যশোরে হুযুর কেবলার প্রদত্ত ভাষণ (১৯৮১ সাল)

হযরত ওলামায়ে কেরাম, উপস্থিত বেরাদরানে ইসলাম আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

আল্লাহ পাকের অশেষ রাহমতে আমরা এমন এক মাহফিলে সমবেত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি যা একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে, আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকার জন্য আয়োজিত হয়েছে। এজন্য রব্বুল আলামীনের দরবারে জানাই লাখো শোকরিয়া। খুলনার সফর শেষে চট্টগ্রাম ফেরার পথে জীবনে প্রথম এ যশোরের মাহফিল। এখানকার লোকদের সাথে পূর্বপরিচয় না থাকলেও মুসলমান ভাই হিসেবে আল্লাহর কুরআন থেকে কিছু কথা পেশ করার আশা রাখি। আল্লাহ পাক যদি তওফিক দেন। আমি সর্বপ্রথম যে আয়াত শরীফটা তিলাওয়াত করেছি তাতে আল্লাহ তাআলা মানব-জাতিকে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা করে বলেছেন,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

‘আমি (খোদা) মানব ও জিন-জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত, দাসত্ব করার জন্য সৃষ্টি করেছি।”

আল্লাহ পাকের এ উদ্দেশ্যকে হৃদয়ঙ্গম করতে হলে আমাদেরকে নিজেদের সৃষ্টির গোড়ার কথাটা পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। প্রথমেই আমি এদিকে আপনাদের পূর্ণ মনোযোগ আকর্ষণ করছি। কারণ কুরআন-হাদীসের আলোচনা পূর্ণ মনোযোগ ছাড়া হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়। এজন্য আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَانْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ )

‘যখন তোমাদের সামনে কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করা হয় তখন তোমরা কান পেতে শুনো এবং চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে ধ্যাণের সাথে হৃদয়ঙ্গম কর। তবেই তোমরা আল্লাহর রহমতের আশা করতে

পার।”

অর্থাৎ আল্লাহর রহমত নাযিল হয়ে তোমার কলব নরম হয়ে যাবে। তখন আল্লাহর দীনের কথা তোমার অন্তরে স্থান পাবে।

আলোচনার শুরুতেই আল্লাহ পাকের অনন্ত শোকরিয়া আদায় করছি এজন্য যে, তিনি আমাদেরকে তাঁর সৃষ্টিজগতের হাজারো লাখো মখলুকাতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম করেছেন। এ শোকরিয়া আদায় করা আমাদের ওপর একান্ত কর্তব্য। কারণ মানব-জাতির এ শ্রেষ্ঠত্ব আপনার আমার চেষ্টা তদবীর কিংবা দোয়া ও অনুরোধের দ্বারা নয়, বরং আল্লাহ তাআলা তাঁরই একান্ত দয়ায় আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ মখলুক করেছেন। তিনি যদি আমাদেরকে গাছ, বাঁশ, তরুলতার মধ্যে শামিল করতেন অথবা তিক্ত, দুর্গন্ধময় ও কণ্ঠক জাতীয় করতেন তাতে কারও কি আপত্তি করার সুযোগ ছিল?

তেমনি গাধা, ঘোড়া, হাতি, শুয়োর প্রভৃতি বন্য পশু হিসেবে যদি আমাদের সৃষ্টি করতেন তাতেও কেউ কি বাধা দিতে পারত? তাছাড়া এই শ্রেষ্ঠ মখলুক করার জন্য আমরাও তো কখনও দোয়া বা অনুরোধ করিনি। এরপরও যে আমাদের প্রতি আল্লাহ অতুলনীয় অনুগ্রহ, এর জন্য অবশ্যই আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া আদায় করতে হবে। প্রভু হে! তুমি নিজ দয়ায় অফুরন্ত সমুদ্রের ঢেউ থেকে আমাদেরকে সৃষ্টি করেছ, সমস্ত প্রশংসা ও ইবাদত আনুগত্য তোমারই জন্য। আল্লাহ পাক মানুষের প্রতি তাঁর অপার অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,

فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ لَنْ يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَ التَّرَابِ .

‘মানব-জাতির ভেবে দেখা উচিত, কোন জিনিস থেকে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে? তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে নির্গত (নাপাক) পানি থেকে। (আজকে তুমি বাড়ির মালিক, গাড়ির মালিক, ধনের মালিক, বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার অনেক কিছু) তাই বলে তুমি আমার নাফরমানি করতে পার না। কেননা তোমাকে একটি ঘৃণিত তুচ্ছ, হেয় নাপাক পানি থেকে সৃষ্টি করেছি।’২

এ এক ফোটা পানি পিতার পিঠ ও বুকের মধ্য থেকে আল্লাহর হুকুমে মায়ের পেটে চলে গেল (সেই পানি এতই ঘৃণিত যে, তা ব্যবহারের উপযুক্ত তো নয়ই, অধিকন্তু তা বের হলে গোসল করা শরীয়ত মতে ওয়াজিব)। অতএব সেই এক ফোটা পানিকে মায়ের পেটের ভেতর নির্দিষ্ট একস্থানে যত্ন সহকারে রেখে দিলাম। তারপর:

ثُمَّ جَعَلْنَهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَمًا فَكَسَوْنَا الْعِظْمَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَهُ خَلْقًا أَخَرَ فَتَبْرَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ

الْخَلِقِينَ

তাফসীরসমূহে উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, সেই এক ফোটা পানি মায়ের পেটের অভ্যন্তরে আমি চল্লিশ দিন পরে রক্তকনিকায় পরিণত করলাম। আর চল্লিশ দিনপর সেই জমাটরক্ত গোল্ডের টুকরায় পরিণত করলাম, এরও চল্লিশ দিন পর সেই মাংস টুকরার মধ্যে হাড় এনে জুড়ে দিলাম। অতঃপর হাড়র ওপর গোন্তের বাইরে চামড়ার পোষক পরিধান করিয়ে দিলাম (আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী কাউকে কাল, কাউকে গোরা বিভিন্ন আকৃতি প্রকৃতিতে সাজানোর পর)। আমি তাকে অন্য একটি রূপ দিয়ে দুনিয়ায় পাঠালাম।’ এত বড় শক্তিমান এত সুন্দর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ কি আছে? এ খোদায়ী কারখানার খবর সম্পর্কে কি আমরা চিন্তা করে দেখেছি কোনো দিন?

মানব-জাতি যদি একটু ভেবে দেখত, চিন্তা করত যিনি আমাদেরকে এত রূপ ও গুণের মালিক করেছেন তাঁর শোকরিয়া আদায় করা, যিকির করা ও দাসত্ব করা অবশ্যই কর্তব্য। নিজের বিবেকের কাছে যদি আমরা প্রশ্ন করি, আপন শরীরটার ওপর গবেষণা চালাই। তাহলে চাষী, মজুর, শিক্ষিত, অফিসার, শ্রমিক যেই হোক না কেন তাকে তার বিবেকই বাধ্য করত যে, আমি যেখানেই থাকি না কেন আমার সৃষ্টিকর্তা পালনকর্তাকে কিছুতেই ভুলতে পারি না। এ দৃষ্টিকোণকে সামনে রেখে বুযুর্গানে দীন বলেছেন,

آدمیت لهم و شحم و پوست نیست آدمیت جز رضای دوست نیست

‘রূপ-গুণ, আকার-আকৃতিকে মানুষ বলে, বরং মানুষ সেই ব্যক্তিকে বলে যে, সর্বাবস্থায় আপন সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টিকে সামনে রেখে সব কাজ করে।’ আপনারা নিজেদের প্রতি আল্লাহ অপার অনুগ্রহ ও কল্যাণের কথা চিন্তা করে দেখুন, আমাদের মতো কত পঙ্গু বিকলাঙ্গ, চোখ ছাড়া, হাত-নাক কাটা লোক রাস্তার ধারে পড়ে রয়েছে। আল্লাহ আমাদের মতো সুষ্ঠু সবল সুঠাম দেহের অধিকারী মানুষকেও সে রকম বানাতে পারতেন। আল্লাহ তাদেরকে এজন্য এ রকম করেছেন যেন, কোটি কোটি মানুষ তাদের দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আল্লাহর বন্দেগি করে ও শোকরিয়া আদায় করে। এজন্য বুযুর্গানে দীন বলেন, তুমি যেখানে থাক, সবসময় আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রাখবে। কেননা সবকিছু তারই দেওয়া।

অনেক রিক্সাঅলা ভাই উপস্থিত হয়েছেন দেখছি, আপনাদেরকে যদি আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা দিনের আলোর সুযোগে দিনের বেলা রিক্সা চালাও, আমি যদি রাতকে দীর্ঘায়িত করে এই দিনকে আসতে না দেই তাহলে এমন কোনো কি শক্তি আছে যা আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত সূর্য উঠিয়ে দিন করতে পারে? আল্লাহর এ অনুগ্রহের কথাটাই চিন্তা করে দেখুন। আল্লাহ পাক বলেন,

قُلْ أَرَعَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ الَيْلَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ مَنْ اللَّهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيَكُمُ بِضِيَاءٍ أَفَلَا تَسْمَعُونَ قُلْ أَرَعَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارِ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ مَنْ الهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيَكُمُ بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فِيهِ أَفَلَا تُبْصِرُونَ وَمِنْ رَّحْمَتِهِ جَعَلَ لَكُمُ

الَيْلَ وَالنَّهَارِ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

‘(হে নবী) আপনি বলুন, আচ্ছা একথা বল তো! যদি আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত একাধারে তোমাদের ওপর রাতকে স্থায়ী রাখেন, তবে আল্লাহ ব্যতীত কে এমন উপাস্য আছে যে তোমাদের জন্য আলো এনে দেবে? তবে কি এমন স্পষ্ট প্রমাণসমূহ তোমরা শুন না? আপনি আরও বলুন, আচ্ছা বল তো! যদি কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ তোমাদের ওপর দিনকে স্থায়ী রাখেন, তবে আল্লাহ ভিন্ন কে এমন উপাস্য আছে যে তোমাদের জন্য রাত এনে দেবে? যাতে তোমরা বিশ্রাম গ্রহণ করতে পার, তবুও কেন তোমরা আমার নিদর্শনসমূহ দেখ না? আর তিনি আপন অনুগ্রহে তোমাদের জন্য রাত ও দিনকে

সৃজন করেছেন যেন তোমরা রাত্রিকালে আরাম কর এবং (দিবাভাগে) যেন তাঁর (প্রদত্ত) জীবিকা অন্বেষণ কর আর যেন (উভয়বিধ নেয়ামতের জন্য) তোমরা শোকরিয়া আদায় কর।” কেবল ঘুমের অবস্থাটাই চিন্তা করুন, আমাদের সারাদিনের খাটুনি ও কান্তি রাতের ঘুমে তলিয়ে যায় আর নিয়ে আসে পরম শান্তি ও সুখের জন্য আশির্বাদ। আল্লাহ তাআলা যদি রাতের ঘুমটা না দেন এবং ব্রেইনটা একটু হালকা করে দেন তখনই বোঝা যাবে, তোমার অবস্থা। ডাক্তাররা বলেন, মানুষের ঘুম না হলে ওষুধেও কাজ করে না। আর এই ঘুম আসা না আসা একমাত্র আল্লাহর ওপরই নির্ভরশীল।

হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা যে যে পেশার লোকই হোন এবং যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন আপন খালেক ও মালেকের শোকরিয়া আদায় করতে থাকুন। দুনিয়ার তিক্ত-মিষ্ট সবকিছু বুঝলেন। কিন্তু যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, অত্যন্ত অসহায় অবস্থা থেকে সৃষ্টির সেরা মানুষে পরিণত করেছেন, একবার সেই আল্লাহর কথা আর তার অফুরন্ত কুদরত, রহমত, অনুগ্রহের কথা ভেবে দেখলেন না। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى لَا يُقَالَ فِي الْأَرْضِ : اللَّهُ اللَّهُ .

‘দুনিয়ায় যতদিন আল্লাহর নাম জারি থাকবে, আল্লাহ আল্লাহ করেন এমন লোক যতদিন বেঁচে থাকবেন এবং আল্লাহর আনুগত্য করে চলবেন ততদিন আল্লাহ পাক দুনিয়াকে স্থায়ী রাখবেন।”

চন্দ্র-সূর্য আলো দেবে, জমিন শষ্য উৎপাদন করবে, বাতাস প্রবাহিত থাকবে। আর যখন দুনিয়ার বুক থেকে আল্লাহর নাম নেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে তখন আল্লাহ আসমান-জমিন সব মিছমার করে দেবেন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক বলেন,

لَوْلَاكَ لَمَا خَلَقْتُ الْأَفْلَاكَ».

‘হে নবী মুহাম্মদ! আপনাকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা যদি আমার না থাকত, তাহলে আমি আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য কিছুই সৃষ্টি করতাম না।’২

উপরোক্ত হাদীসের মর্ম অনুধাবন করলে বোঝা যায়, আল্লাহর এই বিশাল সৃষ্টিজগতে নবীকূলের সরদার হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা হলেন ‘বর’, আর যারা পবিত্র কালিমাকে অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকার ও কাজে পরিণত করে মুসলমান হয়েছেন তারা বরযাত্রীস্বরূপ। এই বর ও বরযাত্রীদের জন্যই দুনিয়ার সাজ-সরঞ্জাম, আসমান ও জমিন সবকিছু। দুনিয়ায় যারা বেদীন-কাফের বসবাস করছে তারা আপনাদের বদৌলতেই রয়েছে। যেমন আমাদের দেশে বিয়েবাড়িতে বর ও বরযাত্রীদের সাথে শ্রমিক, মজুরদেরও বসে খাওয়ার রেওয়াজ আছে। কাফের-বেদীন হয়ে দুনিয়ার সহায়-সম্পদ লাভ করাতে তো আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ এগুলো আল্লাহর নিকট অতিনিকৃষ্ঠ ও মূল্যহীন।

হযরত নবী করীম এ মর্মে ইরশাদ করেছেন,

لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ الله جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِّنْهَا شَرْبَةً

ماء.

‘দুনিয়া এবং দুনিয়ার সবকিছু যদি আল্লাহ পাকের কাছে মাছির দুটি পাখার একটির সমানও মূল্যবান হত তাহলে এক খোশ পানিও তিনি কাফেরদের পান করাতেন না।১

বস্তুত মাছির একটি পাখার চেয়েও দুনিয়ার দৌলত নিকৃষ্ট বলেই আল্লাহ তাআলা এগুলো কাফেরদের ভোগ করার সুযোগ দিয়েছেন। আপনাদের মনেও প্রশ্ন জাগতে পারে হুযুররা তো নামাজ দোয়া পড়েন বলে কোরমা-পোলাও, ডিম, বিরানি আরও যত ভালো খানা আছে সব খেতে পান আর আমরা কি নামাজ দোয়া পড়ি না বলে খেতে পাই না? একথায় গিয়ে অনেকে ধোঁকা খায়।

দেখুন, আল্লাহ পাকের নাম গফুর (অতিশয় ক্ষমাশীল), রহীম (দয়াবান) ও হালীম (ধৈর্যশীল)। তিনি চটপট করে কাউকে শান্তি দেন না।

আপনারা ফেরাউনের কাহিনী তো শুনেছেন। আল্লাহর নবী হযরত মুসা যখন ফেরাউনকে বললেন, আসমানের প্রভু আল্লাহকে স্বীকার কর। তাঁকে মেনে চল। ফেরাউন বলল, আসমানে যে খোদা আছে তা আমি বিশ্বাস করি না। খোদা থাকলেও তিনি ছোট। বড় খোদা হলাম আমি, آناريم الأضى (আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ খোদা)। বুযুর্গানে দীন বলেছেন, ৪০ বছর পর্যন্ত ফেরাউনের কোন দুঃখ-বেদনা, রোগ হয়নি।

দেখুন মহান আল্লাহর সাথে ফেরাউনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এরপরও আল্লাহ তাকে ছুটি দিলেন দীর্ঘ ৪০ বছর। মুসলমান যারা নামাজ পড়ে না, যাকাত দেয় না, তারা তো অন্তত আল্লাহ, রাসুল কুরআন-হাদীসকে বিশ্বাস করে। সুতরাং যেখানে ফেরাউনকে ৪০ বছর ছুটি দিলেন সেখানে অন্যান্য নাফরমানদেরকে কি ছুটি দেবেন না কিছুদিন? আল্লাহর একজন বড় অলী মাওলানা জালালউদ্দীন রুমী বলেছেন,

ولیکن خداوند بالا و پست بعصیاں در رزق بر کسی که نیست

‘আমার খোদা বড় শক্তিমান খোদা, কেউ নাফরমানি করলে তাকে চটপট করে তিনি শাস্তি দেন না, রিযিক বন্ধ করেন না।১

আচ্ছা, তুমি যদি আল্লাহর নাফরমানি কর, তোমাকে পাকড়াও করতে আল্লাহর কি যুদ্ধ করতে হবে? না সৈন্য সামন্ত লাগবে? তোমার নিঃশ্বাসটা বা শিরাটা বন্ধ করে দিলেই তো চিরতরে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ বলেন, আমার বিছানো জমিনে বাস করে, আমার আসমানের সামিয়ানার তলে বসে, আমার চন্দ্র-সূর্যের উজ্জ্বল আলোর কিরণে আমার অফুরন্ত নেয়ামত ভোগ করে তুমি কি আমার আদেশ-নিষেধ মেনে চল, না নাফরমানিতে লিপ্ত থাক তা আমি দেখব, কতদিন এভাবে চলতে পার। তিনি বলেন,

كُلُوا وَ تَمَتَّعُوا قَلِيلًا إِنَّكُمْ مُجْرِمُونَ .

‘তোমরা খাও আর জীবন জীবিকা উপভোগ কর, ছুটি দিলাম, তবে অল্প দিন। কিন্তু আমি জানি, তোমরা নাফরমান দোষী।’২

কুরআন মজীদের অন্য জায়গায় বলেন,

وَ أَمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينَ

‘আমি তাদেরকে সময় দিলাম কিন্তু আমার পাকড়াও বড় শক্ত।’

আল্লাহর অফুরন্ত রহমতের কথা একবার ভেবে দেখুন, আমরা যেই জমিনের ওপর বসে আছি, সেটা যদি আল্লাহর হুকুমে একটু নড়াচড়া করে ভূমিকম্প হয়, তখন মানুষ আতঙ্কে দিশেহারা বেহুশ হয়ে পড়ে। আমরা এ জমিনকে খুড়ে ক্ষেত-খামার করি, জমিনের ওপর পায়খানা-প্রস্রাব করি এতে কোনো দিন কি জমিন বাধা দিয়েছে? জমিন যদি সদা ভূমিকম্পের ন্যায় নড়াচড়া করত তাহলে মানুষ কি শান্তিতে বসবাস করতে পারত? ঘুমাতে পারত? যেমন পারা যায় না পানির ওপর। এই যে জমিন মানুষের অনুগত হয়ে রইল এটা কে করল? আল্লাহ পাক বলেন, امَّنْ جَعَلَ الْأَرْضَ قَرَارًا

‘আমি খোদা ছাড়া আর কে জমিনকে শান্ত নীরব নিস্তব্ধভাবে বসিয়ে দিয়েছে?”

এত কিছুর পরও যদি তুমি নাফরমানি কর তা হলে তোমাকে আরও ছুটি দেব। যেমন দিয়েছি ফেরাউনকে। এরপরও তওবা কর, আমার দিকে ফিরে আস কিনা আমি দেখব। অবশেষে ফেরাউনের দশাই ঘটবে তোমার। ইতিহাস দেখুন ফেরাউন হযরত মুসা ও তাঁর সাথীদেরকে পাকড়াও করার জন্য ধাওয়া করল। নীল নদীর কাছে গিয়ে হযরত মুসা যখন অসহায়, তখন আল্লাহ তাঁর জন্য নদীর বুকে রাস্তা করে ছিলেন। মুসা পার হয়ে গেলেন। আর ফেরাউন সেই রাস্তা পার হতে গিয়ে সৈন্য-সাথীসহ ডুবে মরল। তেমনি নমরুদকেও আল্লাহ তাআলা ছুটি দিয়েছিলেন অনেকদিন।

গ্রন্থনায়: ড. মাওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *