আমি আবার নতুন জীবন লাভ করেছি

১৯৭২ সাল। স্বাধীন বাংলাদেশের অসংখ্য ছাত্র তরুণদের মধ্যে যখন হতাশা বিরাজ করছে। এমনি একদিন আমার এক হতাশাগ্রন্থ বন্ধু মিলল যিনি ঢাকার তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে কাজ করতেন। কোন এক দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে চট্টগ্রামের সাবেক ডেপুটি মেয়র আলহাজ্ব দস্তগীর চৌধুরীর নিউমার্কেটস্থ দোকান ‘প্রিয়তমায়’ কিছুকাল ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। পড়ন্ত বিকেলে নিউমার্কেটে তার কর্মস্থলে আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন- মনে হচ্ছে আপনি হতাশায় ভুগছেন? আপনি কি ধনিয়ালাপাড়া চেনেন? আপনি কি বায়তুশ শরফের নাম শুনেছেন? এতগুলো প্রশ্নের উত্তরে আমি শুধু বললাম- না। তিনি আবার বললেন, যদি তাই হয় তাহলে এই মুহূর্তে আমার বিবেচনায় গোটা বাংলাদেশের আর কোথাও শান্তির খোঁজ পাওয়া না গেলেও বায়তুশ শরফে গেলে তা পাওয়া যাবে। তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়ে বললেন- সামনের বৃহস্পতিবার আছরের নামাযের পূর্বে বায়তুশ শরফ যাবেন কিংবা মাগরিবের নামায সেখানে আদায় করতে চেষ্টা করবেন। এশার সালাতও জামাতের সাথে আদায় করে তারপর ফিরে যাবেন বাসায় এবং পরদিন জুমাবারে সেখানে জুমআর সালাত আদায় করে আখেরী মুনাজাতে শরীক হবেন ইত্যাদি। তিনি বারবার বলেছিলেন যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুও এতটা শান্তিতে নেই যা বায়তুশ শরফে বিরাজ করছে। আপনি অবশ্যই সেখানে যাবেন। সত্যিকথা বলতে কি আমি তখন সংস্কৃতি বলতে গান-বাজনা ইত্যাদিকেই বুঝতাম। আর ভালো গাইতাম বলে সেই সংস্কৃতির অঙ্গনেই দিনরাত পড়ে থাকতাম। আর এতেও মন সন্তুষ্ট না হলে আমার মধ্যে তখন এক রকম হতাশা জন্ম নিচ্ছিল। তবে আমার বিবেচনায় আমার চেয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক বন্ধুর হিতোপদেশে তাৎক্ষণিকভাবে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করলেও সেদিন সম্ভবতঃ মঙ্গলবার সারারাত তাঁর পরামর্শ নিয়ে ভেবেছি। রাতে ভালো ঘুম না হওয়ায় এপাশ ওপাশ করে রাত কাটিয়েছি। তবে কি আশ্চর্য। বৃহস্পতিবার আসতেই দুরু দুরু বুকে শান্তির পরশ লাভের আশায় আমার বাসা টাইগারপাস থেকে পায়ে হেঁটে দেওয়ানহাট হয়ে ধনিয়ালাপাড়ার মসজিদ বায়তুশ শরফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই এবং আসরের অনেক আগেই বায়তুশ শরফে পৌঁছি। তখনকার বায়তুশ শরফ আর এখনকার বায়তুশ শরফের মত ছিল না। ঐ সময়ে বায়তুশ শরফ মসজিদের নির্মাণ কাজ চলছে। হুজুর তখন বর্তমান মাসিক দ্বীন দুনিয়া দপ্তর হুজরাখানা হিসেবে ব্যবহার করতেন।

মসজিদ বায়তুশ শরফের সামনে পাটের চট ও কিছু মাদুর বিছানো থাকতো। আর থাকতো কাঠের হাতওয়ালা ২/৩ খানা চেয়ার। কিছুক্ষণ পর দেখি একজন আলেম অত্যন্ত সাদামাটা পোষাকে এসে একখানা চেয়ারে বসলেন। তাঁর সামনে উপস্থিত জনা ১৫ মুসল্লীর সাথে আমি নবাগত। তাঁকে দেখার সাথে সাথে আমার হৃদয়ে কেমন যেন এক আবেগ সৃষ্টি হলো। আমি এক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তিনিও তা অবলোকন করলেন। তবে আমার সঙ্গে কোন কথা বললেন না। আসরের আযান হলো মুয়াজ্জিনের সুললিত কণ্ঠে। সেই মুয়াজ্জিনকে আমি পরে অনেক খুঁজেছি। জানতে পেরেছি সে রুটি রুযীর সন্ধানে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমিয়েছে। আসরের পর অন্যান্য বেশকিছু মুসল্লীর সাথে আমি হুজরাখানায় ঢুকলাম। বসলাম বর্তমান মাসিক দ্বীন দুনিয়ার নির্বাহী সম্পাদক জনাব মুহাম্মদ জাফর উল্লাহর টেবিলের ডান দিকের কোণায়। হুজরাখানায় ঢুকে হুজুরের প্রতি অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকলাম। আর অনুভব করলাম আমার মাঝে যে হতাশার বান ডেকেছে তা যেন জিমিত হওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ এসেছে। আমি অনেকটা মোহে আচ্ছন্ন হলাম। এই সময়ে ভাই আবদুল গাফফার সাহেব হুজুরের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। কিছুক্ষণ পর বাইর থেকে খাঁচাভর্তি সেমাই পিঠা এলে হুজুরের নির্দেশে উপস্থিত সকলের মধ্যে আবদুল গাফফার ভাই বিতরণ করছিলেন। এক পর্যায়ে হুজুর আস্তে করে আমার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে আবদুল গাফফার ভাইকে বললেন, ‘ঐ ছাত্রকে বেশি করে নাস্তা দাও। মনে হয় তিনি আজই এসেছেন- তাই না।’ হুজুরের কথায় আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত জবাব দিলাম ‘জ্বি হুজুর। আমি নবাগত।’ তারপর হুজুর তাঁর স্বভাবসুলভ আচরণ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার নাম কি? আমার পিতার নাম কি, আমার জন্মস্থান কোথায় ইত্যাদি জিজ্ঞাসা। প্রশ্নের জবাব দিলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। আমি মোহগ্রন্থ হয়ে বসে আছি। কিছুক্ষণ পর হুজুরের লেখা রফিকুস সালেকীন ও অন্য একটি বই উপস্থিতির মাঝে হাদিয়ার বিনিময়ে বিতরণ করা হয়েছে। হুজুর পুনরায় আবদুল গাফফার ভাইকে আমার হাতে বই দু’টি দেয়ার জন্য বললেন। আমি বই দু’টি পেয়ে পকেটে হাত দিয়ে হাতরিয়ে দেখলাম কোন টাকা নেই। আমি বিমর্ষ হয়ে গেলাম। হুজুর তা লক্ষ্য করলেন এবং বললেন, ‘আপনার টাকা দিতে হবে না।’ আমি তন্ময় হয়ে হুজুরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর হুজুর সকলকে এস্তেগফার পড়তে বললেন এবং প্রত্যেকে গায়ে গায়ে মিশে বসবার এবং হুজুরের মাথার হাজী রুমালখানা বাড়িয়ে দিয়ে এতে হাত রাখতে নির্দেশ দিলে হুজুর আমাদের সকলকে বায়আত করালেন। আমার বন্ধুর পরামর্শ মত সেদিন মাগরিবের নামায আদায় ও যিক্র শরীক হলাম। রাতে বাতি নিভিয়ে আলো আঁধারিতে যিক্র। ‘আল্লাহু হাজেরী, আল্লাহু নাযেরী, আল্লাহু মায়ী অথবা ইলাহি আন্তা মাকসুদী, ওয়ারেজাউকা মাতলুবী, তারাকতুদ দুনিয়া ওয়ামা ফিহা’ আমার দিলে নতুন চমক সৃষ্টি করলো। মনে হলো, ঘোর অমানিশার অন্ধকারে মহান রাব্বুল আলামীন যেন আমি গুনাহগারের প্রতি দয়া করেছেন। আমি যেন হারানো পথ খুঁজে পেলাম। পরদিন জুমাবার সকলের আগে মসজিদ বায়তুশ শরফে হাজির হয়ে হুজুর যেখানে নামায পড়েন সেই মসল্লাটির প্রতি লক্ষ্য করে এর কাছাকাছি বসলাম। আর সাথে সাথে হুজুর প্রদত্ত বই দু’টি এবং কাদেরিয়া তরীকার অজিফা পাঠে মুগ্ধ হলাম। যথারীতি জুমআর নামাযের আযান হলো, জুমআ আদায় করে হুজুরের সংক্ষিপ্ত বয়ান। বায়আত প্রদান এবং সুমধুর কন্ঠে ও কান্নাভেজা চোখের মুনাজাত শেষে অসংখ্য মুসল্লী সকলেই হুজুরের সঙ্গে মুসাফাহা করছেন আর মসজিদ উন্নয়নের জন্য অকাতরে দান হুজুরের হাতে রাখছেন। মুহর্তেই হাজার হাজার টাকার স্তূপ হয়ে গেল। একপর্যায়ে আমি হাত রাখলাম হুজুরের হাতে। আমার ইচ্ছা হুজুরের হাতে আমি নালায়েকের হাতটি অনেকক্ষণ থাক। কিন্তু অত্যন্ত ব্যস্ত হুজুর আমাকে একটি টাকা হাতে দিয়ে বিদায় দিলেন। আমি বসে রইলাম। সকলে চলে যাবার পর আমার অন্তরের সকল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়ে হুজুরকে কদমবুছি করলাম এবং ঐদিনের মত বিদায় নিলাম, এমনিভাবে পরপর কয়েক সপ্তাহের বৃহস্পতি, শুক্রবার নিয়মিত বায়তুশ শরফে উপস্থিত হয়ে যিক্র আজকারে শরীক হলাম। প্রায় মাসখানিক পর আমার বন্ধুর সাথে দস্তগীর চৌধুরীর কদমতলীর বাড়িতে দেখা হলে তিনি আমার খোঁজ খবর নেবার এক পর্যায়ে জিজ্ঞাসা করলেন- এতদিন আমি কোথায় ছিলাম? বায়তুশ শরফ গিয়েছিলাম কিনা জানতে চেয়ে পরক্ষণেই বললেন-আপনার চেহারায় প্রশান্তি লক্ষ্য করছি। নিশ্চয়ই আপনি বায়তুশ শরফ গিয়েছিলেন- তাই না? এবার বলুন কেমন লাগলো?

আমি বললাম, অপূর্ব। বললাম, আমি আবার নতুন জীবন লাভ করেছি। আল্লাহ্ আমার প্রতি দয়া করেছেন। আমার জীবনে বহু দরবারে গিয়েছি কিন্তু এমন কল্লি ছোঁয়া আর কোথাও পাইনি। সত্যিই হুজুর কেবলার সান্নিধ্য আমাকে নব জীবন দান করেছে। সেই থেকে আস্তে আস্তে আমি বিপথ হতে ফিরে আসি এবং হুজুরের ছোহবতের আশায় নিয়মিত বায়তুশ শরফে হাজিরা দিতে থাকি।


অধ্যাপক এস. এম. সালাহ উদ্দীন

উপ-পরিচালক, দাওয়াত বিভাগ,

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *