অসাধারণ আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন আল্লাহর অলী হযরত পীর খানজাহান আলী এ খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রায় ছয়শ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক ষাট গুম্বুজ মসজিদ ও পীর সাহেবের দরগাহর জন্য প্রসিদ্ধ। বায়তুশ শরফের মাননীয় পীর হাদীয়ে যমান হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল জব্বার সাহেব ৬৯ ৭, ৮ ও ৯ এপ্রিল ঐতিহাসিক ষাট গুম্বুজ মসজিদ ময়দানে বার্ষিক ঈসালে সওয়াব মাহফিলের আয়োজন করেন। চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৪০০ মাইল দূরে গিয়ে নতুনভাবে এ মাহফিল আয়োজনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁর খুলনা সফরের পূর্বের দিন জুমাবার চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফ মসজিদে যে সংক্ষিপ্ত সারগর্ভ বক্তব্য পেশ করেন তা এখানে উল্লেখ্য। সম্পাদক
জুমআ নামাজের পর আপন ভক্তদের নিয়ে খাস মুনাজাতের পূর্বমুহূর্তে ভক্তবৃন্দের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, খুলনার পীর হযরত খানজাহান আলী উপমহাদেশের একজন মহান অলী। যুগ যুগ ধরে এ মহান অলীর দরগাহকে কেন্দ্র করে চৈত্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ‘চৈত্র-পূর্ণিমা’ নামে মেলা জমে। এ মেলায় শিরক, বিদআত, অসামাজিক ও শরীয়তবিরোধী কার্যকলাপের দেদার ব্যবসা চলে আসছে। ১৯৭৫ সালে আমি সেখানে যিয়ারত করতে গিয়ে এসব ঘটনা শুনে স্থানীয় জনসাধারণ ও মুতাওয়াল্লীদের সতর্ক করলে তারা সেই সময় আমাকে কথা দিয়েছিলেন, হুযুর! আপনি তশীরফ আসলে আমরা আপনার পরামর্শ মতো কাজ করবো।
সেই থেকে নানা ব্যস্ততার কারণে যাওয়া আর সময় হয়নি। ষাট গুম্বুজ মসজিদের মাহফিলে তারা পুনরায় আমাকে আহ্বান জানান। সুতরাং এমন গ্রীষ্মের দিনে এত দূরের সফর আমার জন্য কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হলেও শিরক-বিদআত উচ্ছেদের এ কাজে আমি পিছপা হতে পারি না। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এ বছর ষাট গুম্বুজ মসজিদ ময়দানেই ঈসালে সওয়াব মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে দরগাহের মূল কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সংশোধনে অগ্রসর হব। ইনশাআল্লাহ আমি আগামীকালই রওয়ানা হয়ে যাচ্ছি। আপনাদের মধ্যে যাদের বিশেষ অসুবিধা নেই এ মাহফিলে অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করবেন।
হুযুরের আহ্বানে যাদের বাগেরহাট সফরের সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আমরা একটা বাসে করে মঙ্গলবার সকাল ৮টায় ষাট গুম্বুজ মসজিদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। ওই দিন বিকালে ঢাকা বায়তুশ শরফ মসজিদে রাত কাটিয়ে ভোরে খুলনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। আমাদের কাফেলার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হযরত মাওলানা কুতুব উদ্দীন সাহেব। আলেমদের মধ্যে আরও উল্লেখযোগ্য যারা ছিলেন চট্টগ্রাম পোর্ট অফিসার্স কলোনি মসজিদের পেশ ইমাম প্রসিদ্ধ ওয়ায়েয হযরত মাওলানা আহমদ সাইয়েদ সাহেব। চট্টগ্রামের আনোয়ারা জুট মিলের পেশ ইমাম জনাব মাওলানা আবুল কাসেম সাহেব এবং বাঁশখালীর জনাব মাওলানা সিদ্দিক আহমদ ফারুকী সাহেব।
আরিচা ঘাটে ঠিক সময়ে ফেরি পাওয়াতে আমাদেরকে পথে খাওয়া ও নামাজ ছাড়া কোথাও বিলম্ব করতে হয়নি। অবশেষে ফরিদপুর, যশোর ও খুলনা হয়ে বাগেরহাটের মাইল তিনেক পশ্চিমে বিকেল ৪টার দিকে মনযিলে মকসুদে পৌঁছে যাই। সেখানে মাহফিলের ইন্ডিযাম সুসম্পন্ন। রৌদ্রের তাপ তখনও কমেনি। আসর বাদ আমরা পেটভরে ডাব খাওয়া শুরু করলাম, গড়ে এক টাকা প্রতিটি ডাব। চট্টগ্রামে যেখানে সাড়ে তিন থেকে চার টাকা একটি ডাবের মূল্য সেখানে এক টাকা হারে ডাব পেয়ে আল্লাহর এই নেয়ামতকে লুঠে খেয়েছিলাম।
সবুজ ছায়াঘেরা, গাছ-গাছড়ায় পরিপূর্ণ বাগের হাটের পল্লীগ্রাম। তাল, খেজুর, সুপারি ও নারকেল বাগানের মাঝে নাম নাজানা অনেক গাছের স্নিগ্ধ ছায়ায় লোকের কুঁড়ে ঘরগুলো শান্তির নীড়ের মতো মনে হচ্ছিল। রাত এলো। এ শান্তিকে আরও উপভোগ করতে পারলাম যখন কারও মশারির প্রয়োজন হলো না। কোথাও একটি মশারও সন্ধান মিলেনি। স্থানীয় লোকগুলোর চেহারা দেখে মনে হলো তারা গরিব অথচ উদার। কথায়-বার্তায় খুবই সরল, আপনজনের মতো মনে হলো।
আসর বাদ মাহফিল শুরু হলো ষাট গুম্বুজ মসজিদের উত্তর পার্শ্বের স্কুলের সম্মুখস্থ মাঠে। মসজিদের পশ্চিমে এক অতিকায় দিঘি। প্রায় ৬০০ বছর পূর্বে ষাট গুম্বুজ মসজিদ নির্মাণকালে এ দিঘি খনন করা হয়েছিল। পূর্বপশ্চিম লম্বা এ দিঘির দৈর্ঘ্য প্রস্থ কত তা জানার সুযোগ হয়নি অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে। দিঘির উত্তর পাশে পীর খানজাহান আলী-এর বাসভবনের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন নাকি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। মসজিদের মেহরাবের পেছনে প্রাচীনকালের দুটি বৃক্ষ, জিজ্ঞাসা করলাম, লোকেরা বলল, এগুলো সামু গাছ। প্রাচীনকালের ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদ এ অঞ্চলের ইসলামী ঐতিহ্য, পীর সাহেবের অসাধারণ আধ্যাত্মিক ও জাগতিক ক্ষমতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। সরকার এ ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব ও যাদুঘর বিভাগের একটি অফিস করেছেন মসজিদের সামনে দক্ষিণে। প্রত্নতত্ত্ব ও যাদুঘর বিভাগের পক্ষ হতে মসজিদের স্থাপত্য শিল্প ও কারুকার্য সম্পর্কে একখানা সাইনবোর্ড সামনে দেওয়া হয়েছে। তাতে লেখা আছে, ‘বাংলাদেশের বৃহত্তম আয়তকার ১৬৫”×১৮০” অপূর্ব কারুকার্য খচিত পাঁচ শতাব্দীরও অধিককালের মসজিদ।
স্থাপত্যে, কৌশলে ও লাল পোড়া মাটির ওপর লতা-পাতার অলংকরণে মধ্যযুগীয় স্থাপত্য শিল্পে এ মসজিদ এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। যদিও এটি ষাট গুম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চতুষ্কোণের বুরুজের ওপর চারটি গুম্বুজসহ এতে মোট ৭৪টি গুম্বজ আছে এবং মধ্যের সারির বাংলার চালের অনুরূপ সাতটি চৌচালা গুম্বুজসহ এতে মোট ৮১টি গুম্বুজ আছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এর প্রার্থনা কক্ষের চৌচালা ছাদ ও গুম্বুজগুলো ইট ও পাথরের ২২টি খাম্বার দ্বারা সমর্থিত খিলানের ওপর নির্মিত। ইমারতটির গঠন-বৈচিত্র্যে তুঘলক স্থাপত্যের বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ইটের বিরাট বিরাট দেওয়াল, পোড়ামাটির ফলকে অপূর্ব নকশাকৃত দশটি মেহরাব, বক্র কার্নিশ ও কেবলা দেওয়ালের দরজা ষাট গুম্বুজ মসজিদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। আনুমানিক ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দের কিছু পূর্বে খানুল আযম উলুঘ খানজাহান এ নামক এক মহাপুরুষ এ বিখ্যাত মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
ষাট গুম্বুজ মসজিদ হতে দেড় মাইল পূর্ব দক্ষিণে পীর হযরত খানজাহান আলী এক গুম্বুজ দালানের দরগাহ। দরগাহসংলগ্ন পশ্চিমে এক গুম্বুজ মসজিদ। মসজিদ ও মাযারের পার্শ্বে অতিকায় বিশাল ঐতিহাসিক দিঘি। দিঘির পশ্চিম পাড়ে আছে আরেকটি নয় গুম্বুজ মসজিদ। পশ্চিম পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয় দিঘিটা উত্তর দক্ষিণ লম্বা। আর উত্তর পাড়ে দাঁড়ালে মনে হয় পূর্ব পশ্চিমে লম্বা। দিঘিতে দুই-তিনটি কুমির বাস করে। সময় হলে এরা পূর্বপাড়ে ডাঙায় উঠে বাচ্চা দেয়। মেলার সময় দেখলাম, বিভিন্ন জায়গা হতে মানত করা মুরগী এনে লোকেরা দিঘিতে নিক্ষেপ করছে। জিজ্ঞাসা করলাম এরা কি করছে? লোকেরা বলল, কুমিরকে খাবার দিচ্ছে মকসুদ হাসিল হওয়ার জন্যে।
দেখলাম, এক ব্যক্তি দুই-তিনটি মোরগ হাতে একগলা পানিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার ভয় হলো কুমিরে তাকে ধরে ফেলবে নাকি। দেখছি, ওই লোকের পেছনে পেছনে আরেকজন তালের নৌকা ভাসিয়ে এগিয়ে গেছে। লোকটি পানিতে যেইনা মোরগ নিক্ষেপ করল, অমনি ভেজা মোরগগুলো আরেকজন নৌকায় তোলে নিয়ে আসল। জিজ্ঞাসা করলাম, একি ব্যাপার! বলল, ওই লোক মোরগগুলো কুমিরকে খেতে দিয়েছিল। আগে এরকম দিলে কুমির এসে খেয়ে যেত। এখন মুতাওয়াল্লীর লোকেরা কুমিরকে খেতে দেয় না। নিজেরা উঠিয়ে আনে, আবার বিক্রি করে, আবার তুলে আনে। এভাবে লুকোচুরি ব্যবসা। যারা মোরগ দেয় তারাও আপত্তি করে না। এমনিতে চুপ করে দিঘিতে কয়েকটা ডুব দিয়ে পুণ্যস্নান করে উঠে আসে তারা। এভাবে আরেক ঘাটে কেবল মেয়েরা মোরগ বলি আর পুণ্যস্নান করে হিন্দুদের ন্যায়।
মেলার সময় তিনদিন ধরে চতুর্দিকে বিভিন্ন অঞ্চলের জটধারী ভণ্ড তাপস, ফকির ও গাঁজাড়িদের আসর জমেছিল। মেলায় যারা এসেছে অপেক্ষাকৃত অভাবী ও নিম্নপরিবারের লোক! পুরুষের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশি। আবার হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যা ও সমান সমান। জটধারী ও ভণ্ড ফকিরদের ন্যায় ব্রাহ্মণও দেখা গেল ঘোরা-ফেরায়। মাযারের চতুর্দিকে রকমারি মিষ্টি ও কুটির শিল্পের বাজার যেমন জমেছে, তেমনি মাথায় উন্ধু-খুঙ্কু চুলের জটধারী ফুল মামা, হাফ মামা, ফুল মামী, হাফ মামীরাও কিছু লোক জুটিয়ে আসর জমিয়েছে। কারও গায়ে এক মন লোহার শিকল জড়ানো, কারও গায়ে ডজনখানেক তালার ছড়া এগুলো, ছিল মস্তান আর ফকির বাবুদের আধ্যাত্মিক উন্নতির নিদর্শন।
পথের দোয়ারে আর মাঝে থোকা থোকা হাত খোড়া, পাও ভাঙা, পঙ্গু, বিকলাঙ্গ, ফকিরদের জারিগান আর যিকির পথিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। আগত লোকেরা ঘুরে ঘুরে ফকিরদের হালকা পরিদর্শন, দিঘি হতে কলসি ভরে পানি সংগ্রহ, দরগায় সেজদা, চুমা প্রদান, আসার পথে ষাট গুম্বুজ মসজিদে ঢুকে খাম্বায় কয়েকবার কোলাকোলি ও চুম্বন করা আর পীর খানজাহান আলী-এর তথাকথিত তাবিজ সংগ্রহ করা, গলায় রকমারি ফুলের মালা ঝুলিয়ে ঘরে ফেরাই মেলার যাত্রীদের প্রধান কাজ বলে দেখে মনে হলো। দরগাহর প্রধান প্রধান খাদেমগণ আগত লোকদের একটু যিয়ারতের বা মাযার চুম্বন ও সেজদার সুযোগ করে দিয়ে, ধূপ-মোমবাতি, তাবিজ ও মোরগ বিক্রি করে দুই পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ভক্তরা ধূপ, লোবান ও মোমবাতি খরিদ করে মাযারের ভেতর ফেলে দিচ্ছে, কতক্ষণ পরেই খাদেমরা ঢুকে সেগুলো কুড়িয়ে এনে আবার দোকানে ভাঁজ দিয়ে বিক্রি শুরু করছে। মোরগ আর বাতি বিক্রির এ পুঁজিহীন ব্যবসা সত্যিই অপূর্ব লাভজনক।
এত বৈচিত্রপূর্ণ পরিবেশে দরগাহ ও দরগাহ মসজিদ-সংলগ্ন উত্তর পাশের মাঠে এ বছর এলাকার গণ্যমান্য শিক্ষিত ও আলেমগণ এক ইসলামী সেমিনারে আয়োজন করেন। সেমিনারের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল হযরত খানজাহান আলী-এর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা, রচনা প্রতিযোগিতা ও প্রবন্ধ পাঠ। সেমিনারের উদ্যাক্তারা বলেন, বায়তুশ শরফের পীর সাহেবের আহ্বান ও শুভাগমনে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা নিজেদের উদ্যোগে দরগাহ কেন্দ্রে এ বছর প্রথমবারের মতো এ মহতি সেমিনারের আয়োজন করেছি। বায়তুশ শরফের পীর সাহেব হুযুরের শুভাগমনে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলার সর্বস্তরের জনগণের মাঝে আশাতীত ও অবর্ণনীয় সাড়া জেগেছিল। তিনদিন ব্যাপী যাট গুম্বুজ মসজিদ ময়দানে ঈসালে সওয়াব মাহফিল, খুলনা আলিয়া মাদরাসা, নেসারিয়া মাদরাসা, দারুল উলুম মাদরাসা ও আহমদিয়া মাদরাসাসহ বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক পীর সাহেব হুযুরের আহ্বানে তিনদিনের জন্য বিছানাপত্রসহ এসেছিলেন মাহফিলে।
মাহফিলের দ্বিতীয় দিনে প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন হযরত মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী তাঁর রাজশাহীতে পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রাম স্থগিত করে হুযুরের টেলিফোন পেয়ে এ মাহফিলে উপস্থিত হন। প্রতিদিন বাদ আসর থেকে রাত নয়-দশটা পর্যন্ত ওয়াজ-নসিহত করেছেন। খুলনা বিভাগের বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষক, ষাট গুম্বুজ মসজিদের ইমাম সাহেব, স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ও চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া আলেমগণ। প্রতিদিন সকাল হতে মাহফিলের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ষাটগুম্বুজ মসজিদের ভেতর বিভিন্ন মাদরাসা থেকে আগত ছাত্ররা বক্তৃতা দিয়ে সারাদিন মাহফিলের ইমেজকে সরগরম রাখত। প্রায় তিন-চার শত মাদরাসার ছাত্র পীর সাহেব হুযুরের নির্দেশে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মসজিদ ও দরগাহসহ যেসব স্থানে অজ্ঞ লোকেরা সেজদা, চুম্বন দিত, সেখানে নম্রভাবে বোঝানো এবং ওসব বিদআত-শিরক থেকে ফিরিয়ে রাখার দায়িত্ব পালন করত। মাহফিলের দ্বিতীয় দিনে হুযুর কেবলা ও সাঈদী সাহেব দরগাহ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সেমিনারে তশরীফ নেন এবং শিরক-বিদআতের অশুভ পরিণাম, মুসলিম জাতির প্রকৃত দায়িত্ব ও আল্লাহর প্রিয় পাত্র হওয়ার সুন্নত পন্থা সম্পর্কে জোরালো বক্তব্য রাখেন। তখন চতুর্দিকে শত শত লোক তাঁদের নসিহত শ্রবণ করছিল আর নারায়ে তকবীর ধ্বনীতে ভণ্ড ফকিরদের অন্তর কাঁপিয়ে তুলছিল। ঈসালে সওয়াব মাহফিলে বাগেরহাটের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক, খুলনা আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও আমতলীর মাননীয় পীর সাহেব হুযুর স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত হয়ে বায়তুশ শরফের পীর সাহেবের এ জিহাদী পদক্ষেপকে প্রাণঢালা সমর্থন ও সহযোগিতা দানের আশ্বাস প্রদান করেন।
চতুর্দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বায়তুশ শরফের পীর সাহেব হুযুরের এ পদক্ষেপ আশাতীত সফলকাম হয়েছে। কারণ হুযুরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রথমে ষাট গুম্বুজ মসজিদ এলাকায় মাহফিল করে স্থানীয় জনগণ ও ‘ফকির (মুতাওয়াল্লী) বংশকে সতর্ক করে আয়ত্বে আনা। এরপর যখন সাধারণ মানুষের মাঝে একটি নৈতিক পরিবর্তন সাধিত হবে তখনই দরগাহ কেন্দ্রে অগ্রসর হওয়া এবং ক্রমান্বয়ে বোঝাপড়া ও নৈতিক শাসনের মাধ্যমে বিদআত শিরিকের শিকড় উপড়ে ফেলা। কারণ তিনি দূরদৃষ্টিতে দেখেছেন যে শত শত বছরের ঘুনে ধরা এসব গোমরাহি একদিনের লাঠিপেটা করে বা মুখের ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, তাছাড়া জনগণকে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার করা না গেলে স্থায়ী ফলও পাওয়া যাবে না। কিন্তু এ বছরই হুযুরের ইখলাসের বদৌলতে ষাট গুম্বুজ মসজিদ ও দরগাহেই ভরপুর মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় এবং সর্বস্তরের জনগণ হুযুরকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর হয়।
স্থানীয় লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলল, এ বছর মেলায় দুই তৃতীয়াংশ অসামাজিক কার্যকলাপ কমে গেছে। ভণ্ড-ফকিররা মাইক বা ঢোল-তবলা ব্যবহার করতে পারেনি। তাদের চেহারা ক্রমান্বয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছিল। বৃদ্ধলোকেরা তো আনন্দে কেঁদেই ফেলেছিলেন, আর বলছিলেন, চৈত্র-পূর্ণিমার এ তিনদিন আমরা ঘরের বাইর হতাম না। উক্ত স্থানে প্রতিবছর নিয়মিত বায়তুশ শরফের উদ্যোগে ঈসালে সওয়াবের মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
গ্রন্থনায়: ড. মাওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
Leave a Reply