সম্মিলিত যেকোনো মহৎ প্রয়াসে আল্লাহর রহমত অবশ্যম্ভাবী

১২ রবিউল আউয়াল ১৪১১ হিজরী বায়তুশ শরফের সম্মুখস্থ ঢাকা ট্রাংক রোডে আজুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ পোস্তার পাড়, সুপারিওয়ালাপাড়া, কদমতলী স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি ও মতিয়ারপুল এলাকাবাসীর উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী পবিত্র ঈদে-মিলাদুন্নবী-এর দ্বিতীয় দিবসে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বায়তুশ শরফের সম্মানিত পীর সাহেব কেবলা উপরোক্ত অভিমত ব্যক্ত করেন।-সম্পাদক

উল্লেখ্য যে, অন্যান্য বারের চেয়ে এবারের ঈদে মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ও ব্যাপক। দুই দিনব্যাপী এ আজিমুশশান মাহফিলের প্রথম দিন (১১ রবিউল আউয়াল) বিভিন্ন তামাদ্দুনিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ১২ রবিউল আউয়ালও অনুরূপ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় দিবসের অধিবেশনে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। বাদে আসর থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থান হতে নবীপ্রেমে মাতওয়ারা মুসলমানগণ মাহফিলে সমবেত হতে থাকেন। সমবেত সহস্র জনতার একান্ত আগ্রহের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মুহতারাম পীর সাহেব কেবলা বক্তব্যের সূচনাতেই ভক্তিভরা হৃদয়ে আবেগময় কণ্ঠে সালাতও সালাম পেশ করেন।

আল্লাহর কাছে শোকরিয়া জ্ঞাপনের পর উদ্যোক্তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, সম্মিলিতভাবে একমাত্র ঈমানি স্বার্থে যেকোনো প্রয়াসে আল্লাহর সাহায্যের হাত প্রসারিত থাকে। এ প্রসঙ্গে হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,

يَدُ اللهُ عَلَى الْجَمَاعَةِ».

‘জামায়াতাকারের মাহফিলে অথবা যেকোনো মহৎ কাজে আল্লাহর কুদরতী রহমতের হাত থাকে।

অন্য কারও মতে জামায়াতে আল্লাহ কবুলিয়াতের হাত থাকে বলে উল্লেখ করেছেন। এ হাদীসে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বলেন, পাড়ায়-মহল্লায় পৃথক পৃথকভাবে মাহফিলে মিলাদুন্নবী পালন করা হত, বর্তমানেও হয়। কিন্তু সম্মিলিত কাজে যদি আল্লাহর কবুলিয়তের হাত থাকে তাহলে আসুন আমরাও অভিন্ন উদ্দেশ্যে মিলাদুন্নবী পালন করি। যাতে অন্তত মাহফিলটা দেখে ঈমান তাজা হয়। আমার মনে হয় আজকের মাহফিল দেখলে যেকোনো মুসলমানের ঈমানি চেতনা বৃদ্ধি পাবে।

মহানবী-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে আরবের অরাজকতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত শোচনীয় ও নৈরাজ্যজনক। নৈতিকতাবোধের মারাত্মক অবক্ষয় এমন একপর্যায়ে উপনীত হয়েছিল যে, যত মানুষ ছিল না তার চেয়ে বেশি মূর্তি ছিল। সোজা কথায় রব্বুল আলামীনের মানব-সৃষ্টির মহৎ উদ্দেশ্য লোপ পেয়েছিল।

ইসলামের ইতিহাসের উদ্ধৃতি দিয়ে হুযুর কেবলা বলেন, পৃথিবীতে যখনই মানুষ খোদাহারা, ঈমানহারা হয়ে নাফরমানির পথে মাত্রাতিরিক্ত অগ্রসর হয় তখন নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে।

এ নাযুক অবস্থায় মা’সুম বেগোনাহ মাখলুকাত আল্লাহর কাছে রহমত ও সাহায্য প্রার্থনা করছিল এবং একজন নবীপ্রেরণের আবেদন করছিল। রহমানুর রহীম তাদের দোয়ার ফলশ্রুতি-স্বরূপ মহানবী-কে রহমাতুল লিল আলামীন হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,

سَبَقَتْ رَحْمَتِي عَلَى غَضَبِي».

‘গজবের ওপর আমার রহমত প্রাধান্য পেয়েছিল।”

আলোচনার একপর্যায়ে হুযুর কেবলা ঈমান তাজা করার লক্ষ্যে নবী করীম-এর তাৎপর্য এবং শান ও মান বর্ণনা করেন। এ প্রসঙ্গে আলোচনার পূর্বে উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীর মনোযোগ আকর্ষণ করে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেন এবং বলেন, ফযিলত ও ফতোয়া এক জিনিস নয়। দুটাই দুই মেরুতে অবস্থান করে। ফযিলত যেটা সেটা কিন্তু ফতোয়া নয়। সুতরাং আজকের (১২ রবিউল আউয়াল) আলোচ্য বিষয় ফযিলত। আলোচনা কেউ না বুঝে পরবর্তীতে সেটাকে সমালোচনার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ না করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ফতোয়ার দিক দিয়ে বারো মাসের মধ্যে রামাযান মাসই শ্রেষ্ঠ মাস। আর ফযিলতের দিক দিয়ে সইয়েদুনা ইউসুফ-এর অন্যান্য এগার ভাইয়ের ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব যেমন ভাস্বর তেমনি অন্যান্য এগার মাসের ওপর রবিউল আউয়াল মাসের শ্রেষ্ঠত্ব ও সুস্পষ্ট। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে চমৎকার যুক্তি প্রদর্শন করে একটি সহজ বোধগম্য উপমা দিয়ে তিনি বলেন, সাধারণত বড় বড় বিত্তশালীরা বিয়ে উপলক্ষে বরের সম্মানার্থে লক্ষ টাকার উপঢৌকন সামগ্রী প্রদান করেন। হুযুর এবার প্রশ্ন রাখেন অর্পিত সে উপহার সামগ্রী কখনও বরের চেয়ে মূল্যবান হতে পারে কি? উপস্থিত সহস্র জনতা সমন্বরে জবাব দিল, না। কারণ বরের সৌজন্যেই এ উপহার। সুতরাং কখনও বরের চেয়ে উপহার দামি হতে পারে না।

তদ্রূপ রব্বুল আলামীন, রহমাতুল লিল আলামীন, শফীউল মুযনিবীন, সাইয়েদুল মুরসালীন, আঁকায়ে মাওলা জনাবে মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ-কে বর বানিয়ে আল্লাহ দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। আর রহমত, বরকত ও মাগফেরাতপূর্ণ রামাযান বেহেশতের চাবি-স্বরূপ। মর্যাদাপূর্ণ নামাজ, এ অসীম সওয়াবের আধার হজ ও যাকাত তথা সমস্ত ইবাদতের যে ফযিলত আমরা পেয়েছি তা একমাত্র নবী-এর সম্মানার্থেই পেয়েছি। তাহলে সহজেই অনুমেয় যে, উপহারের চেয়ে যেমন বরের দাম বেশি তেমনি অফুরন্ত সওয়াবে ভরপুর রামাযান মাসের চেয়ে নবী তথা বর আগমনের মাসের দামও বেশি।

নবী করীম-এর প্রতি মহব্বত বৃদ্ধি ও ঈমান তাজা করার উদ্দেশ্যে বুযুর্গদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, জুমাবারের চেয়ে সোমবারের গুরুত্ব বেশি। কারণ নবী করীম-এর জন্ম, মি’রাজ, ওফাত তথা যেই সবকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা সেগুলো সোমবারেই ঘটেছে। তিনি যে সময়ে যে দিনে আগমন করেছেন তাঁর উসিলায় সে সময়টা, সে দিনটাও তাৎপর্যময় হয়েছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে জুমাবার দিনটা বিভিন্ন ফযিলতমণ্ডিত ইবাদতে পূর্ণ, এমনকি একে গরীবের হজের সাথে তুলনা করা হয়েছে, সে হিসেবে তো সোমবারের কোনো আনুষ্ঠানিক ইবাদত নেই, তবুও কেন একটি এত মর্যাদাপূর্ণ? এর উত্তরে মুহতারাম হুযুর একটি মনযোগ আকর্ষণী জবাব দেন এবং বলেন, রাজা-বাদশাহ তথা বড় বড় নেতার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যেমন অফিসের কার্যক্রম বন্ধ থাকে তেমনি সোমবার নবী করীম-এর জন্মদিন বিধায় সেদিন কোনো বিশেষ ইবাদতের প্রয়োজন হয় না এটা তো মহা খুশির দিন।

পৃথিবীর সর্বসৃষ্টিতে নবীপ্রেম আছে এবং নবী করীম-এর প্রতি প্রত্যেক সৃষ্টিরই আকর্ষণ রয়েছে। একথার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে মুহতারাম পীর সাহেব কেবলা বলেন, নবী করীম-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে আসমান এ মর্মে প্রার্থনা করেছিল, ‘হে রব্বুল আলমীন! এ রকম শানঅলা-মানঅলা নবীকে আমার কাছে পাঠান।’ এভাবে অনেক সৃষ্টি আল্লাহর কাছে দরখাস্ত করেন।

একদিন জমিনও অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দোয়া করল, ‘আমিত মাটিই।

আমাকে সবাই ব্যবহার করে, আমি সবার পদতলে। আমার কোনো দাম নেই। সুতরাং নবী করীম-কে আমার কাছে পাঠিয়ে দামি বানিয়ে দিন।’ এখানে একটা শিক্ষনীয় বিষয় এই যে, আল্লাহ নম্রতা ও বিনয়কে পছন্দ করেন। সে নিরিখে আল্লাহ জমিনের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং আসমানের আবেদন ফাইল বন্দি রাখেন। সৃষ্টির প্রতি দয়াবান আল্লাহ পরবর্তীতে মি’রাজ ঘটিয়ে আসমানের আশাও পূরণ করেন।

এভাবে দিনের আলো ও রাতের অন্ধকারের মধ্যেও প্রবল আগ্রহ দেখা দিল। আল্লাহ তাআলা রাসুল মকবুল-কে এমন সময়ে প্রেরণ করলেন যা রাতের অন্ধকার এবং দিনের আলোর সমন্বয়ে দুটো সময়ের মধ্যবর্তী সময় সুবহে সাদিক। নবীপ্রেমের ওপর গুরুত্বারোপ করে হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকেই নবীপ্রেম তাঁর সাথে সম্পৃক্ত। হাদীসে এসেছে,

أَنَا نُورٌ مِّنْ نُوْرِ اللَّهِ، وَالْخَلْقُ كُلُّهُمْ عَنْ نُوْرِي».

‘আমি (মুহাম্মদ) আল্লাহর নূরের সৃষ্টি আর সমস্ত মাখলুক আমার

নূরের সৃষ্টি।’

এ প্রসঙ্গে তিনি একজন আশেকে রাসুল বাতেনি দৃষ্টিসম্পন্ন বুযুর্গের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,

کیا شانِ احمدی کا چمن میں ظہور ہے ہی ہر گل میں ہر شجر میں محمد کا نور ہے

ফুলের বাগানে গেলে দেখা যায় শানে মুহাম্মদী-এর সৌরভ কিভাবে বিলায়, আমি কোনো কোনো দিন এ রকমও দেখি যে, প্রত্যেক ফুলে প্রত্যেক গাছে মুহাম্মদ-এর নূরে পরিপূর্ণ। নবীর ভালোবাসায় নিমজ্জিত পীর সাহেব কেবলা বলেন,
وہ گل گل نہیں جس گل میں نہ ہو ہوئے محمد وہ دل دل نہیں جس دل میں نہ ہو جب محمد

‘আমি সেই ফুলকে ফুল বলবো না যে ফুলের সৌরবে মুহাম্মদ -এর ঘ্রাণ থাকবে না। সেই দিল (কলব)-কে দিল বলবো না যে দিলে মুহাম্মদ-এর মহব্বত থাকবে না।’ নবী করীম-এর প্রেম কত আকর্ষণীয় এবং যার অন্তরে নবীপ্রেমের আগুন ধরেছে তার অবস্থা কি রকম হতে পারে তার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, জনৈক সাহাবী নবী করীম-কে দাওয়াত করলেন। উল্লেখ্য যে, সে যুগে মাছই ছিল দুর্লভ এবং মূল্যবান খাবার। সে হিসেবে নবী করীম-এর জন্য অনেক কষ্ট করে তিনি একটা বড় মাছ খরিদ করে আনেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, সেই খরিদকৃত মাছটিকে কোনো মতে রান্না করা যায় না, চুল্লিতে আগুন জ্বালাতে চাইলে নিভে যায়। প্রাণপণ চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত উক্ত মেজবান সাহাবী মাছটি রাধতে ব্যর্থ হলেন এবং লজ্জায় তার মাথা নুয়ে পড়ল। অবশেষে সাইয়েদুল মুরসালীন হযরত মুহম্মদ তশরীফ আনেন। উক্ত মেজবান সাহাবী তার এই মুসিবতের কথা হুযুর-কে অবহিত করেন। একথা শুনে নবী করীম পাত্রটি আনতে বললেন এবং মাছটি দেখে ইরশাদ করেন, ‘দুনিয়ার সমস্ত আগুন এবং দোযখের আগুন দিয়ে চাইলেও এ মাছ রান্না করতে পারবে না।’

কারণ একজন নৌযাত্রী একটি চলন্ত জাহাজের একপাশে বসে প্রাণভরা ভক্তি-শ্রদ্ধা নিয়ে আমার প্রতি দরুদ শরীফ পাঠ করছিল। এ ভক্তিভরা হৃদয়হরণকারী দরুদ শরীফ মাছটি শুনে এবং মাছটিতে নবীপ্রেমের আগুন লেগে যায়। এখন চলন্ত জাহাজ যেদিকে যায় মাছটিও সেদিকে যায়, শেষ পর্যন্ত ওই দরুদ শরীফ পাঠকারী যাত্রীটি যখন তার গন্তব্যস্থলে নেমে যায় তখন সেই নবীপ্রেমে পাগলপারা মাছটি মৃতপ্রায় হয়ে পানিতে ভাসতে থাকে। তখন এক মৎস্যজীবী মাছটি ধরে বাজারে বিক্রির জন্য আনে এবং ওখান থেকে তুমি তাকে কিনে এনেছো। নবীপ্রেমে আপুত দরুদ শরীফ পাঠকারীর পড়ার মধ্যে একটা তা’সীর আছে, সে তা’সীরটা মাছের ওপর প্রভাব পড়েছে। তাই মাওলানা রুমী বলেন,

ہر کہ باشد عامل صلوا مدام آتش دوزخ بروے حرام

‘যে ব্যক্তি সবসময় নবী করীম এই-এর প্রতি দরুদ পড়তে থাকে তার ওপর দোযখের আগুন হারাম হয়ে যায়।’

নবী করীম স্ত্রী-এর পরশকৃত অনুপম ও অমূল্য ধন যার সাথেই সম্পৃক্ত হয়েছে সেই মর্যদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে হুযুর কেবলা সমস্ত ওলামার ঐকমত্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, দুনিয়ার সমস্ত জমিন থেকে এমনকি মক্কার জমিন থেকেও মদীনার জমিন উত্তম। কারণ মদীনা শরীফের মাটির সাথে হায়াতুন্নবী-এর নুরানি শরীর জড়িয়ে আছে।

মদীনার মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সাধারণত শরীয়তের বিধান হল মক্কায় একে এক লাখ সওয়াব। মদীনাতে ৫০ হাজার সওয়াব। পক্ষান্তরে ইমাম মালিক এ বলেন, ফযিলত ও মরতবা এবং কাইফিয়াতের দিক দিয়ে সর্বোপরি ঈমানের স্বাদ গ্রহণের দিক দিয়ে মদীনাতে একে তিন লাখ সওয়াব।

দোয়া তিনি পবিত্র মক্কার চেয়ে মদীনার মর্যাদা বেশির স্বপক্ষে আরও যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, মক্কা নগরীর জন্য খলীলুল্লাহ ইবরাহীম করেছিলেন। আর মদীনার জন্য দোয়া করেছিলেন হাবীবুল্লাহ মুহাম্মদ। তাহলে সহজে প্রতীয়মান হয় যে শান ও মানের দিক দিয়ে যেমন মহানবী সমস্ত নবীর ওপর শীর্ষস্থানীয় তেমনি খোদার কাছে দোয়া কবুলিয়াতের ব্যাপারেও তিনি অনন্য এবং অসাধারণ।

বাস্তব অভিজ্ঞতার স্মারক হিসেবে শ্রদ্ধেয় হুযুর কেবলা বলেন, আমরা মক্কায় বিভিন্ন কাজ-কর্মে বিশেষ করে খাওয়ার ব্যাপারে যে রকম আল্লাহপ্রদত্ত বরকত অনুভব করি মদীনাতে তার চেয়ে তীব্রভাবে বেশি বরকত অনুভব করি। এমনকি সে বরকত প্রত্যেক গ্রাসে গ্রাসে দেখা যায়। তিনি ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, আমাদের দেশে খেজুর গাছ সাধারণত ১৩-১৪ ফুট লম্বা হলে খেজুর ধরে। কিন্তু মদীনাতে চারা গাছ অবস্থায় খেজুর ধরতে দেখা যায়। দরুদ শরীফের ফযিলত বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন,

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ مَرَّةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا».

‘যে ব্যক্তি আমার রাসুল-এর প্রতি একবার দরুদ পড়ে তার জন্য আল্লাহ দশটি রহমত দান করেন।”

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,

مَنْ صَلَّى عَلَى النَّبِيِّ ﷺ ، كُتِبَتْ لَهُ عَشْرُ حَسَنَاتٍ، أَوْ حُطَّ عَنْهُ عَشْرُ.

سَيِّئَاتٍ، وَرُفِعَ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ.

‘দশটি সগীরা গোনাহ মাফ হয়, দশটি রহমত বর্ষিত হয়, দশটি দরজা বুলন্দ হয়।

দরুদ শরীফের ফযিলত বৃদ্ধির কারণ হল দরুদ শরীফ পাঠ করলে আল্লাহর রহমতে জোশ এসে যায়। সূক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন পীর সাহেব কেবলা কথাটি সহজভাবে উপস্থাপন করে বলেন, আমাদের দেশে যেসব বুদ্ধিমান ভিক্ষুক রয়েছে তারা সরাসরি ভিক্ষা চায় না। তারা প্রথম ডাকে দোয়া করে, ‘আল্লাহ! এ বাড়ির ছেলে-মেয়েদের বরকত দাও। ছেলে সন্তানদের কামিয়াবি দাও। রিযিক বৃদ্ধি করে দাও, বিদ্যা-বুদ্ধি বাড়িয়ে দাও, মান-সম্মান বাড়িয়ে দাও।’ যখনই বাড়ির অভ্যন্তরে ছেলে-মেয়েদের জন্য এ ধরনের দোয়া শুনে তখন মা-বোনেরা তড়িঘড়ি করে ভিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে। কারণ আদরের ছেলে-মেয়েদের উন্নতির জন্য দোয়া করেছে। সে কারণে ভিক্ষা দেওয়ার জন্য তারা প্রবল আগ্রহী। অনুরূপভাবে নবী করীম-এর শানে যখনই দরুদ পাঠ করা হয় তখন আল্লাহর রহমতে জোশ এসে যায়।

এ মর্মে হুযুর কেবলা উপদেশ দেন যে, মুনাজাতের সময় আমাদেরকে একান্ত বিনয়ী ও নম্র হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং প্রথমে হামদ ও সালামের পর স্বীয় মকসুদ পেশ করে তারপর আবার দরুদ শরীফ পাঠ করতে হবে।

দরুদ শরীফ পাঠে আল্লাহর রহমতের জোশের সূক্ষ্মতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হুযুর কেবলা বলেন, প্রত্যেক ফুলের একটি নিজস্ব বিশেষ সৌরভরয়েছে। গোলাপ ফুলে গোলাপ ফুলের গন্ধ পাওয়া যায়, চাপা ফুলে চাপা ফুলের সুগন্ধি পাওয়া যায়। কিন্তু দরুদ শরীফ সেটা এমন একটি ফুল যে ফুলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সুগন্ধি এক সাথে পাওয়া যায়।

সৃষ্টিজীব যেভাবে দরুদ পড়ে

ফুলের রং, গন্ধ ও স্বাদে বিভিন্নতা থাকলেও মধুর স্বাদে অভিন্নতার কারণ হল মৌমাছিরা ফুল থেকে রস আহরণ করে যাওয়ার সময় তারা দরুদ পাঠ করে যায় বিধায় কোনো ফুলের তিক্ত রসও অদ্বিতীয় এবং অতুলনীয় মিষ্টিতে পরিণত হয়। এ মৌমাছি সম্পর্কে কুরআন শরীফে একটি সুরা রয়েছে। মধু আহরণের পর মৌছাকে ফেরার সময় মৌমাছি গুণগুণ শব্দে গুঞ্জরণ করে যায় এবং বিশেষ ধরনের একটি ধ্বনি-প্রতিধবনিত হয়। বাহ্যত গুঞ্জরণ মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে তারা নবী করীম-এর শানে দরুদ শরীফই পড়ে। মাওলানা রুমী বলেন,

گفت چون خوانیم پر احمد درود و می شود شیرین و تلخ رار بود শিক্ষা ও ফুলের বিভিন্নতা সত্ত্বেও যদি দরুদ শরীফের উসিলায় মধুতে এক অভিন্ন, অভূতপূর্ব স্বাদ পাওয়া যায় তাহলে আমরা অজস্র গোনাহর মধ্যে ডুবে থাকলেও এ দরুদ শরীফ পাঠের উসিলায় আল্লাহ আমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন। অনুরূপ আমাদের ত্রুটিযুক্ত ইবাদতসমূহ মধুর ন্যায় মিষ্টিতে পরিণত হবে।

গ্রন্থনায়: হাফেজ মুজিবুর রহমান বেলাল


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *