বর্তমান মাদরাসা শিক্ষার সমস্যা ও সমাধান

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮১ চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বর্তমান মাদরাসা শিক্ষার সমস্যা ও সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে প্রদত্ত হুযুর কেবলার উদ্বোধনী ভাষণ। সম্পাদক

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى سَيِّدِ الْمُرْسَلِينَ وَعَلَى آلِهِ

وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِينَ، أَمَّا بَعْدُ!

মুহতারাম সভাপতি, সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম, অতিথিবৃন্দ এবং বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ ও সমাজ-সচেতন মুসলমান ভাই সাহেবান, আস-সালামু আলাইকুম।

আজ এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য আপনাদেরকে কষ্ট দিতে হয়েছে এবং আল্লাহর রহমতে আপনারাও নিজের মূল্যবান সময় ও অর্থের কুরবানি স্বীকার করে বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান আয়োজিত এই সেমিনারে সমবেত হয়েছেন, যে বিষয়টি আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আজকের সেমিনারের মূল আলোচ্য বিষয়: বর্তমান মাদরাসা শিক্ষার সমস্যা ও সমাধান। এই বিষয়টি শুধু আমাদের এই বাংলাদেশ কিংবা উপমহাদেশের জন্যই নয়, বরং গোটা দুনিয়ার মুসলমানদের সামনে দীর্ঘদিন ধরে এক জটিল সমস্যা ও সংকটরূপে বিরাজ করছে। পৃথিবীতে যেকোনো জাতির মেরুদণ্ড বলতে বোঝায়, তাদের স্বকীয় আদর্শ, ঐতিহ্য ও জীবনধারার আলোকে একটি জাতীয় শিক্ষা-ব্যবস্থা।

এই শিক্ষা-ব্যবস্থা ছাড়া কোনো জাতিরই স্বাধীন অস্তিত্ব বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু বর্তমানে মুসলমানরা এমন এক জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে, তাদের কাছে নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আদর্শের আলোকে একটি জাতীয় শিক্ষা-ব্যবস্থা নেই, অথচ একমাত্র শিক্ষার ওপর ভিত্তি করেই দুনিয়ায় মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোনো গোত্রীয় ভৌগোলিক, ভাষাগত বা বর্ণগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।

অতীত থেকে মুসলমানদের জাতীয় শিক্ষা হচ্ছে, ইসলামী শিক্ষা-ব্যবস্থা যা পবিত্র কুরআন ও হাদীসকে ভিত্তি করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় প্রসারিত। ঐতিহাসিকভাবে এই শিক্ষা-ব্যবস্থা মাদরাসা শিক্ষা নামেই পরিচিত। যে শিক্ষা হযরত মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ-এর জমানায় আসহাবে সুফফার মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং প্রতিটি যুগে প্রতিটি মুসলিম দেশ ও জনপদে মসজিদকে কেন্দ্র করে চালু হয়ে আসছে।

আব্বাসীয় খলীফাদের আমলে এই শিক্ষার মাধ্যমে হাদীস, তাফসীর, ফিকহ, ভাষাতত্ত্ব প্রভৃতি ছাড়াও তর্কশাস্ত্র, দর্শন, অঙ্ক, জ্যোর্তিবিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, চিকিৎসা প্রভৃতিতে বিজ্ঞান ও আবিষ্কারের এক স্বর্ণ-অধ্যয় রচিত হয়। পরবর্তীতে ইউরোপ, বাগদাদ ও কর্ডোবা হতে সেই শিক্ষার আলো পেয়েই বর্তমান সভ্যতার অধিকারী হতে পেরেছে। তখন আরব জাহানসহ সমগ্র বিশ্বে এই মাদরাসা শিক্ষাই মুসলমানদের ধর্মীয় জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনের চাহিদা পূরণ করেছে। খোদ ভারতবর্ষেও ইংরেজ আসার পূর্ব পর্যন্ত ৭০০ বছরেরও বেশি সময় যে মুসলমানরা শাসন পরিচালনা করেছিল তখনও এখানকার জাতীয় শিক্ষা-ব্যবস্থা ছিল মসজিদ-কেন্দ্রিক মাদরাসা শিক্ষা। কিন্তু দুইশ বছর পূর্বে ইংরেজরা যখন ভারতবর্ষের শাসন-ক্ষমতা দখল করে নেয় তখন হতে মাদরাসা শিক্ষা তার গৌরবময় ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যকে হারিয়ে ফেলতে থাকে।

ইংরেজরা এ দেশবাসীকে রাজনৈতিকভাবে অধীন করার পর অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিকভাবে বন্দি করার উদ্দেশ্যে এখানে পাশ্চাত্য ভাবধারায় ইংরেজি শিক্ষা চালু করে। তবুও প্রথম দিকে ভারতবর্ষের পূর্ব প্রচলিত শরীয়তী আইন-আদালত ও শাসন-ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য কিছু কিছু লোক তৈরির প্রয়োজনে এবং কলকাতার মুসলমানদের আবেদনক্রমে ইংরেজরাই ১৭৮০ সালে কলিকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিল, কিন্তু ইংরেজদের শাসন পুরোদমে চালু হওয়ার পর রাষ্ট্রভাষা ফারসিকে রহিত করা হয় এবং আইন-আদালত থেকে শরীয়তের বিধানকে বিদায় দেওয়া হয়। অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে ইংরেজদের অনুগত হয়ে অফিসের কাজ-কর্ম গোছানোর কিছু লোক তৈরি হয়, তখন থেকে নিজেদের হাতে গড়া কলিকাতা আলিয়া মাদরাসাকে পঙ্গু করার জন্য বা ইংরেজি শিক্ষায় রূপান্তরিত করার জন্য ইংরেজরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে ১০০ বছর পরে সরকারি মাদরাসার পাশাপাশি ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী রণক্লান্ত মুজাহিদ আলেমদের প্রচেষ্টায় দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু উভয় মাদরাসাই ছিল ইসলামী শিক্ষার আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও জোড়াতালি দেওয়া ঘর।

বর্তমানে আলিয়া নেসাব ও কওমী নেসাবের দুই সিলসিলার মাদরাসাই আমাদের দেশে প্রচলিত।

বস্তুত ব্রিটিশ আমলে দেশে রাষ্ট্র-ভাষা ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি চালু হওয়ার পর এবং আইন-আদালত হতে শরীয়তের কানুন রহিত করে ইংরেজদের আইন প্রবর্তিত হওয়ার পর থেকে মাদরাসায় শিক্ষিত আলেমরা দারুণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সম্মুখীন হন। অপর পক্ষে হিন্দুদের দেখাদেখি মুসলমান যুবকরাও ইংরেজিদের অধীনে সরকারি চাকরি লাভ এবং পার্থিব উন্নতি লাভের জন্য দলে দলে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকে। ফলে মাদরাসাসমূহ শুধুমাত্র পাক-নাপাক, নামাজ-রোজা ও জানাযা ইত্যাদি মাসআলা শিক্ষার প্রয়োজন পূরণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং ক্রমান্বয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

মূলত এরপর থেকেই ইংরেজি শিক্ষা আমাদের জাতীয় শিক্ষা-ব্যবস্থার আসন দখল করে নেয় এবং মাদরাসা শিক্ষা সমাজের এক কোণায় পঙ্গু বিকলাঙ্গের ন্যায় খয়রাত, যাকাত ও দান-দাক্ষিণ্যের পাত্রে পরিণত হয়। ফলে মাদরাসায় গরিব লোক ছাড়া বড় লোকের ছেলে আসতে চায় না এবং গরীবের ঘরের ছেলেরাও পরের দেওয়া সদকা-যাকাতের ওপর নির্ভর করে পড়াশোনা করতে বাধ্য হয়। যার ফলে অনিবার্যভাবে এসব মাদরাসা শিক্ষিতরা দুর্বলচিত্ত, সাহসহারা ও পরমুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে তারা সমাজ-সংস্কারে বিরাট কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। সে কারণে মাদরাসা শিক্ষা যা এককালে মুসলমানদের জাতীয় শিক্ষা ও যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎসস্থল ছিল তাও আমরা ভুলে গিয়েছি, বরং মাদরাসা বলতে সংকীর্ণ অর্থে একশ্রেণির মৌলভী তৈরির কারখানা বলে ভাবতে থাকি। এই দুঃখ রাখার জায়গা কোথায়? বস্তুত এমনিভাবেই সুকৌশলে মুসলমানদেরকে নিজেদের জাতীয় ইসলামী শিক্ষা-ব্যবস্থা হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এই শিক্ষার মাধ্যমে এখনো আমরা মনে-মগজে এমনভাবে ইংরেজদের হাতে বন্দি আছি যে, বহুবছর পূর্বে তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলেও আজো আমাদের দেশে জাতীয় শিক্ষার মর্যাদা নিয়ে ইংরেজি শিক্ষাই চালু রয়েছে। ইংরেজদের প্রবর্তিত আইন ও শাসন-ব্যবস্থা অনুযায়ীই এখনো দেশ পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের শিক্ষিত লোকদের অনেকেই কথায় কথায় ইংরেজি বলতে পারলে গর্ববোধ করে। তারা অনেকে পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুকরণে উলঙ্গপনা, বেহায়াপনা, মদ, জুয়া ও লাম্পট্য প্রভৃতিকে সভ্যতা ও আভিজাত্যের প্রতীক বলে মনে করে।

ঠিক আমাদের দেশের ন্যায় এই একই অবস্থা চলছে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে। দুয়েকশ বছর পূর্বে যখন মুসলিম বিশ্ব আমাদের ন্যায় পশ্চিমা শাসকদের অধীন ছিল তখনকার প্রবর্তিত পাশ্চাত্য শিক্ষার মাধ্যমে এখনো যারা তৈরি হচ্ছে তারা নামে মুসলমান বা স্বদেশি হলেও মনে-মগজে পশ্চিমাদেরই অনুগত। যে কারণে মুসলিম দেশসমূহে আল্লাহর দেওয়া অফুরন্ত তেল, স্বর্ণ, খনিজ-সম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনশক্তি ইসলামের শত্রুরাই লুণ্ঠন করছে। মুসলমান নেতারা গিয়ে ইসলামের শত্রুদের সাথে মিত্রতা করছে, অথচ আপন ভাই মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হানাহানিতে লিপ্ত রয়েছে।

এক্ষেত্রে দুনিয়ার ১০০ কোটি মুসলমানকে ঐক্যবদ্ধ করে আল্লাহর দেওয়া অফুরন্ত ধনভাণ্ডারকে ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণে নিয়োজিত করার জন্য বিশেষত ইসলামকে বিশ্ববিজয়ী শক্তি হিসেবে পুনপ্রতিষ্ঠিত করার একমাত্র পথ হচ্ছে, সর্বাগ্রে কুরআন ও হাদীসের ভিত্তিতে ইসলামী আদর্শ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের জন্য সার্বজনীন একক ইসলামী শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করা এবং পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী দর্শন ও শিক্ষার নাগাল হতে মুক্ত হওয়া। এই শিক্ষা-ব্যবস্থাকে ইসলামের ঐতিহ্যগত পরিভাষায় মাদরাসা শিক্ষাও বলতে পারেন বা ইসলামী শিক্ষা-ব্যবস্থা কিংবা অন্য কোনো নামেও বলতে পারেন।

সুহৃদ মেহমানবৃন্দ!

আরও একটি গভীরে গিয়ে দেখুন, ব্রিটিশ আমলে ইংরেজরা মাদরাসা শিক্ষার বিকল্প হিসেবে যে মিশনারি স্কুল চালু করেছিল সেগুলোর তৎপরতা এখনো দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। তারা মুসলমানের ঘরের কচিকচি শিশুদেরকে ধর্মহীনতা ও খ্রিস্টীয় চাল-চলন, ভাবধারায় দীক্ষিত করে তুলছে। জনৈক খ্রিস্টান পাদরি দাবি করে বলেছিলেন, মিশনারি স্কুলের মাধ্যমে যদিও এদের পুরোপুরি খ্রিস্টান বানানো না যায় তবুও পুরোপুরি মুসলমানও থাকতে দেওয়া হবে না। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, পাদরি সাহেবের দাবি ঠিকমতোই পূরণ হচ্ছে। মুসলমানের ছেলে মেয়েরা মিশনারি স্কুলের পরিবেশে চলা-বলা, প্রস্রাব-পায়খানা ও ভাবধরায় খ্রিস্টান স্বভাব গ্রহণ করছে। বড় হয়ে তারা খ্রিস্টান কিংবা খ্রিস্টীয় স্বভাবের অথবা নাস্তিক হয়ে পড়ে। তবে পরিবেশ ও পারিবারিক চাপে বা লজ্জায় তা সহজে স্বীকার করতে পারে না।

উপমহাদেশে দুশো বছর পূর্বে ইংরেজরা এসেছিল সওদাগরি করার জন্যে। কিন্তু সুযোগ বুঝে তারা একদিন লাফ দিয়ে দিল্লির মসনদ দখল করে নেয় এবং ১৯০ বছর পর্যন্ত আমাদেরকে গোলাম বানিয়ে রাখে। এই খ্রিস্টান মিশনারিরাও যে একদিন সুযোগ বুঝে ক্ষমতায় লাফ দেওয়ার চেষ্টা করবে না কিংবা নাস্তিক্যবাদীরা ক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর নিধনযজ্ঞ চালাবে না যেমন অন্যান্য দেশে চলছে, তার নিশ্চয়তা দেবে কে? কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, মুসলমান পিতা-মাতা অভিভাবকরা নিজের ও দেশের ভবিষ্যত চিন্তা না করে আপন সন্তানদেরকে দুশমনের হাতে তুলে দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিত্তশালী ও অফিসার শ্রেণির লোকের ছেলেরাই বেশি এসব প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে যারা আগামী দিনে দেশের নেতৃত্ব দেবে। এই আত্মঘাতী পদক্ষেপের জন্য নিশ্চয়ই আমরা দেশের কাছে, জাতির কাছে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল-এর কাছে দায়ী হবো। হাদীস শরীফে হুযুর ইরশাদ করেন,

مَا مِنْ مَّوْلُوْدٍ إِلَّا يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ

يُمَحِّسَانِهِ».

‘প্রত্যেক মানব-শিশুই মুসলমানি স্বভাব নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু তার মাতাপিতা তাকে (শিক্ষা-দীক্ষা ও পরিবেশের মাধ্যমে) ইহুদি, খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজক (বা বিধর্মী) হিসেবে দীক্ষিত করে।” হচ্ছে, কিন্তু এখনও এর পূর্ণাঙ্গ একটি নমুনা দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। আমরা উপলব্ধি করলাম যে, এ বিষয়ে আমাদের চিন্তা, পরামর্শ ও প্রস্তাবকে শুধু কাগজে লিখে রাখলে চলবে না, এজন্য বাস্তব ক্ষেত্রে অনুশীলন ও ক্রমাগত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। তাই আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে আমরা চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফে একটি আদর্শ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

আজকের এই সেমিনারের পরামর্শ, প্রস্তাব ও সুধীমহলের মতামতকে অবলম্বন করে এই মাদরাসার মাধ্যমে মুসলমানদের জন্যে একটি সার্বজনীন একক জাতীয় শিক্ষা-ব্যবস্থা প্রবর্তনই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। যার মাধ্যমে প্রত্যেক শিক্ষার্থী কুরআন-হাদীস ও ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী হওয়ার সাথে সাথে আধুনিক বিশ্বের প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানও আয়ত্ত করতে পারবে এবং দীন ও দুনিয়ার সমন্বিত জ্ঞানের অধিকারী হয়ে যোগ্যতা, প্রতিভা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের মাধ্যমে একই সাথে নামাজের ইমামাত ও সমাজের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। বিশেষত ইসলামী জ্ঞান ও চরিত্র নিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

উপরোক্ত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাদান পদ্ধতিতে প্রচলিত মাদরাসা, স্কুল, কিন্ডার গার্ডেন ও ট্রেনিং কোর্সসমূহের সার্বিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় সাধন করা হবে এবং একই সাথে তা’লীম ও তরবিয়ত (শিক্ষা প্রশিক্ষণ)-এর মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেশের ভবিষ্যত সুনাগরিক, আদর্শ মানুষ ও সত্যিকার মুসলমান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

এজন্য প্রথম পদক্ষেপে দাখিল স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য যোগ্য নাগরিক ও খাঁটি মুসলমান হিসেবে আত্মনির্ভরশীল জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। পরবর্তীতে মেধাবী, প্রতিভাবান ও কৃতী ছাত্রদের জন্য মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুফতি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ইঞ্জিনিয়র ও ডাক্তার প্রভৃতি তৈরি করার লক্ষ্যে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার ব্যবস্থা করার আশা রয়েছে ইনশাআল্লাহ।

পরিশেষে আমি পুনরায় উল্লেখ করতে চাই যে, শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা প্রস্তাবের দ্বারা বর্তমান মাদরাসা শিক্ষার এসব সমস্যা ও জটিলতার সমাধান করা সম্ভব হবে না। এর জন্যে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, ক্রমাগত অনুশীলন ও বাস্তব ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে হবে। তাই আমাদের এই মাদরাসায় আপনাদের পরামর্শ, সহযোগিতা ও দোয়া একান্তভাবে কামনা করি। আল্লাহ পাক আমাদেরকে মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছার তওফিক দান করুন। আমীন।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *