শত মনীষীর দৃষ্টিতে আল্লামা শাহ্ আবদুল জব্বার রহ.

আহা! সব আছে

এ মাটি এ ঘাস ফুল লতা গুল্ম

এ অরণ্য সাগর নদী পাহাড়

চাঁদ সুরুজ

মানুষ পশু পাখি সব আছে, সব

এ মসজিদ মিনার আযান

এ মাহফিল

মিলাদ

মুনাজাত

শবে বরাত

শবে ক্বদর

ঈদ আনন্দ সব আছে,

সব শুধু তুমি নেই, তুমি…

আমার এ পোড়া অন্তর

শুধু তোমাকেই খুঁজে ফিরে।

তুমি ছিলে ধ্যানি, ধনী দয়ার সাগর

কর্ম বিদ্যা ও দানে যা

র এক বিন্দু দিয়েছো এ দীনে।

আমার পীর, আমার মুর্শিদ, আমার পিতৃতুল্য এই মানীষীকে হারিয়ে আমি দিশেহারা। আমার ওপর তাঁর ইহসান কখনো ভোলার নয়। আমি জীবনে হুজুরকে এই চর্মচক্ষে যতোবার দেখেছি, যতোবার তাঁর একান্ত সান্যিধ্যে কাটিয়েছি, হুকুম তামিল করেছি, যতোবার তার সাথে খেয়েছি ও যতোবার তাঁর সাথে ভ্রমণ করেছি তা আমার আপন জন্মদাতা পিতার সাথেও করিনি। দিন যতো যাচ্ছে তাঁর প্রতিটি উদ্যোগ ও কর্মসূচি নতুন মহিমায় আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠছে। যখন তিনি কোন

কর্মসূচি হাতে নিতেন আপাত দৃষ্টিতে মনে হত তিনি কেন এসব কাজে হাত দিচ্ছেন; মনে হয় যেন অপ্রয়োজনীয়। সময়ের ব্যবধানে আমাদের জন্য সেটি অত্যন্ত জরুরী ও একান্ত প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে। আমরা নালায়েক বলে তাঁর কর্মের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে জানতে ব্যর্থ হয়েছি।

আজ সারাদেশে তাঁর যে কর্মসূচী ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তা আকাশ ভেদ করে মাথা উঁচু করে জানান দিচ্ছে যে জাতীর সেবায় এর একেকটি অত্যন্ত আবশ্যক। যুগ যুগ ধরে জাতী ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এ থেকে উপকৃত হবে।

২. আমাদের পীর-মুর্শিদ কেমন ছিলেন:

আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন পীর-মুর্শিদ হাদিয়ে যামান শাহ্ সূফী হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ.-এর একান্ত সান্নিধ্যে ১৫ বছর কাটানোর কারণে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা, দরবারের নতুন ভক্তবৃন্দ, আন্‌জুমনে ইত্তেহাদ ও নওজোয়ানের নবাগত সদস্যবৃন্দ আমার কাছে প্রায়ই জানতে চায় কেমন ছিলেন তিনি? তাঁকে কেমন দেখেছেন? তাঁর কোন্ কথা আপনার বেশি মনে পড়ে? ইত্যাদি ইত্যাদি।

এসব প্রশ্নে আমার মন উতলা হয়ে ওঠে। আমি স্মৃতির অতল তলে হারিয়ে যাই। তাঁর সুবিশাল বিস্তৃত জীবনের কোন্ অংশ নিয়ে লেখা আরম্ভকরব তা ভাবতে ভাবতেই খেই হারিয়ে ফেলি। লিখতে বসলেও লেখা হয়ে ওঠে না; আর এ কারণেই তাঁর ইন্তেকালের পর বহু পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে লেখা চেয়ে বারবার অনুরোধ করার পরও আমি তেমন লেখা দিতে পারিনি।

পীর-মুর্শিদ কে হন? যিনি সৎ পথের সন্ধান দেন। যাঁর সান্নিধ্যে এলে চক্ষু পবিত্র হয়, যাঁর পরশ পাথরসম চারিত্রিক সুষমায় অপবিত্র আত্মায়ও নূরের ঝলক সৃষ্টি হয়। যাঁর তালিম-তরবিয়তে পথহারা মানুষ খুঁজে পায় আল্লাহ্ ও রাসূল প্রাপ্তির পথ। যাঁর দয়া ও দানে ভিখারী পরিণত হয় অগাধ সম্পদের অধিকারী। যাঁর ধ্যান ও তপস্যার এক কণার উসিলায় মূর্খ জাহেলও পরিণত হন খাঁটি আবেদে। কৃপণ পরিণত হয় দানবীরে। যাঁর চিন্তা ও গবেষণার কিঞ্চিত কণায় অতি সাধারণও হয়ে যান দেশ বরেণ্য পণ্ডিত। যাঁর একটুকু হস্ত ছোঁয়ায় পদদলিত মৃত্তিকাও পরিণত হয় খাঁটি সোনায়। অকবি হয়ে যান কবি। অমানুষ হয়ে যান প্রকৃত মানুষ। ঠিক তেমনি ছিলেন আমাদের পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু, আমাদের গর্বের ধন, আমাদের মর্যাদার প্রতীক, আমাদের পীর-মুর্শিদ হযরত শাহ আবদুল জব্বার রহ.।

তিনি ছিলেন সুন্নাতে রাসূল সা. এর প্রকৃত অনুসারী। চেহারা-সুরতে, পোশাকে, আশাকে, চলনে বলনে, কথায় ও কাজে, কদম-বকদম রাসূলে পাক সা. এর সুন্নতকে আমৃত্যু তিনি পরম যত্নে লালন-পালন ও অনুশীলন করেছেন। এতে কোনরূপ কৃত্রিমতা ছিল না তাঁর।

দেশ বরেণ্য মুহাদ্দিস হিসেবে হাদিস ও কুরআনের উপর ছিল তাঁর পূর্ণ দখল। ঘন্টার পর ঘন্টা পবিত্র কালামে পাক ও হাদিস শরীফ হতে তিনি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতেন। ভক্ত-অনুরক্তদেরকে শোনাতেন কুরআন ও হাদিসের শাশ্বত বাণী। সুচরিত্র অর্জনের লক্ষ্যে কুরআন ও হাদিসের সাবধান বাণী উচ্চারণ করতেন বারবার। জান্নাতের সুসংবাদ দিতেন অবিরত। জাহান্নামের ভয়াবহ পরিণতির কথা বলতেন বারংবার।

তাঁর নামায পড়া ছিল অবিকল নবীজীর নামাযের মত। তিনি যখন নামাযে দাঁড়াতেন মনে হত পৃথিবী স্থবির হয়ে গেছে। বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে। সমুদ্রের গর্জন থেমে গেছে। এ পৃথিবীর সমগ্র সৃষ্টি প্রভুর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে পড়েছে।

তাঁর রুকু-সিজদা, তাঁর খুৎবা ছিল অনন্য সুধা মিশ্রিত। তিনি যখন সিজদায় যেতেন আমার পুনরায় মনে হতো পাহাড়-পর্বত, বন-বনানী, মানব-দানব সবাই যেন পরম প্রভুর কুদরতি পদচুম্বনে করজোড় মিনতিতে মাটির সাথে লীন হয়ে গেছে। মহান প্রভুর স্নেহসিক্ত নূরানী হন্তে যতক্ষণ না সিজদারত মস্তকে স্নেহের পরশ না বুলিয়েছেন ততক্ষণ তিনি আর মাথা তুলছেন না।

তাঁর চোখের মত অশ্রুসিক্ত চোখ আমি আর একটিও দেখিনি। পিতার মৃত্যু তিনি দেখেননি। মায়ের মৃত্যুতেও না, সন্তানের শাহাদাতেও নয়; বরং উম্মাহর চিন্তায় বেদনা-ভারাক্রান্ত অন্তরের বাষ্পরুদ্ধ কথকতা তাঁর নয়ন যুগল দিয়ে অশ্রুপ্লাবন হয়ে বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মত ঝরে পড়ত।

তিনি তাঁর শিষ্যদেরকে আপন সন্তানের মত মনে করতেন। তাদের সুখে তিনি আনন্দিত হতেন। তাঁদের দুঃখ বেদনায় ভারাক্রান্ত হতেন। সময় ও সুযোগমত সবারই খোঁজ-খবর নিতেন। কিছু দিন না দেখলে সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়তেন।

শিশুর মত সরলতা তাঁর চোখে মুখে লেগে থাকত। তিনি ছিলেন অকৃত্রিম বিশ্বাসী। বিশ্বাস ছিল তাঁর পরম ধর্ম। আমানতদারীতে তিনি ছিলেন ভুবন বিখ্যাত। কী কথার আমানত! কী আর্থিক আমানত! কী তরীক্বতের আমানত। কী জাতির আমানত! কী দুনিয়াবী আমানত! প্রতিটি আমানতই ছিল তাঁর কাছে সুরক্ষিত। এ আমানত তিনি রক্ষা করেছেন মরণে। আমানতের খেয়ানত করেননি বিন্দু বিসর্গ পরিমাণ।

ইন্তেকালের পর তাঁর কক্ষে দরবারের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের প্রতিটি আমানত দরবারের মুরব্বীগণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝে পেয়েছেন।

একদিন আমাদের মরহুম পীর বারুল উলুম শাহ্ সূফী হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন রহ. অনেকটা স্বগোক্তির মত বলেছেন, “আমার পীর-মুর্শিদ ছিলেন জগৎশ্রেষ্ঠ আমানতদার। তিনি শরীয়ত ও তরীক্বতের আমানত যেমন পূর্ণরূপে রক্ষা করেছিলেন, তেমনি দুনিয়াবী আমানতও রক্ষা করেছিলেন পরিপূর্ণভাবে।”

তিনি ছিলেন এতিম। তাই এতিমের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা। এতিমের লালন-পালন ছিল তাঁর মহান ব্রত। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেশের বিস্তৃত অঞ্চলে গড়ে ওঠা বায়তুশ শরফের এতিমখানাসমূহ। যার প্রকৃত নিদর্শন বায়তুশ শরফের এতিমখানা হতে লালিত-পালিত হয়ে, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী লাভ করে এতিম ছাত্ররা আজ দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কেউ শিক্ষকতার মহান পেশা গ্রহণ করেছেন, কেউ মসজিদে সফলতার সাথে ইমামতী করছেন। আবার কেউ বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী সংস্থায় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন; আবার কেউ বিবিধ টেকনিক্যাল কাজে নিয়োজিত থেকে সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনা করছেন। কেউ কেউ প্রবাসে গিয়ে স্বদেশের জন্য অতি মূল্যবান রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। খুশির সংবাদ এই যে, ইতোমধ্যে অন্তত তিনজন এতিম ছাত্র ডাক্তার হয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছেন কয়েকজন, বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন জনকয়েক।

তিনি ছিলেন গরীব, অসহায়, বিধবা ও কন্যাদায়গ্রন্থ পিতার একনিষ্ঠ অভিভাবক। অত্যন্ত গোপনে তাঁর সাহায্যের হস্ত প্রসারিত হত তাদের দুয়ারে। দানপ্রাপ্ত এমন হাজার হাজার লোকের অশ্রুবিসর্জন বর্তমানে আমাদের নজরে পড়ে তাঁর পবিত্র কবরগাহে।

“দানে আনে” এ সূত্রে বিশ্বাসী মরহুম পীর ছাহেব জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দু’হাতে ধন বিলিয়েছেন। অথচ তাঁর দানের ভাণ্ডারে কখনো শুন্য হয়নি। এক হাতে তিনি মানুষের দান গ্রহণ করতেন আবার তৎক্ষণাৎ অন্য হাতে তা বিলিয়ে দিতেন। তাঁর দয়া ও দানে কার জীবন ধন্য হয়নি? পথের ভিখারী হতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ডক্টর প্রফেসর, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এমনকি ‘বেকায়দায়’ পড়া অনেক ধনীকেও তাঁর দানে ধন্য হতে আমি দেখেছি। অনেককে দেখেছি জীবন চলার পথে কোন দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে নিরাশ, হতাশা ও ধ্বংসের শেষ প্রান্ত হতে সসম্মানে মাথা তুলে দাঁড়াতে। এরূপ অসংখ্য উদাহরণ আমাদের চারপাশে বিদ্যমান। একটু চোখ মেলে তাকালেই আমরা তা দেখতে পাব। একটু কান পাতলেই তা শুনতে পাব।

তাঁর জীবনের বড় কীর্তি তিনি খানকাকে মানুষের দুয়ারে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের দেশে সচরাচর দেখা যায় পীর সাহেবগণ খানকায় অবস্থান করেন, আর মুরীদেরা ভালমন্দ সব বিষয়ে অবগত করানোর উদ্দেশ্যে পীরের দরবারে হাজির হন। তিনি সেখানে বসেই নজর-নেয়াজ, হাদিয়া-তোহফা গ্রহণ করেন। প্রয়োজনীয় দো’আ মুনাজাত করেন। কিন্তু আমাদের পীর-মুর্শিদ ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

তিনি মানুষদেরকে সৎপথে আনায়নের উদ্দেশ্যে এ বাংলার আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। মাহফিলে মাহফিলে রাতের পর রাত কাটানোর ফলে অনিদ্রা ও অনিয়মিত খাদ্য গ্রহণ এবং বিশ্রামের অভাবে মরণব্যাধি তাঁর পবিত্র দেহে চরমভাবে বাসা বেঁধেছিল। সীমাহীন কষ্টসহিষ্ণু আমারদের পীর সাহেব রহ. এসব হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন বলেই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাবলীগে দ্বীনের কাজ করে গেছেন অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে।

তাঁর এই দ্বীনি তাবলীগ কী শুধু স্বদেশে সীমাবদ্ধ ছিল? না, তা নয়। “বায়তুশ শরফ আঞ্জুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ”-এর মসজিদভিত্তিক মানবকল্যাণমূলক সংগঠনের সার্থক সভাপতি হিসেবে এই সংগঠনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তরীকায়ে আলীয়ায়ে কাদেরীয়ার আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও মহত্তম সেবাকর্ম। সশরীরে সে সব দেশে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে প্রচার করেছেন সুন্নতে রাসূলের অমীয় বাণী।

ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, মহাপ্লাবনের এই দেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। পঞ্জিকার পাতা উল্টাতে না উল্টাতে প্রতি বছরই দেশের কোন না কোন অংশে প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয় ঘটে। ফলে লক্ষলক্ষ বনি আদম অন্ন-বস্ত্র বাসস্থান ও চিকিৎসার অভাবে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করে। এমতাবস্থায় মানব দরদী পীর হযরত শাহ্ আবদুল জব্বার রহ. কখনো স্বীয় হুজরা শরীফে বসে শুধু দু’আ করেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি বরং তাঁর ভক্ত অনুরক্তদের সহযোগিতায় লক্ষলক্ষ টাকার ত্রাণ-সামগ্রী নিয়ে বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৮৫ সালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে, ১৯৮৮ সালে ঢাকা-ব্রাহ্মণ বাড়িয়ায়, ১৯৮৭ সালে চকরিয়ায়, ১৯৯১ সালে সমগ্র দক্ষিণ চট্টগ্রামে, ১৯৯৪ সালে বাঁশখালী, কক্সবাজার ও টেকনাফে তাঁর মানবিক সাহায্যের কথা এখনো ঐ সব অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে কিংবদন্তি হয়ে ফিরছে।

এখানেও শেষ নয়! ১৯৭৯-৮০ সালে এবং ১৯৮৯-৯০ সালে রোহিঙ্গা মুসলমান শরণার্থীদের জন্য তাঁর দয়া ও দানের কথা কেউ ভুলবে না। লোক মারফৎ ত্রাণ-সামগ্রী পাঠিয়ে তিনি নীরবে বসে থাকতে পারতেন না। তিনি স্বহস্তে তা বিতরণে আনন্দবোধ করতেন। ১৯৮৮ সালে ঢাকার রূপগঞ্জে এরূপ এক ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার সময় তাঁর ডান হাত অবস হয়ে গিয়েছিলো। ১৯৮৫ সালে পবিত্র রমযানে রোযা মুখে নিয়ে নোয়াখালীর লাক্ষারচরে হাঁটু পরিমাণ কাদা মাটি পানি বেয়ে তাঁকে চলতে হয়েছিল বহু পথ। এ অবস্থায় অনেকে তাঁকে কাঁধে তুলে নিতে চাইলে তিনি তাতে রাজি হননি। এসব ত্রাণকাজে আমি, মাওলানা আবদুল মোমেন, ডা. এমদাদ, হাজী শামসুল হক, বারুল উলুম শাহ্ মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন রহ., কাশেম রাজা, মাহবুবুর রহমান, দস্তগীর চৌধুরীর বড় ভাই জাহাঙ্গীর চৌধুরী, ডা. ফজলুল বারী, ইউনুস কেরু, সাইফুল আলম, হাফিজুর রহমান (মোটা হাফিজ), আশরাফুল আলম ভাই, আবদুল হাকিম ভাই, মোহাম্মদ শাহজাহান, হাফেজ মুহিব্বুর রহমান, হাফেজ মুজিবুর রহমান বেলালসহ আন্‌জুমনে ইত্তেহাদ ও আন্জুমনে নওজোয়ানের স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ হুজুর কেবলার সাথী হয়েছি।

তিনি শুধুমাত্র স্বজাতির মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করে ক্ষান্ত হননি; বরং দু’হাতে হিন্দু, খ্রিষ্টানদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন। চকরিয়ার কাঁকারা ইউনিয়ন, বাঁশখালীর উপকূলীয় জেলে পাড়া এবং খুলনার রূপসাঘাটস্থ খ্রিষ্টানপাড়া তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষকে মানুষ রূপেই মর্যাদা দিতেন। আল্লাহ্ সৃষ্ট জীবের প্রতি সমান দয়া প্রদর্শন করতেন। ফুল ও পাখির প্রতি যেমন তাঁর ভালবাসা ছিল, তেমনি ছিল বনের হরিণ ও মৌমাছির প্রতি।

তাঁর মত চির তরুণ আমি আমার এ ক্ষুদ্র জীবনে আর একজনও দেখিনি। অলসতার কালো ছায়া তাঁকে বিন্দু মাত্র স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর সাথে কাজ করতে গিয়ে আমরা হাঁপিয়ে উঠতাম, ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে পড়তাম, কিন্তু তাঁকে কখনো অনুরূপ অবস্থায় দেখিনি। কর্মের ডাকে সাড়া দিতে, ভাল কাজে এগিয়ে যেতে তিনি ছিলেন সদা প্রস্তুত। তিনি নিজে কাজ করতেন বলে সবার দ্বারা কাজ করাতে পারতেন। তাঁর এ কর্মচঞ্চলতা ভক্তদের এতই বিমুগ্ধ করেছিল যে, পরবর্তীতে কে কার চেয়ে বেশি কাজ করে হুজুরের দু’আ লাভে ধন্য হবেন, সে কারণে সবাই কর্ম নির্দেশের জন্য তাঁর দিকে চেয়ে থাকতেন।

তিনি ছিলেন জ্ঞানী। তিনি ছিলেন আদর্শ পাঠক। তিনি ছিলেন নিরবিচ্ছিন্ন শ্রোতা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর যে ঈর্ষণীয় ভালোবাসা আমরা প্রত্যক্ষ করতাম তা ছিল রীতিমত তুলনাবিহীন। জ্ঞানের কথা যত বেশি ক্ষুদ্র হোক তা তিনি গ্রহণ করতেন। বিজ্ঞানের যত জটিল তত্ত্বই তাঁর সামনে আলোচিত হতো তা তিনি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতেন। এতে কখনো অলসতা বোধ করতেন না। আগ্রহটা ছিল এমন, যেন প্রতিটি বক্তার কাছ থেকেই তিনি নতুন কিছু শিখতে পারছেন।

শুভ সকালে, অপরাহ্ন বা সন্ধ্যায়; অথবা গভীর রজনীতে; এমনকি দীর্ঘ সফরকালে তাঁকে দেখেছি পুস্তক-পুস্তিকা, পত্র-পত্রিকা অথবা জটিল কোন গ্রন্থ অধ্যয়ন করতে। বহুবার বিমান হতে বা ট্রেন হতে নেমে আসার সময় তাঁর হাতে দেখেছি গুরুত্বপূর্ণ কোন বই। যার মাঝে তিনি একটি আঙ্গুল ঢুকিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ ঐ পর্যন্ত তাঁর পাঠ হয়েছে। মজার কোন বিষয় হলে বা আমাদের কিছু জানানোর প্রয়োজন পড়লে তিনি তা ভরা মজলিসেই ঐ বই-এর নাম ধাম পৃষ্ঠা নম্বর উল্লেখ করে আলোচনা করতেন। আল্লাহ্ ও রাসূল বিরোধী কোন লেখা পড়লে তাতে তিনি চরম ব্যথা পেতেন। ক্ষোভে উত্থায় ফেটে পড়তেন।

আমার মনে হতো রমযান মাস যেন তাঁর কাছে ছিল বসন্ত মাস। তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থের লেখা ও অনুবাদের কাজ এ রমযান মাসেই সমাপ্ত হয়েছে। আমি এবং জনাব আবুল হায়াত মুহাম্মদ তারেক (বিভাগীয় পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম) বহুরাত হুজুরের বৈঠকখানায় কাটিয়ে দিয়েছি তাঁর সাথে গ্রন্থের পঠন-পাঠন ও অনুবাদ কর্মে। বহুবার এমনও হয়েছে আল আছরারের লেখাগুলো তাঁকে পড়ে শোনাতে শোনাতে মাইক্রোবাসে বা কারে চড়ে বহু দূরে কোন মাহফিলে গিয়েছি। একবার মাঘ মাসে সাতকানিয়া বায়তুশ শরফের মাহফিল হতে রাত একটায় শহরে ফেরার পথে আমি যখন ঠাণ্ডায় কাঁপছিলাম, তিনি আমাকে তাঁর গাঁয়ের শালখানি অতি আদরে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমি লজ্জায় নিতে চাচ্ছিলাম না, তবুও তিনি জোর করে দিয়েছিলেন।

এতেকাফের দশদিন মসজিদ বায়তুশ শরফে আশেক-মাশুকের পবিত্র মিলন মেলা বসত। তারাবিহ্ পর তাঁর মুখের পবিত্র বাণী ও মসনবী শরীফের বয়ান ছিল অতি মধুর। শেষ রাতে তাঁর সাথে তাহাজ্জুদের নামায ও যিকির মাহফিলের স্বর্গীয় সুধার কথা আমার এ ক্ষুদ্র প্রবন্ধে বর্ণনা করা লেখায় আদৌ সম্ভব নয়।

বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসা, ঢাকা বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, কক্সবাজার বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, রাঙ্গামাটি বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ফেনী বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, চকরিয়া বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স এবং সর্বশেষ কক্সবাজার চক্ষু হাসপাতাল নিয়ে তাঁর আশা-আনন্দের সীমা ছিল না। আমি অত্যন্ত কাছ থেকে লক্ষ্য করেছি এসব কমপ্লেক্সসমূহের বিশাল কর্মের পরিসমাপ্তির জন্য যেমন তাঁর পেরেশানীর অন্ত ছিল না তেমনি আবার ভবিষ্যতের এ সব প্রতিষ্ঠান হতে বহুলোক নানাভাবে উপকৃত হবেন এই ভেবে তাঁর ওষ্ঠদ্বয়ে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠত।

জীবনে একবার মাত্র তাঁর পবিত্র বুকের ছোঁয়া পেয়ে ধন্য হয়েছিলাম। যে শুভক্ষণটির কথা এখনো ভুলতে পারিনি। সেটি হল ১৯৯১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসাকে জাতীয় পর্যায়ে “শ্রেষ্ঠ মাদ্রাসা” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের সনদপত্র ও পুরস্কারের চেক নিয়ে ঢাকা হতে এসে তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে গেলে তিনি আনন্দচিত্তে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। এ আমার পরম সৌভাগ্য।

তিনি ছিলেন সফল ব্যাংকার। তিনি ছিলেন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক পরামর্শক। বিংশ শতাব্দীর অনেক সফলতার মধ্যে মুসলিম ও অমুসলিম বিশ্বে সুদবিহীন ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা প্রবর্তন একটি যুগান্তকারী ঘটনা। একজন দ্বীনি আলেম ও দরবারী পীর হয়েও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এর প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা ও শরীয়া কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান সত্যিই এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর নিজ হাতে গড়া এ ব্যাংক আজ অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী সমগ্র এশিয়ার মধ্যে এই ব্যাংকই প্রথম গ্রেডে রয়েছে। বাংলাদেশে পরপর বিশ বছর সর্বোচ্চ মার্কিং-এ ফাস্ট হয়েছে। এখানেও শেষ নয়: এই ব্যাংকের সফলতা পরিদৃষ্টে বাংলাদেশে আরও ১১টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার দু’টির পরামর্শকও ছিলেন তিনি।

তিনি ছিলেন ঐক্যের প্রতীক। তিনি ছিলেন ইত্তেহাদুল উম্মাহ্ বাংলাদেশ-এর অন্যতম উদ্যোক্তা এবং কেন্দ্রীয় সভাপতি মণ্ডলীর মুখপাত্র। আশির দশকে টেকনাফ হতে তেতুলিয়া পর্যন্ত উম্মাহর ঐক্যের জন্য তিনি যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তা সমকালীন সবারই জানা। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সূচনালগ্নে ১৩ মার্চ ১৯৮৭ ইং ঢাকার রাজপথে তিনি স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যে সাহসিকতাপূর্ণ অনড়-অটল মনোভাব প্রদর্শন করেছেন তা ছিল সত্যিই বীরোচিত। সাময়িকভাবে তাঁকে দ্বীন-ইসলামের জন্য বন্দীও হতে হয়েছিল (সেদিন আমিও তাঁর সাথে গ্রেফতার হয়েছিলাম)। কিন্তু তাতে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হননি; বরং অসীম সাহসে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলে গিয়েছেন।

দলবাজী ও গোড়ামীকে তিনি খুবই অপছন্দ করতেন। তিনি রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী বা নেতা ছিলেন না। সে জন্যই সব দলের নেতারা তাঁর কাছে ছুটে আসত একটু দু’আর জন্য। একটু পরামর্শের জন্য। এটি যে আমার অতিকথন নয় তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ তাঁর পবিত্র নামাযে জানাযা। যেখানে সব দলের, সব মতের লক্ষ লক্ষ্য লোক সমবেত হয়েছিলেন। চট্টলার ইতিহাসে এত বড় জানাযার নামায কেউ চর্মচক্ষে একবারও দেখেনি।

বিশাল অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী আমাদের পীর-মুর্শিদ হযরত মাওলানা আবদুল জব্বার রহ. ছিলেন বিশ্ব মুসলিমের চিন্তায় নিমগ্ন এক মহান পুরুষ। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, কুয়েতে ইরাকী হামলার সময়, ইরাক-আমেরিকা যুদ্ধের সময়, আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসনের সময়, হিন্দু মৌলবাদীদের আক্রমণে বাবরী মসজিদের শাহাদাতের সময় এবং কাশ্মীরী মুসলমানদের উপর ভারতীয় সৈন্যদের অব্যাহত নির্যাতন ও গণহত্যার সময় তাঁর অন্তরের আকুতি আমরা অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। রাজপথে ত্যাজদীপ্ত পদক্ষেপে মিটিংয়ে-মিছিলে অংশ নিতে দেখেছি। রক্ত বন্ধনের জন্য নয়; শুধুমাত্র ঈমানী বন্ধনের কারণে কোন মানুষ ভিনদেশি মানুষের জন্য এরূপ কাঁদতে পারে অনুরূপ আমি আর কাউকে দেখিনি। প্রতি ওয়াক্ত সালাত শেষে, প্রতিটি মাহফিল শেষে তাঁর অশ্রুবিগলিত কান্নায় যেন খোদার আরশ কেঁপে উঠত। উম্মাহর প্রতি এরূপ ভালবাসার মানুষ পাওয়া আজ বড়ই কঠিন।

তাঁর কথা আর কী বলব! অনেক কথার ভীড়ে হয়ত আসল কথাগুলো হারিয়ে ফেলেছি। তবুও এ মুহূর্তে যা মনে পড়েছে তা উপস্থাপন করলাম।

সময় সুযোগ হলে ইনশাআল্লাহ্ বিস্তারিত লেখার আশা রাখি। মহান আল্লাহ্ আমাদের মহান পীর-মুর্শিদকে জান্নাতের উচ্চতম স্থানে সমাসীন করুন। তাঁর সুকীর্তিসমূহ আমাদের জীবনাদর্শরূপে গ্রহণের তৌফিক দান করুন। তাঁর রূহানী ফয়েজ ও বরকতে আমাদের অসামঞ্জস্য জীবনে সৌন্দর্যের পরশ বুলিয়ে দিক।

৩. তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি:

বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা

“বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসা” বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার যুগোপযোগী আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আজ হতে মাত্র ৪০ বছর পূর্বে এ প্রতিষ্ঠান একটি বৃহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে তার শিক্ষাক্রম শুরু করেছিল। স্বল্পকালের ব্যবধানে তা আজ এতদঞ্চলের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও গৌরবের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বায়তুশ শরফের শ্রদ্ধেয় পীর হাদীয়ে যামান শাহ্ সূফী আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জাব্বার রহ. ছাহেবের পুণ্য হাতে বপণ করা ‘বায়তুশ শরফ আদর্শ মাদ্রাসা’ নামক চারাগাছটি আজ ফুলে ফলে সুশোভিত এক বিশাল মহীরুহ। স্বল্পকালে এ প্রতিষ্ঠান তার লক্ষ্যাভিমুখে বিস্ময়কর সফলতায় অগ্রসর হয়েছে- সৃষ্টি করেছে অসংখ্য ঐতিহ্য ও গৌরবগাথা।

‘বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসা’ একটি ব্যতিক্রমধর্মী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ইসলামের আদর্শিক ও বৈষয়িক জ্ঞানের সমন্বয়ে মুসলিম মিল্লাতের জন্য একটি সর্বজনীন ও একক জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পথ রচনা করা এ প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

বর্তমানে প্রচলিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় একদিকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ যুব সমাজ ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে; অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের লালনাগার মাদ্রাসা শিক্ষাকেও একচ্ছত্র আধুনিকীকরণের নামে প্রকৃত দ্বীনি শিক্ষা ও ঐতিহ্য হতে বিচ্যুত করণের ষড়যন্ত্র চলছে।

এ ক্ষেত্রে দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বিত জ্ঞানে সমৃদ্ধ সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা সম্পন্ন জ্ঞানী-গুণী, খোদাভীরু ও চরিত্রবান নাগরিক তৈরি করাই এই প্রতিষ্ঠানের মহান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।

আজ হতে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে মক্কার পুণ্যভূমিতে মানবতার মুক্তিদিশারী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা. এর আবির্ভাব ঘটেছিল জাহিলিয়াতের অন্ধকারে চাপা পড়ে যাওয়া মানুষগুলোর বিবেককে জাগ্রত করতে, মানুষের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ববোধ সৃষ্টি করতে। দীর্ঘ ২৩ বছরের সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি মহান স্রষ্টা মনোনীত জীবনব্যবস্থা ‘আল-ইসলাম’কে মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন হিসেবে পেশ করেন। তার নবুয়াতী জীবনের প্রথম ওহী ছিল “পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন” আর ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বে তিনি ঘোষণা করেছেন “জ্ঞানের কথা অপরের কাছে পৌঁছে দাও, যদিও তা একটি বাক্য হয়।” এভাবে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষকে আদর্শ ও একমাত্র গ্রহণযোগ্য শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে পূর্ণাঙ্গরূপ পরিগ্রহ করেছিল। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যুগে যুগে কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষকে নিজেদের গোলামীর শেকলে আবদ্ধ করার লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে খণ্ডিত মানব রচিত একদেশদর্শী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে। ইতিহাসের সে নির্মম ধারাবাহিকতায় ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর বৃটিশ বেনিয়ার প্রতিনিধি লর্ড মেকলে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগোষ্ঠীকে চির গোলাম করে রাখার লক্ষ্যে ঘৃণ্য মানসিকতায় এদেশে চালু করে দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা। ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে ভাটি বাংলার সবুজ ভূ-খণ্ডের মানুষ দু’দুবার স্বাধীনতা অর্জন করলেও কেরানী তৈরির গোলামী যুগের ঘৃণ্য দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই এদেশে জিইয়ে রাখা হয়েছে স্থায়ী বিভেদ।

একই মায়ের দু’সন্তান দু’টি ভিন্নমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে পড়ালেখা করে সম্পূর্ণ বিপরীত চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা ও দোদুল্যমান বিশ্বাসে গড়ে উঠছে। একটি সন্তান বৈষয়িক ও জাগতিক বিষয়ে অগ্রগতি সাধন করলেও রক্তের সাথে মিশে থাকা ধর্ম ও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপকে অস্বীকার করতে লাগলো; অপরপক্ষে আরেকটি সন্তান বৈষয়িক ও জাগতিক বিষয়কে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে ধর্মীয় বিধিমালার বিস্তৃত ভূমিকে সংক্ষিপ্ত অবয়বে একরোখাভাবে উপস্থাপন করতে লাগলো। এতে করে একদিকে যেমন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীনতা প্রকাশ পাচ্ছিল, অপরদিকে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি জনমনে বিভ্রান্তি ক্রমে বাড়ছিল। এমতাবস্থায় উন্নয়নশীল জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত শিক্ষা ব্যবস্থার এহেন করুণ অবস্থা থেকে জাতিকে মুক্ত করে একটি যুগোপযোগী আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার দাবী অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

একজন আধ্যাত্মিক সাধক হয়েও বায়তুশ শরফের সর্বজন শ্রদ্ধেয় পীর ছাহেব হাদীয়ে যামান হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ, জাতির এ অনিবার্য দাবীর ব্যাপারে প্রথম বাস্তবানুগ চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। ১৯৮১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এ উপলক্ষে ‘বায়তুশ শরফ আঞ্জুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ’ এর উদ্যোগে ‘বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ মিলনায়তনে শ্রদ্ধেয় পীর ছাহেব কেবলার সভাপতিত্বে “বর্তমান মাদ্রাসা শিক্ষার সমস্যা ও সমাধান” শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। উক্ত সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা, বুদ্ধিজীবি, পীর-মাশায়েখ, সাহিত্যিক-সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবি ব্যক্তিবর্গ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে ইসলামী শিক্ষার আধুনিকায়নে তাদের আগ্রহ ও পরামর্শ প্রকাশ করে মরহুম পীর ছাহেবের প্রতি একটি ‘মডেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। সভাপতির বক্তৃতায় মরহুম পীর ছাহেব কেবলা বলেছিলেন, আজকের সেমিনারের পরামর্শ, প্রস্তাব ও সুধীমহলের মতামতকে অবলম্বন করে অচিরেই এমন একটি আদর্শ মাদ্রাসা স্থাপন করা হবে, যাতে পড়ালেখা করে প্রত্যেক শিক্ষার্থী কুরআন-হাদিস ও ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী হওয়ার সাথে সাথে আধুনিক বিশ্বের প্রয়োজনীয় জ্ঞানে জ্ঞানী হয়ে যোগ্যতা, প্রতিভা ও ব্যক্তিত্ব গুণে যুগপৎ সমাজ ও নমাজ অর্থাৎ-নামাযের ইমামতি ও সমাজের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।”

৪ ডিসেম্বর ১৯৮১ জুমাবার (বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার শিক্ষাক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে আরম্ভ হওয়ার ২৭ দিন পূর্বে) চট্টগ্রাম মহানগরীর ধনিয়ালাপাড়াস্থ ‘বায়তুশ শরফ আদর্শ মাদ্রাসা’র উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সাধারণ অধিবেশনে উপস্থিত সুধীবৃন্দ অভিমত ব্যক্ত করেন যে, দেশের এই ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বায়তুশ শরফ আদর্শ মাদ্রাসা দেশ ও জাতির সামনে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার ‘বাস্তব নুমনা’ হবে ইনশাআল্লাহ্।

উদ্বোধনী ভাষণে বায়তুশ শরফের শ্রদ্ধেয় পীর ছাহেব হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জাব্বার রহ. প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার দুর্বলতাসমূহ এবং দেশে বিরাজমান শিক্ষা সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, বর্তমান মাদ্রাসা শিক্ষা মুসলিম সমাজের সীমাবদ্ধ ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম হলেও তা দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রীয় জীবনের চাহিদা মেটাতে অক্ষম। অন্যদিকে গোলামী যুগে ইংরেজ প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের শিক্ষা-দীক্ষা প্রদান করা হলেও সেখানে ইসলামকে জানা ও শেখার ব্যবস্থা না থাকায় সবকিছু অন্তসারশুন্য হয়ে পড়েছে। ফলে একদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা যেমন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন তেমনি আধুনিক শিক্ষার্থীরাও নিজের জীবনের অতীত ভবিষ্যত সম্পর্কে এবং ইসলামের নীতিমালা অনুযায়ী আপন জীবনকে সাজিয়ে গঠন করার পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ বা অনবিজ্ঞ। সুতরাং ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই আজ এ দুই শিক্ষার মাঝে সেতু বন্ধন রচনা করে দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। আর এই উদ্দেশ্যেই আমরা বায়তুশ শরফে এই আদর্শ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

তিনি সুধীবৃন্দের উদ্দেশে বলেন, বর্তমানে সরকারি মাদ্রাসাগুলোকে ঘুযোপযোগী করণের নামে পাঠ্যসূচীতে স্কুল কলেজের যে সব পুস্তক অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এর দ্বারা মাদারাসা শিক্ষার উন্নয়ন বা আধুনিকায়ন নয়; বরং ধ্বংসই ডেকে আনা হবে। মাদ্রাসা থেকে প্রকৃত আলেম, ইমাম, মুহাদ্দিস পাওয়া যাবে না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি স্কুল কলেজে প্রচলিত বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের বইগুলোকে ইসলামী নীতি এবং আদর্শ ভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত করে প্রণয়ন করব। ধর্মহীন বিজাতীয় শিক্ষার অশুভ প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেখুন মাটি এদেশের, লাঙ্গল এদেশের, পানি, আলো, হাওয়া এদেশের কিন্তু ফসল ফলে বিদেশের। আমাদের ছেলে আমাদের পয়সায় গড়া স্কুলে পড়াশুনা করে কিন্তু দেখা যায় এই বিজাতীয় শিক্ষার অশুভ প্রভাবে কিছু সংখ্যক লোক ইন্ডিয়া, চিন, রাশিয়া, আমেরিকা কিংবা ইহুদীদের এজেন্ট হিসেবে তৈরি হচ্ছে। এর জন্য প্রধানত অপরাধী-আমরাই।” আল্লাহ্র রাসূল সা. এরশাদ করেন, “প্রত্যেক মানব সন্তান ইসলামী স্বভাব ও প্রতিভা নিয়ে জন্মলাভ করে কিন্তু তার মাতা পিতা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক রূপে গড়ে তোলে।” [মিশকাত শরীফ]

পরিশেষে তিনি বলেন, “আমরা এই মাদ্রাসাকে এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে চাই, যেখান থেকে এমন লোক বের হবে যাঁরা দ্বীনি ও দুনিয়াবী উভয় জ্ঞানে হবেন সমৃদ্ধ, নামাযে যেমন ইমামতি করবেন তেমনি সমাজের সফল নেতৃত্বও দেবেন তাঁরা। তাঁরা একদিকে হবেন ইসলামী বিশেষজ্ঞ, অন্যদিকে হবেন জাতীয় জীবনের পথ প্রদর্শক। তাঁরা ডাক্তার হবেন সাথে সাথে আলেমও হবেন। ইঞ্জিনিয়ার হবেন আবার আলেমও হবেন। বস্তুত এই প্রতিষ্ঠান হবে সমগ্র দেশ ও জাতির সামনে পরিপূর্ণ ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মডেল। সুতরাং এ প্রতিষ্ঠান আপনাদের; এ প্রতিষ্ঠান এ দেশ ও জাতির। এই আদর্শ মাদ্রাসা আপনাদের সবার অব্যাহত দোয়া, পরামর্শ ও সহযোগিতা কামনা করে।”

মরহুম পীর ছাহেব কেবলার উপরোক্ত কথামালা যে হুজুগে আবেগ তাড়িত তাৎক্ষণিক বক্তৃতার ফুলঝুড়ি ছিলো না বরং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুর্ভাগা জাতির রাহবার হিসেবে অভিভাবকসুলভ অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর কথামালা নির্গত হয়েছিল, বছর না পেরুতেই তা প্রমাণিত হলো।

তাঁর সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে ১৯৮২ সালের ১ জানুয়ারি পাঁচটি ক্লাস নিয়ে “বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা” নামে প্রস্তাবিত মাদ্রাসার কার্যক্রম শুরু হয়।

পূর্ণ ইসলামী শিক্ষাকে আত্মস্থ করে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য, খেলাধুলা, শরীরচর্চা, কম্পিউটার সায়েন্স ও কারিগরি প্রশিক্ষণসহ ইত্যকার সকল বৈষয়িক, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়কে সুবিন্যস্ত পাঠ্যক্রমভুক্ত করে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী মেধা ও মনন তৈরিতে সদা তৎপর এ মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম সময়ের সাথে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ফলত মাদ্রাসাটি ইবতেদায়ী মান নিয়ে পথ চলার শুরু হলেও প্রতিষ্ঠার যুগপূর্তিতে এসে ১৯৯৪ সালে পূর্ণাঙ্গ কামিল (এম.এ) মাদ্রাসা হিসেবে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে স্বীকৃতি লাভে সমর্থ হয়। ২০০৭ সালে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার (বর্তমানে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা) তত্ত্বাবধানে ৩ বছর মেয়াদী ফাযিল (ডিগ্রী) এবং ২০১৬ সালে দু’টি বিষয়ে অনার্স কোর্স ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে চালু হয়। অপেক্ষাকৃত কম সময়ের ব্যবধানে একটি ইবতেদায়ী মাদ্রাসা পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় মানের মাদ্রাসায় রূপান্তর ও উত্তরণ অত্র প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পাঠদান পদ্ধতি, সহপাঠক্রমিক কার্যাবলী, আইন-শৃঙ্খলার বস্তুনিষ্ঠ প্রয়োগ ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পরীক্ষায় ছাত্রদের প্রশংসনীয় সাফল্য ও সর্বোপরি শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আল্লামা শাহ্ মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ., প্রাক্তন অধ্যক্ষ শাহ্ মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দীন রহ. ও ড. মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আবু নোমান এবং বর্তমান অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মাওলানা মুহাম্মদ আমীনুল ইসলাম মহোদয়ের অক্লান্ত কর্মদীপ্তিরই পরিচয় বহন করে। তাই তো এই মাদ্রাসায় বর্তমানে সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করছে।

গতানুগতিক বার্ষিক মাহফিলের বিপরীতে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বায়তুশ শরফ আদর্শ মাদ্রাসার বার্ষিক সভাকে ছাত্রদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিভা বিকাশের মঞ্চ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বিগত ৪০ বছরে মাদ্রাসার ২৫টি বার্ষিক সভায় ছাত্ররা আরবী, ইংরেজী, ফার্সী ও বাংলা ভাষায় প্রায় অর্ধ শতাধিক পরিচ্ছন্ন নাটিকা মঞ্চস্থ করে দর্শক মহলের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এছাড়া আবৃত্তি, বক্তৃতা, গীতি নক্শা বার্ষিক সভার বাড়তি আকর্ষণ। সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ সারা বছর ধরে যেভাবে আন্তরিক প্রচেষ্টায় ছাত্রদের গড়ে তোলেন তারই একটি বাস্তবরূপ প্রদর্শিত হয় বার্ষিক সভায়। এ যেন ইসলামী সংস্কৃতির এক মনোরম দৃশ্যকাব্য। এক কথায় আদর্শ মাদ্রাসার ব্যতিক্রমধর্মী বার্ষিক সভা তার ঐতিহ্যকে স্বতন্ত্র মহিমায় অভিষিক্ত করেছে।

গত ৪০ বছরে এ মাদ্রাসা হতে অসংখ্য কৃতী ছাত্র তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন। এছাড়া অসংখ্য ছাত্র সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন অফিসে, ব্যাংক ও বীমায়, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, বিভিন্ন মসজিদে ইমামতি, কম্পিউটার প্রোগ্রামার, সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিট্যাক্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও অপারেটর প্রভৃতি সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত আছেন। ইতোমধ্যে এ মাদ্রাসার অনেক ছাত্র সুলেখক, সুসাহিত্যিক ও বক্তা হিসেবে জাতীয়ভাবে খ্যাতি অর্জন করেছে। অনেকে পত্র-পত্রিকা প্রকাশ করছে। সোস্যাল মিডিয়ায় রয়েছে অনেকে। ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত হয়েছে অনেক ছাত্র।

মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্র ব্যারিস্টার আরিফুল কবির চৌধুরী ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম লন্ডনে আইন পেশায় কর্মরত, আবদুল আউয়াল হাই কোর্টের আইনজীবী, মাহবুব কায়সার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আশরাফুল হক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, রোকন উদ্দীন ও সাখাওয়াত হোসাইন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইফতেখার উদ্দিন, শফিউর রহমান, আজিজুল হক, মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ, তাহের হোসাইন সেলিম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের অধ্যাপক, মুফিজুল ইসলাম নর্দান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, মুহাম্মদ ইলিয়াস, শাহ্ সোলায়মান, মুজিবুল হক, মেছবাহুর রহমান, আসিফ সোবহানসহ অন্তত ১০০জন ডাক্তার, মোহাম্মদ মিজান, মুহাম্মদ তারেক, সাইফুল হক (চুয়েট), ফুয়াদ জাবিদ মাহমুদ (বুয়েট), জামশেদ (বুয়েট), জুম্মা ইয়াজদানী খান, মুজিব, ফাহিম (চুয়েট) সহ একডজন ইঞ্জিনিয়ার এবং কয়েক ডজন ছাত্র আল আযহার, মদীনা, অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত। অনেকে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি প্রশাসনের দায়িত্ব ও অধ্যাপনা সাফল্যের সাথে পালন করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন ছাত্র এমফিল ও পিএইচ.ডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন। আল আযহার ও মদীনা ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করার পর অনেক ছাত্র বর্তমানে দেশে বিদেশে শিক্ষকতাসহ নানা পেশায় নিয়োজিত। এই মাদ্রাসার শতশত ছাত্র দেশের বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার ইমাম, খতিব, প্রভাষক, অধ্যাপক, মুহাদ্দিস ও অধ্যক্ষ পদে নিয়োজিত আছেন। অনেকে স্বাধীন ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছেন। এ যেন মহান প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ্ আবদুল জব্বার রহ. এর স্বপ্ন পূরণ।

৪. শত মনীষীর দৃষ্টিতে আমাদের মহামান্য পীর সাহেব রহ.:

আল্লাহ মেহেরবান। বায়তুশ শরফের প্রধান রূপকার হাদিয়ে যামান শাহ্ সূফী আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ. শৈশবে এতিম ছিলেন। মাত্র চতুর্থ শ্রেণিতে অধ্যায়নকালে লজিং বাড়িতে ছিলেন। অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টের মাঝে লেখাপড়া করেছেন। কৃতীত্বের সাথে সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এতিম হিসেবে ছোটকাল থেকেই শোকর ও সবরের সাথে জীবন গঠন করেছেন। ফলে তাঁর জীবন অন্য আর দশজন এতিম ছেলের চাইতে ব্যতিক্রম ছিল। তিনি বিদ্যা অন্বেষণকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। পাশপাশি আত্মগঠন, আধ্যাত্মিক সাধনা ও পরোপকারকে জীবনাদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু বস্তুবাদি পার্থিব অর্জনকে কখনো তিনি প্রাধান্য দেননি। এ সময় তাঁর জীবনে আসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই আধ্যাত্মিক বিপ্লবের মহানায়ক তাঁর পীর মুর্শিদ বায়তুশ শরফের মহান স্থপতি কুতুবুল আলম শাহ্ সূফী হযরত মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতর রহ.। তাঁর হাতে হাত রাখার পর তিনি একেবারে বদলে যান। হযরত কেবলা রহ. এর সোহবতে থেকে বিদ্যাশিক্ষার পাশাপাশি তাযকিয়ায়ে নাক্স, ইবাদত বন্দেগী, যিক্র-আযকার ও আল্লাহ্র করুণা প্রাপ্তির লক্ষ্যে গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি সংসার ত্যাগ করেননি। সংস্যার ত্যাগী ছিলেন না। পেশাগত জীবনও ছাড়েননি। অধ্যাপনাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালোবেসে তাঁর শিক্ষার্থীদের হৃদয় উজাড় করে জ্ঞান বিতরণে জীবন উৎসর্গ করেছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওয়াজ নসীহতের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ইসলামের সুন্দর ও সত্য পথের দিকে অনুপ্রাণিত করেছেন। মানুষের মনে আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রেমকে জাগ্রত করেছেন। এতে তিনিও সর্বসাধারণের শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত হন।

স্বীয় পীর মুর্শিদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজের মাদ্রাসার মুহাদ্দিসের পদ ছেড়ে দিয়ে আধ্যাত্মিক অনুশীলনে নিজেকে একান্তভাবে বিলিয়ে দেন। ১৯৭১ সালে হযরত কেবলা রহ. এর ২৯তম হজ্ব পালন শেষে মিনায় ইন্তেকালের পূর্বে পবিত্র খানায়ে কা’বার সামনে তাঁকে নিজ খলিফায়ে আজম হিসেবে মনোনীত করে বায়তুশ শরফের দায়িত্ব অর্পন করে যান। এই নিরহংকার মানুষটি নিজ মুর্শিদের পদাঙ্ক অনুসারে খুলুসিয়াতের সাথে এ দায়িত্বকে পবিত্র জ্ঞানে গ্রহণ করেন।

হযরত কেবলা যেমন হাজার হাজার মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তেমনি হুজুর কেবলা শাহ্ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ.ও লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভক্তি অর্জনে সক্ষম হন। এ সময় মানুষ দোয়ার জন্য, বিপদ হতে মুক্তির জন্য ও মারাত্মক রোগ-ব্যাধি হতে আরোগ্য লাভের জন্য এবং কোন মকছুদ পূরণ হওয়ার জন্য প্রকাশ্যে-গোপনে হুজুরের হাতে শত সহস্র অর্থকড়ি তুলে দিতেন। এ বিপুল অর্থ তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করেননি। বরং জাতির কল্যাণেই তা ব্যয় করেছেন। তাঁর সামনে ছিল বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য ওলী-আল্লাহদের জীবন। যাঁরা ইসলাম প্রচারের জন্য মুসলিম জাতির সেবার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করেননি। ইতিহাসবিদরা বলেছেন-বড়পীর সাহেব, খাজায়ে আজমিরী, মুজাদ্দেদে আলফে সানী, হযরত শাহ্ জালাল, শাহ্ মাখদুম, খান জাহান আলী রহ. প্রমুখ কোনো আল্লাহ্র ওলী ধন ও প্রাচুর্যকে নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করেননি। তাদের হাত ছিল সাফ। দুনিয়ার কোনো ময়লা তাদের গায়ে মাখেননি বলে কোটি কোটি মানুষের শিরোমণি হতে পেরেছেন। শাহ্ আবদুল জব্বার তাঁর নিজ হাতে গড়া মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, হেফজখানা, গবেষণাগার, ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রবৃত্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই বাংলায় সমাজসেবা ও মানবতার কল্যাণ সাধন করে গেছেন তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে।

তাঁর জীবনের অনুদঘাটিত তথ্য উদ্ঘাটনে আমরা এখনো সক্ষম হইনি। তা হলো- তাঁর বুজুর্গী ও আধ্যাত্ম সাধনার গূঢ় রহস্য উন্মোচন। কীভাবে এই সহজ সরল ধন-সম্পদহীন ব্যক্তি এই অসাধ্য সাধন করে গিয়েছেন! কীভাবে দেশের সুপ্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর, প্রফেসর, জজ-ব্যারিস্টার, ডাক্তার, উকিল, পেশকার, সরকারি আমলা, প্রশাসন যন্ত্রের কর্ণধার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সর্বপর্যায়ের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের একান্ত ভক্তি শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন! কেন বারবার ঐ সমস্ত ব্যক্তিবর্গ বায়তুশ শরফ দরবারে ছুটে আসতেন? কেন তারা হুজুরের পদযুগলে লুটিয়ে পড়তেন? এই প্রশ্নের জবাব আমি পেয়েছি ১৯৮৬ সালে আখতরাবাদ (কুমিরাঘোনা) ঈছালে ছাওয়াব মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন ভারতের সুবিখ্যাত নওমুসলিম ড. ইসলামুল হক (পূর্বনাম, ভগবান ড. শিবশক্তি স্বরুপজি)। শুক্রবার বা’দ মাগরিব হুজুর কেবলা রহ. এর আহ্বানে তিনি তার বক্তব্যে বলেন- ‘আজ আমি এখানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষকে দেখে চিন্তায় পড়ে গিয়েছি; কেনো এত মানুষ এখানে এই অজপাড়াগাঁয়ে কনকনে এই শীতের রাতে একত্রিত হয়েছে? অনেক চিন্তার পর আমি বুঝতে পেরেছি উপস্থিত এই লোকদের হৃদয়ে একটি তীব্র তৃষ্ণা বা পিপাসা লেগেছে। এই পিপাসা পানির জন্য নয়, খাদ্যের জন্য নয় বা বস্ত্রের জন্যও নয়। এই পিপাসা রূহের বা আত্মার প্রশান্তির জন্য। এই প্রশান্তি কে মেটাবে? নিশ্চয় তিনি এমন এক আল্লাহ্ ওলী যাঁকে দেখলে, যাঁর মুখ দর্শন করলে, যাঁর বাণী শ্রবণ করলে তাদের হৃদয়ের পিপাসা একেবারে মিটে যায়। তারা আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয় এবং নিজের জীবনকে সত্য ও সুন্দরের পথে পরিচালিত করে। নিশ্চয়ই এই পরিচালক হলেন-বায়তুশ শরফের সম্মানিত পীর ও এই বিশাল মাহফিলের আয়োজক হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ.। তিনি তাঁর ইবাদত বন্দেগী ও কঠোর রিয়াজতের মাধ্যমে আল্লাহকে রাজী করেছেন বলেই আল্লাহ্ মানুষের হৃদয় তাঁর দিকে ঝুঁকে দিয়েছেন।’

১৯৯৮ সালে হুজুরের আকস্মিক ইন্তেকালের পর থেকে এদেশের স্বনামধন্য মনীষীবৃন্দ তাঁর সম্বন্ধে বক্তৃতা-বিবৃতি ও লেখনীর মাধ্যমে নিজেদের মনোভাব ও অভিমত অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। দেশের পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও ওয়াজ-মাহফিলের ক্যাসেটে তা রেকর্ডভুক্ত হয়ে আছে। আমরা বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মাসিক দ্বীন দুনিয়া, শিশু কিশোর দ্বীন দুনিয়া, আল-আছরার ও ছোটখাটো সাময়ীকীতে সংগ্রহ করে প্রচার করেছি। সত্য কথা এখনো পর্যন্ত তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করতে পারিনি। শাহ আবদুল জব্বার রহ. এর সুযোগ্য পুত্র উচ্চ শিক্ষিত খ্যাতিসম্পন্ন স্কলার ও সুলেখক আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ আবদুল হাই নী এই মকুবুল দরবার বায়তুশ শরফের বর্তমান কর্ণধার রাবার ২০২০ সালে আমাদের সম্মানিত পীর বারুল উলুম শাহ্ সূফী হযরত মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন রহ. সাহেবের ইন্তেকালের পর তাঁরই ইশারায় জনাব আবদুল হাই নদভী সাহেব এই বিশাল দরবারের দায়িত্ব নিজ স্কন্ধে তুলে নেন। যোগ্য পিতার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে তিনি বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রসার শিক্ষকতার পাশাপাশি মাসিক দ্বীন দুনিয়ার সহ-সম্পাদক হিসেবে তাঁর পিতার ওয়াজ, বক্তৃতা, লেখামালা নিয়ে অনেক বইপত্র প্রকাশ করেছেন। সেখানে অনেক মনীষীবৃন্দের লেখা স্থান পেয়েছে। সে লেখাগুলোতে হুজুরের প্রতি মানুষের ভালোবাসা যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি তাঁর সুকীর্তিসমূহ তথা কীর্তিগাথা নিপুণভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। আমি তাঁর পরামর্শ ও নির্দেশে বহুবছর যাবত এ লেখাগুলো অতিযত্নে সংরক্ষণ করেছি, অধ্যয়ন করেছি এবং এগুলো দিয়ে কী করা যায় বারবার ভেবেছি। সময় ও সুযোগের অভাবে তা আর করা হয়ে ওঠেনি। আলহামদুলিল্লাহ্! তাঁর ওপর লেখা শতশত প্রবন্ধ-নিবন্ধ, বক্তৃতা, বিবৃতিকে একত্র করে “শত মনীষীর দৃষ্টিতে আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার রহ.” নামে একটি গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ পড়ে তা আপনারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। দয়াময় মেহেরবান আল্লাহ্ আমাদের হুজুরকে জান্নাতুল ফেরদৌসের আরামগাহে চির শান্তিতে রাখুন। আমীন।


মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্