হুমায়ুন, বাড়ি বরিশাল। ছোটবেলা হতে বায়তুশ শরফ এতিমখানায় লালিত পালিত হয়েছে। আমার মুখচেনা। একদিন ঢাকা বায়তুশ শরফে দেখে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় আছ? কি কর? বলল, এখন তো এতিমখানায় থাকতে পারি না। কাজ করতে হবে। বাড়িতে মা আর ছোট ভাই-বোন, তাদের কিছু দিতে হবে। হুজুর কেবলা বলেছেন, ঢাকায় যাও মসজিদের বাইরে, ফুটপাতে ওভার ব্রীজে যেখানে সুবিধা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আতর তসবীহ্ ছোটখাট বই বিক্রি কর। পুঁজিটা তিনি দিয়েছেন দু’একবার তার কাছ থেকে আমিও আতর কিনেছিলাম। কিছুদিন পর আবার দেখা। জানতে চাইলাম, তোমার ব্যবসা কেমন চলছে? দুঃখ ভরা মনে বলল, ভালো করতে পারিনি রমযানে কিছুটা পোষাত। এখন বেচাবিক্রি নাই। তাছাড়া ফুটপাতে দাঁড়ালেই পুলিশকে বখরা দিতে হয়। রোজ ১০০ টাকা। নচেৎ দাঁড়াতেই দেবে না। হুজুর কেবলার কাছে গিয়েছিলাম ব্যর্থতার কথা বলেছি। হুজুর বলেছেন, কক্সবাজার থেকে ঝিনুকের মালপত্র সাপ্লাই দিয়েও নাকি কেউ কেউ ব্যবসা করে। তুমিও চেষ্টা কর। হয়ত দাঁড়িয়ে যেতে পারবে। এবারও তিনি পুঁজির টাকা দিয়েছেন। কিন্তু ঢাকায় দু’একটি দোকানে কথা বলে গেছি। তারা যে দামে কিনবে বলেছিল, মাল আনার পর সে দাম দেয় না। অনেকে বাকীতে রেখে যেতে বলে। ফলে মার খেয়েছি। আফসোস করা ছাড়া আমার করণীয় কিছুই ছিল না। এরপরও আগ্রহ করে তার অবস্থা জানতে চাইতাম। এতে বোধহয় সে সান্ত্বনা পেত। আমাকে মনের কথা খুলে বলত। একদিন বলল, বায়তুশ শরফের এক ধনীলোকের অফিসে চাকরী নিয়েছি দারোয়ানের। কিন্তু পরিশ্রমে আর বেতনে পোষায় না। ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। পুনরায় আরেক ভদ্রলোকের দোকানে চাকরী নেয়। পরে অনেক দিন দেখা নেই।
২৫ মার্চ ‘৯৮ হুজুর কেবলা রহ. এর ইন্তেকাল উপলক্ষে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম। অনেকের মাঝে হুমায়ুনকে দেখলাম। তার জন্য হুজুর কত চিন্তিত ছিলেন ব্যবসায় পুঁজি খাটানোর জন্য পকেট থেকে কত টাকা দিয়েছেন সে কথা চিন্তা করে তার চেহারার দিকে তাকালাম। অনেকের মত তারও অশ্রু টলমল। বললাম, তুমি এখন কোথায়? বলল, ঢাকায় যেখানে চাকরি করতাম ফাজিলের রেজাল্টের খবর পেয়ে আম্মার কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইলাম। তিনি একেবারে বিদায় দিয়েছেন। বরিশাল গিয়েছিলাম। আবার হুজুর কেবলার কাছে এসেছি। হুজুর বলেছেন, তোমার কোন একটা হাতের কাজ শিখতে হবে। আরো বললেন- বর্তমানে, কম্পিউটার অপারেটরের বেশ চাহিদা। তুমি কম্পিউটার শিখ। বললাম, অনেক টাকা লাগবে। হুজুর বললেন- তুমি যোগাযোগ করে আমাকে জানাও। পুরা কোর্স শিখতে একসাথে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে। হুজুর কেবলা প্রথম কিস্তিতে ৩ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বলেছেন, বায়তুশ শরফের লিল্লাহ্ বোর্ডিং এ খাওয়া-দাওয়া করবে। আমি বলে দিচ্ছি। ইন্তেকালের ৩/৪ দিন আগে বাকী ২ হাজার টাকাও দিয়ে দিয়েছেন।
শুনে আমি অশ্রু সংবরণ করতে পারলাম না। কত শত হুমায়ুনদের আপনি মানুষ করেছেন, হে মুর্শিদ! আপনাকে হারিয়ে কাকে বাবা ডাকবে এই এতিমরা? কিভাবে আপনি চলে গেলেন?
মাদ্রাসা কমিটির এক সদস্যকে ঘটনাটি বললাম, তিনি বললেন- ছেলেটি প্রথম পরীক্ষায় খারাপ করেছিল এজন্য তার প্রতি আমাদের মন খারাপ ছিল। বললাম, কোন মেধাবী প্রতিভাবান ছেলের জন্য হয়ত এরূপ বদান্যতা আশা করা যায়। কিন্তু বরিশালের ছেলে। তেমন প্রতিভাবানও না, তবুও তাকে মানুষ করার জন্য হুজুরের কি যত্ন! আমার এক আত্মীয়ের কাছে বলেছিলাম এই বিরল দৃষ্টান্তটি। ফেরদৌস ভাই বললেন, হুজুর কি পরিমাণ টাকা দিয়েছে সেটা বড় কথা নয়। আমার কাছে বড় বিস্ময় হল, যিনি হাজার লক্ষ মানুষের হেদায়াতের দায়িত্ব পালন করেছেন, কোটি কোটি টাকার প্রকল্প তত্ত্বাবধান করেছেন, তিনি একটি এতিম শিশুকে মানুষ করার জন্য কতখানি চিন্তা করেছেন, কত কী পরিকল্পনা করেছেন এবং কিভাবে যত্ন নিয়েছেন তা ভাবতেই তো অবাক লাগে।
-ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, কবি ও প্রাবন্ধিক, ঢাকা।
Leave a Reply