আল মাহমুদ
(হযরত মাওলানা শাহ্ মোহাম্মদ আবদুল জব্বার ছাহেবের ইন্তেকালের সংবাদ শুনে)
তাঁর মৃত্যু সংবাদে মনে হল সততা ও সাহসিকতারই বুঝি অবসান হল।
পর মুহূর্তেই মনে হলো তা কি করে হবে?
তিনি তো ছিলেন ঈমান ও তৌহিদের নিশান। যা কিছু ন্যায় ও সত্য সেসব নিয়ামত তার মুখ থেকে নির্ঝরের মত নির্গত হয়ে আমাদের সিক্ত করে দিত। তিনি আমাকে দু’টি মাত্র উপদেশ ঠিকমত মেনে চলতে শিখিয়েছিলেন। এক, সিজদায় মাথা ঠেকিয়ে রাখার সময় রক্ত-মাংসসহ নিজের ভেতরটাকে একেবারে উবুড় করে দেয়া।
দুই, কবির অহঙ্কার ছেঁড়া ন্যাকড়ার মত ফেলে দিয়ে একেবারে আল্লাহ্ প্রেমিকদের ভীড়ে ফতুর হয়ে মিশে যাওয়া। আমি এর কোনটাই রপ্ত করতে পারছি না বুঝতে পেরে তিনি আমার ব্যর্থ ও ব্যথাতুর মুখের দিকে তাকিয়ে
একটু হাসতেন। তাঁর হাসি ছিলো বেহেস্ত থেকে বিচ্ছুরিত রোদের মত। উষ্ণ ও আশ্বাসযুক্ত। বলতেন, কে বলে পারছ না।
আমি তো কপালে অভ্যেসের চিহ্ন লেখা হয়েছে দেখতে পাচ্ছি। আরও এগোও আর মাথা ঠেকিয়ে মিনতি করতে থাক। অহংয়ের পোশাক খুলে তার কাছে খাড়া হওয়ার সামান্য আচ্ছাদনটুকু মাত্র সম্বল করলে কি হয়?
এই ছিল আমার পীরের মন্ত্র যা আমি ঠিকমত অভ্যেসের ঝুড়িতে জমা করতে পারিনি বলে লজ্জায় কাতরে উঠি। তাঁর কাছে শিখেছিলাম কি করে নিজের আত্মাকে কেবল
মানুষের জন্য দরদী করে তুলতে হয়।
তিনি ছিলেন আর্ত, নিঃসম্বল মানুষের আশ্রয়
যখন তাকে শিশুদের সাথে দেখা যেত মনে হত তিনি
চিরকালের এক শিশু।
কবিদের সাথে তিনি ছিলেন এক
দরবেশের পোশাকধারী শায়ের। যখন আল্লাহর কালাম পেশ করতেন তখন পরিবেশটাই নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে বসে থাকত। আমরা কবিরা ভাবতাম, কবিতা দিয়ে আর কি হবে? মনে হত ঐ আয়াতের গুঞ্জরনে মৌমাছির মত উড়তে থাকি।
তার পবিত্র মুখাবয়ব আর দেখব না ভাবলেই হৃদয় স্তব্ধতায় ভরে যায় আল্লাহর স্তবকারীরা যেমনভাবে একদিন তাদের প্রভুর কাছে সমর্পিত হয়ে যান তার গমনও বুঝি তেমনি আকস্মিক। আমাদের কান্না ও দুঃখ তাকে পিছু ডেকে আর কি করবে? শুধু ভাবি তার পরিতৃপ্ত চেহারা যদি আমার সামান্য রচনায় স্বপ্ন ও কল্পনায় ধরা দেয় তাহলেই কবির সার্থকতা।
বিঃ দ্রঃ- এই কবিতাটি ২৫ মার্চ, ১৯৯৮ সনে রচিত হুজুরের ইন্তেকালে লিখিত প্রথম কবিতা।
Leave a Reply