শাহ্ সূফী হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ. বায়তুশ শরফের মহান রূপকার

বায়তুশ শরফের পীর সাহেব শায়খ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার সাহেব ছিলেন একজন অত্যন্ত জ্ঞানপিপাসু লোক। তাঁর পীর সাহেব ও বায়তুশ শরফের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হযরত মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতর রহ.। তিনি স্টেশন রোডস্থ মসজিদে ইমামতি করতেন এবং আধ্যাত্ম সাধনায় নিজেকে নিযুক্ত রাখতেন। এখানে থাকতে তাঁর বেশ কিছু মুরিদও হয়। বায়তুশ শরফ নামটিও তাঁর দেয়া।

মসজিদকে কেন্দ্র করে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক আন্দোলন শুরু করেন। সমগ্র আন্দোলনই মসজিদ কেন্দ্রিক; এর দুটি দিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক। সমগ্র আন্দোলনটি বায়তুশ শরফ নামে পরিচিত। এর অধীনে আন্জুমনে ইত্তেহাদ নামে তিনি একটি সংগঠন গড়ে তোলেন ১৯৫২ সালে।

মীর আখতর সাহেবকে আমি দেখিনি, দেখার সুযোগ ছিল, কিন্তু আমি তাঁর সম্বন্ধে জানতাম না। তিনি প্রত্যেক বৎসর মুরিদ সমভিব্যহারে হজ্ব পালন করতেন। ১৯৭১ সালে হজ্ব পালন করতে গিয়ে তিনি আরাফাত থেকে মিনায় এসে ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল মুয়াল্লায় সমাহিত হন। ইন্তেকালের পূর্বে তিনি হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার সাহেবকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মনোনীত করে যান।

পীর সাহেব একজন অসাধারণ দক্ষ সংগঠক ছিলেন। মাওলানা আখতর সাহেব বায়তুশ শরফের ভিত্তি স্থাপন করে একটি ধর্মীয়, সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেন সত্য, কিন্তু বায়তুশ শরফকে ফুলে ফলে সুশোভিত করেন মাওলানা আবদুল জব্বার সাহেব।

মাওলানা আবদুল জব্বারের সময়েই আমি বায়তুশ শরফের সাথে সম্পৃক্ত হই। তিনি একজন জ্ঞানী লোক ছিলেন, তাঁর মত জ্ঞানপিপাসু লোক আমি কম দেখেছি বা দেখিনি বললে মিথ্যা বলা হবে না। প্রায় প্রত্যেক মাসে বা দু’এক মাস পর পর বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিলনায়তনে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠের এবং আলোচনার ব্যবস্থা হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আন্‌জুমনে ইত্তেহাদের সদস্যরা, পীর সাহেবের মুরিদান ও বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকগণ অতি উৎসাহ নিয়ে সেমিনারে উপস্থিত থাকতেন। কেউ কেউ আলোচনায়ও অংশ নিতেন। আমার প্রস্তাবে ও পীর সাহেব হুজুরের অনুমোদন এবং আন্তরিক প্রচেষ্টায় ‘বাংলাদেশে ইসলাম: ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ’ নামক এক জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক সেমিনারে উপস্থিত থাকেন এবং প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনায় অংশ নেন। সেমিনার উপলক্ষে লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়। আমি দেখে অবাক হই বায়তুশ শরফ কর্তৃপক্ষ এই সমুদয় অর্থ ব্যয় করেন শুধু জ্ঞান লাভের জন্যই। পীর সাহেব নিজে সম্পূর্ণ ব্যাপারটি তদারক করেন। তিনদিন ব্যাপী সেমিনারের প্রত্যেক সেশনে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আগাগোড়া তিনি উপস্থিত ছিলেন। এতেই প্রমাণ পাওয়া যায় তিনি কত বড় জ্ঞান-পিপাসু ছিলেন।

এই মহান কর্মবীর ও ইসলামী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ১৯৯৮ সালের ২৫ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য সহকর্মী ও মুরীদ হযরত মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন বায়তুশ শরফের পীর সাহেব হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন।


সমাজ ও জীবন: দ্বিতীয় খণ্ড।

প্রফেসর ড. আবদুল করিম ভাইস চ্যান্সেলর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।