পরার্থপরতা ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান গুণ

চট্টগ্রামবাসীর গৌরব, আলেম সমাজের মধ্যমণি, জ্ঞান বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক, দ্বীন দরদী, আদর্শ সমাজসেবী, আধ্যাত্মিক শিক্ষক, ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের অগ্নিপুরুষ, শায়খুত ত্বরীকত হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব শাহ্ সূফী মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ. এর মৃত্যু যেন গোটা চট্টগ্রামবাসীর কাছ থেকে তাদের পরম মানুষটি কেড়ে নিল। যাঁর মহান ব্যক্তিত্ব তাদেরকে দীর্ঘদিন উষ্ণ ভালোবাসা ও একটি স্নেহপরশ শীতল ছায়ার আশ্রয়ে পরিবেষ্টিত করে রেখেছিল। হঠাৎ করে তাঁর তিরোধান এ ভাগ্যাহতরা কিভাবে সহ্য করবে তা ভাবতেই অবাক লাগে। মরহুমের যে ক’টি গুণ আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল সেগুলো হলো তাঁর সুবিশাল অন্তর, পরার্থপরতা, সমাজসেবায় আত্মনিবেদন, সত্যের পক্ষাবলম্বন ও অকুতোভয় সাহসিকতা। ভবিষ্যৎকে যথাযথ মূল্যায়নের জন্য যে প্রখর দৃষ্টি শক্তি আল্লাহ্ পাক তাঁকে দান করেছিলেন তা-ই মূলতঃ আন্‌জুমনে ইত্তেহাদের উত্তরোত্তর উন্নতির পেছনে প্রধানতম ভূমিকা পালন করেছে। দেশের কয়েকটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট। তন্মধ্যে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের গোড়াপত্তন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এখানে মরহুমের কর্মময় জীবন আলোচনা আমার উদ্দেশ্য নয়। কারণ, তাঁর জন্য স্বতন্ত্র একটি তাৎক্ষণিক অনুভূতি প্রকাশ করাই আমার উদ্দেশ্য। দেশের বাইরে অবস্থান করার দরুন জানাযায় শরীক হতে না পারা আমার জন্য একটি দুর্ভাগ্যই বটে। মরহুমের মৃত্যুতে কবির ঐ কথাই যেন মনে পড়ে।

‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন

মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’

একটি ঘটনার উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারছিনা, যা মরহুমের প্রগতিশীল চিন্তাশীলতার একটি উত্তম উদাহরণ। একদা আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগামের সিন্ডিকেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক চলছিল। বিষয়টি ছিল “আই আই ইউ সি”তে অমুসলিম ছাত্রদের ভর্তি করানো হবে কিনা?” এর বিপক্ষে ছিলেন তাবৎ মুরব্বী ও প্রবীণ সদস্যবৃন্দ এবং পক্ষে ছিলাম আমরা মুষ্টিমেয় ক’জন সদস্য যারা প্রগতিশীল চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী। উক্ত সভায় সভাপতির আসন অলংকৃত করেছিলেন মরহুম শাহ্ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ.। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল শেষতক সিদ্ধান্ত আমাদের বিপক্ষেই যাবে। তবুও আমি সাহস করে আমাদের অবস্থানের পক্ষে পবিত্র আল কুরআনের একটি আয়াত পেশ করলাম, যা হচ্ছে নিম্নরূপঃ “যদি মুশরিকদের কোন ব্যক্তি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে করে সে আল্লাহর বাণী শ্রবণ করার সুযোগ পায়। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছিয়ে দাও।” (৯:৬)।

যেহেতু এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোন অমুসলিম ছাত্রের আবেদন করা আমাদের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করার নামান্তর তাই আমরা তাদেরকে শুধু ধর্মীয় কারণে বাদ দিতে পারি না বরং এটা দাওয়াতের একটি বড় ক্ষেত্র বটে।

মরহুম মাওলানা সভাপতির আসনে বসে নীরবে আমাদের বিতর্ক প্রত্যক্ষ করছিলেন। শেষতক এক পর্যায়ে তিনি মুখ খুললেন এবং একটু স্মিথ হাসি দিয়ে সিদ্ধান্ত দিলেন যে, এখানে অমুসলিম শিক্ষার্থীদেরকে ভর্তির সুযোগ দেয়ায় বাঞ্ছনীয়। একজন পীর সাহেবের এহেন প্রগতিশীল সিদ্ধান্তে আমরা শুধু যে পুলকিত হলাম তা নয়; বরং তাঁর চিন্তার প্রশস্ততা দেখে অভিভূতও হলাম। আজ আইআইইউসিতে শত শত অমুসলিম মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করে নিজের জীবন গঠন করছে।


-প্রফেসর ড. আবু বকর রফীক

প্রো-ভাইস চেন্সেলর, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এবং সদস্য

সচিব, শরীয়াহ্ সুপারভাইজরি কমিটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ ঢাকা।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *