কে জানতো লেখকদের নিয়ে এটি তাঁর শেষ সমাবেশ

১৯৯৭ সালের ২০শে নভেম্বর মিষ্টি রোদের বিকেল। মাসিক দ্বীন দুনিয়া কর্তৃপক্ষ আয়োজন করেছেন বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিলনায়তনে নবীন-প্রবীণ লেখকদের নিয়ে প্রীতি সমাবেশ। আর প্রধান অতিথি হিসেবে মঞ্চে উপবিষ্ট, যুগশ্রেষ্ঠ ওলীয়ে কামেল, মাসিক দ্বীন দুনিয়ার প্রতিষ্ঠাতা, প্রকাশক, পৃষ্ঠপোষক হাদিয়ে যামান শাহ্ সূফী আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার সাহেব। দীর্ঘ তিন ঘন্টা ব্যাপী সমাবেশে আন্তরিকতার সাথে বসে আমাদের লেখকদের কথা শুনে ছিলেন। সে দিন একই মঞ্চে হুজুর কেবলার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকের মতো আমি অধমও আমার কথা খুলে বলেছি। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জগতের সেরা সুখী ভেবেছি। এ কথা ভেবে যে, হুজুর কেবলার মতো মহান ব্যক্তিত্বের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলার সুযোগ ক’জনার ললাটে জোটে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে লেখকদের উদ্দেশ্যে হুজুর কেবলা হেদায়াতী বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তব্য গতানুগতিক কোন বক্তব্য ছিল না, হৃদয়ের গভীরতা থেকে তিনি বক্তব্য রাখেন।

কবি আল মাহমুদের ভাষায়-

“কবিদের সাথে তিনি ছিলেন এক

দরবেশের পোশাকধারী শায়ের যখন আল্লাহর কালাম পেশ করতেন

তখন পরিবেশটাই নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে বসে থাকত।

আমরা কবিরা ভাবতাম, কবিতা দিয়ে আর কি হবে? মনে হত

ঐ আয়াতের গুঞ্জনে মৌমাছির মত উড়তে থাকি।”

হুজুর কেবলার নবীন লেখকদের কথা শুনতে বৃদ্ধ বয়সেও নতুন করে তরুণ হয়ে উঠেছিলেন। তার বক্তব্যে বললেন: আঠারো বছর পূর্বে একজন মুরিদ আমাকে একটি পত্রিকা এনে দেন। তাতে লেখা ছিল, আল্লাহ্ থাকেন আরশে আর মানুষ থাকে জমিনে। সুতরাং জমীনের মানুষের জন্য আল্লাহ্ কোন প্রয়োজন নেই এবং ১৪০০ বছর পূর্বেকার সেকেলে জীবন ব্যবস্থা ইসলামের প্রয়োজনীয়তা, বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার এ আধুনিক যুগে সম্পূর্ণ অচল। পত্রিকার এ লেখা পড়ে আমার মুখ থেকে তাৎক্ষণিক উচ্চারিত হলো, ‘মানুষ সুখাদ্য না পেলে কখাদ্য তো খাবেই।” সে চেতনা থেকেই মানুষকে সত্য ও ঈমানের আহার দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ১৭ বছর আগে শত প্রতিকলতাকে ছিন্ন করে দ্বীন দুনিয়া প্রকাশ করি। আল্লাহ সম্ভবত এ পত্রিকাকে কবুল করেছেন আমাদের নিয়তের বিশুদ্ধতার কারণে। তাই একাধারে ৪৪ বছর এ পত্রিকা পাঠকদের নিরবীচ্ছিন্ন প্রশংসা কুড়িয়েছে। আর দ্বীন দুনিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বাসী তরুণ লেখকদের একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। আমার ছোট ছোট ভাইয়েরা আজ যে জিহাদে শরীক হয়েছে আল্লাহ্ তাদের সে পথে কায়েম রাখুন এবং কামিয়াবী দান করুন। তিনি আগামীতে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লেখকদের মনের কথা শোনার প্রত্যাশা রেখে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

কে জানতো, এটাই হুজুর কেবলার লেখকদের নিয়ে শেষ সমাবেশ। লেখকদের নিয়ে প্রত্যাশিত অনুষ্ঠান আর হলো না। হুজুর কেবলা তার আগেই সকলকে কাঁদিয়ে মাহবুবের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন। আমরা হয়ে গেলাম সুযোগ্য কাণ্ডারী বিহীন দীর্ঘ সফরের যাত্রী। আমরা আজ বড্ড অসহায় এতিম। আমরা যারা ইসলামী সাহিত্য-সংস্কৃতির কথা বলি কিংবা ইসলামী সংস্কৃতির বিপ্লব উত্তরণের স্বপ্ন দেখি, সেদিন আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম, চলমান ঐতিহ্য বিরোধী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলায় লেখকদের প্রতি হুজুর কেবলা রহ. এর এমন উজাড় করা ভালোবাসা।

শ্রদ্ধেয় হুজুর কেবলা রহ. সেই দরদভরা বক্তব্য সেদিন নবীন লেখকদের উৎসাহ উদ্দীপনা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছিল। আমরা সেদিন শপথ নিয়েছিলাম হুজুর কেবলার নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব উত্তরণের, বেহায়াপনা সংস্কৃতির উৎখাত করে ইসলামী সংস্কৃতির বাস্তবায়নের।


মুহাম্মদ আবদুর রউফ মিলন

কবি ও সাহিত্যিক, লন্ডন প্রবাসী।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *