তিনি জীবনে কখনো কারো বিরুদ্ধে ফতোয়া দেননি

দীর্ঘ হজ্বের সফরে আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি, আপনারা আমার কণ্ঠস্বর শুনেই অসুস্থতার কথা নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছেন। তবুও আল্লাহ্র ওলীর মহব্বতে তাঁর প্রতি সম্মান জানানোর জন্য হজ্বের সফর শেষে প্রথম প্রোগ্রাম হিসেবে অসুস্থতা নিয়েই আপনাদের সাথে এ বিশাল নাগরিক স্মরণসভায় উপস্থিত হতে পেরে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। হুজুরকে হারিয়ে আমি অন্তরে এমন আঘাত পেয়েছি যা প্রকাশ করার ভাষা আমার নেই। হুজুর যখন ইন্তেকাল করেন তখন আমি হজ্বের সফরে মদীনা মুনাওয়ারায় হুজুরের কনিষ্ঠ জামাতা মর্তুজার মেহমান হমান ছিলাম। ২৫শে মার্চ মর্তুজার কাছ থেকে যখন হুজুরের আকস্মিক ইন্তেকালের খবর শুনি তখন প্রিয়জন হারানোর বেদনায় শোকে নির্বাক হয়ে যাই। হুজুরের জামাই মর্তুজা হুজুরের ইন্তেকালে শিশুরমত কেঁদেছে।

শ্বশুরকে হারিয়ে জামাই এমন উতলা হয়ে কাঁদতে এর আগে আমি আর কখনো দেখিনি। মর্তুজা আমাকে বলেছে, মাওলানা! আমার বাপ-মা চৌদ্দগোষ্ঠী মারা গেলেও আমি এতো বড় আঘাত পেতাম না, হুজুরের ইন্তেকালে আমার ভেতরটা ভেঙ্গে-চুরে একাকার হয়ে গেছে।

১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ন’বছর ইত্তেহাদুল উম্মাত্র দায়িত্ব পালনকালে হযরত মাওলানা আবদুল জব্বার রহ. এর সাহচর্যে থেকে তাঁকে একান্ত কাছ থেকে দেখার ও জানার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমরা দু’জনে সে বছরগুলোতে ইত্তেহাদুল উম্মাহ্ দাওয়াত নিয়ে আলেম-ওলামাদের এক প্লাটফরমে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করেছি। এ দীর্ঘদিনের সাহচর্যে আমি উপলব্ধি করেছি তিনি ছিলেন সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে, উদার প্রাণ ও মহৎ হৃদয়ের অধিকারী কামেল ওলী। তিনি জীবনে কখনো কারো বিরুদ্ধে ফতোয়া দেননি। বরং সব সময় দল-মত নির্বিশেষে সকলকে একই মঞ্চে, একই শামিয়ানার নীচে একত্রিত করার প্রয়াসী ছিলেন।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মোবারক যখন তাঁর সাথীদের মাঝে উপস্থিত হয়েছিলেন তখন তাঁর সাথীরা বলেছিলেন, আমরা যদি হই আকাশের তারকা, তবে আব্দুল্লাহ্ বিন মোবারক সে আকাশের পূর্ণিমার চন্দ্র সদৃশ। আমার মনে হয় বাংলাদেশের সকল আলেম-ওলামা, পীর মাশায়েখ বায়তুশ শরফের মরহুম পীর ছাহেব কেবলার কর্মবহল বর্ণাঢ্য জীবন ও ব্যক্তিতের সামনে তারকা সদৃশ আর তিনি সে আকাশে চতুর্দশী পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো দীপ্তিমান, প্রোজ্জ্বল। তাঁকে হারিয়ে ইসলামের প্রবেশদ্বার, বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি এ চট্টগ্রাম তথা সারা বাংলাদেশ নিষ্প্রাণ, নিষ্প্রদীপ হয়ে গেছে। আমি জানিনা আমাদের জাতীয় জীবনের দুর্যোগ মুহূর্তে তাঁর মতো কে আর আলোর মশাল হয়ে জাতিকে হেদায়াতের পথে নিয়ে যাবেন।

তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী যা আমাদের সমাজে খুবই দুর্লভ। শেখুল হাদিস, ওস্তাজুল আছাতেজা, সাহিত্যিক, গবেষক, দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, সমাজ সংস্কারক, আলেমে দ্বীন, দুর্দিনে জাতির অভিভাবকসহ আরো অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। পীর মুরীদির গতানুগতিক ধারা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে তাসাউফ ও তরীক্বতের প্রকৃত ধারা তিনি মানুষের সামনে যোগ্যতার সাথে পেশ করেছিলেন। তিনি ছিলেন আজীবন পর্ণকুটিরবাসী। আমি বাংলাদেশের অনেক পীর সম্পর্কে জানি, যারা মুরিদদের পয়সায় ঢাকায় বহুতল বিশিষ্ট ভবন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নিজেদের ভাগ্য গড়ার জন্য অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু মরহুম পীর ছাহেব ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী চরিত্রের অধিকারী। আমার স্মরণে পড়ে, ইত্তেহাদুল উম্মাহর দায়িত্ব পালনকালে একবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখতে পাই, অত্যন্ত সাধারণ মানের মাটির ঘরে বাস করেন তিনি। দেখলে বিশ্বাসই হবে না তাঁরই উদ্যোগে সারাদেশে অসংখ্য সুরম্য ইসলামী মারকাজ গড়ে উঠেছে। দ্বীনের জন্য নিবেদিত প্রাণ এ মহান ওলী জাতির জন্যই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি শুধু পীর ছিলেন না, ছিলেন সকল পীর, ওলামায়ে কেরাম, সমাজ সংস্কারকদের জন্য অনুসরণযোগ্য আদর্শ।

হুজুরের ইন্তেকালের পর ২৭শে মার্চ জুমাবার মসজিদে নববীতে সালাতুল ফজর আদায়ের পর আমার চোখে সামান্য তন্দ্রা নেমে আসে। হঠাৎ আমি দেখলাম- একটি সমাবেশে হুজুর উপস্থিত। মাথায় রঙিন টুপি। কাঁধের উপর ঝোলানো সে লাল চাদর। আমি চিন্তা করলাম হুজুর তো ইন্তেকাল করেছেন। তিনি এখানে এলেন কীভাবে? আমার চিন্তার মাঝখানেই হুজুর হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। আমরা উপস্থিত সকলেই তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়ালাম। তিনি তাঁর নরোম দু’টো হাত সামনের দিকে বিস্তার করে দিলেন। আমিও আমার হাত দু’টি প্রসারিত করে দিয়ে ছোট্ট শিশুর মতো তাঁর বুকের ভেতর ঢুকে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনি আমাকে ভুলে যাবেন না। আপনার সাথে আমার দেখা হবে। এরপর আমার তন্দ্রা টুটে গেল।

মরহুম পীর ছাহেবের প্রতি আপনাদের অফুরন্ত শ্রদ্ধা ও ভালবাসা রয়েছে। আমি মনে করি আপনাদের এ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা তখনই সার্থক হবে যদি আপনারা আমরা সকলে মিলে হুজুরের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো সজীব ও সচল রাখতে পারি। আমাদের কোনরূপ কোন্দল, হিংসা, সংকীর্ণতার কারণে অথবা অর্থিক অসঙ্গতির অজুহাতে যেন একটি প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে না যায় সে দিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের কলিজার চেয়ে বেশি মুহব্বত করতে হবে হুজুরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তবেই হুজুরের রূহানী দোআ লাভে আমরা ধন্য হবো। ইনশাআল্লাহ্।


-আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এমপি

আন্তর্জাতিক খ্যাতিমসম্পন্ন মুফাসসিরে কুরআন


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *