হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হযরত নবী করিম সা.কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন অন্যায় দেখে সে যেন তার হাত দ্বারা প্রতিরোধ করে, তা যদি সম্ভব না হয় তখন যেন মুখে প্রতিবাদ করে যদি তাও সম্ভব না হয় সে যেন মনে মনে প্রতিবাদ করে। (ঘৃণা পোষণ করে) এটা সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। (মুসলিম)
উক্ত হাদিস শরীফটি মু’মিন হওয়ার স্তর বা মাপকাঠি বর্ণনা করেছেন। একজন পরিপূর্ণ প্রকৃত মু’মিন হওয়ার জন্য প্রথম কাজটি হল সমাজে কোন
অন্যায় পরিলক্ষিত হলে কঠোর হস্তে দমন করা। সরাসরি দমন করার শক্তি বা ক্ষমতা না থাকলে মৌখিকভাবে বাধা প্রদান করা বা তীব্র প্রতিবাদ করা হল প্রকৃত মু’মিন হওয়ার জন্য দ্বিতীয় কাজ। তাও যদি সম্ভব না হয় ব্যাকুল হওয়া, অস্থির হওয়াটা হল খাঁটি ঈমানদার হওয়ার জন্য তৃতীয় কাজ, আর এ কাজটি সবচেয়ে দুর্বল ঈমানদার হওয়ার লক্ষণ।
উক্ত হাদিস শরীফের আয়নায় বায়তুশ শরফের পীর শ্রদ্ধাভাজন মরহুম হুজুর শাহ্ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রহ.কে যদি দেখা হয় উল্লিখিত তিনটি স্তরের প্রতিটি স্তর তাঁর জীবনে পাওয়া যায়। যেমন লোহাগাড়া থানার বড়হাতিয়া ইউনিয়নে তথাকথিত ঐতিহ্যবাহী ছিদ্দিক মিয়ার বলিখেলা, গরুর লড়াইয়ের নামে ছিল একটি মদ জুয়ার আড্ডা। এ আড্ডাকে তিনি ঈমানী শক্তি ও বেলায়তের পাওয়ার দ্বারা কঠোর হস্তে দমন করে হাজার হাজার সরলমনা মুসলমানের ঈমান আক্বীদা ও চরিত্র রক্ষা করেছেন। সে অসামাজিক কার্যকলাপ, মদ জুয়ার আড্ডাকে পরিবর্তন করে সেখানে প্রতি বৎসর (১১ ও ১২) বৈশাখ তারিখে ঈমানী রূহানী মাহফিলে রূপান্তরিত করেছেন। তদ্রুপ লোহাগাড়া দরবেশ হাটস্থ হযরত শাহ্পীর আউলিয়া রহ.-এর মাজারে শিরক বিদআত মদ জুয়ার বাজারকে চিরতরে উৎখাত করে আল্লাহ্র যিকর ও ওয়াজ নসিহতের কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। বাংলার প্রখ্যাত সুফিসাধক খুলনা বাগের হাটস্থ হযরত খান জাহান আলী রহ.-এর পাক দরবারকে এক শ্রেণির মাজার পূজারী, জটাধারী গাঁজাটি, জুয়াড়ি স্বার্থান্বেষী মহল সুদীর্ঘ ছয়শত বছর যাবত শিরক বিদআত, ঢোল-তাবলা ও অসমাজিক কার্যকলাপ দ্বারা কলুষিত করে ফেলেছিল। মরহুম হুজুর রহ. এ দৃশ্য দেখে অস্থির হয়ে অসীম সাহসিকতার সাথে হেকমতপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করে কিছু হক্কানী আলেম-ওলামাকে সাথে নিয়ে সুদূর বাগের হাটে ছুটে গিয়ে সুকৌশলে আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা সমস্ত বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, ঢোল-তাবলা অসমাজিক কার্যকলাপকে বন্ধ করে চৈত্র-পূর্ণিমা মেলাকে সীরাত মাহফিল ও যিকির মাহফিলে পরিণত করে আল্লাহ্ অলির মর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করেছেন।
যেখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা ও প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিল না সেখানে মৌখিক প্রতিবাদ করে গেছেন। নিন্দাবাদ করেছেন। যেমন ফিলিস্তিনী মুসলমানদের ইহুদী হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ইরাকে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সালমান রুশদী ও তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে তীব প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন। ডাঃ আহমদ শরীফ, কবির চৌধুরীসহ আরো অনেক নাস্তিক মুরতাদের ইসলাম, কুরআন, আল্লাহ ও রসুল সম্পর্কে অবমাননাকর উক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও তীব প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছেন। ১৯৭৯ সনে রাশিয়া কর্তৃক আফগানিস্তানে, ১৯৯৪ সনে সার্বিয়া কর্তৃক চেচনিয়ায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ করেছেন এবং সে সমস্ত অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ অথবা মৌখিক প্রতিবাদ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হননি আজীবন তিনি মনে মনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং আন্তরিক ঘৃণা করেছেন। এতএব, আল্লামা আবদুল জব্বার রহ. হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর বর্ণিত হাদিসটি বাস্তব নমুনা পেশ করার জন্য আজীবন চেষ্টা করে গেছেন।
মাওলানা মুহাম্মদ সাইয়েদ নূর
বিশিষ্ট শায়ের, প্রবন্ধকার ও গীতিকার
শিক্ষক (অব:) বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা।
Leave a Reply