বায়তুশ শরফ প্রতিষ্ঠার গোড়ার কথা

১৯৯০ সালে আল-আসরারের বিশেষ সংখ্যার কাজ যখন পুরোদমে চলছিল এবং আমরা বায়তুশ শরফ ও বায়তুশ শরফের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুল আলম শাহ সুফি মীর মুহাম্মদ আখতার সম্পর্কিত কিছু মৌলিক তথ্য পাঠক-সমাজের কাছে উপহার দিতে সচেষ্ট, তখন ৭ জানুয়ারি ১৯৯০ নোয়াখালীর চরজব্বার (রামগতি) ইউনিয়ন পরিষদে অনুষ্ঠিত এক মহতী মাহফিলের মাধ্যমে কিছু মূল্যবান তথ্য আমাদের সামনে আসে।

চরজব্বারে নির্মাণাধীন বায়তুশ শরফ মসজিদের প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক মাহফিলে পীর সাহেব কেবলা ৯-এর ভাষণের মাধ্যমেই আমরা এ তথ্য লাভ করতে সক্ষম হই। অন্য কোনো আলেম বা মনীষীর মাধ্যমে এসব অমূল্য তথ্য হস্তগত হওয়া সম্ভব নয়। তাই সেই ভাষণটির সারসংক্ষেপ বিজ্ঞ পাঠক-পাঠিকাদের খেদমতে টেপরেকর্ড থেকে লিপিবদ্ধ করে পেশ করা হলো। সম্পাদক

নোয়াখালীর চরজব্বার ইউনিয়নে বায়তুশ শরফ মসজিদের প্রাঙ্গণে প্রদত্ত ভাষণে পীর সাহেব কেবলা চট্টগ্রাম মসজিদ বায়তুশ শরফ প্রতিষ্ঠালগ্নের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফের সুন্দর নামটি চয়ন করেছেন আমার পীর-মুরশিদ কুতুবুল আলম শাহ সুফি হযরত মাওলানা মীর মুহাম্মদ আখতার। তিনি জীবনে ২৯ বার হজ করার পর ১৯৭১ সালের শুরুতে শেষ হজে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। আরাফাত থেকে মিনা গিয়ে সেখানেই তিনি হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন এবং আল্লাহর ঘরের পাশে জান্নাতুল মুআল্লায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। তখন আমিসহ আরও ৬ জন তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম। তিনি আল্লাহর ঘরকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। এজন্য প্রতিবছর হজের মৌসুম এলে তিনি হজে যাওয়ার জন্য পাগলের মতো হয়ে যেতেন।

পাকিস্তান আমলে হাজীদের কোটা নির্ধারিত থাকায় পুরোনো হাজীকে হজে যাওয়ার সুযোগ কম দেওয়া হতো। এমন পরিস্থিতিতে তিনি মিসর, লেবানান বা অন্য কোনো বাইরের রাষ্ট্রে চলে যেতেন এবং সেখান থেকে পবিত্র হজে গমন করতেন। এভাবে তিনি জীবনে ২৯ বার হজ করেন। তার হজ-সফরের সম্বল ছিল একটি টিনের বাক্স আর একটি চামড়ার ব্যাগ। তাতে ব্যবহারের অল্পকিছু কাপড় থাকত আর ছোট বাক্সটিতে থাকত কাফনের কাপড়। তিনি সবসময়ই কাফনের কাপড় সঙ্গে রাখতেন। বাক্সের মধ্যে মক্কা শরীফের অল্প মাটিও রাখতেন। তিনি আমাদের বলতেন, ‘মক্কা-মদীনার মাটি যদি নসিব নাও হয় তাহলে যেখানে আমার মৃত্যু হয় অন্তত সেখানেই এ মাটিখানি আমার কবরে দিয়ে দিয়ো।’ তাঁর এই মহব্বত ও খুলুসিয়তের বরকতেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে চিরতরে মক্কা শরীফে রেখে দিয়েছেন।

তিনি যখন বায়তুশ শরফ মসজিদে সর্বপ্রথম জুমা পড়ান তখনও মসজিদের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। তিনি (বাড়ি থেকে) বায়তুশ শরফ আসলে মসজিদের সামনেই একটা রুমে বসতেন। পরে সেখান থেকে চলে যেতেন। সেদিন মসজিদে জুমা পড়ে তিনি এ রুমে গেলেন আর আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করছি যে, আমি যদি নাও থাকি, তোমরা এই ঘরে বসে আল্লাহ আল্লাহ করতে পারবে।’ ইঙ্গিত হিসেবে তিনি একথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি যে, তিনি বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমি আমার দায়িত্ব তোমাকে দিয়ে গেলাম। আমি যেখানেই থাকি না কেন আমার রুহ বায়তুশ শরফের সাথে থাকবে।’ একথা বলে তিনি চলে গেলেন। এরপর আর বায়তুশ শরফে আসার সুযোগ হয়নি তাঁর।

বায়তুশ শরফ প্রতিষ্ঠার পেছনে আল্লাহর এই মকবুল অলীর খুলুসিয়তের কথা বলছি, তিনি যখন বায়তুশ শরফ মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তখন আমরা কেউ জানতাম না। অথচ নিয়ম ছিল যে, তিনি যখন কোনো কাজের উদ্যোগ নিতেন আমাকে চট্টগ্রাম পাঁচলাইশ ওয়াজেদিয়া আলিয়া মাদরাসা থেকে লোক মারফত ডাকতেন। এরপর আমাকে বলতেন, ‘একটা কাজ শুরু করা হয়েছে কিংবা ওই দিকে সফরের নিয়ত রয়েছে, তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবে।’ এসব কাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাকে সাথে রাখতেন। সেই সময় আমি সপ্তাহে দুই-তিনবার (চট্টগ্রাম) শহরে আসতাম। তাঁর সাথে জুমার নামাজ আদায় করতাম। অথচ তিনি যে বায়তুশ শরফ মসজিদের ভিত্তি দিয়েছেন তা আমাকেও জানাননি।

আমি প্রথম যে-বার বায়তুশ শরফ মসজিদ প্রতিষ্ঠার সংবাদ পাই, তখনকার ঘটনা ছিল, একদিন তিনি কোথাও সফরে যাচ্ছেন। তখন নিজ বাড়ি থেকে (পূর্ব মাদারবাড়ি) বের হয়ে গন্তব্যের বিপরীত দিকে গাড়ি ফেরানোর জন্যে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন। কিছুদূর গিয়ে বর্তমানে যেখানে চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফের গেইট সেখানে এসে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিলেন। তাকিয়ে দেখলাম, একটি দালান কিছুদূর উঠেছে এবং সামনে কিছু ইট রয়েছে। এই প্রথম আমি বায়তুশ শরফ মসজিদ দেখতে পাই। মসজিদের কখন ভিত্তি দেওয়া হয়েছিল তা আমি জানতাম না। তবে যতদূর মনে পড়ে, পীর সাহেব কেবলা ইঙ্গিতে এতটুকু বলতেন যে, ‘একটা কাজ শুরু করা হয়েছে, আল্লাহর কাছে দোয়া করবে।’ স্পষ্টভাবে মসজিদ নির্মাণের কথা বলেননি।

মূলত গোপনভাবে আল্লাহর জন্য কাজ করাটাই তিনি পছন্দ করতেন। পবিত্র হজে যাওয়ার আগেও তিনি প্রচার করতেন না। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই বলতেন। আখতারাবাদ (কুমিরাঘোনা) মাহফিলের বেলায়ও তাঁর এই নিয়ম ছিল। চট্টগ্রাম শহর থেকে দূরে (কক্সবাজার যাওয়ার মাঝ পথে) এক নিভৃত পল্লীতে বায়তুশ শরফের এই বার্ষিক মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই মাহফিলে ওয়াজ-নসিহত আর যিকির-আযকারের তা’লীমই দেওয়া হয়। প্রতিবছরই এই বিশাল মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে সকল কাজ প্রতিবছর নির্দিষ্ট তারিখে করার ব্যাপারে এখতেলাফ রয়েছে বিধায় তিনি এই মাহফিল প্রতিবছর নতুন নতুন তারিখে করতেন। তাঁর নিয়মে আমরাও ভিন্ন ভিন্ন তারিখে মাহফিল করে থাকি।

এছাড়া কোনো হ্যান্ডবিল, পত্রিকা, পোস্টার, মাইকিং কিছুই নেই। তিনি শুধু এক সপ্তাহ আগে মসজিদে ঘোষণা করতেন, ‘আগামী অমুক তারিখে ইনশাআল্লাহ আখতারাবাদ (কুমিরাঘোনা) মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। মাহফিলের কামিয়াবির জন্য সবাই আল্লাহর দরবারে দোয়া করবেন।’ সেই একই নিয়মেই তা এখনো অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর রুহে ব্যাথা পাবেন এজন্য আমরাও মাহফিলের জন্য কোনো প্রচার করি না। তবে যেহেতু সারা দেশে আমাদের তরীকত ছড়িয়ে পড়েছে, সেজন্য পূর্বের তুলনায় মাত্র দুই-চার দিন আগে আমরা মসজিদে মাহফিলের তারিখ ঘোষণা দিই। কারণ বিদেশেও অনেক লোক মাহফিলের তারিখ কখন ঘোষণা হবে তার জন্য অপেক্ষায় থাকেন এবং শুধু আমাদের দোয়ার জন্য এই মাহফিলে শরিক হন।

বলছিলাম, বায়তুশ শরফের কথা। দেখুন এত গোপনীয়ভাবে বায়তুশ শরফের ভিত্তি দেওয়া সত্ত্বেও আজ সারা দেশে এর নাম কত ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং হচ্ছে। তিনি যেহেতু এ মসজিদকে আল্লাহর দরবারে মঞ্জুর করেছেন এজন্য আজ চতুর্দিকে এর ডঙ্কা বাজছে।

ইখলাসের ওপর কাবা শরীফের ভিত্তি ও পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণের পেছনেও আল্লাহর মহান পয়গাম্বর হযরত ইবরাহীম -এর ইখলাস ও ঐকান্তিকতার ভূমিকা রয়েছে যে কারণে দিন-দিন এর শান বৃদ্ধি পাচ্ছে। হযরত মাওলানা রুমী এ সেই স্মৃতিচারণ করে বলেছেন,

کعبه را کش ہر دمی عربی فزود و ☆ آن از اخلاصات ابراهیم بود

‘যতই দিন-কাল অতিক্রান্ত হচ্ছে ততই কাবা শরীফের শান, মরতবা ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর আল্লাহর ঘরের যিয়ারতকারী হাজীর সংখ্যা বাড়ছে। এর কারণ হলো হযরত ইবরাহীম নিখুঁত ইখলাসের ভিত্তিতে পবিত্র কাবা ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছেন।

কাবাঘর নির্জন মরুভূমির পাহাড়-ঘেরা এক নীচু জমিতে অবস্থিত ছিল।

তখন চতুর্দিকে হারাম শরীফের আরও পাশ ঘেঁষে পাহাড় ছিল। এখন অবশ্য পাহাড় কেটে চৌহদ্দি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সফা-মারওয়া পাহাড় এখন হারামের ভেতরে। হযরত ইবরাহীম আপন সন্তান হযরত ইসমাঈল-কে সাথে নিয়ে নির্জন প্রান্তরে একান্ত ইখলাসের সাথে একাজ করেছিলেন। তাই আল্লাহ পাক তাঁর এই খেদমতকে কবুল করেছেন। এমনকি কাবাঘর নির্মাণের সময়ই আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম-এর সাহায্যের জন্য ফেরেশতাদের

মাধ্যমে একটি পাথর পাঠিয়ে দেন যা কাবা শরীফ নির্মাণের সময় সিঁড়ির কাজ দিত। কাবা শরীফের দেয়াল যতই উপরে উঠত ততই পাথরখানি আপনা আপনি উপরে উঠে যেত।

আল্লাহর ঘর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর আল্লাহ পাক হযরত ইবরাহীম

-কে নির্দেশ দিলেন, ‘হে ইবরাহীম! এখন দুনিয়ার মানুষকে আমার ঘর তওয়াফ করতে আসার জন্য ডাক দাও। হযরত ইবরাহীম আরজ করলেন, আমি যত বড় চিৎকার দিয়ে ডাক দেই না কেন তা তো তোমার ঘর-বেষ্টিত পাহাড়ও অতিক্রম করতে পারবে না। আল্লাহ পাক বললেন, ‘তুমি ডাক দাও, সে ডাকের আওয়াজ পৌছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।’ তখন হযরত ইবরাহীম যেহেতু আল্লাহর প্রতি একান্ত তাওয়াক্কুল ও ইখলাস নিয়ে ডাক দিয়েছিলেন। সেহেতু তাঁর আওয়াজ দুনিয়ার সর্বত্র আগত-অনাগত সব মানুষের কানে পৌঁছে গেছে। এমনকি যারা মায়ের পেটে বা পিতার পিঠে ছিল তারাও রুহের জগতে সে ডাক শুনতে পেয়েছে। ডাক শুনে আদম-সন্তানের মধ্যে যারাই লাব্বাইক বলে সাড়া দিয়েছিল জীবনে তারাই আল্লাহর ঘরে গিয়ে হজ করার পরম সৌভাগ্য লাভ করেন। হযরত ইবরাহীম-এর সেই ডাকের জবাব হিসেবে হাজীগণ হজের সময় কুরবানি দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বলতে থাকেন,

لبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَوَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ».

‘আমি হাজির! ইয়া আল্লাহ! তোমার বান্দা তোমার দরবারে উপস্থিত। সমস্ত প্রশংসা ও সকল অনুগ্রহ-নেয়ামত, যাবতীয় রাজ্য ক্ষমতা একান্ত তোমারই, তোমার কোনো শরিক নেই।”

পবিত্র হজের বিশাল রুহানি যিয়াফতের মেজবান হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। আর হযরত ইবরাহীম হচ্ছেন আহ্বানকারী। এজন্য পবিত্র হজে গমনকারীরা স্বয়ং আল্লাহ তাআলার মেহমান। হজ ও ওমরা পালনকারী প্রত্যেকেই আল্লাহর মেহমান। এই ঘটনায় আমাদের জন্য শিক্ষনীয় হলো, হযরত ইবরাহীম ইখলাসের সাথে আল্লাহর ঘর নির্মাণ ও সেই ঘর যিয়ারতের জন্যে ডাক দেওয়ার কারণে আবহমানকাল ধরে সেই ডাকের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে দুনিয়ার সর্বত্র। সেই ঘরের সম্মান আর মর্যাদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনের পর দিন। বায়তুশ শরফ মসজিদের বেলায়ও আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহর অলীর খুলুসিয়তের বদৌলতে অতি-গোপনভাবে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হলেও আজ সারা দেশে এ মসজিদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর প্রতি সর্বশ্রেণির সকল মানুষের ভক্তি ও আকর্ষণ বিদ্যমান রয়েছে। আপনারা যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের অজান্তেই বায়তুশ শরফ মসজিদ প্রতিষ্ঠার মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, সেটাও এই আকর্ষণের অন্যতম প্রমাণ। এই মসজিদ প্রতিষ্ঠার ফলে এর সাথে আমাদের এক ঈমানি মহব্বত কায়েম হয়ে গেছে।

সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য পূরণের মাধ্যম মসজিদ

প্রদত্ত ভাষণের একপর্যায়ে মসজিদের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর বুকে প্রথম যে ঘরটি নির্মিত হয় সেটি ছিল মসজিদ। অর্থাৎ

১ আল-বুখারী, আস-সহীহ, খ. ২, পৃ. ১৩৮, হাদীস: ১৫৪৯, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *