১৯ মার্চ ১৯৮৭ চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফ মসজিদে বাদে মাগরিব হুযুর।
কেবলার প্রদত্ত ভাষণ
আমরা যে ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশের পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা রাজনীতিবিদ তথা সর্বস্তরের মুসলমানদেরকে ঐক্যের প্লটফরমে এনে বাংলার জমিনে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করা। ফলে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভক্তি, মহব্বত, ভাবের আদান-প্রদান ও আন্তরিক ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠছে। আল্লাহর বিশেষ রহমত যে, সবাই আমাকে বিশেষভাবে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে এবং প্রথম নম্বরে গণ্য করেন, অথচ তাঁদের অনেকেই বয়সের দিক থেকে আমার অনেক বড়।
ইত্তেহাদুল উম্মাহর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমরা একে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দান করেছি। কিন্তু গতবছর অরাজনৈতিক সংগঠন শব্দটি উঠিয়ে দেওয়া হলে আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। ১০ জানুয়ারি’৮৭ ঈসায়ী ঢাকায় এক ঐতিহাসিক মিছিল শেষে ইত্তেহাদুল উম্মাহর পক্ষ থেকে ৬ মার্চ ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঢাকায় এক ঐতিহাসিক মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। ইতোমধ্যে ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ আমার ছেলে আবদুর রহীমের শাহাদাতের কারণে মানসিক অবস্থা তেমন ভালো যাচ্ছিল না।
আমি আমার গ্রামের বাড়িতে অবস্থানকালীন মাওলানা সাঈদী সাহেবের একটি পত্র আমার হস্তগত হয়। এতে তিনি আমাকে ৪ মার্চ তারিখে ঢাকা যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। যাতে ৫ তারিখের সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারি। সেই হিসেবে আমি হযরত সাইয়েদ আবদুল আহাদ আল-মাদানী সাহেব (ম. যি. আ.) সহ এক সাথে কারযোগে ঢাকায় রওয়ানা হই, কিন্তু সাঈদী সাহেব পাঁচ তারিখের সাংবাদিক সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকলেন। তিনি আমাদের সাথে দেখা করেননি।
১৩ মার্চের মহাসম্মেলনের সমাবেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্রদ্ধেয় হুযুর কেবলা বলেন, সেই তারিখের সম্মেলনের দিন ঠিক করার আলোচনায় আমি ছিলাম না। মধ্যখানে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ইসলামী শাসনতন্ত্র বাস্তবায়ন কমিটির সাথে ওয়াদা করার কারণেই আমি সেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছি। ১৩ মার্চের হৃদয়বিদারক ঘটনার পরপরই আমরা প্রেস ক্লাবে বসে সাংবাদিকদেরকে আমাদেরকে প্রোগ্রামের সফলতার কথা জানাই এবং ১৯ মার্চ দেশব্যাপী প্রতিবাদ দিবসের ডাক দিই। এভাবে সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিলসহ প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সাঈদী সাহেবের সাথে সামনা-সামনি কোনো কথা না হওয়ায় আমি তার সমাবেশে যোগদান না করার ব্যাপারে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে পারছি না।
যুগে যুগে যেসব আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সত্যিকারভাবে দীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও কুরআনের আইনকে বাস্তবায়নের ডাক দিয়েছেন তাঁদের ওপর এসেছে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের স্টিম রোলার। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, মুজাদ্দিদে আলফে সানী প্রমুখ মনীষীদের ওপর এসেছিল জেল-জুলম। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীও এ পথের পথিক ছিলেন। ফুরফুরা শরীফের পীর সাহেব হযরত মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী-এর কথা উল্লেখ করে শ্রদ্ধেয় হুযুর কেবলা বলেন, তিনি কলকাতা, ত্রিপুরা, আসাম ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে গিয়ে তাঁর খলীফাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁরা যেন একেকটা পত্রিকা বের করেন এবং মুসলমানদের প্রাণের দাবিগুলো এই পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
এভাবে আলেমসমাজ পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাস ভূমির দাবিতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁরা পত্রিকায় ক্ষুরধার লেখনী ও হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতার মাধ্যমে এ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন মাওলানা জাফর আলী খান পাঞ্জাবে, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ দিল্লিতে এবং মাওলানা সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানী দেওবন্দে। আমরা যে ইসলামী শাসনতন্ত্র বাস্তবায়নের আন্দোলন করছি এটি নতুন কিছু নয়, বরং পূর্ববর্তী আলেমদের পদাঙ্ক অনুসরণ মাত্র।
শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সেসব সমালোচকের প্রতি কঠোর হুশিয়ারি বাণী উচ্চারণ করে বলেন, অনেকে বলে আমাদের কাজ যিকির-আযকার ও তসবীহ-তাহলীল পড়া। হুযুর কেবলা ইসলামী শাসনতন্ত্র বাস্তবায়ন আন্দোলনে কেন শরিক হন ইত্যাদি প্রশ্ন। আমি এদের প্রতি বলতে চাই, আমি যে কাজটি করছি এটি হচ্ছে তরীকত ও শরীয়তের মূল কাজ। ইসলাম প্রতিষ্ঠার মধ্যে শরীয়ত ও তরীকতের বাস্তব স্বাদ গ্রহণ করা যায়। যারা আমার এ কাজকে সমর্থন করবে না তারা হচ্ছে মুনাফিক। এদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে আমাকে কদমবুছি করবে আর বাইরে গেলে আমার সমালোচনা করবে এটা আমি চাই না।
আমার শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলা ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার কাজ প্রত্যক্ষভাবে করেননি বটে, কিন্তু পরোক্ষভাবে করেছেন। এ সম্পর্কে এমন কে আছে আমার চেয়ে বেশি অবগত? পীর সাহেব কেবলার সময়ে বায়তুশ শরফের কাজ প্রাথমিক পর্যায়ে সামান্য কিছু হয়েছিল কিন্তু আল্লাহর রহমতে এখন এর কাজ অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এতে কি পীর সাহেব কেবলার আত্মা অসন্তুষ্ট হবেন? যেমন খাজা সাহেবের পীর সাহেব ছিলেন হযরত ওসমান হারুনী, কিন্তু পীর সাহেবের চেয়ে খলীফার নাম বেশি প্রচার হয়ে গেছে। যেমনভাবে বেশি নাম প্রচার হয়েছে বড়পীর সাহেবের, তার মুরশিদের নামের চেয়ে।
আমাদের হুযুর কেবলা অত্যন্ত ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেন, বাইরের কিছু লোক আমাকে এসে আমার কিছু মুরীদের সম্পর্কে এমন কিছু কিছু কথা বলে যে, হুযুর আপনি যে কাজ করছেন আপনার অনেক মুরিদ তা পছন্দ করে না। একথা শোনার পর লজ্জায় আমার মাথা নুয়ে পড়ে, তাদেরকে কোনো জবাব দেওয়ার রাস্তা তখন থাকে না। এসব মুনাফিকের কথায় আমি অন্তরে খুব আঘাত পাই। চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের মুরীদের প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তাঁর মুরীদরা ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। বাইরের লোক আশ্চর্য হয়ে গেছে ১৩ মার্চ তারিখের বায়তুল মোকাররম ও প্রেস ক্লাবের সামনে তাঁদের দৃঢ়তা দেখে।’
গ্রেফতার, জেল-জুলুম ও নির্যাতন হচ্ছে, নবী ও আউলিয়া কেরামের সুন্নত। আল্লাহর অশেষ শোকরিয়া যে কিছুক্ষণের জন্য আল্লাহ আমাকে গ্রেফতার হওয়ার সুযোগ দিয়ে তাঁর নবী ও অলীদের সুন্নত পালন করার তওফিক দিলেন। একথা ধ্রুব সত্য যে, হকের সাথে বাতিলের দ্বন্দ্ব চিরন্তন ও চিরাচরিত। যাঁরা এ বাতিলশক্তির সামনে দৃঢ়তায় মজবুত থেকে অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবেন তাঁরা হচ্ছেন প্রকৃত দীনের মুজাহিদ। পবিত্র হাদীসে তাদের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। ১৩ মার্চের আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্যে সরকার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিল, কিন্তু আল্লাহর রহমতে সেদিন ইসলামের আওয়াজ বুলন্দ হয়েছিল। এভাবে দেখা যায় যে, বিভিন্ন যুদ্ধে হুযুর-এর সাথে যারা নিবেদিতপ্রাণ সাহাবা ছিলেন তাঁরা অনুকূল, প্রতিকূল যেকোনো অবস্থাতেই রাসুল-এর সাহচর্য ত্যাগ করেননি। কিন্তু মুনাফিকরা বিভিন্ন সময়ে হুযুর-এর সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং তাঁর মনে আঘাত দিয়েছে দারুনভাবে।
উল্লেখ্য যে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দুঃখ, নির্যাতন ও যাতনা ভোগ করেছেন আম্বিয়ায়ে কেরাম, আউলিয়ায়ে কেরাম ও হক্কানি আলেমরা। হুযুর পবিত্র হাদীসে ইরশাদ ফরমায়েছেন, ‘আল্লাহর পথে (দীন ইসলাম প্রচার ও প্রসারে) আমি যেভাবে নির্যাতিত হয়েছি অন্য কেউ এভাবে নির্যাতিত হয়নি।’ সাহাবায়ে কেরাম এ ইসলামের বাগানকে ফুলে-ফলে সুশোভিত করার জন্য ঢেলে দিয়েছেন নিজেদের গায়ের তাজা রক্ত। হযরত বেলাল হযরত খাব্বাব-এর ওপর চালানো হয়েছে অমানুষিক অত্যাচার ও নির্যাতনের স্টিম রোলার। ও
পরিশেষে শ্রদ্ধেয় হুযুর কেবলা, পীরের প্রতি মুরীদের কতটুকু দায়িত্ব রয়েছে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, ‘পীরের কাছে মুরিদ হচ্ছে ধৌতকারীর হাতে মৃত ব্যক্তির মতো।’ অর্থাৎ ধৌতকারীর হাতে মৃত ব্যক্তি যেমন কোনো কিছু বলার অধিকার রাখে না, তেমনি পীরের কাছে মুরীদেরও বলার অধিকার থাকে না।
ইনশাআল্লাহ আমি ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করে যাব, যেকোনো বাধা-বিপত্তি আমার সামনে আসুক না কেন। যারা আমার সাথে থাকবেন তাঁরা আমার সার্বিক কাজে সহযোগিতা করবেন। মুনাফিকী আমার সাথে করবেন না। আমি এ রকম মুরিদ চাই না। আমি তাদের সাথে নেই।
উপস্থিত শত শত মুরিদান হুযুর কেবলার এ আহ্বানের প্রতি আন্তরিক সমর্থন জানিয়ে দুই হাত তুলে তকবীর ধ্বনির মাধ্যমে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
গ্রন্থনায়: মাওলানা আবুল হায়াত মুহাম্মদ তারেক
Leave a Reply