ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তর প্রতিরোধ আন্দোলন

১৯৯০ সালের গোড়ার কথা। তখন গাজীপুর থেকে দেশের একমাত্র ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরের বিরুদ্ধে ঢাকায় প্রচণ্ড বিক্ষোভ ও সমাবেশ চলছিল। এ বিষয়ে চট্টগ্রামেও আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরামর্শ নেওয়ার জন্য বন্ধু আবদুর রহীম ইসলামাবাদীসহ সর্বপ্রথম হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার সাহেবের কাছে যাই। বায়তুশ শরফ গমনের পূর্বে ভাবতাম এতবড় পীর সাহেব আলীশান শাহী মহলে ডজন খানেক খাদেম বেষ্টিত অবস্থায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অবস্থান করবেন। আমাদের মত নগন্য লোকদের সাথে কি সাক্ষাৎ করবেন? কিন্তু অনাড়ম্বর পরিবেশে হাসি-খুশি স্বভাবের সহজ-সরল নূরানী চেহারার এক মহান ব্যক্তিত্বকে দেখার এবং তাঁর সাথে কিছু সময় ব্যয় করার সাথে সাথে আমার পূর্বের সমুদয় ধারণা এক নিমিষেই পাল্টে গেল। পীর সাহেব হুজুরের সামনে কতিপয় মধ্য বয়স্ক লোক ও বৃদ্ধ লোক বসা। তিনি তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে শুনছেন এবং কিছু কিছু সমস্যার সাথে সাথে সমাধানও দিচ্ছেন।

হুজরায় প্রবেশ করার সাথে সাথে পীর সাহেব হুজুর আমাদের স্বাগত জানিয়ে বসতে বললেন। আমরা ফ্লোরে বসতেই হুজুর তাঁর দু’পাশে পাতা সোফায় বসার আহ্বান জানালেন। একটু দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতেই তাঁর দ্বিতীয় দফা আহ্বানে অতি সংকোচে তাঁর পাশে বসলাম। অতঃপর ভক্তদের বিদায় করে আমাদের সাথে দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ করলেন। ইতিমধ্যে চা-নাস্তার ব্যবস্থা হয়ে গেছে।

এবার আমরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উঠাতেই তিনি বললেন, “মরহুম মাওলানা মনীরুজ্জামান ইসলামাবাদীর অন্তিম ইচ্ছা ছিল চট্টগ্রামের দেয়াং পাহাড়ে ওয়াক্তকৃত জায়গায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। আফসোস! তাঁর জীবদ্দশায় তিনি তা করতে পারেননি। আমরা যদি চেষ্টা চালাই চট্টগ্রামে একটি ‘ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করতে পারি শুধু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নয়। ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণ ব্যাখ্যায় হুজুর বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আর সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি না থাকলে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের কুরআন ও পেয়ারা নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর সুন্নাহ্ পূর্ণ বাস্তবায়ন হয় না-হবে না।

পীর সাহেব হুজুরের এ মন্তব্য শুনে আমার সমুদয় শ্রদ্ধা আর সম্মান তাঁর প্রতি দৃঢ়ভাবে অর্পিত হলো। এ মনটা এক বেহেস্তী প্রশান্তিতে ভরে উঠলো। পীর সাহেব হুজুরকে সভাপতি, অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ ও এডভোকেট শামছুদ্দীন আহমদ মীর্জাকে সহ-সভাপতি, আবদুর রহীম ইসলামাবাদীকে সাধারণ সম্পাদক, অত্র নিবন্ধকার আবদুর রহমান চৌধুরীকে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক করে অন্যান্যদের নিয়ে ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তর প্রতিরোধ জাতীয় কমিটি’ চট্টগ্রাম শাখা গঠন করা হয়। এ কমিটির উদ্যোগে সর্বপ্রথম আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ উত্তর চত্বরে গণজমায়েত ও শেষে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পীর শাহ্ আবদুল জব্বার সাহেবের সভাপতিত্বে এ জমায়েত জাতীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক ও ইসলামী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সেদিন এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন হয়েছিল। ঢাকা থেকে সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, মুসলিম লীগের সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট মুহাম্মদ আয়েন উদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি মাওলানা আশরাফ আলী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি মাওলানা আবদুল মতীন, কৃষক শ্রমিক পার্টির প্রধান এ এস এম সোলায়মান, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট নজরুল ইসলাম। চট্টগ্রামের এ.কে.এম রফিকুল্লাহ চৌধুরী, মাওলানা মুমিনুল হক চৌধুরী, এডভোকেট আবু জাফর চৌধুরী, অধ্যক্ষ আবু তাহের, এডভোকেট শামসুদ্দিন আহমদ মীর্জা, এডভোকেট আহমদ সগীর, আবদুর রহীম ইসলামাবাদী, আবদুর রহমান চৌধুরী, মাওলানা সরোয়ার কামাল চৌধুরী, মাওলানা সিদ্দিক ফারুকী, অধ্যাপক মফিজুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

পীর সাহেব হুজুর তাঁর ভাষণে দেয়াং পাহাড়ের প্রস্তাবিত স্থানে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী জানান এবং গাজীপুর থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তর না করার জন্য তৎকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এভাবে পর্যায়ক্রমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তর প্রতিরোধ জাতীয় কমিটি চট্টগ্রাম শাখার উদ্যোগে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও জাতীয় বিক্ষোভমিছিল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হুজুরের নেতৃত্বে চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের দাবী ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরা হয়। এসব ব্যাপারে হুজুরকে দেখেছি সার্বিকভাবে সহযোগিতায় উদার ও নিবেদিত।


আবদুর রহমান চৌধুরী

নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক আল হক,

দারুল মা’আরিফ, চাঁন্দগাঁও, চট্টগ্রাম।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *