তাঁর ইউরোপ ও আমেরিকা সফরে অনেক কারামতি ও বুজুর্গী পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। তন্মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করা হল-
প্রথমত আবহাওয়া জনিত:
আমরা দুবাই থেকে ২১শে ডিসেম্বর’৯১ লন্ডন পৌঁছি। সেখানে জানতে পারলাম ২০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত লন্ডনের আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ। প্রচণ্ড তুষারপাত ও ঘন কুয়াশার কারণে এক সপ্তাহ পর্যন্ত হিথ্রো বিমান বন্দরে কোন বিমান অবতরণ করতে পারেনি। লন্ডনগামী সব বিমানকে প্যারিসে অবতরণ করতে হয়েছিল। আল্লাহ্র অশেষ শুকরিয়া আমরা যাওয়ার পূর্বদিন থেকে পরবর্তী ৮দিন ছিল রৌদ্রোউজ্জ্বল দিন এবং চাঁদনি আলোকময় রাত।
একদিন আমরা পাতাল রেল স্টেশন সাদবারী হিলে (SUDBURY HILL) আসার সাথে সাথে হঠাৎ প্রচণ্ড বেগে ঝড়বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছিল।
এমতাবস্থায় আমরা স্টেশনে আটকা পড়ি। হুজুর কেবলাসহ আমরা কয়েকজন যাত্রী স্টেশনের ভেতরে বেঞ্চের উপর বসেছিলাম আলহাজ্ব তাহের সোবহান কোথায় যেন কার কাছে টেলিফোন করতে গিয়েছিলেন আর আলহাজ্ব ছায়েকাতুল ইসলাম অন্যান্য লোকজনের সাথে উদ্বিগ্ন মনে বাইরে পায়চারী করছিলেন। সবার মাঝে এ বিব্রতকর অবস্থা দেখে শ্রদ্ধেয় হুজুর কেবলা বেঞ্চ থেকে ধীরস্থিরভাবে উঠে বাইরের দিকে মুখ তুলে কিছুক্ষণ এক পলকে চেয়ে থাকলেন। তাঁর দাঁড়ানো অবস্থায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঝড় থেমে গেল। আকাশ পুনরায় মধ্যাহ্ন সূর্যের ঝলমল আলোতে ভরে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সবার মাঝে স্বস্তির ভাব ফিরে এল। উপস্থিত বৃটেনবাসীরা আবহাওয়ার এরূপ তাৎক্ষনিক পরিবর্তন দেখে আনন্দ মিশ্রিত বিস্মিত হয়ে বলাবলি করছিল ওহ! হাউ বিউটিফুল সানী ডে-আহ্! কী সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল দিন! সে দিন ছিল খ্রিস্টমাস ডে। খ্রিস্টানদের বড় দিন। তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলছিল, স্মরণাতীতকালের খ্রিস্টমাস ডে-তে এরূপ সুন্দর রোদেলা দুপুর ও নীল আকাশ তারা আর দেখেনি। নিশ্চয় এটি বড় দিনের উপহার। বস্তুবাদী সভ্যতায় যাদের জীবন গড়া তারা কীভাবে জানবে কোন ইঙ্গিতে এরূপ একটি সুন্দর মুহূর্ত অনুভব ও সুন্দর দিন পেয়েছে তারা? অনুরূপ অবস্থা আমরা লক্ষ্য করেছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ২৯শে ডিসেম্বর আমরা লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক পৌঁছি। সেখানে বিমানবন্দরে হুজুরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আগত বাংলাদেশি ভাইয়েরা আমাদেরকে জানালো যে, গত কয়েকদিন প্রচণ্ড তুষারপাত ও হাড় কাঁপানো হিমেল হাওয়ায় জন-জীবন একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ হঠাৎ করে আবহাওয়ার পরিবর্তন সূচিত হল।
আমাদের সপ্তাহখানেক অবস্থানকালে নিউইয়র্কের আবহাওয়া ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও আরামদায়ক। মার্কিন টি.ভি-র আবহাওয়ার বুলেটিনে মন্তব্য করেছিল, গত ১২০ বছরে তুষারময় শীতকালে নিউইয়র্কবাসীরা এরূপ আলোকিত দিন ও চাঁদনীরাত আর প্রত্যক্ষ করেনি। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন দৃষ্টে আমাদের এ প্রত্যয় জন্মেছে যে, এটি আল্লাহর ওলীর কারামত ও আল্লাহ পাক সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার খাস রহমত। তিনি তাঁর মকবুল বান্দার দ্বীনি সফরকে সহজ ও প্রাণবন্ত করার লক্ষ্যে প্রতিকূল আবহাওয়াকে অনুকূল ও সুচিসুন্দর করে দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত ভ্রান্তি মোচন:
হুজুর লন্ডন, আমেরিকা এবং আরব আমীরাতে অবস্থানকালে ব্যাপকভাবে ওয়াজ মাহফিলে ও ঘরোয়া সমাবেশে সারগর্ভ বক্তব্য পেশ করেন। মাহফিলগুলোর পূর্বে যেসব লোক হুজুর একজন পীর এ কথা শুনতে পেরে
বিরূপ সমালোচনা করেছিল তারা, প্রত্যেকেই হুজুরের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য শুনে এবং মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্ সম্পাদিত আল-আছরার বিশেষ সংখ্যা-১৯৯০ পাঠ করার পর হুজুরের এমন ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে অনেকে বায়াত হয়ে যান। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন, লন্ডনে জনাব মোজাম্মেল হক, নিউইয়র্কে জনাব মোতাহের হোসাইন চাকলাদার।
তৃতীয় ভয়েস অব আমেরিকা:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী হোয়াইট হাউজ নগরী ওয়াশিংটন ডি সি তে অবস্থানকালে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকা ভবনের বাংলা বিভাগে গমন করলে আমাদেরকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানানো হয়। বাংলা বিভাগের পরিচালক, প্রযোজক এবং সংবাদ পাঠক কাফি খান, সরকার কবির উদ্দীন, সোহেল সামাদ, ইকবাল বাহার চৌধুরী, মাসুমা খাতুনসহ সবাই আমাদেরকে একান্ত আত্মীয়ের মত বরণ করে নেন। আন্জুমনে ইত্তেহাদের মত বহুমুখী মানবকল্যাণ সংগঠনের সভাপতি হিসেবে বিশেষতঃ একজন পীর সাহেবের নেতৃত্বে এরূপ মানব হিতৈষী কর্মকাণ্ড দেখে হুজরের প্রতি তারা সবাই সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি ছিলেন সর্ববিষয়ে অতুলনীয়। তাঁর তুলনা তিনিই। বায়তুশ শরফের ও আন্জুমনে ইত্তেহাদের তিনি ছিলেন প্রাণপুরুষ। তিনি যেখানেই গিয়েছেন তাঁর আচার আচরণ, কার্যাদি ও তকরীরের মাধ্যমে নতুন প্রাণের নহর বইয়ে দিতেন। প্রত্যেকের ঈমানের সঞ্জীবনী শক্তি ফিরে আসত। তাঁর হাতে বায়াত হয়ে শরীয়ত ও তরীক্বতের পন্থা অবলম্বনে নিজেকে খাঁটি মুসলমান হিসেবে পরিচালিত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতেন।।
আলহাজ্ব এ.এফ.এম হাসান
বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক,
আন্জুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ।
Leave a Reply