জ্ঞানই সর্বোত্তম সম্পদ

দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার অন্তর্গত বড় হাতিয়া ইউনিয়নের আখতারাবাদ বায়তুশ শরফ সিলসিলার বার্ষিক বৃহত্তম সামবেশ ছিল ঈসালে সওয়াব মাহফিল ৩০ জানুয়ারি ১৯৯৩। পরদিন ৩১ জানুয়ারি একই স্থানে ওলামা সম্মেলনে হুযুর কেবলার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য অবলম্বনে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক প্রফেসর ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান নিজস্ব প্রকাশ ভঙ্গিতে এ ভাষণটি বিন্যস্ত করেন। -সম্পাদক

মানুষের জন্য জ্ঞানই সর্বোত্তম সম্পদ। বিশ্বজগতের সর্বোত্তম সৃষ্টি হিসেবে মানব-জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য স্রষ্টাকে জানার মধ্যেই নিহিত। স্রষ্টার জ্ঞানকে মারিফাত বলা হয়। কিন্তু মহান স্রষ্টা রব্বুল আলামীনের জাত বা সত্তা অসীম! তদ্রূপ মারিফাতের জ্ঞানও সীমাহীন। কিন্তু চিন্তা, ধারণা ও সাধ্য সসীম। অতএব মানব-জাতির মহান শিক্ষক, নবীকুল শিরোমণি, হযরত মুহাম্মদ ইরশাদ করেন,

تَفَكَّرُوا فِي آلَاءِ اللَّهِ، وَلَا تَتَفَكَّرُوْا فِي اللَّه».

‘আল্লাহ সত্তা সম্পর্কে চিন্তা করো না, আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শনসমূহ অনুধাবন করো।”

অর্থাৎ সৃষ্টির নিদর্শন মূলে স্রষ্টাকে জানতে চেষ্টা করো। স্রষ্টার সত্তা মূলে সৃষ্টবস্তুকে জানার প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাক। কেননা মানুষের জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া বিশেষ্য থেকে বিশেষণের দিকে পরিচালিত হয় না। আমরা একজন রাজমিস্ত্রী দেখে দালানের মাহাত্ম্য বিচার করি না, বরং দালানের সৃষ্টি নৈপূণ্য বা দালান তৈরির কলাকৌশল দেখে রাজমিস্ত্রীর দক্ষতা নিরূপণ করি। তাই কর্মমূলে কর্তাকে এবং সৃষ্টিমূলে স্রষ্টাকে জানাই মানব-জীবনের পরম লক্ষ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আল্লাহ যেমন অসীম, তেমনি আল্লাহর কুদরত ও সৃষ্টি-কৌশল অন্তহীন। এজন্য আল্লাহর সৃষ্টি কৌশল ও নিদর্শন যতটুকু জানা যায়, তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা এবং অল্প অল্প জানার ভিত্তিতে মানুষের জ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়ার পন্থা অবলম্বন করা বিজ্ঞজনোচিত। কেননা طَلَبُ الْكُلِّ فَوْتُ الْكُلِّ (সমন্তের অন্বেষায় মানুষ সর্বহারা হয়)।

সৃষ্টির নিদর্শন স্রষ্টার وحدانية বা ওয়াহদানিয়ত একত্ববাদকে সূচিত করে।

কেননা বিশ্বজগতে একাধিক স্রষ্টা ও পরিচালকের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকলে নিজ নিজ সৃষ্টবস্তুর পরিচালনায় ও গতিপথ নির্ধারণ তাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও শক্তির সংঘাত দেখা দিত। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, তারা, মাটি, পানি, পাহাড়-পর্বত, জোয়ার-ভাটা ইত্যাদির পৃথক পৃথক স্রষ্টাও পরিচালক বিদ্যমান থাকলে এমনকি নূন্যপক্ষে দুইজন স্রষ্টা থাকলেও বিশ্বজগতের গতিধারায় বৈপরীত্য, দ্বি-কেন্দ্রমুখিতা বহু থাকলেও দেখা দিত। কেননা তাতে একাধিক কর্তার ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলন ঘটাতো। তাহলে বিশ্বজগতের সুসামঞ্জস্য, একমুখিতা ও অনাবিল শৃঙ্খলা ব্যাহত হত।

বিশ্বজগতের কোনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দুতেও যদি শৃঙ্খলাভঙ্গ হয়, তাতে পরমাণুর স্তর থেকে বিশালকায় গ্রহ নক্ষত্রের প্রচণ্ড বেগে ঘূর্ণনশীল ও সজোরে ধাবমান গতিশীলতায় অবশ্যই সংঘর্ষের সূচনা হত এবং বেসামাল ঘাত-প্রতিঘাত ও বিস্ফোরণের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ব ধ্বংসপ্রাপ্ত হত। তাই বিশ্বজগতের কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা মহান স্রষ্টার বিশ্বয়কর সৃষ্টি নৈপূণ্য ও এককত্বের সাক্ষ্য বহন করে। আল্লাহ এক, অদ্বিতীয় বিশ্বজগতের একক স্রষ্টা। উদাহরণ-স্বরূপ মানুষের নিশ্বাসের উপাদান অক্সিজেন বায়ু ঘাস-পাতাই প্রস্তুত করে এবং ঘাস-পাতা ও গাছপালার খাদ্যের বিশেষ উপাদান কার্বো হাইড্রেড বায়ু, মানুষ ও প্রাণীকুল তৈরি করে।

এককথায়, গাছ-পালার নিঃশ্বাস সেবন করে মানুষ ও পশু-পাখি জীবন ধারণ করে এবং মানুষ ও প্রাণীকুলের নিঃশ্বাস গ্রহণ করে গাছ-পালা বাঁচে। মানুষ ও ঘাস-পাতার স্রষ্টা ও প্রতিপালক যদি আলাদা হত অথবা একাধিক হত, তবে এ বিশাল ভূবনে এগুলো পরষ্পরের চাহিদা পূরণ করার জন্য অহরহ কর্মতৎপরতা চালিয়ে যেতে পারত না। ফলে গাছ-পালা, পশু-পাখি সবাই মারা পড়তো। তাই সৃষ্টিজগতের একমুখী গতিধারা ও কর্মতৎপরতা একক স্রষ্টা ও প্রতিপালকের অস্তিত্বের বাস্তব সাক্ষ্য প্রদান করে।
আমরা যেমন একখানা টেবিল দেখে এর পেছনে কাঠ মিস্ত্রির অস্তিত্ব ও অবস্থান উপলব্ধি করি, তেমনি একটি বর্ধিষ্ণু বৃক্ষ দেখে এর পেছনে স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর অস্তিত্ব ও বাস্তব অবস্থানের বিষয় উপলব্ধি করি এবং সমগ্র বিশ্বচরাচরের একমুখীন গতিধারা ও শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ করে একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর অস্তিত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হই। এটিই হযরত ইবরাহীম-এর পর্যবেক্ষণিক গবেষণা ও জ্ঞান উপলব্ধির মূল বিষয় ছিল। তিনি গ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র, সূর্য পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলেন যে, এগুলোর পেছনে থেকে মহান স্রষ্টা ও প্রতিপালক প্রভু, আল্লাহই বিশ্বজগৎ পরিচালনা করছেন। নাম ‘ঈমান বিল-গায়েব’ বা গায়বী প্রত্যয়।

অতএব আল্লাহর এককত্বের বা ওয়াহদানিয়তের জ্ঞানই প্রকৃষ্ট জ্ঞান।

কিন্তু আল্লাহর এককত্ব সমস্ত সৃষ্টিকুলকে পরিবেষ্টন করে আছে, মানুষের জ্ঞান ও চিন্তা শক্তি যা নির্ণয় করতে একান্তই অক্ষম, তাতে আল্লাহর অফুরন্ত ক্ষমতা ও হিকমত সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এ গুলির মাধ্যমে আল্লাহর ছিফাত বা গুণাবলি প্রকাশ পায়। এ গুণাবলি থেকে এককত্বের জ্ঞানে উপণীত হয়ে আমরা আল্লাহর সত্তার সান্নিধ্যে আসি, যা অনন্ত-অসীম।

তুমি যখন এককত্বের অসীম সমুদ্রের তীরপ্রান্তে উপনীত হও, তখন তীরে দাঁড়িয়ে অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ কর। আল্লাহর এককত্বের মহাসমুদ্রে ডুব দিতে চেষ্টা করবে না। কেননা সেখানে যে ডুব দেয় সে আর ফিরে আসতে পারে না। এজন্য নবী করীম ইরশাদ করেছেন,

تَفَكَّرُوا فِي آلَاءِ اللَّهُ، وَلَا تَتَفَكَّرُوْا فِي الله».

‘তোমরা আল্লাহর যাতের অর্থাৎ সত্তার, এককত্ব সম্পর্কে চিন্তা করো না। কেননা আল্লাহ জাত বা সত্তা অসীম, সীমাহীন সমুদ্র। বরং তোমরা আল্লাহ সিফাত বা গুণাবলি সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা কর।”

কেননা আল্লাহ মানুষকে ধারণামূলক জ্ঞানের সামর্থ প্রদান করেছেন, যা ইসিম বা গুণাবলি অনুধাবন করতে পারে এবং অনুরূপভাবে আল্লাহর সীমাহীন গুণাবলি বা সিফাত থেকে শ’খানেক গুণাবলি আল্লাহ মানুষের নিকট প্রকাশ করেছেন। যেমন- রহমান, রহীম, মালিক, কদীর, আলীম অর্থাৎ করুণাময়, দয়ালু, বিচারকর্তা, সর্বক্ষমতাবান, সর্বজ্ঞ ইত্যাদি। যেগুলো আল্লাহ নিরান্নব্বই নামরূপে প্রসিদ্ধ। মানুষ তার সীমিত দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর একেকটি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে, কিন্তু তাতেও প্রত্যেকটি গুণের আদি-অন্ত চিন্তা করতে মানুষ অক্ষম। কেননা আল্লাহ অসীম ও আল্লাহর প্রত্যেকটি গুণও অসীম: আল্লাহর করুণা ও দয়ার, ক্ষমতা ও শক্তির জ্ঞান ও গরিমার কোনো সীমা নেই।

অন্যদিকে আল্লাহর সমস্ত গুণ মানুষের নিকট প্রকাশিত হয় না। আল্লাহর একান্ত গুণাবলি আসরার বা রহস্য নামে পরিচিত, যেগুলোর কিছু কিছু ছিটে-ফোটা মানুষের কাশফ বা অন্তর্দৃষ্টির আলোকে প্রতিভাত হয়। তাই আল্লাহর আসরার বা রহস্যময় গুণাবলির ছিটে-ফোটা জ্ঞান মানুষ প্রাপ্ত হলে তা তার জন্য অফুরন্ত নিয়ামত ও অমূল্য সম্পদে পরিণত হয় এবং তার সম্মুখে আল্লাহ হিকমত হিসেবে দেখা দেয়। এ ধরনের ছিটে-ফোটা হিকমতকে বিপুল সম্পদ তথা খাইরান কসীরা বলে পবিত্র কুরআন মজীদে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِي خَيْرًا كَثِيرًا

‘যাকে হিকমত দেওয়া হয়েছে তাকে অফুরন্ত কল্যাণ দান করা হয়েছে।”

তা ছাড়া সীমিত শক্তি ও ক্ষমতায়, মানুষ একমুহূর্তে একসাথে একটি বিন্দুমাত্র দর্শন করে, একটি সামান্য বিষয়ের অধিক চিন্তা করতে পারে না। সে যখন দ্বিতীয় একটি জিনিস দেখে বা চিন্তা করে তখন তার দৃষ্টি ও চিন্তা থেকে প্রথম জিনিসটি বেরিয়ে যায় এবং তা কেবলমাত্র তার স্মরণশক্তিতে অবস্থান করে। তাই তার চোখ দিয়ে বুক দেখে এবং স্মরণপটে পিঠ অনুভব করে, ‘দেখা ও স্মরণযোগে সে বুকে পিঠে’ একটি জিনিসের জ্ঞান উপলব্ধি করে।

অতএব এ ধরনের সীমিত শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে একসাথে আল্লাহর সমস্ত গুণ অনুধাবন করতে যাওয়া নেহায়ত বোকামি বৈ আর কিছুই নয়।

অতএব আল্লাহ গুণাবলির জ্ঞান থেকে যৎসামান্য জ্ঞান পাওয়া যায় তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা এবং তা বর্ধিত করতে বিরামহীন চেষ্টা করাই মানুষের জন্য বিধেয়। এমনকি নবীকুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মদ-কে পবিত্র কুরআন মজীদে আল্লাহ রব্বুল আলামীন শিক্ষা প্রদান করেছেন, رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا )হে আমার প্রতিপালক প্রভু! আমাকে জ্ঞানে বর্ধিত কর, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও) বলে প্রার্থনা করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। জ্ঞান সম্পর্কে ইসলামের প্রথম যুগের একজন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ হযরত হাসান আল-বসরী বলেছেন,

الْعِلْمُ عِلْمَانِ: – أَمَّا فِي الْجَنَانِ وَأَمَّا عَلَى النِّسَانِ – وَالْعِلْمُ عَلَى النِّسَانِ حُجَّةٌ عَلَى بَنِي آدَمَ، وَالْعِلْمُ فِي الْجَنَانِ فَذَلِكَ».

‘জ্ঞান দুই প্রকার। যথা- অন্তরে ও জিহ্বায়। জিহ্বায় বা মুখের জ্ঞান মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য বহন করে, অন্তরের জ্ঞান উপকারী জ্ঞান।১

কেননা জিহ্বা বা মুখ দিয়ে যেসব জ্ঞান কথার আকারে প্রকাশ পায় তা শেষবিচারের দিনে হাশরের ময়দানে মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়াবে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তুমি যা বলেছিলে তা করেছিলে কিনা, তোমার উদ্দেশ্য কি ছিল এবং তোমার কথার ফলে কি সৌহার্দ বেড়ে ছিল না বিদ্বেষ বর্ধিত হয়েছিল? কল্যাণ অথবা অকল্যাণ সাধিত হয়েছিল এবং মানুষের অন্তরের জ্ঞান, যা অন্তরকে আলোকিত করে, অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেয়, প্রকাশ্য জ্ঞানের সাথে আল্লাহর রহস্যময় অদৃশ্য কল্যাণ, মহব্বত, সৌন্দর্য, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানের সংযোগ সাধন করে, তা মানুষের জীবনকে মহিমাময় করে তোলে, তাই উপকারী জ্ঞান। এজন্য নবী করীম আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন,

«اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَّا يَنْفَعُ».

‘হে আমার প্রতিপালক প্রভু! আমি আপনার নিকট সেই জ্ঞান থেকে আশ্রয় ভিক্ষা করি যা কোনো উপকারে আসে না।’২

সে জন্য আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করছেন,

وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَى

‘তুমি সেসব লোকের চলার পথের অনুসরণ করো যারা আমার দিকে ধাবিত হয়।

অর্থাৎ তুমি এমন পথের অনুসন্ধান করো এবং এমন ইমামের ইকতিদা করো, যিনি আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল-এর দিকে তোমাকে নিয়ে যেতে পারেন। এদিক থেকে মানুষ সবাই মুকতদী এবং প্রত্যেকে আবার একেকজন ইমামের অনুসারী এবং সব ইমামের ইমাম হলেন আল্লাহর নবী যিনি মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছায়ে দেন। এ ধরনের পথের এবং এ ধরনের জ্ঞানের অনুসন্ধান করা মানুষের জন্য বাঞ্ছনীয়। জ্ঞান অবশ্যই কল্পনা নয়।

পবিত্র কুরআন মজীদে আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,

اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ

‘তোমরা ধারণা ও কল্পনাপ্রসূত জ্ঞান থেকে বিরত থাক, অবশ্যই কোনো কোনো কল্পনা পাপের শামিল।”

পীর-মাশায়েখদের উপদেশ হল তুমি দিব্য জ্ঞানে উদ্ভাসিত হয়ে তোমার নিয়তকে খালিস অর্থাৎ উদ্দেশ্যকে বিশুদ্ধ করো এবং আমলকে দোরস্ত অর্থাৎ কর্মকে নিখুঁত করো। হযরত কেবলা শায়খ মুহাম্মদ আখতার বলেছেন, তোমরা মুরিদ হতে চাও বা শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে চাও তো প্রথমে اعتقاد واعتماد

(ইখতিয়ার কর অর্থাৎ প্রত্যয় ও নির্ভরশীলতা অবলম্বন করো)। পীরের প্রতি

ভক্তিপূর্ণ দৃষ্টিতে দৃঢ় বিশ্বাস এবং সর্ববিধ ব্যাপারে নির্ভরশীলতার নীতি ধারণ করো এবং মুরিদ হওয়ার পর طلاع واتباع। অর্থাৎ জ্ঞাত করা ও অনুসরণ করার পন্থা অবলম্বন কর। তোমার শরীরে ও অন্তরে যা কিছু জাগরিত হয় আর তোমার পারিপার্শ্বিক অবস্থায় যা কিছু ঘটে প্রয়োজনবোধে তা পীরের খেদমতে আরজ করো, তাঁকে অবহিত করো এবং তাঁর আদেশ, উপদেশ ও নির্দেশ বিনা দ্বিধায় অনুসরণ করো। তিনি ধর্মকে একটি মহান ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করতেন। তিনি বলতেন,

الْإِسْتِقَامَةُ فِي الدِّيْنِ شَيْءٌ عَظِيمٌ.

‘ধর্মে অটল থাকা একটি মহান ব্যাপার।’

ধর্ম একটি মহৎ পন্থা। ধর্ম বাবিতণ্ডের বস্তু নয়। না-হক বা অন্যায় ধর্মের অঙ্গ নয়। অতএব হক-নাহক পরখ করা ধর্মের শর্ত বটে, খোদ ধর্ম নয়। আর হক-নাহক পরখ করে নিয়েই ধর্ম গ্রহণ কর। অতএব ধর্মে সুপ্রতিষ্ঠিত থাক। কেননা ধর্মের উদ্দেশ্য হল ইবাদত বা আল্লাহর গোলামি করা, মান্য করা এবং সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা। এককথায় ধর্ম তর্কের বিষয় নয়, প্রতিষ্ঠার তথা استقامة-এর বস্তু। তিনি ধর্মের ওপর অটল থাকাকে

কারামতের ঊর্ধ্বে স্থান দিতেন এবং বলতেন, الْإِسْتِقَامَةُ فَوْقَ الْكَرَامَةِ.

‘ধর্মে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা অলৌকিকতার ঊর্ধ্বে।’

তিনি বলতেন, কিয়াম, ওরশ, ফাতিহা ইত্যাদি মুস্তাহাব বনাম বিদআতের বিষয় নিয়ে বাবিতণ্ডা করা ধর্মের জন্য মানানসই নয়। এ স্থলে তিনি ই’তিদাল অর্থাৎ মধ্যপন্থা অবলম্বন করতেন এবং বলতেন এ বিষয়ে কোনটা হক ও কোনটা না হকের প্রশ্ন নয়, বরং নাহকের বদলে হক ও আহকের বিবেচনা করাই শ্রেয়। কেননা (ক) যারা কুরআন ও হাদীসের নস বা প্রকাশ্য দলীল দ্বারা বিষয়বস্তুর বিবেচনা করেন, তারা অধিকতর ন্যায়বান, (খ) যারা ধর্মকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার উদ্দেশ্যে সুন্নত মোতাবেক সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কোনো কল্যাণকর কাজে মুসলমানকে একত্রিত করতে চান, তাদের পন্থা কল্যাণকর বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। কেননা আল্লাহ কর্মের থেকেও উদ্দেশ্যের প্রতি অধিকতর লক্ষ করেন। তিনি বলেন, النَّفْسُ يَطْلُبُ مِنْكَ الْكَرَامَةَ، وَاللَّهُ يَطْلُبُ مِنْكَ الْإِسْتِقَامَةَ.

‘মন বা নফস মানুষকে অলৌকিকতার দিকে প্রলুব্ধ করে, পক্ষান্তরে আল্লাহ মানুষের প্রতি ধর্মে অটলতা তলব করেন।’

হযরত কেবলা বলতেন, যারা বুঝেছে তারাই বুঝেছে অর্থাৎ যারা অটলতা বা ইস্তিকামত কর্মের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে, তারাই এর মর্ম বুঝেছে। আর যারা এর গভীরে যায়নি তারা বুঝতেও অক্ষম। অতএব অকীদার দৃঢ়তা ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে ইস্তিকামতের মর্ম অনুধাবন করা মানুষের প্রধান কর্তব্য।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *