তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ. বার্মার (মায়ানমার) সাংগু জেলার পিনজুলুক রেল স্টেশনের ৫ কিলোমিটার পূর্বে কালা বস্তি বাঙ্গালি কলোনীতে ১৯৩৩ সালে জন্যগ্রহণ করেন। তখনকার সময় তাঁর আব্বাজান ব্যবসার উদ্দেশ্যে সপরিবারে মায়ানমারে অবস্থান করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ ওয়াছিউদ্দীন মিয়াজী (মৃত: ১৩৫৫ হিঃ/১৯৬৩ খ্রিঃ), মাতার নাম ফিরোজা খাতুন (মৃত: ১৯৯৪ খ্রি:)। তিনি স্থানীয় মক্তবে মৌলভী আবদুল করিমের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর সাতকানিয়া উপজেলাধীন গারাঙ্গিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৪৯ সালে আলিম ও ১৯৫১ সালে ফাযিল পাস করেন। অতঃপর তিনি উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৫৩ সালে হাদিস বিভাগ থেকে কামিল পাশ করেন।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত বহুমুখী প্রতিষ্ঠানসমূহ: মাওলানা আবদুল জব্বার রহ. পীর জগতের একজন ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি একজন সমাজ হিতৈষী ও মানবতাবাদী পীর ছিলেন। তিনি সমাজকল্যাণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, ইসলামী অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, অসহায় বিধবা ও ইয়াতিমদের পুনর্বাসনসহ আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন পূর্ণমাত্রায়। তিনি তাঁর পীর সাহেব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘বায়তুশ শরফ আন্জুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ’ নামের অরাজনৈতিক ও মসজিদভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে সারা দেশে একটি সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল মিশনারী কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সংগঠনের পরিচালনায় দশটি প্রকল্পের অধীনে ৪৩৬টি কর্মসূচি চালু আছে। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি নিজ উদ্যোগে ও তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তবৃন্দের সহযোগিতায় ‘বায়তুশ শরফ’ নামে ৬৬টি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ইবতেদায়ী, দাখিল, আলিম, ফাযিল ও কামিল শ্রেণি পর্যায়ের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন ১৪টি। এর মধ্যে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসা দেশের শীর্ষস্থানীয় আধুনিক ও দ্বীনি শিক্ষার সমন্বয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিদেশ সফর: তিনি সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান, আরব আমিরাত, ইরাক, পাকিস্তান, ভারত, মালেশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, জর্দান, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইতালী, বুলগেরিয়া ও আমেরিকা প্রভৃতি দেশ সফর করেন। তিনি ১৯৮৮ সালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ‘মুসলিম নারী শিক্ষার উন্নয়ন’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ ও দা’য়ী আহমদ দিদাত ও বৃটেনের নও মুসলিম ইউসুফ ইসলাম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের আলিম-ওলামা ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সমাজ ও মানব কল্যাণে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তাঁকে ১৯৯২ সালে নিউইয়র্কে অবস্থিত চট্টগ্রাম এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া হয় এবং ১৯৯২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশ সময় রাত দশটায় ভয়েস অব আমেরিকা থেকে তাঁর একটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। ২৫/১০/৯১ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজকল্যাণ ফেডারেশন ও চট্টগ্রাম সমাজ কল্যাণ পরিষদকে ভূষিত করা হয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ইসলামের প্রচার, প্রসার ও মানবকল্যাণে বিশেষ অবদান রাখায় ‘কারেন্ট নিউজ পদক’ মরণোত্তর এ ভূষিত করা হয়। ২৬ ডিসেম্বর ২০০৩ সালে ইসলামী সমাজ কল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রাম, ইসলামের আলোকে সমাজসেবা ও আধ্যাত্মিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য মরণোত্তর সংবর্ধনা, নগদ অর্থ ও গোল্ডেন ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। ২২ অক্টোবর ২০০৪ সালে ‘বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি’ দ্বীনি ইল সম্প্রসারণে বিশেষ অবদান রাখার জন্য কুরআন শিক্ষা সোসাইটি এ্যাওয়ার্ড ও নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। ২৮ মার্চ ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম-এর প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা চেয়াম্যান হিসেবে প্রধান ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ মরণোত্তর সম্মাননা ও গোল্ডেন ক্রেস্ট প্রদান করে; যা তৎকালীন মাননীয় রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান এর কাছ থেকে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভী গ্রহণ করেন।


-ড. মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আবু নোমান

(অব:) অধ্যক্ষ, বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *