জন্মিলে মরিতে হবে
অমর কে কোথা কবে?
এ এক অমোঘ সত্য। সব মৃত্যুই প্রিয়জনের চোখে সৃষ্টি করে অশ্রুর বান, হৃদয়ে জাগায় কষ্টের তুফান। কিন্তু এ মাটির জমিনে এমন কিছু কালজয়ী ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের অন্তর্ধান শুধু প্রিয়জনকেই কাঁদায় না বরং পুরো দেশ ও জাতিকে শোকে মুহ্যমান করে তোলে, আলোকিত পৃথিবীকে ঠেলে দেয় মৃত্যুর অন্ধকার গর্ভে। সবকিছু ছাপিয়ে সত্য হয়ে ওঠে “মাউতুল আলিমে কা মাউতুল আলম”, তথা জ্ঞানীর মৃত্যু যেন পৃথিবীরই মৃত্যুর নামান্তর- এ ঐতিহাসিক প্রবাদ বাক্যটি।
বায়তুশ শরফের পীর সাহেব হাদীয়ে যামান শাহ্সূফী আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ. ছিলেন তেমনি বিরল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী একজন ক্ষণজন্মা সাধক পুরুষ, কালজয়ী ব্যক্তিত্ব। বড় অসময়ে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়েই তিনি চলে গেলেন জীবনের ওপারে, জান্নাতের সবুজ উদ্যানে, পরম প্রভুর একান্ত সান্নিধ্যে। আমরা পৃথিবীবাসী হয়ে গেলাম এতিম, নিঃস্ব, অভিভাবকহারা ছাড়পত্রহীন মানুষ। বাংলাদেশ আজ তাঁর শ্রেষ্ঠ সন্তান হারানোর বেদনায় বিমূঢ়। টেকনাফ হতে তেতুলিয়া, রূপসা হতে পাথুরিয়া, পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল অধ্যুষিত এ সবুজ ‘ব’ দ্বীপের সর্বত্র আজ শোকের মাতম। তিনি ছিলেন হাদীয়ে যামান, যুগের নকীব। কুরআন ও হাদিসের বাণী নিয়ে, আল ইসলামের দাওয়াত নিয়ে সারাটি জীবন তিনি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়িয়েছেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকাসহ অসংখ্য দেশ সফর করেছেন। তাঁর এ কষ্ট সার্থক হয়েছে। অসংখ্য পথহারা মানুষ তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হেরার কাফেলায় শামিল হয়েছে, পেয়েছে হেদায়াতের অমৃতের সন্ধান।
বান এলে মানুষ যেভাবে সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নেয়, তেমনি সত্য পথের সন্ধানে দিকভ্রান্ত মানুষ ছুটে আসত বায়তুশ শরফে। চলমান শয়তানী বন্যার সর্বনাশ থেকে নিজেদের নিরাপদ ও হেফাজত করার জন্য তিনি দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। এভাবেই তিনি হেদায়াতের মশাল নিয়ে ছুটে গেছেন এক দেশ হতে অন্য দেশে, পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে। মানুষের জন্য ছিল তাঁর অসম্ভব ভালবাসা। হতাশাগ্রস্ত, দুর্দশাক্লিষ্ট বিপন্ন মানবতার দুয়ারে দুয়ারে ছিল তাঁর মুখরিত পদচারণা। যেখানেই আর্তের আহাজারি ধ্বনিত হয়েছে, উচ্চারিত হয়েছে মজলুমের আর্তনাদ, সেখানেই সান্ত্বনার বাণী নিয়ে, সাহায্যের ঝুলি নিয়ে তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এভাবে তিনি একদিকে ছিলেন মানব অন্তঃপ্রাণ নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক, অপরদিকে ছিলেন হেদায়াতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাহবার। সে মানবপ্রেমী দরদী মানুষটি আজ আর নেই। জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রতীক, হেদায়াতের এ প্রদীপ্ত সূর্য ২৫শে মার্চ ১৯৯৮ বুধবার সকাল সোয়া সাতটায় অন্তমিত হলেন। শোকের অশ্রুসিক্ত আঁধারে ছেয়ে গেল সারা দেশ। শোক সাগরে ভাসিয়ে গেলেন তিনি লক্ষলক্ষ আশেককুলকে।
যেভাবে চলে গেলেন:
২৪শে মার্চ ১৯৯৮ মঙ্গলবার। তিনি বরাবরের মতো অসুস্থ। তবু কর্মোদ্যমী এ মানুষটির চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ নেই। বুঝি জীবনের শেষ কাজগুলো ধীরে-সুস্থে গুছিয়ে নিতে চান। সকালে আদর্শ মাদ্রাসার কামিল শ্রেণির বুখারী শরীফের ক্লাস নিলেন। বাদ জোহর দাখিল পরীক্ষার্থীদের (১৯৯৮) দোয়া মাহফিল। হুজুরের কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল কাইয়ুমও পরীক্ষার্থী। অসুস্থতা সত্ত্বেও উপস্থিত হলেন। ধৈর্য ধরে সকলের কথা শুনলেন। হেদায়াতী বক্তব্য রাখলেন। কে জানতো এ তাঁর শেষ হেদায়াতী বক্তব্য! দোয়া করলেন। অন্যদিনের চেয়ে বোধহয় একটু বেশিই কাঁদলেন। এভাবেই হয়তো তাঁর সবচাইতে প্রিয় প্রতিষ্ঠান বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসার ছাত্রদের শেষবারের মতো আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলেন। আসরের পর কামিল ছাত্রদের আবার বুখারী শরীফের দরস দিলেন। সকালে তাদের বলেছিলেন, আজ তোমাদের ডাবল ক্লাস নিব। সে অনুযায়ী অন্যদিনের মত সাক্ষাতপ্রার্থীদের সাথে দেখা না করে বুখারী শরীফের দরস দিলেন। এশার পর পরদিন কামিল ক্লাসের জন্য বুখারী শরীফের দরস দেখে নিলেন। এভাবে জীবনের শেষ রাত অবধি তিনি হাদিসে নববীতে (সা.) ছিলেন মশগুল ও আত্মমগ্ন। ২৫শে মার্চ ১৯৯৮ বুধবার। তাহাজ্জুদ, জিকির শেষে সালাতুল ফজর আদায় করলেন। বাদ সালাত অযিফা পাঠ করলেন। হালকা নাস্তা সেরে সালাতুল এশরাকের প্রস্তুতি (না আল্লাহর সাথে মিলনের প্রস্তুতি) নিচ্ছিলেন। হঠাৎ চেহারাটা একটু ফ্যাকাশে হলো- বুকে হয়তো ব্যথা অনুভব করছেন। প্রেসারটা একটু বেড়েছে।
কামরায় তখন হেফজখানার দুই মাসুম বাচ্চা। তাদের ঔষধ দিতে ইশারা করলেন। ঔষধ স্প্রে করা হলো। হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে শুয়ে পড়লেন, মুখে গুণগুণ আওয়াজ- ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু….ওয়া রাসূলুহু‘। এতিম শিশু দু’টি ভীত-চকিত হলো। কাঁদতে কাঁদতে বাইরে এসে বড়দের ডাক দিল। খাদেম শহীদ ভাই, হেলাল ভাই, শাহজাহান দৌড়ে এল। আওয়াজ ছাড়াই মুখ নড়ছে- কালেমা শাহাদাত বুঝি এখনো শেষ হয়নি। বড়রাও কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। কেউ ছুটলো এম্বুলেন্স আনতে। ততক্ষণে বুঝি ডাক এসে গেছে মাশুকের পক্ষ থেকে- “ইয়া আইয়াতুহান নাফসুল মুতমায়িন্যা ইরজিয়ী ঈলা রাব্বিকি রাদিয়াতাম মারদিয়্যাহ, ফাদখুলী ফি ঈবাদী, ওয়াদখুলী জান্নাতী।”
“ওহে প্রশান্ত আত্মা! প্রত্যাবর্তন করো তোমার রবের দিকে সন্তোষ সহকারে, আর তিনিও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। অতএব আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।” -(সূরা আল ফজর)
তখন সকাল ৭ টা ১৫ মিনিট। অবোধ পৃথিবীবাসীর ভালবাসা-আবেগ কিছুই মানে না। অবিশ্বাস্য কোন সংবাদ যাতে শুনতে না হয় সে প্রত্যাশায় নগরীর প্রথম শ্রেণির ক্লিনিক ‘হলি ক্রিসেন্ট’এ নিয়ে যাওয়া হলো তাঁকে। এদিকে পুরো বায়তুশ শরফে কান্নার রোল। মসজিদে শুরু হয়ে গেছে খতমে কুরআন, খতমে তাহলীল, দোয়া-মুনাজাত।
ডাক্তাররা দুঃখ প্রকাশ করলেন। আল্লাহ্র ওলী চলে গেছেন তাঁর মাহবুবের সান্নিধ্যে। (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না…..রাজেউন)। তাৎক্ষণিক হুজুরকে নিয়ে আসা হলো বায়তুশ শরফে। শায়খুল হাদিস মাওলানা নেছারুল হক সাহেব সংবাদ শোনামাত্রই জ্ঞান হারালেন, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল ক্লিনিকে। অজ্ঞান হলেন আরো অনেকে। শোকাহত জনতার ভীড় উপচে পড়লো বায়তুশ শরফের পবিত্র আঙ্গিনায়।
হৃদয় গোলাপ গিয়েছে ঝরে:
পারিবারিক ব্যবসার উদ্দেশ্যে আমি তখন ঢাকায়। ২৪শে মার্চ রাতে চট্টগ্রাম আসার জন্য হঠাৎ মনটা তোলপাড় করতে থাকে। অজানা আশঙ্কায় কাঁপতে থাকে মন। ঢাকায় জরুরী কাজ থাকা সত্ত্বেও রাতেই চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। ভোরে যখন বাসায় পৌছি আমাকে দেখে আব্বা ক্ষুব্ধ হন জরুরী কাজ ফেলে কিছু না জানিয়ে চলে আসার জন্য। সামান্য ঘুমিয়ে আবার ঢাকা রওয়ানা হবার জন্য বলেন। সকাল ৯ টায় ঘুম থেকে উঠে আম্মাকে বললাম, আমি বায়তুশ শরফ থেকে একটু ঘুরে আসি, তারপর ঢাকা যাব। আমি তখনো জানি না আমার কতবড় সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার জীবনের সর্বোত্তম ভালবাসার মায়াবী রুশদ, হৃদয় গোলাপকে হারিয়ে আমি অসহায় এতিম হয়ে গেছি। বাসার পাশেই নেছারিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরল। তারা হুজুরের শেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইল। আমি তাদের কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছিলাম না। আমার অজ্ঞতা বুঝতে পেরে তারা আমাকে পৃথিবীর সবচাইতে দুঃখজনক সংবাদটি শোনালো। তাদের কথায় বুঝলাম হুজুর আর নেই। নেছারিয়ার শিক্ষকরা দেখে এসেছেন। কিন্তু এ যে অবিশ্বাস্য! হুজুর অসুস্থ জানতাম, কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে চলে যাবেন তা কল্পনাই করা যায় না। পাগলের মতো ছুটলাম বায়তুশ শরফে। চোখে পানি, হৃদয়ে সর্বস্ব হারানোর শোক। কিন্তু সংবাদটাকে তখনো সত্য বলে মেনে নিতে পারছিলাম না। বায়তুশ শরফে পৌছে দেখি লাখো বনী আদমের নীরব অশ্রুতে শোকবিধুর হয়ে উঠেছে এ পবিত্র প্রাঙ্গন। আমি কিছুক্ষণের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। দেখলাম মসজিদের বারান্দায় শ্বেত শুভ্র চাদরে আবৃত হুজুরের নূরানী কফিন। মুখ দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল- “ইন্নালিল্লাহে…… রাজেউন”। দোয়া কালাম পড়ে গেলাম মাসিক দ্বীন দুনিয়া অফিসে। আদর্শ মাদ্রাসার সম্মানিত সেক্রেটারী আলহাজ্ব শামসুল হক সাহেব আমাকে দেখে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে শিশুর মত ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলেন। বললেন কে আর তোমাকে আদর করবেন? প্রকৃতই হুজুরের অসম্ভব ভালোবাসায় অধম ঐশ্বর্যশালী হয়ে উঠেছিলাম। তিনি ছিলেন আমার হৃদয়ের শ্রেষ্ঠতম গোলাপ, খুশবুর আধার। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার সে মায়াবী রুশদ গোলাপ ঝরে গেছে। ভাবতেই বুক ভেঙ্গে যায়, কান্নায় উথলে ওঠে অশ্রু নদী।
চারিদিকে শোকের মাতম:
মুহূর্তেই স্বজন হারানোর এ সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো। সারাদেশে নেমে এল শোকের ছায়া। ভক্ত-অনুরক্তের দল ছুটে আসলো বায়তুশ শরফ অভিমুখে। সকলের মুখে একই কথা- বায়তুশ শরফের রূহ মরে গেছে। আমরা এতিম হয়ে গেছি। অল্প সময়ের মধ্যে গোসল সেরে, কাফন পরিয়ে মাইয়েতকে বায়তুশ শরফ মসজিদের বারান্দায় রাখা হলো। মাথায় সেই চিরায়ত সুন্দর রঙিন টুপি। কি জ্যোতির্ময় নূরানী চেহারা। মনে হয় ঘুমিয়ে আছেন মায়ের কোলে। এখুনি উঠে ভক্তদের প্রয়োজনীয় নসিহত করবেন। চেহারা দেখে মনেই হয় না তিনি আর কখনো উপস্থিত ভক্তবৃন্দের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন না। চারেিদক কুরআন খানি চলছে। কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে দর্শনার্থী ভক্ত-অনুরক্তরা। প্রিয় মুর্শিদকে শেষবারের মতো এক নজর দেখার জন্য তাদের সেই কী আকুতি। মুখে কালেমায় শাহাদাত, চোখে অশ্রুর বান। ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে পরদিন অর্থাৎ ২৬/৩/১৯৯৮ ইং, সকাল সাড়ে দশটায় ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড ময়দানে নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। দেশের সব অঞ্চলের ভক্তরা যাতে জানাযায় শরীক হতে পারে তাই এ আয়োজন।
বেলা গড়িয়ে যায় কিন্তু শোকাহত দর্শনার্থীদের সংখ্যা ক্রমাগত শুধু বাড়তেই থাকে। দর্শনার্থীদের উপস্থিতির কথা চিন্তা করে মসজিদ বায়তুশ শরফের মেহরাব থেকে ‘মজলিসুল ওলামা বাংলাদেশে’র শীর্ষস্থানীয় ওলামাগণ শোকাহত জনতার উদ্দেশ্যে কুরআন, খতমে তাহলীল, নফল নামায, অপরদিকে ওলামাদের তকরীর, আর ভিন্নদিকে শোকার্ত দর্শনার্থীদের প্রিয় মুর্শিদকে শেষ দেখা আকুতি ভরা দীর্ঘ প্রতীক্ষার লাইন। সবমিলিয়ে বায়তুশ শরফে এক শোকবিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল, যা বর্ণনার অতীত। হুজুরের ইন্তেকালের সংবাদে শোকাহত জনতা রাজধানী ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, যশোর, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, বরিশাল, সিলেট, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজারসহ দেশের সব জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সকল দূরত্বের সীমা ডিঙ্গিয়ে বায়তুশ শরফ প্রাঙ্গণে সমবেত হতে থাকে। সকাল থেকে পরদিন জানাযা পর্যন্ত শোকাহত জনতার এ আগমন অব্যাহত থাকে এবং দর্শনার্থীদের ভীড় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এদিন অসংখ্য দর্শনার্থীর সাথে যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তি শ্রদ্ধেয় হুজুর কেবলাকে শেষ নজর দেখার জন্য এসেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম শাহী জামে মসজিদের খতীব আওলাদে রাসূল সাইয়েদ আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী আল-মাদানী, বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রী এম. এ. মান্নান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র এ.বি.এম. মহিউদ্দীন চৌধুরী, নগর জামায়াতের আমীর মাওলানা মুহাম্মদ আবু তাহের, স্থানীয় এম.পি. আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী প্রমুখ এবং নাম জানা অজানা মহানগরীর অসংখ্য সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ।
বিদায় বার্তা রচিত হলো যেভাবে:
হুজুরের আকস্মিক ইন্তেকালে সবচাইতে বেশি আহত হন তাঁর রূহানী সন্তান আঞ্জুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ’এর কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাবৃন্দ। যারা সার্বক্ষণিক হুজুরের স্নেহের ছায়াতলে থেকে এ দ্বীনি সংগঠনের কর্মতৎপরতাকে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে আতানিবেদিত ছিলেন। প্রিয় মুর্শিদকে হারিয়ে এসব নিবেদিত প্রাণ ভীনের খাদেমগণ বেদনায় বিমঢ় হয়ে আকুল কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। হযরত মাওলানা কুতুব উদ্দিন সাহেব (ম.জি.আ) আলহাজ্ব শামসুল হক, আলহাজ্ব এ. কে. মাহমুদুল হকের মত সর্বজন শ্রদ্ধেয় বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিরাও সেদিন শিশুর মতো কেঁদেছেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য-হুজুরের হাতে গড়া তাঁর এ সকল রূহানী উত্তরাধিকাররা এ কঠিন বিপদের মুহূর্তেও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে এতটুকুন গাফেল ছিলেন না। হুজুরের গোসল হতে দাফন পর্যন্ত সকল কাজ তাঁরা ভক্তি ও সম্মানের সাথে সম্পন্ন করেছেন। লক্ষলক্ষ মানুষের আবেগ ও শোককে নিয়ন্ত্রণ করে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রেখেছেন। কোথাও এতটুকুন বিশৃঙ্খলা বা বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়নি। হুজুরের ইন্তেকালের অব্যবহিত পর মাসিক দ্বীন দুনিয়া অফিসে গিয়ে দেখি মাসিক দ্বীন দুনিয়ার নির্বাহী সম্পাদক (বর্তমানে সম্পাদক) জনাব মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্ কাঁদছেন আর হুজুরের বিদায়ী সংবাদ ও সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখছেন। কান্নার জন্য তাঁর লেখা এগুচ্ছেনা। তাঁর হাতেই প্রিয় মুর্শিদের মৃত্যু সংবাদের ‘সংবাদ বিজ্ঞপ্তি’ রচিত হচ্ছে, একথা ভেবে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন। জনাব মোহাম্মদ আমান উল্লাহ্ খান ও চৌধুরী মোমিন উল্লাহ সান্ত্বনাবাণী ও সহযোগিতায় শেষাবধি পত্রিকায় প্রেরণের জন্য হুজুরের সংক্ষিপ্ত জীবনীসহ তাঁর ইন্তেকালের প্রেসবিজ্ঞপ্তি তৈরি হয়। এ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতেই সেদিন জাতীয় প্রচার মাধ্যম রেডিও-টেলিভিশন ও পরদিন সকল স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকের মাধ্যমে হুজুরের ইন্তেকালের খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। অভূতপূর্ব ব্যাপার হলো প্রেস বিজ্ঞপ্তির জন্য রচিত এ সংক্ষিপ্ত জীবনী জানার জন্য উপস্থিত লাখো লাখো শোকাতুর জনতা ফটোকপির দোকানগুলোতে ভীড় করে এবং তা সংগ্রহে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে মহান ওলীর কর্মময় সংক্ষিপ্ত জীবনী।
নামাযে জানাযা- লাখো লাখো মানুষের ঢল:
২৬শে মার্চ ১৯৯৮ বৃহস্পতিবার। সকাল সাড়ে দশটায় পলোগ্রাউন্ড ময়দানে জানাযা হবে। সকাল থেকেই পূর্ব দিনের মতোই ধনিয়ালাপাড়াস্থ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সে লক্ষলক্ষ মানুষের ঢল নামে। সারাদেশের অগণিত ধর্মপ্রাণ মুসলমান হুজুর কেবলাকে শেষ নজর দেখার জন্য বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো আছড়ে পড়ে। বাদ ফজর হুজুরের কফিন মাদ্রাসা মাঠে বিশেষভাবে নির্মিত প্যান্ডেলে রাখা হয় এবং দর্শনার্থীদের জন্য কফিনের চেহারা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। দর্শনার্থীদের সংখ্যাধিক্যের কারণে বেলা গড়ার সাথে সাথে বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স মানব-সমুদ্রে রূপ নেয়। মানুষের উপচে পড়া ভীড় ক্রমাগত বাড়তে থাকলে শোকার্ত জনতা স্থান সংকুলানের অভাবে জানাযার জন্য নির্ধারিত স্থান ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠ অভিমুখে রওয়ানা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পলোগ্রাউন্ড ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। সকাল সাড়ে নয়টায় শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কেবলার কফিন বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স হতে জানাযাস্থলে পৌঁছলে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। লক্ষলক্ষ শোকাহত জনতার মধ্য দিয়ে কফিন যখন মাঠের পশ্চিম প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন ভক্তদের বুকফাটা কান্না আর কালেমা শাহাদাতের হৃদয় উজাড় করা আওয়াজে আল্লাহর আরশও বুঝি কেঁপে উঠেছিল। স্মরণকালের বৃহত্তম এ নামাযে জানাযায় বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন মাননীয় শ্রম ও জনশক্তিমন্ত্রী জনাব এম.এ. মান্নান, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় অসংখ্য আলেমে দ্বীন, পীর মাশায়েখ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পেশাজীবী এবং সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সকাল ৯ টা ৪৫ মিনিটে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসার ছাত্র হাফেজ মফিজুর রহমানের সুললিত কণ্ঠের তেলাওয়াতে কালামে পাকের মাধ্যমে নামাযে জানাযার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। না’ত পেশ করেন বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদরাসার সুযোগ্য শিক্ষক হযরত মাওলানা শব্বির আহমদ। বায়তুশ শরফ দরবারের বিশিষ্ট খাদেম জনাব মোহাম্মদ আমান উল্লাহ খানের পরিচালনায় জানাযায় উপস্থিত লক্ষলক্ষ মানুষের সমাবেশে শোকাহত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর জননেতা আব্বাস আলী খান, মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা
মহিউদ্দীন খান, ইসলামী ব্যাংক শরীয়াহ কাউন্সিলের সদস্য সচিব মাওলানা কামাল উদ্দীন জাফরী, ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদের সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ শামসুদ্দীন, বায়তুশ শরফের বর্তমান পীর ছাহেব ও বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদরাসার সুযোগ্য অধ্যক্ষ মাওলানা কুতুব উদ্দীন ছাহেব (ম.জি.আ), সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অবঃ) অলি আহমদ বীর বিক্রম, সাবেক মেয়র মীর মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন, স্থানীয় এমপি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধরী বার এমপি, সাবেক সংসদ সদস্য ইসহাক মিয়া, জনাব নূরুল ইসলাম বিএসসি, নগর বি.এন.পির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব দস্তগির চৌধুরী প্রমুখ। এছাড়া কক্সবাজার হাশেমিয়া আলিয়া মাদরাসার রেক্টর, প্রবীণ আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা মুজহের আহমদ, চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের খতীব আওলাদে রাসূল সাইয়্যেদ আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী আল-মাদানী, চট্টগ্রাম দারুল মা’আরিফ আল ইসলামিয়ার মহাপরিচালক হযরত মাওলানা সুলতান যওক নদভী, সোবহানিয়া আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন। জামায়াত নেতা মাওলানা মুমিনুল হক চৌধুরী, নগর জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ আবু তাহের, সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, ইসলামী ঐক্যজোট নেতা মুফতী ইজহারুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী, বি.এন.পির যুগ্ম মহাসচিব আবদুল্লাহ্ আল নোমান, ইসলামী ব্যাংক পরিচালক মণ্ডলীর ভাইস চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মুহাম্মদ ইউনুস, ব্যাংকের নির্বাহী সভাপতি কামাল উদ্দীন চৌধুরী, দৈনিক সংগ্রামের সহকারী সম্পাদক মাওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতী প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
লাখো লাখো জনতার উদ্দেশ্যে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলেন, বায়তুশ শরফের পীর সাহেব কেবলা ছিলেন বাংলাদেশের সর্বস্তরের মুসলমানদের প্রকৃত অভিভাবক। যে কোন সংকটময় পরিস্থিতিতে আমরা তাঁর কাছ থেকে সঠিক নির্দেশনা পেয়েছি। তাঁর ইন্তেকালে আজ বাংলাদেশের মুসলমানরা পিতৃহারা এতিম হয়ে গেছে। তার এ শূন্যতা পূরণ হবার নয়। তিনি আরো বলেন, পীর সাহেব ছিলেন এ অঞ্চলের ইসলামের সূর্য। যেখানেই এদেশের অসহায় দুর্বল মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের আঁধার ঘনীভূত হয়েছে, সেখানেই তিনি আলোর মশাল হয়ে ছুটে গেছেন। তাঁর ইন্তেকালে ইসলামের সে প্রদীপ্ত সূর্য অস্তমিত হলো।
জননেতা আব্বাস আলী খান বলেন, মরহুম পীর সাহেব কেবলা ছিলেন ইসলামী আদর্শের সফল রূপকার, ইসলামী সমাজগঠনে দৃঢ়প্রত্যয়ী কর্মঠ পুরুষ। তাঁর উদ্যোগেই ইসলামী ব্যাংক ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গড়ে উঠেছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে আজ যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা পূরণ করা কঠিন হবে। তিনি তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাদের ‘সবরে জামীলের’ জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন, তাঁর পরকালীন উচ্চ মর্যাদা কামনা করেন এবং তাঁর যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচনের তৌফিক কামনা করেন।
মাওলানা কামাল উদ্দীন জাফরী বলেন, তিনি ছিলেন ইসলামী ঐক্যের প্রতীক, সংহতির চিহ্ন। তিনি যখনই ডাক দিয়েছেন দেশের সর্বস্তরের মানুষ তখনই তাঁর ডাকে এক প্লাটফরমে একত্রিত হয়েছে, ভুলে গেছে সব ভেদাভেদ। আজ ইসলামী ঐক্যের এক বিরল সিপাহসালারকে হারিয়ে এ জাতি নিঃস্ব হয়ে গেছে। তিনি বলেন- হাদিস শরীফের ভাষ্যানুযায়ী বড় বড় কাজ করা আল্লাহ্র নেয়ামত। মরহুম পীর সাহেব অসংখ্য বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের পত্তন করে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে আমাদের জন্য ছিলেন বড় নেয়ামত। আজ সে নেয়ামত থেকে আমরা বঞ্চিত।
স্থানীয় এমপি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মরহুম পীর সাহেব কেবলাকে ইসলামী আন্দোলনের নেপথ্য কর্মী, নীরব খাদেম আখ্যায়িত করে বলেন, সরলতা ছিল মরহুমের শ্রেষ্ঠ গুণ। বহু প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও কামেল ওলী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর জীবনযাপন ছিল একেবারে সাদা-সিধে। তাঁর সহজসরল জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। বিএনপির নগর সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব দস্তগীর চৌধুরী ঢাকা ট্রাঙ্ক রোডের নাম মরহুম পীর সাহেব কেবলার নামে নামকরণের প্রস্তাব করলে উপস্থিত লাখো লাখো জনতা দু’হাত তুলে তার প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন জানায়।
জানাযার সময় যত নিকটবর্তী হচ্ছিল শোকাহত জনতার তরঙ্গ ততই উত্তাল হচ্ছিল। মানুষের বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ার পলোগ্রাউন্ড ময়দান, ওয়াজি উল্লাহ ইনস্টিটিউট ময়দান, রেলওয়ে পাবলিক স্কুল ময়দান ছাড়িয়ে উত্তরে রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবের পাহাড়ের চূড়া, পূর্বে কদমতলী মোড় পেরিয়ে বি.আর.টি.সি সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে এক মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। এমনকি দক্ষিণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল লাইনের উপরেও জনতা কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়ালে তখন আগত আন্তঃনগর এক্সপ্রেসের একটি ট্রেন শোকার্ত জনতার সামনে জানাযা স্থলে অনির্ধারিত যাত্রা বিরতি করতে বাধ্য হয়।
নামাযে জানাযায় ইমামতি করলেন হুজুরের বড় সাহেবজাদা:
নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে দশটায় মরহুম পীর সাহেব কেবলার সুযোগ্য জ্যেষ্ঠ পুত্র আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভী সাহেবের ইমামতিতে এ মহান ওলীর নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযা শেষে পলোগ্রাউন্ড ময়দানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। সকলের মুখে কালেমায়ে শাহাদাতের উচ্চারণ আর চোখে স্বজন হারানোর অশ্রুবান। শোকার্ত মানুষ কফিনবাহী খাট শেষবারের মত স্পর্শ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আবেগ রুদ্ধ শোকাহত লাখো লাখো জনতার এ মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে কফিন যখন পলোগ্রাউন্ড ময়দান থেকে কদমতলী মোড় হয়ে বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সে আনা হচ্ছিল তখন রাস্তার দু’ধারে বাড়িঘরের ছাদে অসংখ্য নারী-শিশু হুজুরের কফিন শেষবার দেখার জন্য ভীড় জমায়। অনেকে আবেগ আপ্লুত কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। অনেকেই শোক সংবরণ করতে না পেরে জ্ঞান হারাচ্ছিলেন বারবার। শোকার্ত জনতার ভীড় অতিক্রম করে পলোগ্রাউন্ড থেকে কফিন বায়তুশ শরফ নিয়ে আসতে এক ঘণ্টার অধিক সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়।
যেখানে ঘুমিয়ে আছে শান্ত হয়ে আমার প্রাণের বুলবুলি:
দুপুর বারোটায় বাংলার এ প্রদীপ্ত সূর্য, কোটি কোটি বনী আদমের নয়নমণি, যুগশ্রেষ্ঠ কামেল ওলী, আল্লাহ্ প্রিয় বন্ধুকে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসা ও মসজিদের মধ্যবর্তী ফুলবাগানে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
চারদিকে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা পবিত্র সমাধি। একপাশে আল্লাহর ঘর মসজিদ, অপর পাশে রাসূল (সা.) এর ঘর মাদ্রাসা। দু’টি জান্নাতী প্রতিষ্ঠানের মাঝে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছেন আমার প্রাণের বুলবুলি, শ্রদ্ধেয় হুজুর কেবলা (রাহ.)। এ যেন ‘রওযাতুম মিন রিয়াফিল জান্নাহ্’ বেহেশতী বাগানের খণ্ড টুকরো। চৌদিকে ফুলে মৌ মৌ খুরু। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে পাঞ্জেগানা নামায ও আযানের ধ্বনি, মাদ্রাসায় গুঞ্জরিত হচ্ছে পবিত্র হাদিসের অমীয় বাণী। সার্বক্ষণিক চলছে জেয়ারতকারীদের জেয়ারত, কুরআন ও অযিফা পাঠ। আজীবন পর্ণকুটিরবাসী হুজুরের কবরগাহেও নেই কোন জৌলুসের চিহ্ন, লালচাদর কিংবা গিলাফের অতিরিক্ত আচ্ছাদন। শিরক-বিদআতমুক্ত সম্পূর্ণ জান্নাতী পরিবেশে ঘুমিয়ে আছেন তিনি।
দু’টি অবোধ প্রাণীর নীরব কান্না:
যে ফুল বাগানে শেষ শয্যা গ্রহণ করেছেন তারই পাশে নির্বাক প্রাণী হুজুরের গৃহপালিত হরিণ দু’টোও যেন অঝোরে কাঁদছিল। হুজুরের ইন্তেকালের দিন ও জানাযার দিন প্রিয়জন হারানোর শোকে কোন আহার গ্রহণ করেনি তারা। তারা হয়তো বুঝতে পেরেছিল, আর কোনদিন হুজুর তাদের আদর করবেন না, স্নেহভরে মুখে তুলে দেবেন না সুস্বাদু আহার। এভাবে মহান স্রষ্টার সকল সৃষ্টির সেবক এ ওলীর মৃত্যুতে শুধু মানুষ নয় আকাশ-বাতাস ধরণীর সবকিছুই জারজার হয়ে কেঁদেছিল।
স্বাধীনতা দিবস, শোক দিবসে পরিণত:
বৃহস্পতিবার ছিল ২৬ মার্চ দেশের স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু এ মহান ব্যক্তির আকস্মিক ইন্তেকালে বন্দর নগরীতে স্বাধীনতা দিবস শোক দিবসে রূপান্তরিত হয়েছিল। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকলের মুখে ছিল শোকের ছায়া। সকাল থেকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিপণিগুলো ছিল বন্ধ। জানাযার উদ্দেশ্যে আগত গাড়ি ছাড়া তেমন কোন যানবাহন চলেনি। নগরীর সকল সড়কেই জানাযাগামী মানুষের ঢল লক্ষ করা গেছে। নির্ধারিত সময়ে জানাযা অনুষ্ঠিত হওয়ায় ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও অনেকে দূর-দূরান্ত হতে এসে জানাযায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। দুপুর অব্দি জানাযায় অংশগ্রহণের নিমিত্ত মানুষের আগমন ছিল অব্যাহত। জানাযা না পেয়ে অনেককে বুক চাপড়ে কাঁদতে দেখা গেছে। নগরীর কোথাও স্বাধীনতা দিবসের উৎসবের আমেজ ছিল না। বরাবরের মতো মাইক বাজানো, গানের আওয়াজ, বাজি ফুটানো ইত্যাদি থেকে নগরী যেন ছিল শান্ত, মুক্ত। বিশেষ করে যুবকদের মাথায় টুপি ও চোখে অশ্রুর দৃশ্য ছিল সকরুণ। আমার জীবনে এতবড় জানাযা আমি কখনো দেখিনি। বর্তমান পীর সাহেব হযরত মাওলানা কুতুব উদ্দিন ছাহেব (ম.জি.আ) বলেছেন, হুজুরের অসংখ্য জ্বীন মুরীদগণও জানাযায় অংশগ্রহণ করেছেন।
কুলখানি ও জেয়াফত:
২৮শে মার্চ, ১৯৯৮, শনিবার ধনিয়ালাপাড়াস্থ মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সে মরহুম হুজুর কেবলার কুলখানি অনুষ্ঠিত হয়। ৩০শে মার্চ সোমবার হুজুরের গ্রামের বাড়ি কুমিরাঘোনাহ মিয়াজী পাড়ায় হুজুরের মাগফেরাত কামনায় জেয়াফতের আয়োজন করা হয়। ৪ঠা এপ্রিল বাদে এশা হতে ধনিয়ালাপাড়াস্থ মসজিদ বায়তুশ শরফ প্রাঙ্গণে বায়তুশ শরফের প্রাণ-প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুল আলম শাহ্সূফী হযরত মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতর রহ. ও হাদীয়ে যামান আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ. এর মাহফিলে ঈছালে সাওয়াব অনুষ্ঠিত হয়। এসব কুলখানি ও জেয়াফতে সর্বস্তরের মুসলমানসহ দরবারের হাজার হাজার ভক্ত-অনুরক্ত ও দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
সুধীমহলের অভিমত:
বায়তুশ শরফের হযরত পীর সাহেব কেবলা এমন এক সময়ে বাংলার সবুজ জমিন থেকে হারিয়ে গেলেন যখন সমগ্র বিশ্ব বিংশ শতাব্দীকে বিদায় ও একবিংশ শতাব্দীকে স্বাগত জানানোর জন্য মুখরিত হয়ে একটি জটিল Turning Point অতিক্রম করছে। সমস্ত বিশ্বজুড়ে আজ একটাই ধ্বনি ‘আগামী শতাব্দী হবে ইসলামের বিজয়ের শতাব্দী।’ ইসলামের বিজয়ের যে অবশ্যম্ভাবী সম্ভাবনা আজ সুস্পষ্ট এর প্রেক্ষিত বিনির্মাণে বিশ্বের যে ক’জন ব্যতিক্রমী মনীষীর অবদান অবিস্মরণীয়, তাঁদের মাঝে মরহুম পীর সাহেব কেবলা রহ. অন্যতম সমুজ্জ্বল মহিমায় ভাস্বর। তাই তাঁর ইন্তেকালের পর দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার্ঘ্য সমর্পিত হয়েছিল বায়তুশ শরফে। জানাযায় উপস্থিত হয়ে আবেগ জড়িত কণ্ঠে বক্তব্য রাখছিলেন দেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, যা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে বিরল দৃষ্টান্ত। ধর্মীয় প্রেক্ষিতে আমাদের দেশের আলেম ওলামারা জনসাধারণের নিকট নানা প্রান্তিকতার অধিবাসী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু হুজুরের মৃত্যুতে পারস্পরিক বিরোধিতার সে দৃশ্য চুকে গেছে। তাঁর ইন্তেকালে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামেয়াতুল ইসলামিয়া, আন্জুমনে রহমানিয়া আহমদীয়া সুন্নিয়াসহ সকল ইসলামী রাজনৈতিক দল ও সংস্থা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ফুরফুরা শরীফের পীর হযরত মাওলানা আবুল আনসার মুহাম্মদ আবদুল কাহহার সিদ্দীকী সাহেব বলেছেন- তাঁর ইন্তেকালে আমার ডান হাত ভেঙ্গে গেছে। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান বলেন, আমরা শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদকে হারিয়েছি। আড়াইবাড়ির পীর হযরত মাওলানা গোলাম হক্কানী সাহেব ও চরমোনাইর পীর হযরত মাওলানা ফজলুল করীম ছাহেব গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁর ইন্তেকালে জাতি একজন নিবেদিত প্রাণ নিঃস্বার্থ দ্বীনের খেদমতগারকে হারিয়েছে। এভাবেই মৃত্যুর পরও মুসলিম মিল্লাতের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তিনি হয়েছেন নন্দিত- লাভ করেছেন সর্বমহলের শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও আন্তরিক দোয়া।
জাতীয় প্রচার মাধ্যম ও সংবাদপত্রের প্রতিক্রিয়া:
হুজুরের আকস্মিক ইন্তেকালে জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত সংবাদপত্র জগত ও সংবাদপত্রসেবীদের মাঝেও নেমে আসে শোকের ছায়া। সকাল থেকেই বাংলাদেশ বেতার, স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদে বারবার পীর সাহেব কেবলার আকস্মিক ইন্তেকালের খবর প্রচার করতে থাকলে মুহূর্তেই এ শোক সংবাদ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম টেলিভিশন সন্ধ্যা ছয়টার সংবাদে মরহুমের সচিত্র মৃত্যু সংবাদ বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। বাংলাদেশ টেলিভিশনও সন্ধ্যা সাতটায় স্থানীয় সংবাদ ও রাত আটটায় প্রচারিত জাতীয় সংবাদে পীর সাহেব কেবলার আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ প্রচার করলে সারা দেশবাসী আকুল কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। পরদিন ২৬শে মার্চ স্থানীয় খবরের কাগজ দৈনিক পূর্বকোণ, দৈনিক আজাদী, দৈনিক ঈশান, দৈনিক কর্ণফুলী ‘লীড নিউজ’ হিসেবে হুজুরের সচিত্র মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করে। দৈনিক কর্ণফলী সাদা কফিনে ঢাকা হুজুরের নূরানী চেহারা মুবারকের চিত্র প্রকাশ করলে শোকাতুর জনতা প্রিয় মর্শিদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহ করতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। জনতার ক্রমাগত চাহিদার প্রেক্ষিতে সেদিন দৈনিক কর্ণফলী দুপুর ১২টায় ততীয় সংস্করণ প্রকাশ করে।
দৈনিক ইত্তেফাক, ইনকিলাব, সংগ্রাম, দিনকাল, জনকণ্ঠ, মুক্তকন্ঠ, মানব জমিন, ভোরের কাগজ, বাংলাবাজার, ডেইলি স্টার, বাংলাদেশ টাইমস, অবজারভার, দি ইন্ডিপেন্ডেন্টসহ সকল জাতীয় দৈনিকও এদিন পীর ছাহেবের সচিত্র মৃত্যু সংবাদ বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ছুটি থাকার কারণে ২৭ তারিখে পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। ২৮ তারিখে প্রকাশিত পত্রিকায় স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের খবরের সাথে সাথে হুজুর কেবলার ঐতিহাসিক জানাযার সচিত্র সংবাদ ছিল স্থানীয় সংবাদপত্রসমূহের লীড নিউজ। জাতীয় পত্রপত্রিকাসমূহও হুজুরের জানাযাকে ঐতিহাসিক জানাযা হিসেবে উল্লেখ করে রিপোর্ট ছাপে। দৈনিক ইনকিলাব লিখেছে, ‘বায়তুশ শরফের পীর সাহেবের জানাযায় লক্ষলক্ষ মানুষের ঢল।’
২৮শে মার্চ দৈনিক ঈশান ‘আমরা শোকাহত’ শিরোনামে এবং ১লা এপ্রিল দৈনিক কর্ণফুলী ‘এক মহৎপ্রাণের স্মরণে’ শিরোনামে সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করে। এছাড়া ২৮শে মার্চ ১৯৯৮ দৈনিক ঈশান আবু নোমান মুহাম্মদ তারেক লিখিত ‘পীর-ই-বায়তুশ শরফ: একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব’ শিরোনামে, ১লা এপ্রিল ১৯৯৮ দৈনিক কর্ণফুলী মুহাম্মদ সাইফুল হক সিরাজী লিখিত ‘জাতি হারাল নিবেদিত প্রাণ এক শিক্ষক’ শিরোনামে পীর সাহেবের স্মরণে পৃথক পৃথক উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করে।
গত ৩রা এপ্রিল ১৯৯৮ শুক্রবার দৈনিক ঈশান, ৪ঠা এপ্রিল ১৯৯৮ শনিবার দৈনিক সংগ্রাম ও ৫ই এপ্রিল ১৯৯৮ রবিবার দৈনিক কর্ণফুলী মরহুম পীর সাহেবের স্মরণে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। এসব ক্রোড়পত্রে পীর ছাহেব কেবলা সম্পর্কে দেশ-বিদেশের পীর-মাশায়েখ, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের জনসাধারণের হৃদয়ানুভূতির স্বচ্ছন্দ প্রকাশ ঘটেছে।
হুজুর কেবলা রহ. এর উপর প্রথম প্রকাশনা:
মাসিক দ্বীন দুনিয়ার নির্বাহী সম্পাদক জনাব মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্র সম্পাদনায় হুজুর কেবলা রহ. এর গৌরব উজ্জ্বল জীবন ও কর্মের উপর ১১২ পৃষ্ঠার সুদৃশ্য ও তথ্যবহুল গ্রন্থ ‘জান্নাতের পথে বায়তুশ শরফের পীর’ ৪ঠা এপ্রিল ১৯৯৮ প্রকাশিত হয়। মাত্র ৪ দিনের প্রচেষ্টায় প্রকাশিত চমৎকার গ্রন্থটি সুধীমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
স্মৃতি রক্ষায় প্রস্তাবসমূহ:
হুজুর চলে গেছেন, রেখে গেছেন অসংখ্য কীর্তি। তাঁর কীর্তির মাঝেই তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন। তবুও তাঁর অমর স্মৃতি রক্ষায় যে সমস্ত প্রস্তাব সুধী মহলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে সেগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
১. চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দরের নাম হুজুর কেবলার নামে নামকরণ করা।
২. চট্টগ্রাম রেল স্টেশনের নাম হুজুর কেবলার নামে নামকরণ করা।
৩. ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাঙ্ক রোড হুজুর কেবলার নামে নামকরণ করা।
৪. হুজুরের কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক-বিভাগ সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে অবগত করানোর
জন্য তাঁর উপর একটি পূর্ণাঙ্গ রিসার্চ একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা।
৫. হুজুরের বক্তব্যের ক্যাসেট ও লিখনীসমূহের যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের ব্যবস্থা করা।
আমার শ্রেষ্ঠ স্মৃতি:
মরহুম পীর সাহেব কেবলা কারামত প্রকাশে সবসময় ছিলেন নিরাসক্ত। তিনি বলতেন, আমি যে দ্বীনের অসংখ্য মারকাজ গড়ে তুলছি, সেখান থেকেই তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর। এতদসত্ত্বেও তাঁর অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী অগণিত কারামতের সুখ-স্মৃতি বুকে ধারণ করে ধন্য হয়ে আছেন। আমার জীবনের তেমনি একটি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত প্রাপ্তির কথা বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। আমি ১৯৮৯ সাল থেকে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসার ছাত্র। শুরু থেকেই শ্রদ্ধেয় হুজুর কেবলা ও সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দের দোয়া ও সস্নেহে নেকনজর লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। ফলে সকলেই আমার কাছ থেকে একটা সুন্দর ফলাফল প্রত্যাশা করতেন। কিন্তু ১৯৯৪ সালে দাখিল পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেয়েও আমার মেধা তালিকায় স্থান লাভ সম্ভব হয়নি।
১৯৯৬ সালের হজ্বের পূর্বের ঘটনা। মাদ্রাসার সেক্রেটারী আলহাজ্ব শামসুল হক সাহেব আমার কাছে আলিম পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। বিনম্র কন্ঠে বলি, আপনারা দোয়া করুন। তিনি বললেন, আমাদের দোয়া দিয়ে কী হবে। যাঁর দোয়া কবুল হবে তিনি তো মক্কায়। তাঁর কাছে চিঠি লিখে দোয়া চাও। উল্লেখ্য যে, হুজুর কেবলা তখন হজ্বের সফরে মক্কা শরীফে অবস্থান করছিলেন। হাজী সাহেব তাঁর প্রতি ইশারা করলেন। আমি ভক্তি-বিগলিত হৃদয়ে হুজুরের বরাবরে দোয়া চেয়ে পত্র দিলাম। এরপর অনেকদিন কেটে গেছে। পরীক্ষা আসন্ন। দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হল। মাহফিলের শেষে হুজুরের সাথে মোলাকাত করতে গেলে তিনি জানতে চাইলেন, মক্কা শরীফে আমিই তাঁর কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলাম কিনা? আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দেই। সেদিন তিনি আর কিছু বলেননি। এরপর পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্ট বেরুলো। বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসার ইতিহাসে আমিই সর্বপ্রথম সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান লাভের গৌরব অর্জন করলাম। সুসংবাদ জানিয়ে দোয়া নেয়ার জন্য হুজুরকে কদমবুচি করতে গেলে হুজুর জিজ্ঞেস করলেন তুমি হজ্বে দোয়া চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলে? আমি ‘জ্বী’ বললে তিনি নীরবে নামায পড়তে চলে গেলেন। এভাবেই তিনি আমাদের ভাগ্যের দুয়ারকে বিকশিত করেছেন। ক্বাবা শরীফের গিলাফ ধরে আমাদের জন্য দোয়া করে কবুল করিয়েছেন। কিন্তু নিজের কামালিয়াতকে প্রকাশের চেষ্টা করেননি। আজ তাঁকে হারিয়ে আমরা এতিম হয়ে গিয়েছি। আমার বিশ্বাস, তিনি যদি সেদিন দোয়া না করতেন তবে এত ভাল ফল লাভ করা আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব হতো না। উল্লেখ্য হুজুরের দোয়া এতই মকবুল হয়েছিল যে, এরপর থেকে প্রতিবছর মাদ্রাসার ছাত্ররা মেধা তালিকায় স্থান লাভ করে আসছে।
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহিনা:
পরিশেষে বলতে চাই,
নাহি সেতো আজি ধূলির ধরায়
আছে শুধু তাঁর জ্বালানো আলো
পথহারা কত লক্ষ পথিক
সে আলোতে পথ পেলো।
সত্যিই তাই। হুজুর কেবলা আজ আমাদের মাঝে নেই একথা সত্য। কিন্তু তিনি আমাদের পথচলার জন্য অসংখ্য আলোর উৎস রেখে গেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া মসজিদ, মাদ্রাসা, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন মূল্যবান সুলিখিত কিতাবাদী আমাদের পথ চলার পাথেয়। এসব প্রতিষ্ঠান যাতে কোনদিক থেকে দুর্বল বা ভঙ্গুর হয়ে না পড়ে সে জন্য হুজুরের সকল ভক্তদের সজাগ সহানুভূতির দৃষ্টি নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। আজ আর মর্সিয়া-ক্রন্দন নয়, আজ বড় প্রয়োজন সকলের নিঃস্বার্থ ত্যাগী মনোভাব। বর্তমান পীর সাহেব হুজুর, মরহুম পীর সাহেব কেবলার যোগ্য উত্তরসূরী, বারুল উলুম আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (ম.জি.আ) এর সুযোগ্য নেতৃত্বে শোককে শক্তিতে পরিণত করে হুজুরের রেখে যাওয়া কাজকে মনজিলে মকছুদে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। তবেই হুজুরের আত্মা শান্তি পাবে। আমরা তাঁর রূহানী ফয়েজ লাভে ধন্য হবো।
আল্লাহ্ যেন তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের সকলকে সবরে জামীল এখতিয়ারের তৌফিক দান করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসে সম্মানিত মেহমান হিসেবে কবুল করেন। আমীন।
হাফেয আবু নোমান মোহাম্মদ তারেক
Leave a Reply