নিজেদের মধ্যকার অহংবোধ এবং জালেম ও ইসলামের দুশমনদের প্ররোচনায় আজ মুসলমানগণ বিশেষত আলেম সমাজের মধ্যে কোন্দল ও ফেরকা পীর সাহেবকে বিশেষভাবে ব্যথিত করেছিল। আলোচনার টেবিলে বসিয়ে উম্মাহ্র মধ্যে ইত্তেহাদ বা ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি উদ্যোগী হয়ে গঠন করেছিলেন “ইত্তেহাদুল উম্মাহ বাংলাদেশ” ও “মজলিসুল ওলামা বাংলাদেশ”। উম্মাহ্র মধ্যকার ঐক্য সুসংহত করণের পাশাপাশি তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সেবামূলক কর্মের প্রক্রিয়ায় ইসলামের প্রচারে আজ দেশব্যাপী সফলভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে, “বায়তুশ শরফ আন্জুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ” এর বহুমুখী সেবামূলক কর্মকাণ্ড। সমকালীন সমাজে একজন ব্যতিক্রমধর্মী পীর ও ইসলামের মহান সাধক এবং আমলে ছালেহ এর মাধ্যমে পার্থিব জীবনে সফলকাম বা ছোয়ালিহীন মাওলানা আবদুল জব্বার সাহেব রহ. ২৫শে মার্চ ১৯৯৮ ইংরেজি মাত্র ৬৫ বৎসর বয়সে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহে…… রাজেউন)।
করুণাময়ের কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। পরদিন চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত তাঁর জানাযায় চট্টগ্রামের ইতিহাসে স্মরণাতীতকালের বৃহত্তম জনসমাবেশ তাঁর সফল কর্ম সাধনার যথার্থ বহিঃপ্রকাশ। এ জাতীয় সার্থক সাধক ও আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্তদের অনুগামী করার জন্যই আমরা প্রতিদিন সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে থাকি।
বায়তুশ শরফের পীর হযরত মাওলানা আবদুল জব্বার সাহেব রহ.-এর আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইসলাম প্রচারে ব্যতিক্রমধর্মী কর্মকাণ্ডের একটি বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত “বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান।” ইসলামের উপর মৌলিক গবেষণা, প্রকাশনা ও একাডেমিক সেমিনারের মাধ্যমে তিনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণিকে বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের একত্রিত করে আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইসলামের বিভিন্ন দিকের উপর সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন।
তিনি বলতেন, ইসলামের ধর্মীয় বিধানাবলী পালনের পাশাপাশি, ইসলাম বিরোধী তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম নবী-রাসূলদের সময়কাল থেকে অব্যাহত ইসলামী জীবন সাধনার একটি অত্যাবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য।
ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ্র প্রতিরক্ষার জন্য তিনি আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল উদ্ভাবনের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করতেন। তিনি বলতেন, তলোয়ার দিয়ে জিহাদের দিন আর নেই। যুগ ও প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটেছে। অতএব, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এর সুন্নাত ভেবে শুধু তলোয়ার নিয়ে বসে থাকলে আজকের দিনের মুসলমানদের আর চলবে না। আণবিক যুগে আণবিক শক্তিকে মোকাবেলা করতে হবে আণবিক শক্তি দিয়ে। ১৯৯২-৯৩ সনে ইউরোপের বুকে বিশ্বের আণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের মৌন সম্মতি ও নিষ্ক্রিয়তার সুবাদে বসনিয়ায় নির্বিবাদে মুসলিম নিধনের বিরুদ্ধে সেমিনার ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছিল তাঁরই উদ্যোগে বায়তুশ শরফে। রোহিঙ্গা সমস্যা ও আরাকানে মুসলিম নিধনের বিরুদ্ধেও সেমিনার এবং প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছিল বায়তুশ শরফ প্রাঙ্গণে।
পীর ছাহেব হুজুর রহ. বলতেন, লেখনী ও প্রচার মাধ্যম হচ্ছে আজ ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত বড় অস্ত্র। অতএব, ইসলামের স্বার্থে সকল ইসলামপন্থীকে আজ এই অস্ত্রের ব্যবহারে নিপুণতা অর্জন করতে হবে। তিনি বলতেন, ধর্মীয় আলেমগণ আজ সমাজে শক্তিহীন। তবে মানুষ এখনও তাদেরকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। আজ সমাজে শক্তিধর গ্রুপ হচ্ছে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণি। বিশ্বের মুসলিম দেশসমূহ তারাই শাসন করছে। যুগোপযোগী জ্ঞানই হচ্ছে সমাজের শক্তি। তিনি শব্দের দ্যোতনা সৃষ্টি করে প্রায়শ বলতেন-
“আলেম সমাজের ভক্তি ও ইংরেজি শিক্ষিতদের শক্তি, এই দুইয়ের মধ্যে হয় যদি চুক্তি, তবেই আসবে উম্মাহ্র মুক্তি।”
একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ বাদে অন্যান্য আধুনিক বিষয়সমূহ যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি, লোক প্রশাসন, ইংরেজি, ব্যবস্থাপনা বা বিজ্ঞান অনুষদের বিভিন্ন বিষয়ে মাদ্রাসা থেকে পাশ করে যারা ভর্তি হবার সুযোগ লাভ করে, তাদের অধিকাংশই বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসার ছাত্র। এটা এই প্রতিষ্ঠানের উন্নত শিক্ষা পদ্ধতির প্রতিফলন বলা যায়।
-প্রফেসর ড. আবদুন নূর
লোক প্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Leave a Reply