বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহুদেশে কয়েক লক্ষ মুরিদ ও ভক্তদের রেখে চলে গেলেন আমাদের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদে বরহক হজরতুল আল্লামা হাদিয়ে যামান আলহাজ্ব মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার ছাহেব রহ.। লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আহাজারির মাধ্যমে তাঁকে চির বিদায় জানানো হয় চট্টগ্রাম রেলওয়ে পলোগ্রাউন্ডে গত ২৬শে মার্চ ১৯৯৮ইং, বেলা দশটায়। মুর্শিদে বরহক! আলবিদা-আলবিদা। আর চর্মচক্ষুতে আপনার সাথে আমাদের দেখা হবে না। কিন্তু যিক্র মাহফিলে বা গভীর নিশিথে যাদের মুখে উচ্চারিত হয়েছে- ‘এলাহি আনতা মকসুদী, ওয়ারেজাউকা মাতলুবী, তারাকতুদ দুনিয়া ওয়ামা ফিহা’ তাঁরাই হয়ত আধ্যাত্মিক শক্তির বলে আপনার মোলাকাত পাবেন। কিন্তু আমরা যারা ঐ স্তরে পৌঁছতে পারিনি তারাতো এতিম হয়ে গেলাম। কে আমাদের লালন করবে, কে শুনাবে অভয় বাণী? নফছকে পদদলিত করে স্বকীয়তাকে বিসর্জন দিয়ে মোহমুক্ত মানুষকে হাতে ধরে নিয়ে যাবে কে গাউসে পাকের পথে, পাক পবিত্র মদীনার পথে, সিরাতুল মুসতাকিমের পথে?
কিন্তু হুজুর কেবলা রহ. এর অন্তর্ধান যতই বেদনাদায়ক হোক না কেন আল্লাহ্ ফয়সালাকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না- ‘কুলু নাফসিন যা-ইকাতুল মাওত’ (সকল জীবকে অবশ্যই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে)। মানুষ জীব জগতের অধিবাসী। তাই মৃত্যুকে আমাদের গ্রহণ করতেই হবে।
মরহুম হুজুর কেবলা রহ. মসজিদকে কেবল নামায ও ইবাদতের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মসজিদে নববীকে যেমন হুজুরে আকরাম সা. রাষ্ট্রনীতি, ধর্মনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, জিহাদ ঘোষণা ও যুদ্ধ পরিচালনা প্রভৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহার করতেন তেমনি আমাদের হুজুর কেবলা রহ.ও মসজিদ ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানাদি স্থাপন করে গেছেন, যা সমাজসেবায়, দেশসেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ৬২টি মসজিদ বায়তুশ শরফ, ১৩টি এতিমখানা, ১০টি হেফজখানা, ৫টি ফ্রি চিকিৎসা কেন্দ্র ও হাসপাতাল, সৈকত নগরী কক্সবাজারে ১টি শিশু হাসপাতাল ও ১টি অত্যাধুনিক চক্ষু হাসপাতাল, উন্নত শ্রেণির আলীয়া মাদ্রাসা, ২টা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩২টা ফোরকানীয়া মাদরাসা জনসেবায় নিয়োজিত আছে। তিনি বলতেন, খৃস্টান পাদ্রীগণ অনুন্নত দুর্গম এলাকায় গিয়ে হাসপাতাল ও গির্জা প্রতিষ্ঠিত করে দরিদ্র মানুষকে খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা স্থাপন করেছেন। শিক্ষা বিস্তারের জন্য মাদ্রাসা খুলেছেন এইসব এলাকায় বহু উপজাতি সপরিবারে তারই পুণ্য হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এইসব বহুমুখী প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনা করা দুরুহ ব্যাপার। তাই প্রায় সময় তিনি আল্লাহ্ পাকের সাহায্য চেয়ে কান্নাকাটি করতেন। হুজুর কেবলা রহ. এর তেমন কোন আর্থিক সংগতি ছিলনা। তাঁর গ্রামের বাড়িটাও নড়বড়ে কাঁচা। তাঁর মুরিদগণ বাড়িটা পাকা করে দেবার প্রস্তাব করলে তিনি রাগতস্বরে বলতেন ‘ইটের গাঁথুনী আমাকে আল্লাহর রোষ থেকে রক্ষা করতে পারবে না।’ তাঁর লক্ষাধিক মুরিদ দেশে বিদেশে বিভিন্ন কাজকর্মে নিয়োজিত আছেন। তাঁরাই প্রয়োজনে হুজুর কেবলা রহ. এর জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানাদিগকে গোপনে গোপনে আর্থিক সাহায্য দিয়ে থাকেন।
মরহুম হুজুর কেবলা রহ. পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে ভালোবাসতেন এবং ছাত্রদের সাথে একাত্ম হয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। তিনি বায়তুশ শরফ আদর্শ আলিয়া মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষরূপে সুদীর্ঘকাল কর্তব্যরত ছিলেন। তিনি ২১ খানা গবেষণামূলক পুস্তক রচনা করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক গবেষণা কেন্দ্র দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদগণের মিলন ক্ষেত্র। তিনি গুণীজন সংবর্ধনার ব্যবস্থা করে ইসলামী চিন্তাবিদ, বিশিষ্ট শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী সমাজসেবকদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদানের জন্য পুরস্কৃত করতেন।
আমাদের মহান শেখ মনে করতেন মানুষের সেবা করাই খোদার নৈকট্য লাভের অন্যতম প্রধান উপায়। তাই তিনি জনসেবামূলক বহু প্রতিষ্ঠান তথা এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এই সাম্রাজ্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায়-দায়িত্বভার রেখে যাওয়া এতিম মুরিদানদের উপর ন্যস্ত রয়েছে। তাই ব্যক্তিগত স্বার্থ ও মতামতকে ঝেড়ে ফেলে একাত্মভাবে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
আমরা জেনে অত্যন্ত খুশি হয়েছি যে হুজুর কেবলার রহ. এর দীর্ঘদিনের সাথী, ছায়ার মত যিনি তাঁর সাথে সাথে ছিলেন, ছাত্রজীবনের যার মেধা সকলের ঈর্ষা করত, নিবেদিত একজন শিক্ষক, বক্তা ও কবি হিসেবে যিনি জনসমক্ষে সুপরিচিত, বর্তমানে বায়তুশ শরফ আদর্শ মাদ্রাসায় যিনি অধ্যক্ষের পদে কর্মরত আছেন, তিনি হুজুর কেবলা রহ. এর শূন্যস্থান পূরণ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন (বাহরুল উলুম শাহ্ সূফি হযরত মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন রহ.)। আল্লাহ্ পাকের দরবারে লক্ষ কোটি শুকরিয়া আদায় করছি যে, এরকম একজন উপযুক্ত ও যোগ্য ব্যক্তির উপর মরহুম হুজুর কেবলা রহ. এর অসমাপ্ত কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে। তাঁরই সুদক্ষ পরিচালনায় বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
অধ্যক্ষ আজমত উল্লাহ্
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ।
Leave a Reply