বায়তুশ শরফের শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব এ ছিলেন দেশের একজন অতি-পরিচিত সর্বজন শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও শ্রেষ্ঠ সমাজসেবক। কাজেই তাঁর প্রতিটি বক্তব্য, কথা ও কাজ অতিমূল্যবান এবং অনুকরণীয়। আধ্যাত্মিক দীক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় মাহফিলে তাঁর জ্ঞানগর্ভ ও প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ ওয়াজ ও হৃদয়গ্রাহী ভাষণ ধর্মপ্রাণ মানুষের রুহের খোরাক ও চলার পথের দিশারী। তাঁর ওয়াজ ও আলোচনাগুলো এতই হৃদয়গ্রাহী, তথ্যপূর্ণ, শিক্ষণীয় ও প্রাঞ্জল হতো যে, এর আবেদন সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কালোত্তীর্ণ ও ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করতো। এ ধরনের একটি আলোচনা ছিল কদমতলী মোড়ে পবিত্র মিলাদুন্নবী মাহফিলের ভাষণ। এ ভাষণে তাঁর জীবনধারা, চিন্তা, চেতনা ও পীর সাহেব হিসেবে স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির যেমন প্রতিফলন ঘটেছে, তেমনি সাধারণ মানুষ এবং অনৈক্য, বিদ্বেষ ও হানাহানিতে লিপ্ত মুসলিম-সমাজ ও আলেমদের জন্য সুমহান শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফের পূর্ব দিকে কোয়ার্টার মাইলের মধ্যেই কদমতলী মোড়। কদমতলীর মহল্লাবাসী ১৯৮৯ সালের ৯ ডিসেম্বর যে পবিত্র মিলাদুন্নবী মাহফিলের আয়োজন করে তা কয়েকদিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। প্রথমত জায়গাটি শহরের কেন্দ্রস্থলে, দ্বিতীয়ত মহানবী -এর মিলাদ মাহফিল বলে জনগণের ধর্মীয় আকর্ষণ ছিল অত্যন্ত প্রবল। তৃতীয়ত ওই মাহফিলে যে কয়েকজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে দাওয়াত করা হয়, সাধারণভাবে মানুষ তাঁদেরকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন বলে কল্পনা করে। এজন্য একই প্লাটফরম থেকে তাঁরা কে কোন ধরণের বক্তব্য রাখছেন তা শোনার জন্য স্বাভাবিকভাবেই সবাই উদগ্রীব ছিলেন এবং লোকের সমাগমও হয়েছিল প্রচুর। এ প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে বায়তুশ শরফের পীর সাহেব কেবলা তাঁর আলোচনায় অনেকগুলো অনুল্লেখিত প্রশ্নের জবাব দেন যা উপস্থিত লোকদেরকে বিমোহিত করে।
——- সম্পাদক
আল্লাহ পাকের প্রশংসা এবং রাসুল মকবুল-এর শানে সমবেতভাবে দরুদ শরীফ পেশ করার পর কদমতলী এলাকাবাসীর পক্ষ হতে বিশাল
আকারে পবিত্র মিলাদুন্নবী মাহফিল আয়োজনের জন্য উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনার ভূমিকায় আত্মজীবন ও বায়তুশ শরফ সম্পর্কে এবং সেই মাহফিলের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন,
অনেকক্ষণ ধরে বিভিন্ন ওলামায়ে কেরাম অনেক ওয়াজ-নসিহত করেছেন। বিশেষ করে মাওলানা জালাল উদ্দীন সাহেব (অধ্যক্ষ, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদরাসা) রাসুল পাক-এর শান ও মানকে সামনে রেখে মূল্যবান বয়ান করেছেন, মানুষের দীন ও ঈমান তাজা হওয়ার জন্য ওয়াজ সাধারণত এ সময়ে (এতো রাতে) শেষ করা হয়। ওয়াজ শেষ করার সময় আমি শুরু করছি। বিষয়ও নির্দিষ্ট নেই, কি বলবো তাও জানি না। দেখা যাচ্ছে মাহফিলে হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমেছে। বসার জায়গাও নেই, দাড়ানোর জায়গাও নেই। এর কারণ সম্পর্কে আমার ধারণা হচ্ছে, যা ঠিক হতেও পারে, নাও হতে পারে। আমি ও মাওলানা মুহাম্মদ জালাল উদ্দীন সাহেব একসাথে আসছি বলে চতুর্দিকে প্রচার করা হয়েছে যা সাধারণত খুব কমই হয়ে থাকে। সবাই মাহফিলের দৃশ্য অবলোকন ও কথা শোনার জন্য জমজমাট হয়েছে।
আসলে ব্যাপারটা এ রকম নয়। যাক, এখন আমি যৌবনকাল থেকে শেষ বয়সে পদার্পণ করেছি, বয়স দিনদিন কমে যাচ্ছে। প্রায় ত্রিশ বছর যাবৎ ওয়াজ-নসিহত করে আসছি। নিজে মাদরাসায় লেখাপড়া করেছি চৌদ্দ বছর, পাঁচলাইশ ওয়াজেদিয়া আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছি প্রায় চৌদ্দ বছর। আমার পীর সাহেবের আদেশক্রমে মাদরাসা থেকে চলে আসলাম তাঁর খেদমতে। তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর আমি নগণ্য গোনাহগারের ওপর দায়িত্ব এসে পড়ল। হযরত কেবলা রাসুল পাক-এর অনুকরণে-অনুসরণে মসজিদভিত্তিক কর্মসূচির যে বাগান আমাদেরকে দান করে গেছেন তার প্রচার ও প্রসারের জন্য দিনদিন দায়িত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, দিন-রাত সেই দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। কোনো মাহফিলে যাওয়ার সময় মোটেই নেই। তবুও যাই, কিন্তু স্বাস্থ্য বাধা দেয়।
হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ লোকের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি যেন প্রশ্ন করছিল, বায়তুশ শরফ ও পীর সাহেব সম্পর্কে একশ্রেণির লোক অহরহ সমালোচনা করে, এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই? এসব সমালোচনার সঠিক উত্তর ও দাঁতভাঙা জবাব হয়তো তিনি দেবেন। কিন্তু না, তাঁর দৃষ্টি ছিল অনেক ঊর্ধ্বে। হযরত নবী করীম-এর সুন্দর জীবনের চিত্র তুলে ধরলেন অত্যন্ত আবেগময় ভাষায়। পীর সাহেব কেবলা বলেন, ছোটকাল থেকে আমার সাথে কারও কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়নি, বর্তমানেও নেই, ভবিষ্যতেও হবে না ইনশাআল্লাহ। কাউকে অশ্লীল কথা বলা, গালি-গালাজ করা, কোনোদিন আমার মুখে আসেনি, ইসলামের শিক্ষাও তা নয়। আপনারা জানেন রাসুল করীম-এর চেয়ে বেশি আঘাত, কষ্ট পৃথিবীর আর কেউ পাননি। স্বয়ং নবী করীম ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় আমাকে যেভাবে কষ্ট দেওয়া হয়েছে সেভাবে কষ্ট কখনও কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (আল হাদীস)
তায়েফের ময়দানে নবী করীম ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁকে কাফেররা পাথর নিক্ষেপ করেছিল, কষ্ট দিয়েছিল। তা দেখে আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরীল-কে প্রেরণ করলেন। হযরত জিবরীল এসে বললেন, ‘ইয়া রাসুলল্লাহ! আল্লাহ তাআলা তায়েফবাসীদের কার্যকলাপ দেখে আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। আপনি অনুমতি দিলে আমি তায়েফবাসীকে সমূলে বিনাশ করে দিতে প্রস্তুত। হযরত মিকাঈল এসে আরজ করলেন, ইয়া রাসুলল্লাহ! ঝড় বৃষ্টি ও প্রবল বাতাস আমার হাতে। আপনি যদি অনুমতি দিন, তাদের ওপর আমি বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দিতে পারি। নবী করীম ফরমালেন, ‘আল্লাহ আমাকে অভিসম্পাতকারী করে পাঠাননি, বরং রাহমত হিসেবে আমাকে পৃথিবীর বুকে পাঠিয়েছেন। মানুষকে আঘাত করার জন্য, কষ্ট দেওয়ার জন্য আমাকে প্রেরণ করা হয়নি।’ (আল-হাদীস)
আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীরাও যখন কষ্ট দিতে লাগল তখন তিনি একটুও মনক্ষুণ্ণ হলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘হে পেয়ারে হাবীব! আপনি কাফেরদের সমালোচনা অপবাদ ইত্যাদিতে মনক্ষুন্ন হবেন না। আপনার পূর্ববর্তী সব নবী-রাসুলকে এভাবে গালমন্দ, সমালোচনা করা হয়েছে। এটা নবী-রাসুলের জন্য পুরাতন সুন্নত। সুতরাং মনক্ষুণ্ণ হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
তদ্রূপ সাহাবায়ে কেরামও কঠোর পরিশ্রম এবং অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জান-মাল কুরবান করেছেন, আত্মীয়-স্বজনের গালি শুনেছেন, তাঁদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা সবকিছু সহ্য করে গেছেন। কখনও দীন প্রচারের কাজ বন্ধ করেননি, যাঁদের জান-মাল ইত্যাদির বিনিময়ে আজ পৃথিবীর সর্বত্র ইসলামের আলো পৌঁছে গেছে। এভাবে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণও দীনের দাওয়াত দিয়ে এসেছেন, অনেক কষ্ট করেছেন, অনেক সমালোচনা, গালি-গালাজের শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ আমাকে বলে, হুযুর! আপনাকে এত গালি-গালাজ করে আপনি তাদেরকে কিছু বলেন না কেন? আমি বলি, যেখানে সাইয়েদুল আম্বিয়া পর্যন্ত সমালোচনা, অপবাদ, বানানো-সাজানো কথা থেকে পরিত্রাণ পাননি সেখানে আমি পীর সাহেব, মৌলভী সাহেব কি? আমাদের তো তা শুনতেই হবে।
পীর সাহেব হুযুর বলেন, ভালো, সৎ ও নেককারদের বিরুদ্ধে সমালোচনা নুতন কোনো বিষয় নয়। সব সময়ই আল্লাহ তাআলা এমন সমালোচনাকারী ও শত্রুতাকারী সৃষ্টি করে রেখেছেন। কাজেই কেউ সমালোচনা বা শত্রুতা করলে করণীয় কি তা আল্লাহ পাক নির্ধারিত করে দিয়েছেন। যেমন কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে আরও বলেন,
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوًّا شَيْطِيْنَ الْإِنْسِ وَالْجِنْ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ . ‘আল্লাহ প্রত্যেক নবীর জন্য মানুষ এবং জিন জাতি থেকে একপ্রকার শত্রু তৈরি করেছেন যারা পরস্পর মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথাবার্তাকে
রূপ দিয়ে কানাকানি করে সোনালি রং মিশ্রিত করে অর্থাৎ মিথ্যাকে
সত্যের রং দিয়ে অন্যের কাছে তুলে ধরে একে অপরকে বলে।”
কেন বলে? তার উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য।’ অতঃপর আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তাদের অপবাদ, মিথ্যা রটানো, ভিত্তিহীন কথা বলা বন্ধ করতে পারতেন।’
সুযোগ দিয়েছেন বলেই তাদের বলা সম্ভব হচ্ছে, আল্লাহর ইচ্ছা হল তারা বলতে থাকুক। কেননা তাতে আল্লাহর নেক বান্দাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। মূলত আল্লাহ তাআলার নেক বান্দাদের মর্যাদা বৃদ্ধির কাজই তারা করতে থাকুক। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের সম্বোধন করে বলেন, হে বান্দা! তোমার কাজ তুমি করে যাও, তাদের এসব মিথ্যা কথার প্রতি কর্ণপাত করবে না, তাদেরকে অপবাদের কাজে ছেড়ে দাও।
রাসুল পাক-কে কাফেররা যাদুকর, পাগল ও কবি ইত্যাদি বলে সমালোচনা করেছিল, কিন্তু তিনি কোনো প্রতিবাদ করেননি, বরং সহ্য করে নীরবে দীন ও ইসলামের কাজ চালিয়ে গেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবীবকে সম্বোধন করে বলেন, তারা যা কিছু মিথ্যা বানানো-সাজানো কথা, অপবাদ ও অশ্লীল কথা আপনাকে বলে তার ওপর আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার, সদুপদেশ ও উত্তম চরিত্রের দ্বারা পরিত্যাগ করুন। শত্রু যদি সামনে আসে তাকে চাদর বিছিয়ে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে শত্রু আসলে চা-নাস্তার ব্যবস্থা করা এবং খানাপিনার ব্যবস্থা করাকে বলা হয় উত্তম চরিত্র দ্বারা পরিত্যাগ করা।
ইসলামের ঘোর শত্রুকেও রাসুলুল্লাহ নিজের চাদর বিছায়ে সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। মক্কার কাফেররা ঘোষণা করল যে, যে লোক মুহাম্মদ-এর মাথা কেটে আনতে পারবে তাকে একশত উট পুরস্কার দেওয়া হবে। এ ঘোষণার পর হযরত ওমর তরবারি হাতে নিয়ে বীর বিক্রমে বের হলেন, পথে একজন তাঁকে দেখে বলল, তুমি কোথায় যাচ্ছ? সেখানে যাওয়ার পূর্বে তোমার বোনের খবর নাও। হযরত মুহাম্মদ-এর দীন ইসলাম তোমার ঘরে ঢুকে গেছে। আগে নিজের ঘরকে হেফাজত কর, তারপর মুহাম্মদের মাথা নিয়ো।
অতঃপর বোনের ঘরে গিয়ে দেখেন, সে কি যেন একটি পাঠ করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কি পড়ছ? হযরত ওমর-কে দেখার সাথে সাথে তাঁর বোন সেই অংশটুকু লুকিয়ে ফেললেন। কিন্তু দূর থেকে কুরআনের আওয়াজ শুনেই বেসামাল হয়ে বোনকে বেধড়ক মারধর আরম্ভ করলেন। মারতে মারতে রক্তে রঞ্জিত করে দিল। পরিশেষে তাঁর মনে অনুভূতি জাগ্রত হল যে, এত মারধর করার পরও আমার বোন যখন তা দেখাচ্ছে না তবে দেখতে হবে, এটি কি জিনিস। হযরত ওমর আবারও তা দেখার জন্য পীড়াপীড়ি করলে তার বোন বলল, তুমি গোসল করে আস। এটি এমন জিনিস যা পবিত্র অবস্থা ছাড়া ধরা যায় না। তখন তিনি গোসল করে আসলেন এবং সুরা তোহার আয়াত শোনার পর কুরআনের তলোয়ারে তিনি পরাজিত হয়ে গেলেন। বোনকে বললেন, তোমার স্বামী কোথায়? তাঁকে ডেকো এবং বল আমাকে যেন সেই নবীর দরবারে নিয়ে যায়।
অতঃপর তাঁর ভগ্নিপতি তাঁকে নিয়ে সরকারে দোআলম-এর দরবারে নিয়ে হাজির হলেন। তাঁকে দেখে সাহাবায়ে কেরাম ভীত-সন্ত্রস্ত্র হলেন। কিন্তু নবী করীম বললেন, তোমরা তাঁকে বাধা দিয়ো না, তাঁকে আসতে দাও। নবীর দরবারে হাজির হয়ে হযরত ওমর বললেন, ওহে আল্লাহর নবী! ওমর আপনার বিরোধিতা করে সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমি পবিত্র কুরআনের আয়াত শুনে আমার অন্তর্চক্ষু খুলে গেছে। এখন আমাকে কালিমা পাঠ করিয়ে আপনার দলভুক্ত করুন। নবী করীম-এর এ ধরনের মহান চরিত্রের প্রশংসায় স্বয়ং আল্লাহ পাক বলেন, وَ إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ . ‘নিশ্চয় আপনি উত্তম চরিত্রের অধিকারী।”
এর দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম তরবারির জোরে প্রচারিত হয়নি, বরং উত্তম চরিত্র দ্বারা ইসলাম প্রসারিত হয়েছে।
পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণ ও সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও নির্যাতনের বর্ণনা দেওয়ার পর পীর সাহেব হুযুর মানুষের জন্য শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন। অপবাদকারী, সমালোচনাকারী ও শত্রুতাকারীদের মোকাবিলায় কোন ধরনের আচরণ করা যাবে সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ পাক আমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবীবকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন, ‘মন্দ ব্যবহার ও সৎ ব্যবহার কখনও এক নয়। মন্দ ব্যবহারের বদলা উত্তম ব্যবহার দ্বারা প্রতিশোধ গ্রহণ করুন। এভাবে যদি করা হয় তাহলে আপনার সাথে কারও শত্রুতা থাকলে সেও আপনার সাহায্যকারী বন্ধুতে পরিণত হবে।’
নবী করীম-এর শিক্ষা ও আদর্শ যদি ঘরে বাইরে সবখানে বাস্তবায়ন করা হয় তবে হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানি সব বন্ধ হয়ে যাবে। এ সম্পর্কে স্বয়ং রাসুল মকবুল ইরশাদ করেন, ‘যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে তার সাথে তুমি সম্পর্ক স্থাপন কর, তোমাকে যে অত্যাচার করেছে তাকে তুমি ক্ষমা কর এবং যে তোমার সাথে মন্দ ব্যবহার করেছে, ক্ষতি সাধন করেছে তার সাথে সদ্ব্যবহার ও তার মঙ্গল কামনা কর।’ কুরআন ও হাদীসের এ বাণীকে সামনে রেখে আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও আধ্যাত্মিক জগতের সুপ্রসিদ্ধ সাধক শেখ সা’দী বলেছেন,
بدی را بدی سہل باشد جزا ہیں اگر مردی احسن الی من اسا
‘মন্দের বদলা মন্দ দ্বারা, হত্যার বদলা হত্যা দ্বারা, গুলির বদলা গুলি করে দেওয়া অতি-সহজ।’২
এতে বিদ্যা-বুদ্ধির দরকার হয় না, কোনো ডিগ্রিরও প্রয়োজন হয় না, তা যে কেউ দিতে পারে। কিন্তু যদি আল্লাহ তাআলার প্রকৃত বান্দা ও মুমিন বান্দা হয়ে থাক তবে অত্যাচার ও জুলুমের প্রতিদান ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে দাও। আসলে গালির প্রতিদান সালাম দ্বারা দেওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। ভেবে দেখা উচিত, নবী করীম গালির প্রতিশোধ, পাথরের প্রতিশোধ কেন গ্রহণ করেননি। কারণ আল্লাহ হুকুম দিলেন, ‘আপনি দীনের কাজ করে যাচ্ছেন, আল্লাহর কাজ, সমাজের কাজ, এতিম-অসহায় ও বিধবার খেদমত করে যাচ্ছেন। এতে শত্রুরা যতই গালি-গালাজ করুক, সমালোচনা করুক, পাথর নিক্ষেপ করুক না কেন আপনি অসীম ধৈর্যের সাথে আপনার কাজ করে যান, যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য অসীম ঈমানি শক্তির প্রয়োজন হয়। এ মহান উদ্দেশ্যেকে সামনে নিয়েই এ ধৈর্য ধারণ। এ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ পাক বলেন, এ ধৈর্য ও ত্যাগ একমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে। কেননা আল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ .
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যধারণকারীদের সাথেই আছেন।”
তাই বড় বড় মনীষী ও আল্লাহর অলীগণ সবর বা ধৈর্য ধারণ করেছেন। হযরত নিযাম উদ্দীন আউলিয়া-এর সুযোগ্য খলীফা হযরত আমীর খসরু ফরমায়েছেন,
ما شاخ در ختیم و پر از میوه توحید ہر رہگذری سنگ زند باک نداریم
আমরা হলাম মা’রিফত ও তাওহীদের এক বিরাট ফলবান বৃক্ষ। পথচারী যখন গাছে ফল দেখে তখন সে দিকে ঢিল পাথর ছুড়ে, কিন্তু সে ঢিলের বিনিময়ে গাছ তাকে ফল দান করে।’
বায়তুশ শরফের বিরুদ্ধে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে পীর সাহেব হুযুর বলেন, আমরাও হলাম তাওহীদের ফলের বৃক্ষ এবং রাস্তার ধারেও বটে। তাই বায়তুশ শরফের ওপর সবার চোখ পড়ে। এ কারণে দুষ্ট লোকেরা যাওয়ার সময় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে, গালি-গালাজ করে। বাংলাদেশে কত পীর আছেন, কত দরবার আছে। অথচ সব আক্রমণ বায়তুশ শরফের ওপর। তবে আমাদের নীতি হচ্ছে, যে আমাদেরকে ঢিল মারবে তাদের আমরা ফুল দেব। যে আমাদেরকে গালি দেবে তার হিদায়তের জন্য আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করবো। হাফিয শিরাযী বলেন,
کم مباش از درخت سایه مکن هر که سنگت زند ثمر بخشش
তুমি যদি আল্লাহর খাঁটি বান্দা, হক্কানি আলেম, নায়েবে রাসুল বা পীর হও তবে গাছের মতো ফল দান কর। গাছের ছায়ার নীচে বসে কেউ প্রথমে ঢিল ছুঁড়ে, ইট মারে বা লাঠি মারে, তাহলে গাছ নিজের ডাল ভেঙে তাকে আঘাত করে না, বরং ফল দান করে। আমরাও তদ্রূপ ফল দান করবো। এ কারণে এভাবে আল্লাহর নেক বান্দাদের ওপর নির্যাতন, সমালোচনার ঝড় আসাটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
আল্লাহর নবী হযরত মুসা এ-এর যুগের শ্রেষ্ঠ ধনী ছিল কারুন। সে অত্যন্ত কৃপণ ছিল, দান-খয়রাত করত না। হযরত মুসা তাকে নসিহত করেন, ‘হে কারুন! তোমাকে আল্লাহ যতেষ্ট ধন-দৌলত দান করেছেন, তা থেকে আল্লাহর রাস্তায় কিছু দান-খয়রাত কর। সমাজে অসহায়, এতিম-মিসকিন ও বিধবার খোঁজ-খবর নাও। তোমাকে যেভাবে আল্লাহ তাআলা ইহসান করেছেন, তুমিও সমাজের এতিম, গরিব-মিসকিনকে সেভাবে ইহসান কর।’ কুরআন শরীফে আছে,
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّابِلِ وَالْمَحْرُومِ .
‘ধনীদের ধন-সম্পদে গরিব-অসহায়দের হক রয়েছে।”
কিন্তু জবাবে অহংকারী কারুন বলল, আমাকে ধন-সম্পদ আল্লাহ দেননি, আমার বিদ্যা-বুদ্ধির বদৌলতে আমি এ ধন-সম্পদ লাভ করেছি। হযরত মুসা এ বললেন, ‘তুমি গর্ব করো না, আল্লাহ গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।’
আল্লাহর রাস্তায় দান করা ও গর্ব না করা সম্পর্কে উপদেশ দেওয়ার কারণে কারুন হযরত মুসা-এর ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে গেল এবং তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করল। পরিশেষে পরিকল্পিতভাবে মুসা-কে সমাজে কলঙ্কিত করার জন্য এক গর্ভধারিনী মহিলাকে হাজির করে বলল, হে সমাজের লোকেরা! দেখ, তোমরা যাকে নবী বলে গ্রহণ করেছ, সে কি কুকর্ম করেছে? তখন হযরত মুসা এ নিরুপায় ও হতভম্ব হয়ে চুপ করে থাকেন।
আল্লাহ তাঁর নবীকে পবিত্র ও নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য তাঁকে জানিয়ে দিলেন, ‘হে মুসা! তুমি তাদেরকে ওই মহিলার পেটের ভেতর যে বাচ্চা আছে তার থেকে জিজ্ঞাসা করতে বল, সে কার জন্ম? পেটের ভেতরের বাচ্চা থেকে জিজ্ঞাসা করা হলে বাচ্চা উত্তর দিল, আমি মুসা এ-এর থেকে জন্ম লাভ করিনি। অমুক ব্যক্তি কর্তৃক আমার জন্ম। অতঃপর মহিলা থেকে জিজ্ঞাসা করা হলো। তুমি নবীর ওপর এ মিথ্যা অপবাদ কেন দিয়েছ? মহিলা বলল, আমাকে প্রলোভন দিয়ে একথা বলানো হয়েছে। ভাইগণ! দেখুন, আল্লাহর নবী পর্যন্ত অপবাদ, সমালোচনা ও ষড়যন্ত্র থেকে নিষ্কৃতি পাননি, অন্যান্যদের কথা আর কি বলবো! এভাবে কুরআন হাদিস না কদিম (নশ্বর না চিরন্তন) মতভেদকে কেন্দ্র করে হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল-কে প্রায় ২৮ মাস যাবৎ জেলখানায় আবদ্ধ করে হয়। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এ-এর মত ছিল, কুরআন কদিম আর তৎকালীন শাসকের মত ছিল কুরআন মখলুক ও হাদিস। অবশ্য সাধারণের মাঝে এসব কথা আলোচনা করার কথা নয়, এগুলো বিজ্ঞ সুধী সমাবেশের বিষয়। যা হোক, মিথ্যাবাদীরা তাঁকে তাঁর মতবাদ থেকে বিরত রাখার জন্য অনেক নির্যাতন করত। প্রত্যেক দিন তাঁকে বেত্রাঘাত করা হত। বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে সে যুগের অধিকাংশ আলেমকে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এ-এর বিপক্ষে নেওয়া হয়।
একবার চিন্তা করে দেখুন, যে শক্তিশালী বাদশাহ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল-এর ওপর অত্যাচার করেছিল এ পৃথিবীর বুকে আজ তার কোনো নাম-গন্ধ নেই। কিন্তু ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল-এর অভিমতের ওপর আজ সারা বিশ্বের আলেমগণ একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অনুরূপভাবে ইতিহাসের প্রতি আরও একটু লক্ষ করুন, হযরত ইমাম আবু হানিফা যাকে ইমাম আযম বলা হয়, নবী করীম যাকে (আমার উম্মতের উজ্জ্বল বাতি) বলে উপাধি দান করেছেন সে ইমামকে তৎকালীন শাসক প্রস্তাব দিলেন, আপনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করুন, কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, আমি উক্ত কাজের যোগ্য নই।
একশ্রেণির সরকারি আলেম বাদশাহকে উসকানি দেওয়ার জন্য বলল, ইমাম আবু হানিফা বাদশাহর আদেশ অমান্য করে চরম দৃষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন, আসলে এ কাজের জন্য তিনিই উপযুক্ত, তিনি মিথ্যা বলেছেন। তখন তিনি বললেন, ‘আমার মতো একজন মিথ্যাবাদীকে কেন বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত করতে চাও?’ আসলে তিনি যোগ্য ছিলেন, কিন্তু যেহেতু তাঁর বিচার হবে কুরআন-হাদীসের দৃষ্টিতে, আর বাদশাহ বিচার করতে বলবে তার মনগড়া সুবিধা নীতি দিয়ে। সেজন্য তিনি অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন। অতঃপর অবাধ্যতার কারণে তাঁকে জেলখানায় বন্দি করা হল। সেখানেই তিনি ইহজগৎ ত্যাগ করেন। তবুও তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব ও আদর্শকে জলাঞ্জলি দেননি।
হযরত ইমাম শাফিয়ী এও একজন সর্বজন স্বীকৃত ইমাম ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা হলাম হযরত ইমাম আবু হানিফা-এর সন্তানের মতো। তাঁর মাযহাব, ইমাম আবু হানিফা এ-এর মাযহাব, ইমাম মালিক এ-এর মাযহাব ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এ-এর মাযহাব এ চার ইমামের মাযহাবের মধ্যে অনেক ব্যবধান ও মত-পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববাসী সব মাযহাবকে সঠিক ও সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। শরীয়তে এক ইমামের অনুসারী অন্য ইমামের পিছনে সেই মাযহাব অনুযায়ী নামাজ পড়া বৈধ ঘোষণা করেছে।
একদিন হযরত ইমাম শাফিয়ী তাঁর শিষ্য ও ভক্তবৃন্দকে নিয়ে হযরত ইমাম আবু হানিফা এ-এর মাযার যিয়ারত করতে যান। সেখানে তিনি দুই রাকআত নামাজ আদায় করলেন। তাতে তকবীর তাহরীমার সময় হাত উঠালেন। সম্পূর্ণ নামাজে আর একবারও হাত উঠাননি। অতঃপর নামাজ শেষে তাঁর ভক্তবৃন্দ ও শিষ্যরা জিজ্ঞাসা করলেন, হুযুর! আপনি একজন মাযহাবের ইমাম, আজ কেন এভাবে নামাজ পড়লেন বুঝে আসেনি। এর কারণ কী?
তিনি উত্তরে বললেন, বিশ্ববিখ্যাত ইমাম হযরত ইমাম আবু হানিফা -এর মতো একজন মহাপুরুষ এ মাযারে শায়িত আছেন, মসজিদ-সংলগ্ন তাঁর মাযার। হযরত শাফিয়ী এ বলেন, তাঁর মতো এক প্রখ্যাত ইমামের দরবারে এসে তাঁর মাযহাবের বিপরীত নিয়মে নামাজ পড়তে লজ্জাবোধ হয়েছে বিধায় আমার মাযহাবকে বাদ দিয়ে তাঁর মাযহাবের অনুসরণ করলাম, সুবহানাল্লাহ। ভাইগণ! আপনারা দেখুন, একজন মহাপুরুষের সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে ইমাম শাফিয়ী নিজের মত ও নীতিকে পর্যন্ত পরিহার করলেন। এ ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা দরকার।
আলোচনার একপর্যায়ে উস্তাদ শাগরেদের সম্পর্ক ও উস্তাদের প্রতি করণীয় সম্পর্কে পীর সাহেব কেবলা বলেন, হযরত ইমাম আবু হানিফা এ-এর মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি হওয়ার কারণ কি জানেন? একদিন হযরত ইমাম আবু হানিফা হাদীসের দরস দিচ্ছিলেন? অনেক শিষ্য ও ভক্ত উপস্থিত ছিলেন। তিনি হঠাৎ কিতাব বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেলেন। সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেল। বিনাকারণে হুযুর কেন দাঁড়িয়ে গেলেন বুঝতে না পেরে তারা হুযুর থেকে জিজ্ঞাসা করলেন। ইমাম আবু হানিফা উত্তর দিলেন, ‘পড়নোর সময় হঠাৎ দেখলাম একজন জেলের ছেলে আসছে। তার সম্মানার্থে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম।’ শিষ্যরা বলল, জেলের ছেলেকে আপনার সম্মান করার কি অর্থ থাকতে পারে? ইমাম আযম বললেন, ‘সে হল আমার ওস্তাদের ছেলে।’ তারা বলল হুযুর! আপনি এত বড় শরীয়তের আলেম, মহান ইমাম, জেলের নিকট আপনি কি শিক্ষা লাভ করেছেন? তিনি বললেন, ‘একবার কোনো এক ব্যক্তি আমার নিকট প্রশ্ন করেছিল, হুযুর! কুকুর কখন বালেগ হয় বলুন। আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধি সব ব্যয় করার পরও এ মাসআলা কোথাও পেলাম না এবং তার প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে চিন্তিত হয়ে বসে আছি।
তখন এক জেলের সাথে দেখা হল। তিনি আমাকে বললেন, আপনি আজ এত চিন্তিত কেন? আমি তাকে বললাম, তোমাকে বলে কি লাভ? বললাম, পুরুষ কখন বালেগ হয় ও স্ত্রী কখন বালেগা হয় তা আমি জানি। কিন্তু কুকুর কখন বালেগ হয়, তা অবগত নই। এখন আমি এ ব্যাপারে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি, উত্তর দিতে পারিনি বলে চিন্তাযুক্ত হয়ে বসে আছি। জেলে তখন বলল, এটা তো কোনো জটিল সমস্যা নয়। জেনে রাখুন, কুকুর যখন পা উঠিয়ে প্রস্রাব করে, বুঝতে হবে তখন কুকুর বালেগ হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা এএ এ মাসআলা শিখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন। ইমাম আবু হানিফা-এর মতো একজন মহাজ্ঞানী যদি জেলে ও তার ছেলেকে সম্মান করেন তাহলে তাঁকে কেন দুনিয়া স্মরণ করবে না?
এত বড় শরীয়তের জ্ঞান-ভাণ্ডারের অধিকারী হয়েও যদি বলেন, আমি জানি না। আর আমরা দুয়েকটি কিতাব পড়ে যদি বলি, আমি সব জানি আমি যা বলি তা সত্য ও সঠিক তা শোভা পায় না। জ্ঞান আমারটাই সর্বোত্তম এমন কথা কেউ বলতে পারে না। আল্লাহ পাক বলেন, প্রত্যেক জ্ঞানীর ওপর মহাজ্ঞানী আছেন, প্রত্যেক বুদ্ধিমানের ওপর শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান আছেন।
তিনি বলেন, যাদের বংশ একটু নিম্নমানের, ইতর পরিবারের ছেলে, তাদের পক্ষে এ ধরনের কথা বলাটা স্বাভাবিক। অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্কর। সুতরাং মানুষও জ্ঞানের গুণ দ্বারাই মানুষে মানুষে আকাশ-পাতাল তফাৎ হয়ে যায়। উল্লিখিত ইমাম শাফিয়ী-এর ঘটনাকে লক্ষ করলে আমরা অনুধাবন করতে পারি যে, তিনি একজন মাযহাবের অন্যতম ইমাম হওয়া সত্ত্বেও হযরত ইমাম আবু হানিফা-এর প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন তা তাঁর ইলম ও মর্যাদাকে বৃদ্ধি করেছে।
জ্ঞান-বুদ্ধি কি জিনিস তা অন্যতম সাধক মাওলানা রুমী মসনবী শরীফে সুন্দর বলেছেন, ভোমরা যখন বিভিন্ন বাগানেরর ফুলের রস আহরণ কর তখন তা দংশনকারীর বিষে পরিণত হয়, কাউকে কাটলে তার ব্যথা-বেদনায় সে অস্থির হয়ে যায়। পক্ষান্তরে মৌমাছি যখন বিভিন্ন বাগানের ফুলের রস আহরণ কর তা মধুতে পরিণত হয়ে যায়। একই বাগানের ফুল এবং একই ফুলের রস ভোমরা নিলে বিষ এবং মৌমাছি নিলে সুমিষ্ট মধু হয়ে যায়।
বর্ণিত আছে, একদিন রাসুলুল্লাহ-এর সাথে মৌমাছির কথাবার্তা হল। ‘তোমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৌমাছি, কিভাবে তোমরা অতুলনীয় দ্রব্য সৃষ্টি কর?’
এমন কিছু কথা ও বিষয় দ্বারা সমাজের সরলমনা মুসলমান ভাইদেরকে বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ করা হচ্ছে, যা বায়তুশ শরফের ধারে-কাছেও নেই। আমাদের দোষ-ত্রুটি ধরার জন্য যোগ্য ব্যক্তি ও বিজ্ঞ আলেমের প্রয়োজন। আমরা যেকোনো বিষয় যাচাই-বাছাই করে বলে থাকি। কারণ আমাদের মধ্যে জ্ঞানী লোক আছেন। সুযোগ্য আলেম-ওলামা ও চিন্তাবিদগণের সাথে আমাদের ওঠা-বসা আছে। যখন কোনো বিষয় সম্পর্কে বড় বড় শিক্ষিত অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ ও হক্কানি আলেম-ওলামা স্বীকৃতি প্রদান করেন তখন তাতে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। আর না বুঝে বা উলটো বুঝে যদি কেউ গালি দেয় বা সমালোচনা করে তাতে করার তো কিছুই নেই। এটা তো নতুন কোনো কিছু নয়, চিরাচরিত নিয়ম। এরা আসলে আমাদের চেহারাই দেখতে পারে না। আমি আপনাদের উদ্দেশে একটি রসালো দৃষ্টান্ত দিচ্ছি,
এক ব্যক্তি তার ছেলের জন্য একটি নতুন বউ আনল। পাশের বাড়ির এক বুড়ি নতুন বউ দেখার জন্য লাঠির ওপর ভর দিয়ে তার বাড়িতে ঢুকল।
বুড়ির দৃষ্টি শক্তি ছিল কম। বউয়ের ঘরে ছিল এক আয়নাঅলা আলমারি। ঘরে ঢুকতেই হঠাৎ করে বুড়ির চোখ সে আয়নাতে গিয়ে পড়ল। আয়নাতে বুড়ি নিজের ছবি দেখে মনে করল এটাই বুঝি নতুন বউ। অথচ বুড়ি এখনও আসল বউ দেখতে পায়নি। আয়নার মধ্যে নিজের ছবি দেখে বলে ওঠল, হায়! এত টাকা খরচ করে কষ্ট স্বীকার করে এ লোকটি তার ছেলের জন্য আমার মতো এক বুড়ি কি করে আনল, দেশে কি মেয়ের অভাব ছিল? একটু ভেবে-চিন্তে কেন কাজটা করল না।
হুযুরের সমালোচনাকারী জনৈক আলেমের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, কেউ কেউ বলে, হুযুর! আপনি তার উস্তাদ বলে শোনা যায়, সে কেন আপনাকে গালি দেয়, আপনার সমালোচনা করে? আমি বলি, উস্তাদ হলে কি হবে, শিং মাছ এমন এক ধরনের মাছ সে কাউকে চেনে না, যাকে পায় তাকে কাটা মারে। মালিকও চেনে না, আপনও চেনে না, পরও চেনে না। এটা আমার কথা নয়, শেখ সা’দী বলেছেন,
তার স্বভাব হল কাঁটা বিদ্ধ করা। যাকে পায় তাকে কাটা মারে। হিংসা-বিদ্বেষ করে মারে না, বরং তার অভ্যাস সে রকম। হযরত শেখ সা’দী আরও বলেন, সমুদ্রের নিচে যে ঝিনুক আছে সেই ঝিনুক ভাদ্র মাসে পানির ওপর এসে এক ফোটা বৃষ্টির পানি গ্রহণ করে পানির নীচে চলে যায়, ফলে তার মধ্যে মুক্তা তৈরি হয়। তদ্রূপ কুকুরও ভাদ্র মাসে সেভাবে মুখ খুলে দাঁতের মধ্যে বৃষ্টির পানি গ্রহণ করে। তখন ওই পানি দ্বারা তার মধ্যে বিষ পয়দা হয়। কাউকে সে কামড় দিলে মানুষ মরে যায়, মহিলাকে কামড় দিলে পেটে কুকুরের বাচ্চা জন্মে। একই বৃষ্টির ফোটা দ্বারা একদিকে মুক্তা তৈরি হয় অপরদিকে তৈরি হয় বিষ।
নবী করীম ইরশাদ করেছেন, ‘অযোগ্য পাত্রে ইলম রাখা শুয়োরের গলায় স্বর্ণ ও মুক্তার হার পরানোর মতো।’ তিনি ইসলামের সুন্দর শিক্ষার দিকে মনোযোগ আকৃষ্ট করে বলেন, নবী করীম ইরশাদ করেন, ‘কারও দোষ তালাশে লিপ্ত হয়ো না। কারও পিছনে উঠে পড়ে লেগো না।’ মানুষকে বিভ্রান্তির ঘূর্ণিপাকে নিক্ষেপ করা উচিত নয়। যেমন- নবী কি মাটির মানুষ না
Leave a Reply