ড. আবদুল করিমকে যথাযথ সম্মান ও সম্মানী দিতে কুণ্ঠিত হননি

মরহুম আবদুল জব্বার শাহ সাহেব সম্পর্কে এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। তাঁর জীবনী প্রকাশিত হয়েছে। সারা দেশে বায়তুশ শরফ মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, হেফজখানাসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করে তিনি জাতিকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এ দেশে ইসলামী শিক্ষা, ইসলামী সমাজ ও ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় মরহুম আবদুল জব্বার সাহেবের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে; এটা আমার বিশ্বাস।

ড. আবদুল করিম যখন সামরিক আইনের নির্যাতনের শিকার হয়ে কিছুটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন তখন তার কাছে যিনি রহমতের হাত সম্প্রসারিত করে দিলেন তিনি হলেন বায়তুশ শরফের মরহুম পীর সাহেব হযরত আবদুল জব্বার সাহেব রহ.। তিনি তার গভীর অনুভূতি দিয়ে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ইতিহাসবিদ আবদুল করিমকে দিয়ে তিনি বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন। ড. আবদুল করিমের কাছে এ প্রস্তাব দেয়া হলে প্রথমে তিনি ইতঃস্তুত করেন।

কারণ ইতঃপূর্বে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে তিনি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, গবেষণা ও প্রশাসনের সাথে জড়িত ছিলেন। এর বাইরে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হয়ে গবেষণাকাজ পরিচালনা করেছেন। প্রস্তাবিত মসজিদ-মাদরাসাভিত্তিক পীর-মাশায়েখের পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো কাজ কোনোদিন করেননি। তাই শত ইতঃস্ততার মাঝেও কঠিন বাস্তবতার মাঝে শায়েখের অনুরোধে তিনি বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা কেন্দ্রের মহাপরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। মরহুম শায়েখ আবদুল জব্বার সাহেব ড. আবদুল করিমকে যথাযথ সম্মান ও সম্মানী দিতে কুণ্ঠিত হননি।

মরহুম শায়েখ আবদুল জব্বার সাহেব থেকে তিনি বহু শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তিনি তাঁর হাতে বায়াত হননি; এমন কথা কখনো আমাকে বলেননি। একদিন তিনি আমাকে মরহুম শায়েখের শিক্ষা সম্পর্কিত একটি ঘটনা বলেছিলেন।

ঘটনাটা হলো, তিনি শায়েখকে বললেন, ‘হুজুর’ আমি বহু লোকের উপকার করেছি। যাদের উপকার করেছি তারা সবাই আমার কোনো না কোনো অপকার করেছে। যাদের বেশি উপকার করেছি তারা বেশি অপকার করেছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি ভবিষ্যৎ জীবনে আর মানুষের উপকার করব না। যাতে করে মানুষের অপকারের শিকার হতে না হয়। আপনি কী বলেন? শায়েখ তখন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সহজ সরল কণ্ঠে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন, আয়াতটি হলো, ‘হাল জাযাউল ইহসানি ইল্লাল ইহসান’ (সূরা আর রাহমানের আয়াত) অর্থাৎ, যদি কেউ মানুষের কল্যাণ করে তার বদলা হিসেবে সে কল্যাণ লাভ করবে। ড. আবদুল করিম আরবি-ফার্সি ভালো জানতেন। ফলে শায়েখের তিলাওয়াতকৃত আয়াতের মর্মার্থ বুঝতে তিনি খুবই সক্ষম ছিলেন। তখন সাথে সাথে তিনি তার পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং অবশিষ্ট জীবন মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার প্রত্যয় গ্রহণ করেন।


ড. মোহাম্মদ মুহিবউল্যা ছিদ্দিকী

প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *