আমার বড় ভাই (মঞ্জু) ছোট বেলায় অতিশয় দুর্বল, রুগ্ন ছিল। আব্বা মানত করলেন আমার ভাই যদি ভাল হয়ে যায় তবে তাকে বায়তুশ শরফ মাদ্রাসায় পড়াবেন। ইনশাআল্লাহ্ সে ভাল হল। কিন্তু যখন তার পড়ার বয়স হলে আব্বা তাকে স্কুলে ভর্তি করালেন কারণ বায়তুশ শরফ আমাদের বাসার চেয়ে অনেক দূরে ছিল। কিন্তু আমার ভাইয়ের দুষ্টামী বেড়ে গেল। সে কি আর পড়ালেখা করে। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে। তাকে স্কুলে পাঠানোই এক মুসীবত হয়ে গেল। অবশেষে এক বছর স্কুলে লস্ দিয়ে তাকে আব্বা বায়তুশ শরফে ভর্তি করালেন। আল্লাহর রহমতে আমার ভাই দাখিল, আলিম, কৃতিত্বের সাথে পাশ করেছেন। বর্তমানে উচ্চ শিক্ষা লাভ করছেন।
আমার বড় আপা খুব নার্ভাস ধরনের মেয়ে। পরীক্ষা আসলেই অমনি নানা অসুখের সৃষ্টি হত। মাথাব্যথা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, জ্বর আসা ইত্যাদি। ডাক্তার দেখিয়ে কোন লাভ হয়নি। তার নার্ভাসনেস কাটানো যায়নি। শেষে আব্বা তাকে আল্লামা শাহ্ আবদুল জব্বার রহ. কাছে নিয়ে গেলেন। উনার দোয়ার বরকতে আপা পড়াশোনা শেষ করে এখন সুখে শান্তিতে ঘর সংসার করছে।
তাহলেই বুঝতেই পারছেন প্রিয় পাঠক পাঠিকাগণ! আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে হুজুরের গুরুত্ব কতখানি। উনি আমাদের পুরো পরিবারের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে একজন ত্রাণকর্তা ছিলেন। আমাদের জন্য উনি তাঁর পাকমুখে দোয়া চাইতেন এবং আল্লাহ্ সেই দোয়া কবুল করতেন। আব্বা (ডা. আবু তাহের) যে কোন সমস্যায় পড়লে হুজুরের পরামর্শ চাইতেন। হুজুর কেবলা সঠিক সিদ্ধান্ত দিতেন এবং আব্বা সে মত কাজ করে সফল হতেন। শুধু আমরা কেন বাংলাদেশের শত শত দুর্দশাগ্রস্ত পরিবার আছে, যাদের জন্য হুজুর রহমতের বারিধারা ছিলেন। পারিবারিক পরিমণ্ডলে এই অধিক পরিচিত মানুষটিকে আমি অতিশয় ভক্তি করতাম, শ্রদ্ধা করতাম এবং এখনও করি।
আমার মনে আছে হুজুরকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ক্লাস নাইনে থাকতে। হ্যাঁ তবে স্বচক্ষে নয় একটি নিউজ পেপারে। বন্যা কবলিত অসহায় মানুষকে ত্রাণসামগ্রী দিচ্ছিলেন এরকম একটি ছবি দৈনিক ইনকিলাবে ছাপা হয়। ছবিটি বহুল প্রিন্টের জন্য ঝাপ্সা হলেও তার নূরানী চেহারা মোবারকে ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট ছিল। আরেকবার দেখেছিলাম একটি ভিডিও ক্যাসেটে। সে বছর আমার বড় ভাই বায়তুশ শরফ আলিয়া মাদ্রাসায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকটি পুরস্কার জিতে নেয়। পুরো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি ভিডিও করা হয় এবং সেই রেকর্ড করা ভিডিও ক্যাসেটটিতে আমি শ্রদ্ধেয় হুজুরের প্রাণবন্ত উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করি। ঈমানের বলে বলীয়ান এই মানুষটিকে স্বচক্ষে না দেখলেও তাঁর পবিত্র মুখ নিসৃত বাণী আমাকে, আমার পরিবারকে ঈমানের শক্তি দেয়। আমার মায়ের সংগ্রহে হুজুর কেবলার অসংখ্য ওয়াজের ক্যাসেট আছে। তাঁর লিখিত প্রায় সব মূল্যবান বই আমার সংগ্রহে আছে। আমার পিতামাতা ভাই বোন যেমন আমার রক্তের সম্পর্কে আত্মার ঠিক তেমনি হুজুরকে আমার আত্মার আত্মীয় মনে হয়।
অধ্যাপিকা রহিমা আক্তার ফারজানা
বিজয় স্মরণীয় ডিগ্রী কলেজ, ভাটিয়ারি চট্টগ্রাম।
Leave a Reply