৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮১ বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বর্তমান মাদরাসা শিক্ষার সমস্যা ও সমাধান’ শীর্ষক আলোচনা সভার সমাপ্তিলগ্নে বায়তুশ শরফ আদর্শ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সম্পর্কে হুযুর কেবলার প্রদত্ত ভাষণ টেপ রেকর্ড হতে কলম বদ্ধ করা হল। -সম্পাদক
বিগত ২৬ এপ্রিল ১৯৮১ বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রথম সেমিনার সুদবিহীন ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেদিন ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে নামাজ পড়ে বের হচ্ছি, এমন সময় একজন বৃদ্ধ মাওলানা এসে সজোরে হাত চেপে ধরে বলতে লাগলেন, আপনি ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা সম্পর্কে সেমিনার করেছেন। আপনাকে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতেই হবে, কবে করবেন বলেন। মাওলানা সাহেব নাছোড়বান্দা। চতুর্দিকে মোলাকাতের জন্য অপেক্ষায় লোক দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তিনি ছাড়বেন না। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।
আমি বললাম, দেখেন, ইতঃপূর্বে যারা ইসলামী ব্যাংক করার জন্য সরকারের নিকট অনুমতি চেয়ে দরখাস্ত করেছেন, অন্যান্য মুসলিম দেশের সাথে সাহায্য-সহযোগিতা সম্পর্কে যাদের সাথে আলোচনা হয়েছে তারা তো এখনও করেননি। তাছাড়া ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদন নিতে প্রথেমেই যে ৫০ লাখ টাকা সরকারের কাছে জমা দিতে হবে তাও কোথায় পাব? এরপরও মাওলানা সাহেব কিছুতেই ছাড়েন না। এবার আমি বললাম, বিগত সেমিনার হয়েছিল সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থার কুফল আলোচনা প্রসঙ্গে এবং ইসলামী ব্যাংক রূপরেখার ওপর একটি সেমিনার করবো ইনশাআল্লাহ। সেখানে ইসলামী ব্যাকিং প্রতিষ্ঠার বাস্তব দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে। মাওলানা সাহেব বরাবরই বলতে লাগলেন, ওসব সেমিনারে কাজ হবে না। আগে কাজ আরম্ভ করে দিতে হবে।
যা হোক, এবার আমি চিন্তা করলাম যে, মাদরাসা শিক্ষার সমস্যা ও সমাধান নিয়ে শুধু আলোচনা ও সেমিনার করলেই হবে না। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমে কাজ আরম্ভ করে দিতে হবে। পরপর বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ ও অভিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ নিয়ে ক্রমান্বয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তাই চিন্তা করলাম বাস্তব নমুনা হিসেবে একটি আদর্শ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার।
এতক্ষণ ধরে বিভিন্ন প্রবন্ধকার ও আলোচক এ বিষয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। আমি তো কোনো চিন্তাবিদ-শিক্ষাবিদ নই, একজন খাঁটি মোল্লা মাত্র। আমরা যা দেখছি আমাদের দেশে দুই ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান। একটি (মিস্টার) বানানোর স্কুল শিক্ষা। অপরটি (মোল্লা) তৈরির মাদরাসা শিক্ষা। একই পিতার দুটি ছেলে, একটি মাদরাসায়, অন্যটি স্কুলে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, এক ভাই অন্য ভাইকে ঘৃণা করে। মাওলানা সাহেব সমাজের কোনো কাজেই আসে না। এটা ছিল ব্রিটিশ আমলের অবস্থা। বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে স্কুলের প্রথম দিকে তো যেমন তেমন, ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর অনেকে বলতে শুরু করে, ইসলাম চলবে না, মোল্লার ইসলাম মানি না। কোনো একটা বইতে পড়েছিলাম, জনৈক চিন্তাবিদ লিখেছেন, ‘দেখুন, জমি এদেশের, পানি এদেশের, বীজ এদেশের, লাঙ্গল-জোয়াল-গরুও এদেশের, মাতা-পিতা এদেশের, তবুও কলেজ-ভার্সিটিতে লেখাপড়ার পর ফসল উৎপন্ন হয় ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়ার। এ হল আমাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা।’
আমাদের দেশের কয়েকজন লোক জার্মান গিয়েছিলেন। ফিরে এসে আলোচনা প্রসঙ্গে আমাকে বললেন, আমরা সেখানে ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে চেয়ে কারও সাথে কথা বলতে পারিনি। জার্মানিরা জার্মান ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলতে চায় না। তেমনি অন্যান্য দেশেও নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা-দীক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কার্য পরিচালনা করা হয়। কিন্তু কেবল আমরাই নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে বিদেশি ইংরেজি ভাষা চর্চা করতে গর্ববোধ করি এবং ব্রিটিশের মানবিক গোলামিতে বন্দি হয়ে আছি। অনেক সংগ্রামের পর মাতৃভাষা বাংলাদেশকে রাষ্ট্রভাষা করা হল। কিন্তু অফিস-আদালতে ব্যবহৃত হয় সেই গোলামি যুগের ইংরেজি ভাষা। এই একই অবস্থা আজ বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে বিরাজমান। ইরাক, জর্দান, সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তান; সেখানকার যুবশ্রেণি ও শাসক গোষ্ঠী কমিউনিস্টদের সাথে হাত মিলিয়েছে। আমাদের দেশের একশ্রেণির যুবকও চাচ্ছে সবকিছু কমিউনিস্ট মতবাদে পরিচালিত হোক। কমিউনিস্ট মতবাদের অর্থ হচ্ছে, যারা আল্লাহ মানে না, রাসুল মানে না, কুরআন মানে না, আখেরাত মানে না। তাদের মতবাদের জন্য তারা জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। এর মূলে দায়ী হচ্ছে, আমরা ইসলামের ধারক-বাহক নায়েবে রাসুলরা যুবসমাজের কাছে ইসলামকে পৌঁছাতে পারিনি। ফলে মাওলানা সাহেবের ভাই, বন্ধু, ছেলে-সন্তান ও কমিউনিস্ট হয়ে যেতে চাচ্ছে।
দেখুন, কোনো মাওলানা সাহেব যদি নির্বাচনে প্রার্থী হন লোকে ভোট দিতে চাইবে না। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও না। তার কারণ লোকে বলবে, হুযুর তো সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি করতে পারবেন না। ফলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে এসব পন্থায় কিছু আনতেও পারবেন না। এদিকে আমরা মাহরুম থেকে যাব। কিন্তু চোর ডাকাতকে ভোট দিলে তারা নিজে খাওয়ার পর অন্তত কিছু না কিছু তো আমাদের দিত। বস্তুত এভাবেই ভাত-কাপড়ের জন্য মানুষ দীনকে বাদ দিয়ে দিচ্ছে। আল্লাহর বিরুদ্ধে, রাসুল-এর বিরুদ্ধে, যেই নবী বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মহামানব বলে বিধর্মী মনীষীরাও একবাক্যে স্বীকার করেছেন, সেই নবীর বিরুদ্ধে মুসলমানের ঘরের ছেলে-সন্তানরা রুখে দাঁড়াচ্ছে। এর কারণও সেই একটাই। আমরা মুসলমানরা যুবসমাজকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাতে পারিনি। মাদরাসা শিক্ষায় এসবের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা নেই।
এত কিছুর পরও মাদরাসা শিক্ষা সম্পর্কে বলতে গেলে ব্রিটিশের অধীনে এদেশবাসীর দু’শ বছরের গোলামির যুগে এবং বর্তমানেও এই ধর্মহীনতার যুগে মাওলানা সাহেবরা যাকাত, সদকা, ফিতরা তালাশ করে নিজের ইজ্জতকে পায়ের তলায় দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে মাদরাসা শিক্ষাকে এ পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছেন। এর কল্যাণে এখনো নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামের নৈতিক শিক্ষা প্রভৃতি বেঁচে রয়েছে। মুসলমানদের প্রতি আলেম সমাজের এই অবদান কিছুতেই ভুলা যাবে না। তবে অবস্থার চাপে অনেক সময় তাদেরকে সরকারি অফিসারদের কাছ থেকে সরকারি টাকা উদ্ধার করতে গিয়ে ঘুষ প্রদান করে দুর্নীতির শিকার হতে হচ্ছে। এধরণের দৃষ্টান্ত বহু রয়েছে। বর্তমানে আমাদের শিক্ষিত মহলের অবস্থা হয়েছে, যারা দীন (ধর্ম) জানে তারা সমাজকে জানে না, যারা সমাজ সম্পর্কে জানে তারা দীন জানেনা। অথচ ইসলাম বলে,
الدِّينُ وَالْمُلْكُ تَوَأْمَانِ.
‘ধর্ম ও রাষ্ট্র পরস্পর পরিপূরক।”
বর্তমানে যারা মসজিদের ইমাম তাঁদের নেতৃত্ব মসজিদের ভেতর সীমাবদ্ধ। যেকোনো বড় লোক, প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী তাদের হুকুমবিনে রুকু-সেজদা করতে পারবে না। কিন্তু মসজিদের বাইরে আসতেই সমাজপতিরা ইমাম সাহেবদেরকে নিজের কর্মচারীর ন্যায় ব্যবহার করে। এমন অবস্থার পেছনে আরও একটি কারণ দায়ী, তা হল মাদরাসায় যারা পড়ে তারা অধিকাংশ গরীবের ছেলে। তাই তারা সাদকা-যাকাত খেয়ে পড়তে বাধ্য। এর অনিবার্য প্রভাবে তারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল, সাহসহারা হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সমাজের প্রভাবশালী, অফিসার শ্রেণি ও ব্যবসায়ীদের ছেলে সন্তান যারা হত সাহসী, প্রতিভাবান, স্বাধীনচেতা ও নেতৃত্বের যোগ্যতাসম্পন্ন তাদেরকে মাদরাসায় দেন না।
বর্তমান মাদরাসা শিক্ষার আরও একটি দিক উল্লেখ করা প্রয়োজন। মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিক করার জন্য স্কুল-কলেজের বস্তুবাদী বই-পুস্তক ঢুকানো হচ্ছে। সেগুলো অধিকাংশ ইসলাম বিরোধী ও কুরআন-হাদীসের নীতিমালার পরিপন্থী। অথচ কুরআন-হাদীস বা ইসলামী শিক্ষার মান উন্নয়নের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে মাদরাসা শিক্ষাও বস্তুবাদী শিক্ষায় রূপান্তরিত হয়ে যেতে বাকি কতক্ষণ? যেমন নাস্তিক ডারউইনের মতবাদ যদি মাদরাসায় পড়ানো হয় তাহলে…। আমরা বরাবরই বলে আসছি। মাদরাসায় যেসব স্কুল-কলেজের বই-পুস্তক ঢুকানো হবে সেগুলো সর্বাগ্রে ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী সংশোধন করে নিতে হবে।
বস্তুত উপরে আলোচিত দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, ধর্মীয় ও দুনিয়াবি শিক্ষাকে একই সাথে দিয়ে একত্রে নামাজ ও সমাজের নেতৃত্বদানের উপযুক্ত লোক তৈরির জন্য একটি আদর্শ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেখানে একটি স্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ ইসলামী পরিবেশে প্রত্যেক ছাত্রকে একেকজন খাঁটি মুসলমান, আদর্শ নাগরিক ও আত্মনির্ভরশীল জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুফতি, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার প্রভৃতি তৈরির জন্য উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার ব্যবস্থা নেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ। এর ফলে অত্র মাদরাসার ছাত্ররা একই সাথে মাতৃভাষা বাংলা, জাতীয় ভাষা আরবি ও প্রয়োজনীয় ইংরেজি ভাষায় বুক ফুলিয়ে লিখতে ও কথা বলতে পারবে।
সবশেষে আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান হচ্ছে, বিশেষ করে আপনারা যারা অফিসার, ব্যবসায়ী, উকিল, অধ্যাপক আছেন আপনাদের ছেলে এই মাদরাসায় দিতে হবে (হুযুরের এই আহ্বানে সমবেত সুধীগণ স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানান)। অত্র মাদরাসার সামগ্রিক উন্নতির জন্য আপনাদের সহযোগিতা, পরামর্শ কামনা করি এবং আল্লাহর দরবারে কবুলিয়াতের জন্য মুনাজাত করি, আমীন।
Leave a Reply