জাহেরি ও বাতেনি ইলমের পরিচয়

চুনতী বার্ষিক সীরাতুন্নবী মাহফিলে আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার

৯-এর প্রদত্ত বয়ান। বয়ানটি বাংলাদেশ বিমানের সাবেক জি. এম. (মার্কেটিং) মরহুম ইউসুফ আলী সাহেবের কাছে সংরক্ষিত ভিডিও ক্যাসেট থেকে অনুলিখন করেন তাঁর দৌহিত্র হাফেজ আবু নোমান মোহাম্মদ ছফি উল্লাহ। সম্পাদক

بِسْمِ اللَّهِ وَالْحَمْدُ للهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُوْلِهِ اللَّهِ ، أَمَّا بَعْدُ!

উপস্থিত ইসলাম প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহ তাআলার শোকরিয়া আদায় করছি, তিনি আমাদেরকে সীরাতুন্নবী মাহফিলের শেষ দিনে শরিক থাকার এবং শাহ সাহেব কেবলা-এর যিয়ারতের সুযোগ দান করেছেন। আল-হামদু লিল্লাহ। আমাকে এ মাহফিলে ওয়াজ করার জন্য বিষয় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সময়ের অভাবে বিষয়ভিত্তিক কিতাব দেখার সুযোগ হয়নি। কত আগ্রহ করে আলমারির তাক থেকে কিতাব নামিয়ে বালিশের পাশে রাখি, কিন্তু আফসোস! সময়ের অভাবে কিতাব আর দেখা হয় না।

তাছাড়া বিষয়ভিত্তিক ওয়াজ করার অভ্যাসও আমার নেই। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে ওয়াজ শুরু করি, আশে-পাশের ওলামায়ে কেরামের দোয়ার বরকতে আল্লাহ তাআলা যা কিছু আমার মুখ দিয়ে বলান তা বলি।

আল্লাহ মানবজাতিকে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। আমরা বাবা হযরত আদম-এর সন্তান। একসময় আমরা এ দুনিয়ায় ছিলাম না। আল্লাহ তাআলা কুরআনুল করীমে ইরশাদ করেন,

هَلْ أَتَى عَلَى الْإِنْسَانِ حِينٌ مِّنَ الدَّهْرِ لَمْ يَكُنْ شَيْئًا مَنْ كُورًا

‘কালপ্রবাহে মানুষের ওপর তো এমন এক সময় এসেছিল, যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না।”

আল্লাহ রব্বুল আলামীন বাবা হযরত আদম-কে সৃষ্টি করে হিকমতের সাথে কৌশলে এ দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তাঁকে বানিয়েছেন চারটি জিনিস মিশ্রিত করে, আগুন, পানি, মাটি ও বাতাস। এ চারটি বস্তুর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা হযরত আদম-এর কায়া বা শরীর সৃষ্টি করেছেন। তাঁর হুকুমে ফেরেশতাগণ এ চার বস্তু দ্বারা হযরত আদম এ-এর শরীর তৈরি করেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর শরীরের মধ্যে রুহ প্রবেশ করিয়েছেন। রুহ এ দেশের নয়, রুহ হলো বিদেশি। অর্থাৎ আমরা এখানে ছিলাম না, আমাদের বাবা হযরত আদম তিনি জান্নাতে ছিলেন। তাঁর ঠিকানা যেহেতু জান্নাত, তাই আমাদের ঠিকানাও জান্নাত।

রুহের জগত হলো আলমে আরওয়াহ। আরওয়াহ হলো রুহের বহুবচন।

আল্লাহ তাআলা সেখান থেকে রুহ এনে হযরত আদম-এর শরীরে ঢেলে দিয়েছেন। হযরত আদম-কে সৃষ্টি করার পর কিয়ামত পর্যন্ত যত মানবজাতি এ পৃথিবীতে আসবে সবাইকে তাঁর পিঠের মধ্যে আল্লাহ তাআলা রেখে দিয়েছেন। এখানে আমাদেরকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত যা আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন, ততদিন পর্যন্ত বসবাস করতে হবে। আল্লাহ তাআলা মানবজাতির খাওয়া-পরার ব্যবস্থাও এখানে ঠিক করে রেখেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,

وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَ مَتَاعٌ إِلَى حِينٍ

‘পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল।১

এখন আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে আল্লাহ হযরত আদম-কে তাঁর সন্তান-সন্ততিসহ এখানে পাঠানোর উদ্দেশ্য কি? কেন তাঁকে এখানে পাঠিয়েছেন? তাঁকে পাঠানোর উদ্দেশ্য বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

‘আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্য যে, তারা আমার ইবাদত করবে।’২

আল্লাহ তাআলা বহু মাখলুক সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু এ দুই মাখলুক অর্থাৎ জিন ও ইনসান সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তাআলার ওহদানিয়াত তথা তাঁর একত্ববাদ স্বীকার করে তাঁর বন্দেগি করার জন্য। উল্লিখিত আয়াতে করীমায়

ليعبدون-এর তাফসীর করা হয়েছে لِيُوحُدُون ও لِيَعْرفون অর্থাৎ তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়া, তাঁর পরিচয় লাভ করা।’

তাই আল্লাহ তাআলাকে চিনে, তাঁর পরিচয় লাভ করে, তাঁর হুকুম-আহকাম মেনে চলতে হবে। আর এটিই হলো তাঁর বন্দেগি করা। যেহেতু আমরা তাঁকে وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ )ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু) হিসেবে মেনে নিয়েছি, তাই তাঁর ইবাদত ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করা যাবে না। এগুলো কিছু মোটা মোটা দাগের কথা যা আপনাদের সম্মুখে আমি উল্লেখ করে যাচ্ছি।

আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে যে একলক্ষ ২৪ হাজার আম্বিয়া পাঠিয়েছিলেন তাঁদের দায়িত্ব কী ছিল? তাঁরা আল্লাহর হুকুমে নুবুওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব নিয়ে দুনিয়াবাসীর কাছে এসেছিলেন, এ আদম-সন্তানের কাছে এসেছিলেন। যে যুগে যে নবী এসেছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকে আল্লাহ যতটুকু হুকুম দিয়েছিলেন ততটুকু হুকুম মানবজাতির কাছে পৌঁছিয়েছিলেন। প্রত্যেক নবীর আহ্বান বা দাওয়াত ছিল আল্লাহর ইবাদতের প্রতি, যা আল্লাহ তাআলা কুরআনুল করীমে উল্লেখ করেন,

يُقَوْمِ اعْبُدُوا الله

‘হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর।”

এরকম হযরত আইয়ুব, হযরত শোয়াইব, হযরত ইউনুস প্রত্যেক নবী দাওয়াত দিয়েছিলেন যে, হে আমার জাতি! তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই। আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য এ পৃথিবী বসবাসের উপযোগী করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,

امَنْ جَعَلَ الْأَرْضَ قَرَارًا

‘কে পৃথিবীকে করেছেন আবাস উপযোগী।”

এই যে জমিনকে নীরব-নিস্তব্দ করে রেখেছেন তোমাদের খেদমতের জন্য। শেখ সা’দী ফরমান,

شرط انصاف نباشد که تو فرمان نبری

‘তোমরা যদি খোদার আদেশ-নিষেধ না মান, তাহলে বেইনসাফি হবে।”

সম্মানিত ভাইয়েরা! পানির স্বভাব বা গতি হলো সবসময় নিচের দিকে প্রবাহিত হওয়া। পানি যেখানেই রাখা হোক না কেন, সুযোগ পেলেই নিচের দিকে গড়িয়ে যায়। তদ্রূপ মানুষের গতি ও সম্পর্ক হচ্ছে তার খোদার দিকে, তার সৃষ্টিকর্তার দিকে। কীভাবে তাঁকে পাওয়া যাবে, কোন পথে গেলে তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে। আম্বিয়ায়ে কেরাম এসেছেন মানুষকে তার রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে দেওয়ার জন্য। তাঁরা আসার পূর্বেও মানুষ তাদের রবের ইবাদত করত। মক্কার মুশরিকরাও কাবার তাওয়াফ করত, কুরবানি করত, হজ করত। তবে সেগুলো করত তাদের নিজেদের মনগড়া রীতিমত, নিজেদের বানানো নিয়ম অনুযায়ী। তারা এগুলো কেন করত? আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى ‘আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’২

কাফির-মুশরিকরাও নিজেদের ইচ্ছামত, নিজেদের মনগড়া ইবাদত করত তাদের খোদাকে পাওয়ার জন্য, খালেকের সন্তুষ্টির জন্য, খালেকের রেজামন্দি হাসিল করার জন্য। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়ায়ে কেরাম-কে কেন পাঠিয়েছেন? তিনি পাঠিয়েছেন এই কারণে যে, বান্দা আমাকে পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে, কিন্তু সে সঠিক তরীকা জানে না, তার কাছে সহীহ পন্থা নেই। তাদেরকে পথ দেখানোর জন্য, যাতে করে তাদের রবের দিকে যেতে পারে, যে পথে গেলে রবের রেজামন্দি হাসিল করা যাবে, যে পথে গেলে তাঁকে পাওয়া যাবে, কীভাবে বন্দেগি করলে খোদার নৈকট্য লাভ করা যাবে, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে, এগুলো শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে আম্বিয়ায়ে কেরাম-কে পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের কাজ হলো বান্দাদেরকে তাদের রবকে পাওয়ার পথ দেখিয়ে দেওয়া, তাদেরকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেওয়া।

আমাদের নবী করীম হলেন সাইয়েদুল আম্বিয়া তথা নবীগণের সরদার বা নেতা। তাঁর দীন হলো পরিপূর্ণ দীন। অন্যান্য নবীগণের দীন ছিল সীমাবদ্ধ বা আংশিক। তাঁদের দায়িত্বও ছিল নির্দিষ্ট কওম বা জাতির প্রতি।

কিন্তু আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ-এর দীন হলো পরিপূর্ণ দীন। মানব-জীবনের সবকিছুর সমাধানের জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর ত্রিশপারা কুরআনুল করীম নাযিল করেছেন। তাঁর দাওয়াত জিন-ইনসান সকলের জন্য, সমস্ত পৃথিবীর জন্য, সমস্ত দুনিয়াবাসীর জন্য, সর্বযুগের জন্য, সর্বকালের জন্য। তাঁর হিদায়েত হলো গোটা মানব-জীবনের জন্য হিদায়েত। ইহকাল ও পরকালের শান্তির জন্য। নবী পাঠানোর কারণ বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

رَبَّنَا وَابْعَثُ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَبَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ . ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আর আপনি তাদের মধ্য হতে তাদের নিকট একজন রাসুল পাঠান, যিনি তাদের নিকট আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন।১

মুফাসসিরীনে কেরাম ‘হেকমত’ শব্দের অনেক অর্থ করেছেন। কেননা এর অর্থ ব্যাপক। কেউ বলেছেন, হেকমত অর্থ হলো হাদীস শরীফ। অন্য কেউ বলেছেন, হেকমত অর্থ হলো কুরআন বোঝার যোগ্যতা। আবার কারও কারও মতে হেকমত হলো কুরআনুল করীমের আসরার তথা গোপন তথ্য, যেগুলো বাহ্যিক কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায় না। সেগুলো বোঝার ক্ষমতা হলো হেকমত।

এছাড়া হেকমত অর্থ সুকৌশলও হতে পারে, অর্থাৎ এমন এক পন্থা, যে পন্থার দ্বারা মানুষকে আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করা যায়, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করা যায়। তাই বোঝা যায় নবী করীম-কে আল্লাহ তাআলা পাঠিয়েছেন জাহেরি ও বাতেনি ইলম শিক্ষা দেওয়ার জন্য। জাহেরি ইলম হলো নামাজে, রোজা, হজ, যাকাতসহ যত আহকাম আছে সবগুলো। শরীয়তের অধিকাংশ ফতওয়া দেওয়া হয় জাহেরি আমলের ওপর ভিত্তি করে। বাতেনি ইলম কুরআন-হাদীসের বাইরে নয়, তবে প্রকাশ্য দেখা যায় না।

জাহেরি ইলমের ফল হলো বাতেনি ইলম। যেমন- নামাজ আদায় করলে, কুরআন তিলাওয়াত করলে মানুষের ভেতরের লোভ-লালসা, অহংকার, আত্মগৌরব, রিয়া বা লোক দেখানো, দীর্ঘ আশা ইত্যাদি কুস্বভাব পরিবর্তিত হয়ে সুস্বভাব যেমন- সবর, শোকর, কানায়াত তথা অল্পেতুষ্টি, রাগ হজম করার ক্ষমতা ইত্যাদিতে স্থান লাভ করে।

নবী করীম জাহেরি ও বাতেনি সবকিছু শিক্ষা দিয়েছেন। শরীয়ত, তরীকত, মা’রিফত, হাকীকত এগুলো সবকিছু নবী করীম শিক্ষা দিয়েছেন। এগুলোর কেন্দ্র হলো মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ। তাঁর কাছ থেকে খোলাফায়ে রাশিদীন এ শিক্ষা পেয়েছেন। যদিও নবী করীম-এর তুলনায় তাঁদের ইলম কম ছিল। এভাবে আস্তে আস্তে ইলম কমতে থাকল।

কোনো কোনো বুযুর্গানে কেরাম বলেন, হযরত হুসাইন ইয়াযীদের হাতে বায়আত না হওয়ার কারণ হলো ইয়াযীদের কাছে বাতেনি ইলম ছিল না। সে আধ্যাত্মিকতা থেকে মাহরুম ছিল। হযরত হুসাইন সপরিবারে কারবালার প্রান্তরে জীবন দিয়েছিলেন তারপরও ইয়াযীদকে মেনে নেননি। তাঁর তো রাজত্বের বা ক্ষমতার কোন লোভ ছিল না। তিনি রাসুলুল্লাহ-এর নাতি, তাঁর বংশধর। শুধুমাত্র দীনের খাতিরে ইয়াযীদের বিরোধিতা করেছিলেন।

আমাদের অনেক ভাই আছেন যারা আল্লাহর কালামের জাহেরি অর্থের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন কিন্তু বাতেনি অর্থ তারা মানতে বা বিশ্বাস করতে চান না। তারা বলে থাকেন এগুলো কোথা থেকে এসেছে? আমরা বলি, এগুলো তো কুরআন-হাদীস থেকে এসেছে। আমরা বাতেনি অর্থ কোথায় পেয়েছি? আমরা বাতেনি অর্থ পেয়েছি নবী করীম-এর হাদীস থেকে। তিনি ইরশাদ করেন,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ: «أُنْزِلَ الْقُرْآنُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ، لِكُلِّ آيَةٍ مِّنْهَا ظَهْرٌ وَبَطْنُ».

‘আল-কুরআনকে সাতটি ভাষায় নাযিল করা হয়েছে, প্রত্যেকটি আয়াতের বাহির এবং ভেতর রয়েছে।”

একটা পিঠ আছে আরেকটা পেট আছে। পিঠ মানে জাহেরি অর্থ আর পেট মানে বাতেনি অর্থ। যার উদাহরণ হলো আল্লাহ তাআলা কুরআনুল করীমে ইরশাদ করেন,

لَا يَمَسُّةَ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ

‘পবিত্রতা ব্যতীত কেউ তা স্পর্শ করে না।’ আয়াতে করীমার জাহেরি অর্থ হলো নাপাক অবস্থায় বা অযু ছাড়া কেউ যেন কুরআনুল করীম স্পর্শ না করে। যারা বাতেনি ইলম নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেন সেসব বয়র্গানে দীন ও সুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, জাহেরি অর্থ তো ঠিক আছে। কিন্তু আমরা বলি, যে ব্যক্তি তাকাব্বরি বা অহংকার, বড়াই করা, রিয়া বা লোকদেখানো এসব দুনিয়াবি মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত নয়, সে কুরআনুল করীমের সঠিক অর্থ বুঝতে পারবে না। আমরা অযু-গোসল কেন করি? পেশাব-পায়খানা ইত্যাদি নাপাকি থেকে পবিত্রতা হাসিল করার জন্য। এগুলো থেকে পবিত্র না হলে কুরআনুল করীম স্পর্শ করা যাবে না।

সুফিয়ায়ে কেরাম আরও বলেন, এগুলো তো জাহেরি বা বাহ্যিক অপবিত্রতা। কিন্তু শরীরের বাতেনি বা অভ্যন্তরীণ যে অপবিত্রতা রয়েছে যেমন-অহংকার, লোভ-লালসা, পরনিন্দা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি নিন্দনীয় অভ্যাস থেকে পবিত্রতা হাসিল না করলে কুরআনুল করীম বোঝা সম্ভব নয়। তাই কুরআনুল করীম বুঝতে হলে এ সমস্ত বাতেনি অপবিত্রতা থেকে মুক্ত থাকতে হবে। মাওলানা জালালউদ্দীন রুমীএ যিনি আধ্যাত্মিক জগতের নক্ষত্র ও গবেষক, তিনি বলেন, معانی قرآن از قرآن بجو ہو ور نه یابی از اهل دل بیجو

‘কুরআনের ইলম কুরআন দ্বারা নিজে বুঝতে পারলে বুঝে নাও, আর না পারলে যাদের মধ্যে জাহেরি ও বাতেনি ইলমের জ্ঞান আছে তাদের কাছ থেকে কুরআন বুঝতে চেষ্টা কর।’

আমি আপনাদের সামনে কুরআনুল করীমের জাহেরি ও বাতেনি অর্থের দুয়েকটি দৃষ্টান্ত দিয়েছি, যাতে করে আপনারা চিন্তা করতে পারেন, আপনাদের জ্ঞানের চোখ খুলে যায়। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে নামাজ আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন,

“তোমরা নামাজ কায়েম কর।”

وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ

ভাইয়েরা! নামাজ আদায় করা সহজ না কঠিন? যারা নিয়মিত আদায় করে তারা বলেন সহজ। আর যারা নামাজ আদায় করে না তাদের কাছে বিশাল এক বোঝা। তারপরও যারা আদায় করেন তাদের কাছেও কষ্টকর। বিশেষ করে শীতকালে অযু করা কত কষ্টকর! আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَ إِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَشِعِينَ )

‘এবং এটা (আল্লাহর অনুগত) বিনীতগণ ব্যতীত আর সকলের নিকট নিশ্চিতভাবে কঠিন।”

যে আল্লাহ নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি স্বীকার করছেন এটা কষ্টের। কিন্তু বিনীতগণ ব্যতীত অর্থাৎ যারা অন্তর লাগিয়ে, দিল-মন লাগিয়ে খুশু-খুযুর সাথে নামাজ আদায় করে তাদের জন্য কষ্টকর নয়। সুবহান আল্লাহ। বিনয়ীগণ কারা? তাদের ব্যপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُمْ مُّلْقُوْا رَبِّهِمْ وَأَنَّهُمْ إِلَيْهِ رَاجِعُونَ )

‘যারা বিশ্বাস করে যে, তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে নিশ্চতভাবে তাদের সাক্ষাৎ হবে এবং তাঁরই দিকে তারা ফিরে যাবে।’২

এটি হচ্ছে কুরআনের জাহেরি অর্থ। বাতেনি অর্থ কী? সুফিয়ায়ে কেরামগণ বলেন, নামাজ আদায় করা বড় কঠিন, অনেক বড় বোঝা এটা সত্য কথা, কিন্তু যেসব আল্লাহর বান্দা আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে, ‘আল্লাহ আমার সামনে উপস্থিত আছেন’ একথা মনে রেখে নামাজ আদায় করে, আল্লাহর কুদরতের কদমে সিজদা দেয়, তাদের জন্য কঠিন নয়। তাদের ব্যাপারে নবী করীম সুসংবাদ দিয়ে বলেন,

الصَّلَاةُ مِعْرَاجُ الْمُؤْمِنِينَ».

‘নামাজ মুমিনদের জন্য মি’রাজ স্বরূপ।’

যে মুমিন নামাজে আল্লাহর দর্শন লাভ করে, নামাজের মধ্যে আল্লাহর সাথে মোলাকাত লাভ করার আশা করে, তার জন্য নামাজ কঠিন নয়। তার জান-মাল সবকিছু সে এ নামাজের বিনিময়ে দিয়ে ফেলতে পারে, তাদের জন্য এই নামাজ কতই না আনন্দদায়ক। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে খুশু-খুযুর সাথে নামাজ আদায় করার তওফিক দান করুন। আমীন।

গ্রন্থনায়: হাফেজ আবু নোমান মোহাম্মদ ছফিউল্লাহ


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *