যবস্থা কিভাবে করেন তাও একবার ভেবে দেখুন। নারী জাতি অর্থাৎ আমাদের মা-বোনদের মধ্যে আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক নিয়মে ঋতুস্রাব বা মাসিক হয়। কোনো কারণে যদি এই ঋতুস্রাব বন্ধ হয় বা অনিয়ম হয় তাহলে রোগ ব্যাধি দেখা দেয়, প্রচণ্ড ব্যথা বেদনার সৃষ্টি হয়। কেননা সেই রক্ত দূষিত, দুর্গন্ধযুক্ত ও অপবিত্র।

ঋতুস্রাবকালে নামাজ পড়া, রোজা রাখা নিষেধ। কিন্তু আল্লাহর হেকমত দেখুন। মাতৃগর্ভে শিশু জন্ম নেওয়ার পর হতে তার বেড়ে উঠার জন্য খাবারের প্রয়োজন দুনিয়ার ফলমূল তার মুখে পৌঁছানো সম্ভব নয় মায়ের দুধ ও চুষে খেতে পারবে না। তাই খোদায়ী ব্যবস্থাপনায় সন্তান গর্ভ ধারণের সাথে সাথে মা-বোনদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। এ রক্ত কোথায় যায়? শিশুর নাভার সাথে একটি পাইপ লাইন সংযোগ করা হয় সেই পাইপ দিয়ে মায়ের পেটের রক্ত চলে যায় শিশুর পেটে। তাতে হৃষ্ট-পুষ্ট হয়ে বেড়ে উঠে মানব-শিশু মাতৃগর্ভে। মানব-শিশুর আহার যোগানোর কী সুন্দর ব্যবস্থা। فَتَبْرَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَلِقِينَ )কত উত্তম, শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ)। শেখ সা’দী বলেন,

فراموشت نکرد ایزو در آن حال ہو کہ بودی نطقه مدفون مدہوش

‘তুমি যখন নাপাক দুর্গন্ধ যুক্ত শুক্রবিন্দু ছিলে তখনও আল্লাহ তোমাকে ভুলেননি। তুমি মায়ের পেটে ছিলে অসহায় অক্ষম অস্তিত্বহীন, তখনও আল্লাহ তোমার কথা ভুলেননি।

আর এখন বড় হয়ে সওদাগরি-ব্যবসা-বাণিজ্যের দোহাই দিয়ে আল্লাহর অহরহ নেয়ামতের মধ্যে ডুবে থেকে ভুলে যাও তাকে। যিনি অপরিপূর্ণ অবস্থায় তোমার আহার ও জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন, তিনি এখন তোমার আহার যোগাতে পারবেন না-এ শয়তানি ধোঁকা কে ঢুকিয়ে দিল তোমার অন্তরে বা মাথায়?

যে খোদা সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা এবং প্রভু, সে খোদার বন্দেগি ও দাসত্ব করার জন্যেই তো তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ, নেতৃত্ব-সরদারি সবই করো। কিন্তু সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুম মেনে চলো। এটিই আল্লাহর ইবাদত, দাসত্ব। তোমাদের লালন-পালনের ব্যবস্থা, রিযিকের বন্দোবস্ত আল্লাহ পাক করেছেন, তোমরা শুধু তাঁর বন্দেগি করে চলো। আকাশ হতে যে বৃষ্টি বর্ষিত হয় তার কথা একবার চিন্তা করুন। আল্লাহ পাক বলেন,

وَمَا انْزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِنْ مَاءٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا

‘আর আমি আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেছি এবং তা দিয়ে পৃথিবীকে মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেছি।” বৃষ্টির পানি দ্বারাই জমিনে ফসল উৎপন্ন হয়। খাল-বিল, নদী-নালায় পানি হয়। আমাদের সংসার জীবনে পানির চাহিদা মিটে। এই যে পানির ব্যবস্থা, তাও কত সুন্দর লক্ষ করুন। পুকুর, নদী-নালার পানি জলীয় বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে। সাগরের লোনা পানি বাতাসের সংস্পর্শে আকাশে উঠে যায়, সেখানে তা মিঠা পানিতে পরিণত হয় এবং বাতাসের গায়ে ভর করে ছড়িয়ে যায় চতুর্দিকে। এরপর ফোটা ফোটা বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে পৃথিবীর বুকে। যদি সমুদ্রের লোনা পানি মিটা পানি না হয়ে এমনিতেই নেমে আসত তা হলে, পুকুর, নদী, খাল-বিল সব লবণাক্ত হতো, ক্ষেত-খামার জ্বলে পুড়ে যেত। জীবন ধারণ সম্ভবপর হতো না। কি সুন্দর ব্যবস্থাপনায় আল্লাহ পাক লোনা পানিকে আকাশে নিয়ে মিঠা পানিতে পরিণত করে আমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

আবার যদি বৃষ্টির পানি ফোটা ফোটা না হয়ে নদীর স্রোত কিংবা ঝর্ণাধারার মতো হত, তাহলে পানির তোড়ে সব ভেসে যেত। ক্ষেত খামার লণ্ডভণ্ড হয়ে যেত। অথচ প্রচণ্ড মেঘের গর্জনের ভেতর মুষলধারে বৃষ্টিতেও দেখি আমরা আল্লাহর সেই রহমতের নির্দশন। আল্লাহ তাআলা তাই জিজ্ঞাসা করেন, ৮৩ নির্বাচিত ভাষণ

أَفَرَوَيْتُمُ الْمَاءَ الَّذِي تَشْرَبُونَ وَأَنْتُمْ اَنْزَلْتُمُوهُ مِنَ الْمُزْنِ أَمْ نَحْنُ الْمُنْزِلُونَ . ‘তোমরা কি কখনও ভেবে দেখেছ, যে পানি তোমরা পান করছ, কলিজা ঠাণ্ডা করছ, সেই পানি কি আকাশের পরিধি থেকে তোমরাই বর্ষণ করেছ নাকি আমিই তা বর্ষণ করেছি?”

বস্তুত এভাবেই আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। অথচ আমরা চিন্তা করি না। আল্লাহ পাক তো বলেন, যদি তুমি মস্তবড় জ্ঞাণী-পণ্ডিত নও, সে কথা থাক, আর কিছু না বুঝলেও নিজের শরীরকে তো বুঝতে পারো। সে শরীর নিয়ে চিন্তা করলেই তো আল্লাহর রহমতের সন্ধান পাবে। আল্লাহর মা’রিফতের নিদর্শন দেখতে পাবে।

আফসোস যে, আমরা অযথা সময় নষ্ট করি। অথচ আল্লাহর কুদরত ও হেকমতের বিচিত্র নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করি না।

আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগির কথা বললে আমরা উলটা নানা অজুহাত খুঁজে বেড়াই। কেউ বলি, কাজ-কর্ম নিয়ে খুবই ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছি, নামাজ-কালাম ঠিকভাবে আদায় করার জন্য সময় করে উঠতে পারি না। হাশরের ময়দানে এসব লোকদের সামনে আল্লাহ পাক হযরত সুলাইমান-কে দেখিয়ে বলবেন, ‘সুলাইমান-কে তো আমি দুনিয়ার রাজত্ব, দুনিয়ার ঝামেলা মাথায় দিয়েছিলাম, এরপরও কি তিনি আমার ইবাদত-বন্দেগিতে অবহেলা করেছেন? কাজেই তোমাদের কৈফিয়ত গ্রহণযোগ্য নয়।’

যদি বলে যে, আমি শরীরের অশান্তি ও অসুখ-বিসুখের জন্য আল্লাহর ইবাদত করতে পারছি না। তাহলে আল্লাহ পাক হযরত আইয়ুব-কে দেখিয়ে বলবেন, ‘দীর্ঘ ১৮ বছর আমি আইয়ুব এ-কে কঠিন রোগে আক্রান্ত রেখেছিলাম। জিহ্বায় পর্যন্ত পোকা পড়েছিল, এরপরও কি আইয়ুব এক মুহূর্তও আমার স্মরণ হতে বিরত থেকেছেন?’

যদি দেশ পরিচালনা, মন্ত্রী-মিনিস্টারির দোহাই দিয়ে পার হতে চান তাহলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক, হযরত ওমর ফারুক তথা খোলাফায়ে রাশেদীনের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে বলা হবে, তাঁরা অর্ধ-দুনিয়া শাসন করেছেন, হাজারো সমস্যার মোকাবিলা করেছেন। এর মধ্যে একমুহূর্তও তাঁরা আমার ইবাদত হতে গাফেল ছিলেন না। আমার যিকির, বন্দেগি, দীনের প্রচার ও ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে অবহেলা প্রদর্শন করেননি।
যদি গরিব লোকেরা বলে যে, ইয়া আল্লাহ! আমরা গরিব ছিলাম, ক্ষুধার তাড়নায়, স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের মুখে খাবার জোটানোর প্রচেষ্টায় সদা ব্যস্ত থাকতে হয়েছে, তোমার ইবাদত-বন্দেগি করতে পারিনি, তাহলে তাদেরকে হযরত ঈসা-এর দৃষ্টান্ত দেখিয়ে বলা হবে। দেখ, ‘ঈসা এ-এর পুত্র-পরিজন দূরে থাক, ঘর-বাড়ি পর্যন্ত ছিল না। সবসময় দুশমন বেষ্টিত থাকতে হয়েছে। এরপরও তিনি আমার দীনের প্রচার ও আমার বন্দেগিতে গাফেলতি করেননি।’

একবার নিজেদের কথা চিন্তা করে দেখুন। অহরহ আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করছি। আল্লাহর বিছানো জমিনে বসবাস করছি। আল্লাহর দয়া ও রহমত ছাড়া একমুহূর্তও বাঁচার সাধ্য কারও নেই। কাজেই এগুলো শোকরিয়া আদায় করে খাঁটি বান্দা হিসেবে আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা কর্তব্য। কেননা দুনিয়ার এ জীবন চিরস্থায়ী নয়। এখানে চিরদিন থাকতে পারব না। একদিন না একদিন চলে যেতেই হবে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَ مَتَاعٌ إِلَى حِينٍ ‘পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের বসবাস ও জীবিকার ব্যবস্থা রয়েছে।”এখানে যতদিন থাকবেন, ততদিনের জীবিকার ব্যবস্থা আল্লাহ পাক করেছেন, দুনিয়ায় যার রিযিক শেষ হয়ে গেছে সে অতিরিক্ত এক ঢোক পানিও পান করতে পারবে না। শুধু মানুষ নয়, দুনিয়ায় যত জীব-জন্তু, পশু-পক্ষী রয়েছে সবার রিযিকের ব্যবস্থা একমাত্র আল্লাহই করেছেন। তাদের মধ্যে কোনো কোনো প্রাণীকে বিনাপরিশ্রমে রিযিক দেওয়া হয়, তবে মানুষকে চেষ্টা করে তার জন্য বরাদ্দকৃত রিযিক অনুসন্ধান করতে হবে, যোগাড় করতে হবে। কেননা মানুষ তো অজগর সাপ নয় যে, আহার সামনে এসে হাজির হবে আর তা সে গলাধকরণ করবে। আল্লাহর ওপর (তাওয়াক্কুল) ভরসা করে চেষ্টা করলে হালালভাবে রিযিকের ব্যবস্থা আল্লাহ পাক করে দেন। আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তওফিক দিন। আমীন।

গ্রন্থনায়: ড. মাওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *