তিনি সংসার ত্যাগী ছিলেন না, সম্পদ ত্যাগী ছিলেন

তাঁর উপনাম- আবদুল জব্বার। জব্বার মানে মহানিয়ন্ত্রক ও মহাব্যবস্থাপক।আর আব্দ আবদু আবদুল, মানে গোলাম, দাস। অর্থাৎ তিনি ছিলেন মহানিয়ন্ত্রক, মহাব্যবস্থাপক আল্লাহ্ গোলাম। এর অর্থ অনুধাবন করতে আরবি কবির একটি মর্মবাণী স্মরণ করা যায়। কবি বলেন- ‘কুদ আছারুনা’ তাদালু আলাইনা; ফান্যুর বা’দুনা ইলাল আছার।’ আমাদের পরিত্যক্ত আচার ঐতিহ্য, আমাদের দলিল প্রমাণ, যা আমাদেরকে প্রকাশ করে; অতএব, আমাদের পরবর্তীতে আমাদের আচার-ঐতিহ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত কর।

দৃকপাত কর। দৃকপাত কর! বায়তুশ শরফের প্রতি দৃকপাত কর! একটি জীবনের প্রকাশ থেকে ওপাশে, কিসের থেকে কী হয়ে গেল। কোথায় ছিল হযরত কেবলা রহ. এর ভিত্তি প্রস্তর, আর কোথায় হল শতধা প্রসারিত, ক্ষুদ্র-বৃহৎ স্বায়ত্ত্ব শাসিত স্ব স্ব ব্যবস্থাপনায় সম্প্রসারণশীল শত শত বায়তুশ শরফ প্রতিষ্ঠান, হুজুর কেবলার মহান ব্যক্তিত্বের প্রশ্নাতীত সদিচ্ছাসূচক শক্ত আঁটুনীতে একত্রিতভাবে সুনিয়ন্ত্রিত হয়ে চলছে। দিবা-রাত্র নির্বিশেষে বিরতিহীন সাধনামূলে সার্থক হয়েছে। তাঁর উপনামঃ আবদুল জব্বার- মহা-নিয়ন্ত্রকের গোলাম।

তাঁকে অনেকে জিজ্ঞেস করেছেন- আপনি কোটি কোটি টাকার এত বড় বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন কিরূপে? আপনি কি আরব, আমেরিকা থেকে টাকা পান? আপনি নির্বিবাদে এগুলো পরিচালনা করেন কিভাবে? আপনি নিজেকে বায়তুশ শরফের পীর বলেন কেন? আপনার পীর মুর্শিদ তো এ নামে পরিচিত ছিলেন না।

তিনি বলেন- এ ধনিয়ালাপাড়ায় একজন সিলেটি ব্যবসায়ী সিনেমা হল করার জন্য ১৩ গণ্ডা জায়গা খরিদ করেছিল। কিন্তু কোন বিপাকে পড়ে তিনি এর কিছু অংশ বিক্রি করতে চাইলে আমার পীর মুর্শিদ তা খরিদ করে তাতে ১৯৬৮-৬৯ সালে একটি মসজিদ তৈরি করেন এবং খুৎবা দিয়ে জুমার সালাত আরম্ভ করেন। তিনি এটাকে বায়তুশ শরফ নামকরণ করে আমার হাতে সোপর্দ করে দেন। তাঁর ইন্তেকালের পর আমি এটাকে ঘর হিসেবে নয়; আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। আমি আমার মুর্শিদের দোয়ার উপর ভরসা করে এবং আল্লাহ্ উপর নির্ভর করে বায়তুশ শরফের প্রকল্প গ্রহণ করি ও কাজে হাত দেই। লোকেরা বিশ্বাস করে আমার হাতে টাকা-পয়সা প্রদান করে, কাজ আপন গতিতে চলতে থাকে। আল্লাহ্ কোন অভাব রাখেন না। বায়তুশ শরফে পীর মুরীদীর রেওয়াজ থাকায় আরবেরা কোন পয়সা দেয় না। অন্য কোন বিদেশীরাও বায়তুশ শরফে পয়সা কড়ি প্রদান করে না। বায়তুশ শরফের মুরীদ, পৃষ্ঠপোষক, খেদমতগার এবং সদিচ্ছা-প্রণোদিত সমর্থকরা এর খরচ যোগায়। তবে ঢাকার বায়তুশ শরফে হার্ট ক্লিনিক এবং কক্সবাজার বায়তুশ শরফে চক্ষু হাসপাতাল গড়ে তুলতে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড থেকে উল্লেখযোগ্য সাহায্য এসেছে। তা উল্লেখ করা যায়।

তিনি ছিলেন শাহ; মানে আধ্যাত্মিক জগতে রাজকীয় মর্যাদা প্রাপ্ত। এটা আধ্যাত্মিক জগতে প্রেমিকের উপাধি। যাঁরা আল্লাহর প্রেমে দুনিয়ার সর্বস্ব ত্যাগ করে, ফকীর-দরবেশ অর্থাৎ চিন্তা ও কর্মে নিঃসম্পদ হয়ে যান, তাঁরা এ সম্মানজনক পদবী লাভ করেন। তিনি সংসার ত্যাগী ছিলেন না, সম্পদ ত্যাগী ছিলেন। তিনি রাতের নিদ্রা ত্যাগ করেছিলেন। রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর রহমতের প্রেমময় ফসল তোলার জন্য কখনো ঘুমাতেন না। তিনি যৌবনকালে প্রথম রাতেও কুরআন পাঠ এবং কিতাব অধ্যয়নে মশগুল থাকতেন। এমনকি রমযান মাসে তিনি প্রায়শঃ সারারাত জাগরণ করতেন ও মধ্যরাতে ভক্ত-অনুরক্ত নিয়ে মসনবী পাঠের আসর বসাতেন। তিনি স্বীকার করতেন যে, না ঘুমিয়ে তিনি শরীর নষ্ট করেছেন কিন্তু সেজন্য তিনি চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন না।

তিনি ছিলেন সূফী, অর্থাৎ সাধক পুরুষ, আধ্যাত্মিক সাধক। সাধনার ক্ষেত্রে তিনি প্রতীয়মান করতে চেয়েছেন যে, ইবাদতের সারাংশ এবং আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্রবিন্দু হল- যিক্র। আরবি কথায়- ‘আযযিক্ মুখখুল ইবাদত’। বিষয়টি ব্যাপকভাবে সবার হৃদয়ঙ্গম করার লক্ষ্যে তিনি দু’টি বই আরবি থেকে ও দু’টি বই উর্দু থেকে নির্বাচিত অংশবিশেষ বাংলায় অনুবাদ করেন। আরবি একটি বইয়ের মূল রচয়িতা শেখ আবদুল কাদির ঈসা, বইটির শিরোনাম ‘হাকীকতে ইলমে তাসাউফ’, বাংলায় এর নাম রাখা হয়েছে এলমে তাসাউফের হাকীকত। উর্দু ভাষার এই বই দু’টির মূল রচয়িতা মাওলানা এমদাদুল্লাহ্ মুহাজির মক্কী; একটি বইয়ের নাম- তোহফাতুল উশাক, অর্থাৎ প্রেমিকদের উপহার এবং অন্যটির নাম গেজায়ে রূহ অর্থাৎ রূহের খোরাক। দ্বিতীয় আরবি বইটির রচয়িতা শায়খুল হাদিস হযরত আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী এবং গ্রন্থটির নাম- জফুল কুলুব ইলা দিয়ারিল মাহবুব, এর বাংলা শিরোনাম-হৃদয়ের টানে মদীনার পানে।


-ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান

প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ও মহা-পরিচালক, বায়তুশ শরফ গবেষণা প্রতিষ্ঠান।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *