পীর সাহেব কর্মজীবন শুরু করার প্রাক্কালে যথারীতি তার মুর্শিদ মীর মোহাম্মদ আখতরের পরামর্শ গ্রহণ করেন। মুর্শিদ হুজুরকে লক্ষ্য করে বললেন, অর্থকডির আশা থাকলে মসজিদের ইমামতি আর জ্ঞান চর্চা করতে চাইলে মাদরাসায় শিক্ষকতা- তুমি যেটা পছন্দ সেটা করো’। যিনি ইলমে দ্বীনের জন্য এত কষ্ট করেছেন, বৈশ্বিক স্বপ্নে বিভোর, মানব কল্যাণ যার ব্রত তিনি কি করে জ্ঞানের রাজ্যে অবগাহন না করে পারবেন? তিনি মুর্শিদের উদ্দেশ্যে অভিমত প্রকাশ করলেন, “জ্ঞান চর্চার প্রাণকেন্দ্র মাদ্রাসায় শিক্ষকতাকে জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গ্রহণ করাই শ্রেয় মনে করি।” ১৯৫৩ সালে হুজুরের মুর্শিদ বাগদাদ গমন করলে চট্টগ্রামের মনসুরাবাদস্থ হাজী মসজিদের ইমাম সফরসঙ্গী হলে তার স্থলে হুজুর ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। এ মসজিদে থাকাবস্থায় জনৈক ইমাম সাহেব মারফত জানতে পারেন যে, পাঁচলাইশল্প ওয়াজেদিয়া আলিয়া মাদরাসায় একজন শিক্ষকের পদ খালি আছে। হুজুর সেখানে গিয়ে অধ্যক্ষ মাওলানা আতিকুল্লাহ্ খান সাহেবের কাছে সাক্ষাৎকার দেন। তিনি এতে সন্তুষ্ট হলে ১৯৫৪ সালে ইলমুল হাদিসের শিক্ষক হিসেবে হুজুরকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এখানে হুজুর ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এক নাগাড়ে চৌদ্দ বছর ইলম ও আমলের আলোয় আলোকিত হয়ে সোনার মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
শাহ মাওলানা আবদুল জব্বার খুব ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, সর্বস্তরের মুসলমান বিশেষত: আলিম-ওলামার ঐক্য না হলে মুসলমানদের কোন স্বার্থই অর্জিত হবে না, ইসলাম একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে না। তাই তিনি নিজস্ব অবস্থান থেকে ১৯৮১ সালে ৬ আগস্ট ঢাকার টি এন্ড টি কলোনী মসজিদে সারা দেশের প্রতনিধিত্বশীল ৮৫ জন ওলামা মাশায়েখের এক সম্মেলনের আয়োজন করেন। সম্মেলনে ইত্তেহাদুল উম্মাহ বাংলাদেশ নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার লক্ষে ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সিদ্ধান্তক্রমে একই বছর ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর শাহ সূফী আবদুল জব্বারের সভাপতিত্বে একই স্থানে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে তাঁকে কেন্দ্রীয় সাদারতের মুখপাত্র নির্বাচিত করা হয়। সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তব্য পেশ করেন আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী। ১৯৮৫ সালে ইত্তেহাদুল উম্মাহর চট্টগ্রাম জেলা সম্মেলন এবং ১৯৮৭সালে ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ময়দানে মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উভয় সম্মেলনে হুজুর সভাপতিত্ব করেন। ইত্তেহাদুল উম্মাহ্র কার্যক্রমকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে বড় বড় সম্মেলনে যোগদান করেন। ঐক্যের সাড়া পড়ে সমগ্র দেশে।
হুজুর তাঁর কর্মের দুনিয়াবী মূল্যায়ন হোক-তা চাইতেন না। তিনি নিছক আল্লাহর জমিনে আল্লাহ্র দ্বীন কায়েমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। পার্থিব পুরস্কার ও বাহবাহর পেছনে ছুটলে হয়ত তিনি বহু কিছু পেতেন। কিন্তু প্রচার বিমুখ এ পীর সদা নীরবে নিভতে এমন জনসেবা ও দ্বীনের খিদমত করেছেন যার কোন মূল্যায়ন হয় না। বরং তিনি বায়তুশ শরফের উদ্যোগে নিজ নিজ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ দেশের সোনার সন্তানদের গুণীজন সংবর্ধনা দেয়ার যে ধারা ১৯৯৪ সালে শুরু করেছেন তা অদ্যাবধি চলমান রয়েছে। সমাজসেবায় অনন্য অবদান রাখার জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজকল্যাণ ফেডারেশন ও চট্টগ্রাম সমাজ কল্যাণ পরিষদ কর্তৃক তিনি স্বর্ণ পদকে ভূষিত হন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রণীত ইসলামী বিশ্বকোষে হুজুরের জীবন ও কর্ম স্থান পেয়েছে। ১৯৮৪ সালে দায়েমী কমপ্লেক্স ঢাকা কর্তৃক জাতীয়, সামাজিক ও ধর্মীয় নীতিমালার বাস্তবায়ন, প্রচার ও পুনর্জাগরণের জন্য মসজিদ প্রতিষ্ঠা, আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখায় হুজুরকে দায়েমী কমপ্লেক্স ধর্মীয় পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তিদের জীবনালেখ্য প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান আমেরিকান বায়োগ্রাফিকেল ইন্সটিটিউট, নর্থ কেরোলিনা কর্তৃক প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ডাইরেক্টরি অব ডিসটিংগুইশড লিডারশিপ গ্রন্থে (১৯৯০-২০০০ সাল) দশক সেরা বিশ্ব ব্যক্তিত্বদের বাছাইকৃত কয়েকজনের মধ্যে হুজুরকে অন্যতম হিসেবে মনোনয়ন করা হয়।
পারিবারিক জীবনে শাহ মাওলানা আবদুল জব্বার ছিলেন সাদা মনের মানুষ। সহজ-সরল ও শান্তিপ্রিয় অভিভাবক হিসেবে কখনো স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের সাথে রাগারাগি করেননি। তিনি ১৯৫৪ সালে প্রিয় মুর্শিদের উপদেশ মোতাবেক আমিরাবাদের রাজঘাটাস্থ মল্লিক সোবহান গ্রাম নিবাসী ঠাণ্ডা মিয়ার কনিষ্ঠা কন্যা মনসুরা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রিয় মুর্শিদ মীর মোহাম্মদ আখতর তাঁর একমাত্র কন্যা ফাতিমা তাহিরাকে হুজুরের স্ত্রীর বড় ভাই এম.এ. কুদ্দুস সাহেবের সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। ফলে উভয়ের মাঝে নব আত্মীয়তার সূত্রপাত হয়। হুজুরের তিন ছেলে সবাইকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত এবং পাঁচ মেয়ের সবাই আলিম ও ধর্মপ্রাণ পরিবারে পাত্রস্থ করেন। বড় ছেলে মাওলানা আবদুল হাই নদভী একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত গবেষক, গ্রন্থকার ও ইসলামী চিন্তাবিদ। ২য় ছেলে হাফেজ আবদুর রহীম বায়তুশ শরফ আদর্শ মাদরাসায় আলিম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন ১৯৮৭সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে মিছিলে শরীক হলে পাষণ্ড ইসলাম বিরোধী শক্তির বোমার আঘাতে আন্দরকিল্লা জেনারেল হসপিটালের গেটে শাহাদাত বরণ করেন। হুজুরের ছোট ছেলে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম বায়তুশ শরফ মাদরাসা হতে পড়াশোনা শেষ করে শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
রায়হান আজাদ
সেক্রেটারী, সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড পলিসি স্টাডিজ
সিআরপিএস এবং কলামিস্ট
অধ্যাপক, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
Leave a Reply