আঁরো পোয়াওয়ার হনো দোষ নওয়াছিল

আমার বাবা চাকরি করতেন তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে। চট্টগ্রাম বন্দরে। বাবার টেবিলে কোনো ফোন থাকত না। তিনি অনেক ছোট ছিলেন। ফোন পাওয়ার অধিকারী না। ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজ থেকে আব্বাকে ফোন করেছে। গার্ডিয়ানের কাছে। আমার গার্ডিয়ান আমার পিতা। উনার উপরস্থ কর্মকর্তা যেটির সুপারিন্টেডেন্ট আজম সাহেব। তার নিকট ফোন করেছে। আজম সাহেবকে বলল, হাফিজ সাহেবকে ডেকে দেন। তখন আজম সাহেব থেকে (পদবীতে) অনেক ছোট আমার বাবা হাফিজ সাহেব। হাফিজ সাহেবকে ডাকার পর আজম সাহেব বলল,

হাফিজ সাহেব! বড়া খোশ খবরে, বড়া খোশ খবরে?

আব্বা বললেন, –স্যার কিয়া হোয়া? মুজে পাতা নেহি!

বাত করো বাত করো।

তখন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের শিক্ষকের সাথে টেলিফোনে কথা বললেন আমার আব্বা। শিক্ষক বললেন, রেজাল্ট আমাদের হাতে এসেছে। পত্রিকায় ছাপা হবে রাত্রে। পড়বেন কাল সকালে। আপনার ছেলে ইবরাহিম কুমিল্লা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। আমার আব্বা আনন্দে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন। ফোনটা তার হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল নিচে।

আব্বা বলেন, আমার বিশ্বাস হয় না। আল্লাহ্ আমাকে এতো বড় একটা নেয়ামত দেবে? এটা আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না! বাবা অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চলে আসলেন চট্টগ্রাম বন্দর পোর্ট কলোনীর ১০নং রোডে ২৮৬ নং বাসায়। যেখানে আমি বড় হয়েছি। আব্বা সেখানে আসলেন। এসে আমাকে বললেন,

ইবরাহিম! তুই বলে পরীক্ষায় ফাস্ট অইয়ো? আঁরে ফোন গরি খইল। আঁতুন বিশ্বাস নঅর, আঁই হুজুরর হাছে যাইয়ুম।

অর্থাৎ: ইবরাহিম তুমি ফাস্ট হয়েছ। আমাকে কলেজ থেকে বলেছে। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, আমি হুজুরের কাছে যাবো।

আব্বা আমাকে রেডি হতে বললেন। আমি প্যান্ট শার্ট পড়ে নিলাম। আব্বা আমাকে নিয়ে একটি বেবি টেক্সি করে চলে আসেন মাদার বাড়ি।

হুজুরের কাছে আসলেন। হযরত মীর মোহাম্মদ আখতর হুজুর রহ.। আমি একটা বাচ্চা ছেলে ১৮ বছর বয়স। আমি দরবারের আদব জানি না। কিছুই জানি না। তিনি আমাকে দেখে মুচকি হাসলেন। আব্বাকে বললেন, ‘বেটাকো বেটনি দো।’ আমি বসলাম। আব্বা চোখের পানি ফেলে আর বলছেন,

হুজুর, কলেজ থেকে বলছে যে আমার ছেলে ফার্স্ট হয়েছে এইচ.এস.সি-তে বোর্ড পরীক্ষায়। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আপনিই জানেন আমাকে বলেন।

হুজুর হেসে বললেন, মনে হচ্ছে তুমি অনেক উদ্বিগ্ন। তুমি আমাকে বল তোমার কি হয়েছে? আমি তোমার বাবা। আমি তোমার পাশে দাঁড়াতে পারলে দাঁড়াবো। কিন্তু তুমি আমাকে বল।

তখন আমি উনাকে বলেছি- যে আব্বা, এই এই পরিস্থিতি। তিনি বললেন, তোমাকে আমি এক্ষুনি আমার হুজুর কেবলার সাথে মিলিয়ে দিচ্ছি টেলিফোনে। তুমি হুজুরকে বল।

আব্বা আমাকে মিলিয়ে দিলেন হযরত মাওলানা শাহ্সফী আবদুল জব্বার রহ. এর সাথে। তিনি আমাকে পুত্রের মতো স্নেহ করতেন।

আমি হুজুরকে বললাম, এই এই পরিস্থিতি! তিনি বললেন,

– আপনার সঙ্কট কিংবা সমস্যাটা কোথায়?

আমি বললাম,

– আমার কলম দিয়ে, আমার জবান দিয়ে, এমন কোনো আদেশ যেন বাহির না হয় যেটা সৈন্যদের জন্য ক্ষতিকারক, বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। মহান আল্লাহ্ যেন আমার জবানকে এবং কলমকে হেফাজত করেন। কারণ- আমার কলমের আদেশে এবং আমার জবানের আদেশে মহাবিপর্যয় ঘটে যেতে পারে অথবা শান্তি থাকতে পারে। আপনার কাছে দোআ চাই, আল্লাহ্ যেন আমার পাশে থাকেন। আল্লাহ্ যেন আমাকে দয়া করেন।

বায়তুশ শরফের পীর সাহেব কেবলা হযরত মাওলানা আবদুল জব্বার রহ. টেলিফোনে মেজর জেনারেল ইবরাহিমকে বলেছিলেন,

আমি দোআ করছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন। আপনি অস্থির হবেন না।

আমি আর অস্থির হই নাই। যে সকল জেনারেল ঐ বিপর্যয় পরিস্থিতিতে ছিল, আমি সবার থেকে উন্নত, সবার থেকে বেশি সম্মান নিয়ে অবসরে আসছি। অবসরে তো আসতেই হতো। আমি অবসরে আসছি সম্মানের সঙ্গে। ইজ্জতের সঙ্গে। প্রশংসার সঙ্গে।

এখন আমার চাকরি চলে গেল। বাধ্যতামূলকভাবে অবসর পেলাম। আমি ওমরাহ্ করার জন্য সৌদি আরবে গিয়েছি। এয়ারপোর্টে আমাকে অবসর আদেশ ধরিয়ে দিল। আমি পড়ি নাই। কাগজটি না পড়ে পকেটে নিলাম। বলেছি শুকর আলহামদুল্লিাহ।

সেখান থেকে ফেরত আসলাম। ঢাকায় একদিন ছিলাম। পরের দিন চট্টগ্রামে আসলাম। আমার বাবার সাথে দেখা করতে এবং বায়তুশ শরফে আসতে।

হুজুর আমার কথা শুনে আমাকে দেখে কোনো কথা বলেননি। স্থির চিত্তে তাকিয়ে ছিলেন আর শুনলেন। আমার কথা শুনে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন। কিছুই বললেন না।

তরুণ সম্প্রদায়। আপনারা আমার বর্ণনাটা বুঝতে পারছেন?

তিনি বায়তুশ শরফের মসজিদ এর সামনে হুজরাখানার ২য় তলায় থাকতেন। আমি সেখানে গিয়ে হুজুরকে বলেছি।

আমার মনের মধ্যে একটি চিন্তা। একটা প্রশ্ন। আমাকে যে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর দেওয়া হয়েছে। আমি কি দোষী? না আমি নিদোর্ষ? আমার উপর কি অন্যায় হয়েছে? আমি এর উত্তর চাই।

আমি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল। আল্লাহ্র কাছ থেকে উত্তর চাচ্ছি! হে আল্লাহ্! আমার চাকরি যে বাধ্যতামূলক চলে গেল। আমি তো শুকর আলহামদুল্লিাহ বলেছি। কারণ- সবই তো আপনার হুকুম। কিন্তু আমার চাকরি বৈধভাবে গেল? নাকি আমি নির্দোষ ব্যক্তির উপর অত্যাচার করা হল? এ উত্তরটি আমি জানতে চাই?

এ কথা আমাকে তো কেউ এসে জানাবে না? আল্লাহর কোনো ফেরেশতা এসে জানাবে না। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আমাকে স্বপ্নেও জানাবে না। তাহলে আমি কেমনে জানবো?

আপনারা এবার শুনুন আমি কেমনে জানলাম। আমি বায়তুশ শরফে আসা যাওয়া করি। মনের মধ্যে আমার প্রশ্নটা রয়েছে। যে হুজুর আমার কথা শুনে কিছুই বলেন নাই। নিশ্চয়ই তিনি কোনো না কোনো একদিন বলবেন। এই একিন নিয়ে আমি যতবার আসি ততবার হুজুরের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকি যে, তিনি কিছু বলেন কিনা।

আমার চাকরি চলে যাওয়ার ১বছর ৭-৮ মাস পর হুজরাখানা দু’তলায় ৫-৬ জন লোকের সাথে আবার বসেছিলাম। তিনি দু’তলার বারান্দায় বসেছিলেন চেয়ারে। আমরা সামনে বসেছিলাম ফ্লোরে। তিনি কিছু একটা বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বক্তব্যের মাঝে হঠাৎ বলে ফেললেন,

“ছনা অওয়া, আঁরো পোয়াওয়ার চরি উদাউদি গেইয়্যেদি ন! একবেরে উদাউদি, আঁরো পোয়াওয়ার হনো দোষ নওয়াছিল।”

আমার অন্তর ফেটে কান্না আসছিলো। আমি এখনো কাদঁছি। আমার হুজুর আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আমি সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহ্র কাছে সেজদা করেছি। আমি এখন খুশি আল্লাহ্, শুকর আলহামদুল্লিাহ্।

আপনাদের নিকট এ বর্ণনা করার উদ্দেশ্য আধ্যাত্মিক জগত। কঠিন জগত। আধ্যাত্মিক জগতে আছাড় খেয়ে যদি পড়ে যায় কেউ, উঠে দাঁড়ানো মুশকিল। আধ্যাত্মিক জগতের প্রথম শর্ত হচ্ছে- আদব। আদব। আদব।


মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

বিশিষ্ট বাগ্মী, বহু গ্রন্থ প্রণেতা ও রাষ্ট্রচিন্তক।

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *