হুযুর কেবলার দৃষ্টিতে আখতারাবাদ ঈসালে সওয়াব মাহফিলের বৈশিষ্ট্য

نَحْمَدُهُ وَنُصَلِّي عَلَى رَسُوْلِهِ الْكَرِيمِ

আমাদের প্রাণপ্রিয় হযরত কেবলা অলীকুল শিরোমণি, কুদওয়াতুস সালিকীন, জুবদাতুল আরিফীন, কুতুবে আলম, মুরশিদে আযম হযরত শাহসুফি মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতার কুমিরাঘোনায় (আখতারাবাদ) যে ঈসালে সওয়াবের বার্ষিক মাহফিল প্রচলন করে গেছেন এবং তার সে তরীকা যে নিয়ম ও পদ্ধতি গবেষণা করে উদ্ভাবন করেছেন তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ধারণা হয় যেন স্বয়ং আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে এ বিষয়ে হযরত কেবলার ওপর ইলহাম হয়েছিল। এজন্যই উক্ত মাহফিলে যোগদানকারী সর্বশ্রেণির লোকদের ওপর একপ্রকার তাসির সৃষ্টি হয় এবং তাদের মনের ও ধ্যানের গতি পরিবর্তন হয়। ভেবে দেখলে বোঝা যায় এ মাহফিলের দ্বারা অনেক অনেক ঈমানি ও রুহানি ফায়দা হাসিল হয়। বিশেষ করে তরীকতপন্থিদের উন্নতি হয়।

কোনো চিন্তাবিদের মতে খালেস নিয়ত ও আদবের সাথে এ মাহফিলে শরিক হলে সারা বছর যা লাভ করা যায় না তা একদিনেও একরাতে হাসিল করা সম্ভব হয়। জনৈক সুযোগ্য আলেম তাঁর মতপ্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি একত্রিশ বছর যাবৎ মাদরাসায় দীনী তালিমের খেদমত করে আসছি। কিন্তু এ মাহফিলে যতক্ষণ কাটিয়েছি মনে হয়েছে এটি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়।’

দেখা গেছে যে, উক্ত মাহফিলে যোগদানকারীদের মধ্যে অনেকের অবস্থারও মনোভাবের পরিবর্তন হচ্ছে। যেমন- কারও মধ্যে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়েছে। কারও শক্ত কলব নরম হয়েছে, কুস্বভাব সুস্বভাবে পরিণত হয়েছে কিংবা গাফলত দূর হয়েছে এবং ইবাদত-বন্দেগির শওক পয়দা হয়ে সৎকাজের উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। আবার কারও অহংকার ও তকাব্বরি দূর হয়েছে এবং খেদমত করার মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে, কেউবা খেদমতের নিয়ম পদ্ধতি শিখেছেন।

কুমিরাঘোনা মাহফিলের অনুসরণ ও অনুকরণে বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় মাহফিলসমূহে বর্তমানে খানাপিনার ইন্ডিযাম ও যিয়াফতের প্রচলন করা হচ্ছে।

এ পবিত্র মাহফিলের প্রভাবে বে-নামাযিরা নামাজ পড়ছেন, অনেক মধ্যপায়ী মদ্যপান ত্যাগ করছেন, বেপরোয়াভাবে চলাফেরায় অভ্যস্ত লোকেরা নিজেদের অতীতের জন্য অনুতপ্ত হয়েছেন এবং আল্লাহর দরবারে তওবা ও রোনাযারি করেছেন। অনেকের যিকির-আযকারের প্রতি মহব্বত পয়দা হয়েছে, আলেমবিদ্বেষী লোকেরা আলেমদেরকে শ্রদ্ধা করছেন, অনেকের মধ্যে পীর-বুযুর্গের প্রতি ভক্তি সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা তাদের নিকট মুরিদ ও বায়আত হয়ে ঈমানি ও রুহানি সম্পর্ক কায়েম করে নিজেদের সংশোধন করার চেষ্টা করেছেন।

তারা নিজেদের অতীত কৃতকর্মের জন্য আফসোস করত ভবিষ্যৎ জিন্দেগি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল-এর নির্দেশিত পথে পরিচালিত করে নেক বান্দাদের তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা লাভে সচেষ্ট হন এবং এ উদ্দেশ্যে নিজেদের মধ্যে আবেগ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হওয়ার জন্যে আল্লাহর দরবারে কাকুতি মিনতি করেন। মাহফিলে আল্লাহর অলীদের ও নেক বান্দাদের আল্লাহর ভয়-ভীতি, কান্নাকাটি ও রোনাজারি সহকারে মুনাজাতের অবস্থা দেখে উপস্থিত মুসলমান ভাইগণের মনে এই ভাব সৃষ্টি হয় যে, হায়! হায়! তারা যদি এভাবে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটির সাথে হাজেরি দিয়ে সাহায্যের দরখাস্ত করেন এবং নফসের সংশোধন, ইবাদতের তওফিক এবং রহমত ভিক্ষা চেয়ে থাকেন, তবে আমাদের কি উপায় হবে?

বহু গোপন তত্ত্বও এ মাহফিলে নিহিত রয়েছে। এর জাহেরি দিকের কিছু অংশ প্রকাশ করা হল, কিন্তু বাতেনি দিকের আলোচনা সর্বসাধারণের বোধগম্য নয় বিধায় উল্লেখ করা হয়নি।

উল্লিখিত ঈসালে সওয়াবের মাহফিলের বৈশিষ্ট্যগুলো চিন্তা করে দেখলে বলা যেতে পারে, এটি মাহফিলে তালিম ও তলকীন, মাহফিলে তাযকিয়া, মাহফিলে তারগীব ও তরহীব, মাহফিলে তবশীর ও তনজীর, মাহফিলে তকরীম ও তাযীম, মাহফিলে হিদায়ত ও ইবরত, মাহফিলে রহমত ও বরকত, মাহফিলে তওবা ও ইস্তিগফার, মাহফিলে দোয়া ও মুনাজাত, মাহফিলে তকিয়া ও তসফিয়া, মাহফিলে ইসার ও কুরবানি, মাহফিলে ওয়াজ ও নসিহত, মাহফিলে ইশক ও মুহব্বত, মাহফিলে গিরিয়াজারি, মাহফিলে কুরবত ও ইজাবত, মাহফিলে ঈমান ও ইরফান, মাহফিলে সবর ও তাহাম্মল, মাহফিলে তসলীম ও রেযা, মাহফিলে সিরাত ও মিলাদ, যার প্রকাশ্য নাম মাহফিলে ঈসালে সওয়াব।

এককথায় এ মাহফিলকে সংশোধন ও প্রশিক্ষণের কেন্দ্র এবং তরীকতপন্থি বা এর প্রতি অনুরাগীদের কনফারেন্স বা মহাসম্মেলন বললে অত্যুক্তি হবে না। অথবা বলা চলে এ পবিত্র মাহফিল ঈমানি ও রুহানি যিয়াফত স্বরূপ (জ্ঞাণী-ভাইদের জন্য এতটুকু ইশারাই যথেষ্ট।)

এ মাহফিল ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নত নয় এমনকি মুস্তাহাবও নয়।

বুযুর্গানে দীন এ প্রকার মাহফিলকে মুস্তাহসান অর্থাৎ পছন্দনীয় আখ্যা দিয়েছেন (ওলামায়ে উম্মতের পছন্দনীয় বিষয় আল্লাহর নিকটও পছন্দনীয়)। অবশ্য এটি নফল হলেও স্মরণ রাখতে হবে যে, নফল কাজের মাধ্যমে আল্লাহর প্রেমিক বান্দাগণ মওলার নৈকট্য লাভ করে থাকেন। (হাদীসে কুদসী)

লক্ষ্যণীয় যে, এ মাহফিলে যারা অংশগ্রহণ করেন তাঁদের অধিকাংশই মুসাফির এবং দূরদূরান্ত হতে অনেক কষ্ট স্বীকার করে তাঁরা এ মাহফিলে যোগদান করেন। মাহফিলে জামায়াতের সাথে নামাজ আদায়, যিকির-আযকার ও দোয়া মুনাজাত করা হয়। হাদীসের মর্মানুযায়ী এ ধরনের জামায়াতের ওপর আল্লাহর রহমতের হস্ত প্রসারিত হয় এবং মুসাফিরের দোয়া ও সম্মিলিতভাবে দোয়াকারীদের দোয়া (অর্থাৎ কেউ দোয়া করতে থাকলে অন্যরা আমীন বললে) কবুলের নিশ্চয়তা রয়েছে। যথারীতি প্রতিবছরই সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত উপায়ে এ মাহফিল পরিচালিত হয়ে আসছে। আল্লাহ আমাদেরকে ও সমস্ত ঈমানদারকে এ পবিত্র মাহফিল হতে ঈমানি ও রুহানি বরকত হাসিল করার তওফিক দিন। আমিন।

بِحُرْمَةِ سَيِّدِ الْمُرْسِلِيْنَ، رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمِ، وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ.


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *