আল্লাহর যিকিরের দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে

১৯৯২ সালে আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার লন্ডন সফরকালে

সেখানকার কিংসক্রস শহরে বাংলাদেশি ভাইদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বয়ান। বয়ানটি বাংলাদেশ বিমানের সাবেক জি. এম. (মার্কেটিং) মরহুম ইউসুফ আলী সাহেবের কাছে সংরক্ষিত ভিডিও ক্যাসেট থেকে অনুলিখন করেন তাঁর দৌহিত্র হাফেজ আবু নোমান মোহাম্মদ ছফি উল্লাহ। -সম্পাদক

بِسْمِ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُوْلِهِ اللَّهِ ﷺ، أَمَّا بَعْدُ!

আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর দয়া ও মেহেরবানির বদৌলতে আমাদেরকে এ মজলিসে বসার সুযোগ করে দিয়েছেন। আল-হামদু লিল্লাহ। আপনাদের ঈমানী শ্রদ্ধা ও ভক্তির বদৌলতে আজকের এ মাহফিল। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -এর কথা এবং কুরআন ও হাদীসের বাণী আলোচনা করলে, শুনলে মানুষের ঈমান তাজা হয়। ঈমান তাজা হওয়ার আর কোনো সামান বা পাথেয় নেই, একমাত্র পাথেয় হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল-এর কথা এবং কুরআন

ও হাদীসের বাণী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা, জাল্লা জালালুহু ওয়া আম্মা নাওয়ালুহু স্বয়ং রাসুল-কে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেন,

وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَى تَنْفَعُ الْمُؤْمِنِينَ .

‘(হে নবী)! আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, কারণ উপদেশ মুমিনদেরই উপকারে আসে।”

হে পেয়ারে হাবীব! আপনি কুরআনের আলোচনা করে, কুরআনের কথা বলে মানুষকে ওয়াজ করুন, তাদেরকে শোনান। কেননা ঈমানদারগণের জন্য এ ওয়াজ উপকারী। আল-হামদু লিল্লাহ। এই উপকারী হলো ঈমানী উপকারী, রুহানি উপকারী। মানুষের ঈমান তাজা করার জন্য আল্লাহর পবিত্র কালাম ও তাঁর রাসুল-এর বাণী ছাড়া দুনিয়ায় আর কোনো জিনিস নেই। মানুষের শরীরের আরামের জন্য পৃথিবীতে অনেক কিছু আবিষ্কার করা হয়েছে। এগুলো মানুষের শরীরের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, হাত-পা, পেট-পিঠ, চোখ ইত্যাদির প্রশান্তির জন্য। কিন্তু মানুষের আসল শান্তি, প্রকৃত শান্তি যে জিনিসের মধ্যে সেটি হলো কলবের তথা আত্মার শান্তির মধ্যে। সুবহানআল্লাহএ

প্রিয় ভাইয়েরা! আপনারা একটু লক্ষ করুন, মনোযোগ দিয়ে শুনুন, চিন্তা-ভাবনা করুন। এগুলো কুরআন-হাদীসের কথা। ওলামায়ে কেরাম, বুজুর্গানে দীন এসব কথা কুরআন-হাদীস হতে বের করেছেন। যেগুলো কুরআন-হাদীসের বিপরীত নয়।

মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ال الله )লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), এক আল্লাহ।

তিনি ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই। মানুষের শান্তি লাভের যেসব সামান বা উপকরণের কথা উল্লেখ করলাম, এগুলোর মালিক আল্লাহ রব্বুল আলামীন। মানুষ চিন্তা-গবেষণা করে প্লেন-জাহাজ, গাড়ি-বাড়ি, চেয়ার-টেবিল ইত্যাদি তৈরি করে। কিন্তু এসব জিনিস তৈরি করার জন্য যে লোহা, মাটি, কাঠ, পানি ইত্যাদির প্রয়োজন, এগুলোর মালিক কে? এগুলোর মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা।

মানুষ যে মাটির ওপর বসবাস করে, তার ওপর কত বিশাল আকারের কল-কারখানা, মিল-ফ্যাক্টরি ইত্যাদি বানায়, সেই মানুষ কী এক টুকরো লোহা, একমুঠি মাটি, একখণ্ড কাঠ বানাতে পারবে? মানুষ তার বিবেক-বুদ্ধি ব্যয় করে, চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে এতকিছু বানাচ্ছে, আবিষ্কার করছে, কিন্তু তাকে বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা-গবেষণা করার শক্তি কে দান করেছেন? একমাত্র আল্লাহ তাআলাই এগুলো তাকে দিয়েছেন, আর তিনিই এগুলোর একমাত্র মালিক। আল্লাহ তাআলা কুরআনুল করীমের এক আয়াতের মধ্যেই সব প্রমাণ করে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন,

وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ

‘তোমাদের নিকট যেসব নিয়ামত আছে তা তো আল্লাহরই নিকট হতে।”

এই ছোট একটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন, পৃথিবীর বুকে যত নিয়ামত তোমরা ভোগ করছ, এগুলো সব তাঁর পক্ষ হতে তিনি দয়া করে আমাদেরকে দান করেছেন। আল-হামদু লিল্লাহ। একজন আল্লাহর অলী ফরমান,

این امانت چند روزه نزد ماست و در حقیقت مالک ہر شے خداست

এ দুনিয়ায় তোমরা যা কিছু ভোগ করছ, ব্যবহার করছ এগুলো সব আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমানতস্বরূপ তোমাদেরকে দান করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। কিসের পরীক্ষা? তোমরা এ আমানত ভোগ করে তাঁর ইবাদত করছ না নাফরমানি করছ, তাঁর শোকর আদায় করছ না বেশোকরি করছ, তাঁর কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে চলছ না বিরোধিতা করছ।

মানুষ গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী ইত্যাদি আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করে, কিন্তু সে কি একটি ডিমও বানাতে পারবে? দুনিয়ায় কারও পা ভেঙে গেলে কৃত্রিম পা দিয়ে চলাফেরা করে, এই কৃত্রিম পা যতই দামি হোক না কেন এটা অস্থায়ী। আল্লাহ তাআলা যেভাবে বানিয়েছেন মানুষ কি কখনও সেভাবে বানাতে পারবে? তাই সবকিছুর আসল মালিক আল্লাহ রব্বুল আলামীন, তাঁর কোন তুলনা হতে পারে না। তিনি আমাদের উপকারার্থে সবকিছু সৃষ্টি করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

اللَّهُ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَنْعَامَ لِتَرْكَبُوا مِنْهَا وَ مِنْهَا تَأْكُلُونَ *

‘আল্লাহই তোমাদের জন্য গবাদি-পশু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তার কিছুসংখ্যকের ওপর তোমরা আরোহণ কর আর কিছুসংখ্যক হতে তোমরা খাও।”

প্রতিনিয়ত আমরা কত গোশত খাই, দুনিয়ার সকল শক্তি মিলে এক টুকরো গোশতও কি বানাতে পারবে? মানুষ কি একটি ফলও বানাতে পারবে? এমনকি অতিক্ষুদ্র চাল পর্যন্ত কেউ বানাতে পারবে না, একটা বালুর কণাও মানুষ বানাতে পারবে না। তাই সবকিছুর আসল মালিক আল্লাহ রব্বুল আলামীন, যাঁর কোনো তুলনা হয় না। তিনি আমাদের শরীরের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন বানিয়েছেন, তদ্রূপ শরীরের ভেতরের অংশও তাঁর বানানো। সব কিছুর মালিক কে? একমাত্র إِلَهَ لِ اللَّهُ )লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)। এক ফোঁটা পানি থেকে সব বানিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

أَلَمْ نَخْلُقُكُمْ مِنْ مَاءٍ مَّهِينٍ

‘আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি হতে সৃষ্টি করিনি।

এক ফোঁটা ঘৃণিত পানি থেকে আল্লাহ রব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, যা বাবার বীর্য থেকে আল্লাহর হুকুমে মায়ের রেহেমে যায়। এমন এক পানি যা বের হলে পরে গোসল ওয়াজিব হয়। কাপড়ে বা শরীরে লাগলে কাপড় বা শরীর ধোয়া ওয়াজিব। এ এক ফোঁটা পানির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর বুকে কত প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। কোনোটি দুই পাবিশিষ্ট, কোনোটি চার পা বশিষ্ট। যেমন- গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী। তদ্রূপ মানুষও দুই পাবিশিষ্ট। আবার এমন অনেক প্রাণী সৃষ্টি করেছেন যেগুলোর কোনো পা নেই। যেমন-সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী, সাপ-জোঁক ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَاللَّهُ خَلَقَ كُلَّ دَابَّةٍ مِّنْ مَّاءٍ فَمِنْهُمْ مَنْ يَنشِئُ عَلَى بَطْنِهِ ۚ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنشِئُ عَلَى

رِجُلَيْنِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَمْشِي عَلَى أَرْبَعٍ يَخْلُقُ اللهُ مَا يَشَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . ‘আল্লাহ সমস্ত জীব সৃষ্টি করেছেন পানি হতে, অতঃপর তাদের মধ্য হতে কিছুসংখ্যক পেটে ভর দিয়ে চলে, কিছুসংখ্যক দুই পায়ে চলে এবং কিছুসংখ্যক চার পায়ে চলে। আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।’২

এগুলো সব আল্লাহর কুদরত, তিনি যেভাবে চান যা চান বানাতে পারেন। আমরা গরু-ছাগলকে খাদ্য খাওয়াই। এই খাদ্যগুলো পেটের ভেতরে গিয়ে রক্ত, পেশাব-পায়খানায় পরিণত হয়। সেই সাথে সাথে আল্লাহর হুকুমে দুধও তৈরি হয়! আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন,

وَإِنَّ لَكُمْ فِي الْأَنْعَامِ لَعِبْرَةً نُسْقِيكُم مِّمَّا فِي بُطُونِهِ مِنْ بَيْنِ فَرْثٍ وَدَمٍ لَبَنًا خَالِصًا

سابعًا لِلشَّرِبِينَ

‘অবশ্যই গবাদি-পশুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। তাদের

উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য থেকে তোমাদেরকে পান করাই

বিশুদ্ধ দুধ, যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু।”

তোমরা গরু-ছাগলকে ঘাস, ভুসি ইত্যাদি খাওয়াও। এ পশুগুলো আল্লাহর সৃষ্টি, খাদ্যগুলোও আল্লাহর সৃষ্টি। আমি এগুলো থেকে খাঁটি দুধ বের করি, যা সবাই পান করতে পারে। পান করতে চিবানো লাগে না, কোনো কষ্ট হয় না। এমনকি দাঁত উঠেনি এমন শিশুরা পর্যন্ত সহজভাবে পান করতে পারে। এখানে মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই একমাত্র ক্ষমতা আল্লাহ তাআলার। কেননা তিনিই এগুলো বানিয়েছেন। আমরা গরু-ছাগলের গোশত খাই, এগুলোর চামড়া ব্যবহার করি, এমনকি ভেতরে যে ভুঁড়ি থাকে সেগুলোও ব্যবহার করি। এ সবকিছু আমাদের উপকারার্থে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَلَكُمْ فِيهَا مَنَافِعُ كَثِيرَةٌ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ )

‘এবং তাতে তোমাদের জন্য রয়েছে প্রচুর উপকারিতা; আর তোমরা তা থেকে খাও।১

মানুষ আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করছে, ব্যবহার করছে, কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করছে না। কে এগুলো সৃষ্টি করেছেন? কে এগুলো বানিয়েছেন? যে খালিক-মালিক এগুলো সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করতে হবে, তাঁর নীতি মেনে চলতে হবে। যদি চিন্তা করে তাহলে মানুষের বিবেক তাকে তার সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করতে বাধ্য করবে। আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন। মানুষ যদি মনে করে সে তার শরীরের মালিক, তাহলে তো তাকে মরতে হতো না। সে কি হযরত আজরাইল-কে বলতে পারবে আমি মরব না? কেউ পারবে না। কোনো প্রেসিডেন্ট, কোনো মন্ত্রী, কেউ পারবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

لِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ إِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَلَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ .

‘প্রত্যেক জাতির এক নির্দিষ্ট সময় আছে, যখন তাদের সময় আসবে তারা মুহূর্তকালও পেছাতে বা আগাতে পারবে না।’

আমি মানুষের জন্য মেয়াদ নির্ধারিত করে রেখেছি, ঠিক করে রেখেছি। যখন নির্ধারিত সময় আসবে তখন হযরত আজরাইল রুহ টান দিয়ে জান কবজ করে নিয়ে যাবেন। দুনিয়ার কোনো চিকিৎসা, কোনো ডাক্তার, কোনো যন্ত্রপাতি তাকে বাঁচাতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ রুহ চালু রাখবেন ততক্ষণ চিকিৎসা চলবে, ডাক্তারের পরামর্শ চলবে। যখনই রুহ বন্ধ হয়ে যাবে তখনই সব শেষ হয়ে যাবে। সুতরাং আমাদের সকলেরই আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

أَفَلَا يَشْكُرُونَ

‘তবুও কি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না।”

মানুষ আল্লাহর নিয়ামতসমূহ ভোগ করছে, কিন্তু তাঁর শোকর আদায় করছে না। আল্লাহ তাআলার যথাযথ শোকর আদায় করা আমাদের পক্ষে সম্ভবও নয়। আমরা দুনিয়ায় কারও প্রতি শোকরিয়াস্বরূপ তাকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে পারি। কিন্তু আল্লাহর শোকরিয়া আদায়ের অর্থ হলো তাঁর নিয়ামত ভোগ করে তাঁর ইবাদত করা, তাঁর হুকুম-আহকাম মেনে চলা, তাঁর নীতি মেনে চলা। এগুলোই হলো আল্লাহ তাআলার শোকরিয়া আদায়। আল্লাহর অলী-বুজর্গগণ বলেন,

بندگی کن بندی کن بندگی، زندگی بے بندگی شرمندگی۔

‘ওহে আল্লাহর বান্দা! তুমি যেখানেই থাক আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চল, তাঁর বন্দেগি কর।’

এটাই হলো তাঁর শোকরিয়া আদায়। বান্দাকে সবসময় তাঁর মা’বুদের আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে হবে। যার নিয়ামত ভোগ করছি তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার নাম বন্দেগি। তোমার জীবনটাই হলো আল্লাহর বন্দেগি করার জন্য। আমাদের এ জিন্দেগি হায়াত আর মউতের মাঝখানে। এখন আমাদের হায়াত আছে, এরপর আসবে মউত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيُوةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلانَ

‘যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার

জন্য, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম।’২

আল্লাহ বলেন, হায়াত-মউত আমি সৃষ্টি করেছি। কেন সৃষ্টি করেছি? তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। কিসের পরীক্ষা? আমার নিয়ামত ভোগ করে, আমার জমিনে বসবাস করে, কে আমার কথা মেনে চলছে, কে কুফুরি করছে, কে আমার শোকরগুজারি করেছে এগুলো পরীক্ষা করার জন্য। কার হায়াত কতটুকু রেখেছেন এটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। তিনি আমাদের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন সৃষ্টি করেছেন তদ্রূপ আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশও তিনি সৃষ্টি করেছেন।

আমাদের আরাম-আয়েশের সমস্ত জিনিস আল্লাহ সৃষ্টি করে রেখেছেন।

তবে এসব কিছুর মূল হচ্ছে মানুষের কলব বা অন্তর। কলবে যদি শান্তি থাকে তাহলে সবকিছুতে শান্তি। আর কলবে অশান্তি দেখা দিলে সবকিছুতেই অশান্তি। যেমন- আপনাদের এখানে এত বড় বড় গাড়ি, দোতলা বাস, কার ইত্যাদি আছে, যদি এগুলোর ভেতরের ইঞ্জিন ঠিক থাকে তাহলে গাড়ি চলবে, আর ইঞ্জিন নষ্ট থাকলে গাড়ি যতই সুন্দর বা দামি হোক না কেন গ্যারেজে ফেলে রাখতে হবে। রাসুল ইরশাদ করেন,

أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً: إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ.

‘জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরো আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হল অন্তর।”

হাদীসে উল্লিখিত (১া শব্দটি আরবি কায়দা বা ব্যাকরণ মতে অর্থ হচ্ছে,

সতর্কবাণী, সতর্ককারী। আপনারা ইংরেজিতে বলেন, ওয়ার্নিং। উর্দুতে বলে, তানবীহ। রাসুলুল্লাহ এখানে «» শব্দটি দ্বারা সতর্ক করেছেন কেন? এজন্যই সতর্ক করেছেন, যেহেতু কলব বা অন্তরের শান্তির ওপর সকল প্রকার শান্তি নির্ভর করে। কলবে যদি শান্তি থাকে তাহলে টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত, পরিবার-পরিজন, স্ত্রী-সন্তান সবকিছুতেই শান্তি। আর কলবে যদি অশান্তি হয় তাহলে এগুলো সবকিছুতেই অশান্তি, কিছুই ভালো লাগবে না। গাড়ি-বাড়ি সবকিছুই মূল্যহীন। এ কলবের শান্তির মধ্যেই সকল শান্তি। সুবহানআল্লাহ।

আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, আমাদের এ ইউরোপ-আমেরিকা কত উন্নত, এখানে শান্তির কত উপকরণ রয়েছে, মানুষের শান্তির জন্য কতকিছু আবিষ্কার করা হয়েছে, কত সুযোগ-সুবিধা, অশান্তি কোথায়? আমি বলি, হ্যাঁ, এগুলোতেও শান্তি আছে তবে এ শান্তি হলো অস্থায়ী শান্তি। এগুলো স্থায়ী শান্তির উপকরণ নয়। তাছাড়াও যত নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে মানুষ মারার অস্ত্রের আবিষ্কারও তত বেড়ে যাচ্ছে। তাহলে বলুন, এসকল আবিষ্কারের মাধ্যমে কি শান্তি আসতে পারে?

এ নতুন নতুন আবিষ্কারগুলো হচ্ছে মানুষের শরীরের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শান্তির উপকরণ, এগুলো চোখের শান্তির জন্য। এগুলো দ্বারা কলব বা অন্তরে শান্তি আসতে পারে না। একটা প্লেনের মূল্য কোটি কোটি ডলার, যদি প্লেনের ইঞ্জিন বিকল থাকে তাহলে এ প্লেন অচল, বিনাটিকিটে নিতে চাইলেও কেউ যাবে না। এখন আপনারা বলুন, যে কলবের শান্তির ওপর মানুষের শান্তি নির্ভর করে, সে কলবের খাদ্য কি বা কিসের মাধ্যমে কলব শান্তি পায়? কলব কি মাছ-গোশত, ফল-ফলাদি ইত্যাদি খায়? দুনিয়ার সকল আমার-আয়েশের উপকরণ ব্যবহার করলে কি কলবে শান্তি আসবে?

আমাদের শরীরের মধ্যে ৩৬০টি জোড়া আছে। এগুলো সব আল্লাহর সৃষ্টি। ৩৬০টির সাথে যদি দুটি করে অঙ্গ জোড়া লাগানো থাকে তাহলে ৭২০টি হয়। একেক অঙ্গ একেক প্রকার, সবগুলো আল্লাহ তাআলার দান, তিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন। তাঁর কুদরতের কারখানায় এগুলো তৈরি করা হয়েছে। আপনারা দুনিয়ার জীবনের জন্য গাড়ি, ফ্রিজ ইত্যাদি কিনে থাকেন। এগুলোর সাথে একটা ক্যাটালগ দেওয়া থাকে, অর্থাৎ কীভাবে জিনিসটি ব্যবহার করবেন, কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করবেন সেগুলোর একটি নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।

তদ্রূপ এ মানবজাতিকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, তিনি তাদের জীবন-যাপনের নিয়ম-কানুন সংবলিত নির্দেশনা দিয়ে ত্রিশপারা কুরআন নাযিল করেছেন। যে ব্যক্তি এ কুরআনকে সামনে রেখে, এ কুরআনের নির্দেশনা মোতাবেক জীবন পরিচালনা করবে তার ইহকাল-পরকালে শান্তি, দুনিয়া-আখিরাতে শান্তি, কবর-হাশরে শান্তি, সমস্ত জায়গায় শান্তি।

ভাইয়েরা আমার! গাড়ির যেমন বিভিন্ন পার্টস বা অংশ থাকে মানুষের শরীরেও তদ্রূপ বিভিন্ন অংশ রয়েছে। গাড়ির কোন অংশের জন্য লাগে তেল আবার কোন অংশের জন্য লাগে মবিল। মানুষের শরীর ঠিক রাখার জন্য যেরূপ খাদ্যের প্রয়োজন কলবের জন্যও খাদ্যের প্রয়োজন। কলবের খাদ্য কি? আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, الا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ .

‘জেনে রাখ, আল্লাহর যিকিরের দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে। ১

যে কলবের ওপর তোমার দুনিয়া-আখিরাতের শান্তি নির্ভর করে, দুনিয়ার কোনো কিছুর দ্বারাই কলবের শান্তি নেই। না খাওয়া-দাওয়া না আরাম-আয়েশ। কলবের একমাত্র শান্তি আল্লাহর যিকিরের দ্বারা। আর কোনো কিছুতেই কলবের শান্তি নেই। সুবহানআল্লাহ।

হাদীসে যেমন র্যা শব্দটি দ্বারা সতর্ক করা হয়েছে, কুরআনেও । শব্দ দ্বারা আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করছেন, সাবধান! তোমরা দুনিয়ার চাকচিক্য দেখে ধোঁকা খেয়ো না। আল্লাহর আউলিয়া কেরাম চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে কলবের শান্তির জন্য পীর-মুরিদী, বায়আতের সিলসিলা ও তরীকাসমূহ বের করেছেন। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাজ এবং ওয়াজিবসমূহ আদায় করি। এগুলোও যিকিরের মধ্যে গণ্য। তাই যিকির-আযকার যত বেশি করা হবে কলবের শান্তিও তত বেশি লাভ করা যাবে, ঈমান তত উন্নত হবে, বাতেনি বা অভ্যন্তরীণ শান্তি বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কলবের শান্তি এমন এক জিনিস যা চোখে দেখা যায় না। তাই হচ্ছে বাতেনি নিয়ামত। আমরা যা কিছু দুনিয়ার জীবনে ভোগ করি সেগুলো জাহেরি নিয়ামত, যা আমরা দেখতে পাই। কিন্তু কলবের নিয়ামত বাতেনি, এ নিয়ামত দেখা যায় না।

ভাইয়েরা আমার! মানবজাতি এ পৃথিবীতে আসার আগে সকলেই রুহ জগতে ছিল। যার নাম আলমে আরওয়াহ অর্থাৎ ‘আলম’ মানে জগত, ‘আরওয়াহ’ রুহ শব্দের বহুবচন তথা রুহসমূহের জগত। আল্লাহ তাআলা হযরত আদম-কে সৃষ্টি করেছেন আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস এ চার প্রকার বস্তু দ্বারা। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর দেহে রুহ প্রবেশ করিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন,

وَ نَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحي

‘এবং তাতে আমার পক্ষ হতে রুহ সঞ্চার করবো।’২

শরীরে রুহ প্রবেশ করার পর হযরত আদম নড়াচড়া করলেন, কথা বলতে পারলেন। এতক্ষণ রুহ ছাড়া কোনো প্রকার নড়াচড়া, কথাবার্তা ছিল না। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত আদম-কে আদেশ দিয়ে বললেন, হে আদম! তুমি সেসব ফেরেশতার নিকট যাও যারা সমবেত অবস্থায় বসে আছে এবং তাঁদেরকে সালাম দাও। হযরত আদম এ ফেরেশতাদের নিকট গিয়ে তাঁদেরকে আস-সালামু আলাইকুম বললেন। তাঁরা জবাবে বললেন, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।’ হযরত আদম আল্লাহ তাআলার কাছে ফিরে এলে তিনি বললেন,

إِنَّ هَذِهِ تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ بَنِيكَ بَيْنَهُمْ».

‘এটিই তোমার ও তোমার সন্তানদের পারস্পরিক অভিবাদন।”

এ হাদীসের মাধ্যমে বোঝা গেল, কিয়ামত পর্যন্ত যত আদম-সন্তান দুনিয়ায় আগমন করবে এটাই সবার সালাম হবে।

রুহ ছাড়া যেভাবে আদম সন্তান দুনিয়ায় চলতে পারে না, আবার এই রুহের জন্য দরকার শরীর। একটা আরেকটার মুখাপেক্ষী। রুহানি ও আধ্যাত্মিক গবেষক মাওলানা জালালউদ্দীন রুমী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মসনবী শরীফে রুহ এবং শরীরের পরস্পরের মুখাপেক্ষিতার উপমা দিতে গিয়ে সুন্দর একটি গল্প উল্লেখ করেছেন,

এক অন্ধ ব্যক্তি যে চলাফেরা করতে পারে না, কোথাও যেতে পারে না।

কোন জায়গায় গেলে খাওয়া-দাওয়া পাওয়া যাবে, কোথায় দাওয়াত আছে, চোখে না দেখার কারণে সে এসব জায়গায় যেতে পারে না। অপর আরেক ব্যক্তি যার পা নেই; ল্যাংড়া, চলাফেরা করতে পারে না, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে না, কোনো দাওয়াতে যেতে পারে না। তখন অন্ধ আর ল্যাংড়া ব্যক্তি দু’জনে মিলে একটি চুক্তি করল যে, ল্যাংড়া ব্যক্তি যেহেতু চলাফেরা করতে পারে না কিন্তু চোখে দেখে আর অন্ধ ব্যক্তি যেহেতু চলাফেরা করতে পারে কিন্তু চোখে দেখে না, তাই অন্ধ ব্যক্তি ল্যাংড়া ব্যক্তিকে কাঁধে করে যেখানে খাওয়া-দাওয়া পাওয়া যায় এবং দাওয়াত থাকে সেখানে নিয়ে যাবে। তবে ল্যাংড়া ব্যক্তি অন্ধ ব্যক্তিকে ছাড়া কিছু খাবে না, যা পাওয়া যাবে দু’জনে মিলে তা খাবে। কিন্তু ল্যাংড়া ব্যক্তি অন্ধ ব্যক্তির চোখে না দেখার সুযোগে বেশি করে খেয়ে নিত, কখন অন্ধ ব্যক্তিকে খাবার দিত আবার কখন দিত না। আল্লাহ তাআলা অন্ধদের চোখে আলো না দিলেও তাদেরকে প্রখর অনুভূতি শক্তি দিয়েছেন। অন্ধ ব্যক্তি ল্যাংড়া ব্যক্তির চালাকি ধরে ফেলল। তাকে বলল, তুমি তো আমাকে ফেলে বেশি পরিমাণ খেয়ে ফেল। ল্যাংড়া ব্যক্তি বলত, না না তোমার জন্যও খাবার আছে।

ভাইয়েরা! এভাবে আমরা যদি আমাদের শরীরের যত্ন নেই, শরীরকে খাবার দেই আর অন্যদিকে রুহের যত্ন না নেই, রুহকে খাবার না দেই.

তাহলে রুহ দুর্বল হয়ে পড়বে, রুহকে রুহানি খাবার দিতে হবে। দুনিয়ার মাটি থেকে যত প্রকার খাদ্য উৎপাদন হয় এগুলো সব মানুষের শরীরের খাদ্য। এগুলো দ্বারা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হয়। যেহেতু মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি, পানি, বাতাস ও আগুন দ্বারা। তাই মানুষের খাদ্যও উৎপন্ন হয় এ চার প্রকার বস্তু দ্বারা। আর রুহ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার কুদরতি সৃষ্টি। তিনি ইরশাদ করেন,

وَيَسْتَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُمْ مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا

‘তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলুন, রুহ আমার রবের আদেশঘটিত এবং তোমাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে সামান্যই।”

হে নবী! মানুষ আপনাকে জিজ্ঞেস করে রুহ কী? আপনি বলুন রুহ আল্লাহর হুকুম, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছে। আবার যেদিন আল্লাহর হুকুম আসবে তখন রুহ বের করে নেওয়া হবে। যিনি রুহ শরীরে প্রবেশ করিয়েছেন তিনি যখনই হুকুম দেবেন তখনই শরীর হতে বের হয়ে আসবে। এ রুহ কি জিনিস দ্বারা তৈরি করা হয়েছে তা এক আল্লাহ ছাড়া আর কেহ জানে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا

‘এবং তোমাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে সামান্যই।”

হে আদম সন্তান! তোমাদেরকে যে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তা অতি সামান্য, রুহ কোন জিনিস দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, এর হাকীকত কী তা তোমাদের বুঝে আসবে না। যেহেতু এর হাকীকত বোঝার জ্ঞান তোমাদেরকে দেওয়া হয়নি। তাই এতটুকু বুঝে নাও মেনে নাও, রুহ আল্লাহর হুকুম। এটি আল্লাহর হুকুমের একটি বাতাস। এ বাতাস যতদিন শরীরের ভেতর থাকবে ততদিন মানুষ জীবিত থাকবে। আমি আগেই উল্লেখ করেছিলাম যে, রুহ আলমে আরওয়াহ তথা রুহ জগত হতে আল্লাহর হুকুমে এ পৃথিবীতে এসেছে। আমাদের খাওয়া-দাওয়া, পানাহার এগুলো আমাদের শরীরের জন্য, আমাদের প্রশান্তির জন্য। কিন্তু রুহ পৃথিবীর এসব বস্তু দ্বারা শান্তি লাভ করে না, যেহেতু রুহ এ জগতের নয়। তাই তার শান্তি হলো সে যে জগত থেকে এসেছে সে জগতের জিনিসের মধ্যে, সেখানকার খোরাকের বা খাদ্যের মধ্যে। আর তা হলো আল্লাহর যিকির। তিনি ইরশাদ করেন,

الا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ .

‘জেনে রাখ, আল্লাহর যিকিরের দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।১ করে।১

এখান থেকে বোঝা গেল, দুনিয়ায় বিজ্ঞানীদের এত গবেষণা, এত আবিষ্কার, এত আশ্চর্যজনক সৃষ্টি সবগুলোই মানুষের শরীরের জন্য, পেট-পিঠের আরামের জন্য, চোখের শান্তির জন্য। এগুলোতে রুহের কোনো শান্তি নেই। রুহের শান্তি কোথায়? রুহের শান্তি হলো, আল্লাহর কালামের মধ্যে। তিনি বলেন,

الَّا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

‘জেনে রাখ, আল্লাহর যিকিরের দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’২

আমি অনেক আগে প্রথমবার যখন আপনাদের এ লন্ডনে এসেছিলাম, আমাদের এক ভাই আমার জন্য বিমানের টিকেটের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার বাসায় থাকা অবস্থায় একজন ডাক্তার সাহেব আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, হুযুর! আমার কাছে যেসব রোগী আসে তাদের মধ্যে এমন অনেক ব্যক্তি আছে যাদের বাহ্যিক কোনো রোগ নেই। আমাকে বলেন, ডাক্তার সাহেব! আমার টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি কোনো কিছুর অভাব নেই, তারপরও আমার মনে অশান্তি। তখন তাকে যে নির্দেশনা বা পরামর্শ দিয়ে থাকি তাতে আমি নিজেও সন্তুষ্ট নই।’

ডাক্তার সাহেব নিজে আমাকে একথা বলেছেন। আরও বলেছেন, ‘তাদের মানসিক অবস্থা অনেক সময় এমন হয় যে, তাদের কিছুই ভালো লাগে না। এমনকি তারা নিজেকে ধ্বংস করার জন্য আত্মহত্যা পর্যন্ত করে। নাউযুবিল্লাহ।’ তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এর কারণ কী?’ আমি তাকে বলেছিলাম, আমি তো ডাক্তার নই। তারপরও চিন্তা করে বললাম, তাদের তো কোনো কিছুর অভাব নেই, গাড়ি-বাড়ি, স্ত্রী-সন্তান ইত্যাদি। কিন্তু তারা দীনের মতো যে দৌলত, এ দীন হতে বঞ্চিত। তাই তাদের এত অশান্তি। তাদের মধ্যে ঈমানী শান্তি, আত্মার শান্তি, কলবের শান্তি নেই। তাই সবকিছু থাকার পরও তারা মানসিক অশান্তিতে ভুগছে। তাকে আমি এ উত্তর দিয়েছিলাম আল্লাহ তাআলার এ আয়াত থেকে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

الا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ .

‘জেনে রাখ, আল্লাহর যিকিরের দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।

করে। ১

দুনিয়ার কোনো জিনিস দ্বারা কলবের শান্তি নেই, যতই দামি হোক না কেন। একমাত্র আল্লাহর যিকিরই কলবে শান্তি আনতে পারে। আর কলবের শান্তির ওপর সবকিছুর শান্তি নির্ভর করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বুঝে আমল করার তওফিক দান করুন। আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।

رَبَّنَا تَقَبَّلُ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَ تُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ .

‘আমাদের থেকে কবুল করো, নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ। … এবং আমাদের ক্ষমা করো। নিশ্চয় তুমি তওবা কবুলকারী, দয়ালু।’২

গ্রন্থনায়: হাফেজ আবু নোমান মোহাম্মদ ছফিউল্লাহ


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *