আমার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেললেন

ছোটবেলা থেকে ষাট গম্বুজ মসজিদ সম্বন্ধে এত বেশি গল্প শুনেছিলাম যে, মসজিদটির ব্যাপারে বিস্ময়ের শেষ ছিল না। আর সেই মসজিদ এখনই চাক্ষুষ দেখবো এটা আমার কাছে রীতিমত এভারেস্ট বিজয়ের মত আনন্দজনক ছিল।

যে কারণে দ্রুত পায়ে আবেগ ভরে মসজিদে ঢোকার জন্য এগিয়ে গেলাম, কিন্তু বিধিবাম: দ্বাররক্ষীরা আমাদের গতিরোধ করে দাঁড়ালেন। কি ব্যাপার। জানতে চেষ্টা করে জানলাম, দরজায় দাঁড়ানো চারজন ব্যক্তি সবার নাম ধাম এবং ওষু আছে কিনা জেনে মসজিদে ঢুকতে দিচ্ছে। সব দর্শনার্থী সে অনুযায়ী প্রবেশ করলেও একজন যুবক বেঁকে বসেছেন, তিনি নাম বলবেন না। অথচ মসজিদে ঢুকবেন। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি চলছে। ক্রমেই জটলা বাড়ছে, একটা গণ্ডগোল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। পরিস্থিতি আঁচ করে এগিয়ে গেলাম ও উভয় পক্ষের সম্মতি নিয়ে আপোষমূলক কথা বলতেই দর্শনার্থী যুবক রণে ভঙ্গ দিল, মুহূর্তে ব্যাপারটির নিষ্পত্তি হয়ে গেল। এত বড় একটা ব্যাপার যখন আমার হস্তক্ষেপে মীমাংসা হয়ে গেল, তখন দ্বাররক্ষী স্বেচ্ছাসেবক চারজনের নেতা যুবকটি লাফিয়ে এসে আমার ডান হাতটি তার দু’হাতের মধ্যে লুফে নিয়ে বললেন, ‘আমি হাফেজ আবদুর রহমান বা আবদুর রহীম (কোনটা সঠিক আজ আর আমার মনে নেই)। চট্টগ্রাম থেকে বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা আবদুল জব্বার ছাহেবের সাথে এসেছি। দেখছেন না, এখানে কেমন অনৈসলামিক কার্যকলাপ চলছে, আমরা এগুলো উৎখাত করতে চাই।’

উত্তরে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, চট্টগ্রাম থেকে এসে এক সপ্তাহ এখানে থেকে কিভাবে বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত অনৈসলামিক কার্যকলাপ উৎখাত করবেন? উত্তরে হাফেজ সাহেব বললেন, ‘আমরা এখানে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছি। এখানকার স্থানীয় ছেলেরা সেখানে লেখাপড়া করছে, ওরা বড় হয়েই সমূলে উৎখাত করবে এ সমস্ত অন্যায় কার্যকলাপ।

খুশী হয়ে বললাম, হ্যাঁ! এ ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারলেই ফল পাওয়া যাবে। দোয়া করুন। আমরা সে চেষ্টাই করছি। ফি আমানিল্লাহ বলে পা বাড়াতেই হাফেজ সাহেব বললেন, আপনাদের দাওয়াত। নিশ্চয় রাতের খাওয়া এখনো হয়নি? না না। আমাদের জন্য আর কষ্ট করা লাগবে না। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, বললাম আমি।

আমার এ কথা শুনে হাফেজ সাহেব যেন গোস্বায় ফেটে পড়লেন, তিনি রেগে মেগে বললেন, ‘যশোর-খুলনার মানুষগুলো নিজেরা খেতে জানে না। অন্যদের খাওয়াতেও জানে না। জানেন প্রতিদিন ৫০০ লোকের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু ডেকে ডেকেও কাউকে পাওয়া যায় না।’

কি কথায় কি এসে গেল, নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো- আমার জন্য এলাকার বদনাম। তাই নরম গলায় বললাম, ঠিক আছে দাওয়াত কবুল করলাম।

তিনি হেসে বললেন, ‘যান, মসজিদ দেখে এখানে ফিরে আসুন। আপনারা আসলেই আমরা একত্রে খেতে যাব।’

আমরা দেখা শোনা শেষ করে ওদের সাথে খাওয়ার স্থানে পৌছে দেখলাম, পীর সাহেবসহ ২০/২৫ জন লোক খাবার পাটিতে বসে আছেন। আমাদেরও সেখানে বসানো হলো ও সাথে সাথে একটা করে টিনের প্লেট সবার হাতে ধরিয়ে দেয়া হল, যাতে ভাত তরকারী ছিল।

আমাদের আসার পথে হাফেজ সাহেব বলেছিলেন, পীর সাহেবও সবার সাথে খাবেন এবং তিনিও একটা প্লেট পাবেন অর্থাৎ সবার জন্য একটি করে প্লেট বরাদ্দ করা হয়েছে। আমরা ছিলাম খাদ্যহগ্রহণ করার শেষ ব্যাচ। সে যা হোক প্লেটের ভাতের পরিমাণ দেখে আমার ক্ষুধার আগুন যেন দ্বিগুণ হলো। বলা যায় সারাদিন ভাত পেটে পড়েনি। শুধু টো টো করে ঘুরেছি আর এটা সেটা ছাইপাশ খেয়ে পেট ভরেছে। ফলে এখন পেট ভরে ভাত খাওয়া একান্ত দরকার। প্লেটে ভাতের পরিমাণ সে তুলনায় সত্যিই কম মনে হল, সে জন্য বার বার আমাদের মেজবান হাফেজ সাহেবের দিকে তাকাতে লাগলাম।

হাফেজ সাহেব পরিস্থিতি বুঝে ইশারায় জানতে চাইলেন আর একটা প্লেট লাগবে কি না?

হ্যাঁ সূচক ঘাড় নাড়ালাম। প্লেট ম্যানেজ করতে হাফেজ সাহেব ছুটলেন কিন্তু ম্যানেজ করতে পারলেন না। কারণ মাথা গুণেই এখানে প্লেট সরবরাহ করা হয়েছে। অতএব; অতিরিক্ত প্লেট দেয়া যাবে না, এটাই পীর সাহেবের নির্দেশ।

কাচুমাচু মুখে অনতিদূরে হাফেজ সাহেবকে দাঁড়ানো দেখে ইশারায় জানালাম- কুচ পরোয়া নেহি, এতেই চলবে।

পীর সাহেব সবাইকে বিস্মিল্লাহ্ বলে শুরু করতে বললেন। এক পর্যায়ে সবার খাওয়া শেষ হলো। তবে আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটলো আমাদের চার জনের বেলায়, আমরা কেউই প্লেটে সরবরাহ করা সেই সামান্য ভাত গোস্ত খেয়ে শেষ করতে পারলাম না।

আমি নিজে পীর ফকীরে বিশ্বাসী কোন মানুষ নই, যদিও একেবারে শিশুকাল থেকেই নামায রোযার পা-বন্দ একজন বান্দাহ। তাছাড়া ইসলামের ওপর আমার যে সামান্য পড়াশোনা তাতে পীর সাহেবদের প্রতি দুর্বল হওয়ার মত কোন অবস্থা তখনো সৃষ্টি হয়নি।

সত্যি কথা বলতে কি আমার জীবনে, আজ পর্যন্ত ঐ ঘটনাতেই প্রথম হোচট খাই। পীর আবদুল জব্বার সাহেব আমার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেললেন। না! তারপর আর দ্বিতীয় বার তাঁর সাথে দেখা করার সুযোগ আমার হয়নি। তবে আমি দূর থেকে এ মহান ব্যক্তিত্বকে সব সময় মনে প্রাণে শ্রদ্ধা করেছি। নানা সময়ে বন্ধু-বান্ধবের কাছে উক্ত ঘটনাটি যতদূর সম্ভব বলেছি। ঘটনাটি যেদিন ঘটেছিল সেদিনও ভেবেছিলাম এবং আজও বিশ্বাস করি, যদি কোনও পীরের মুরিদ হতেই হয়, তবে হযরত মাওলানা আবদুল জব্বার সাহেবের মত পীরের হাতেই হবো। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করুন।


নাসির হেলাল

বিশিষ্ট কবি ও লেখক ইসলামী বিশ্বকোষ প্রকল্প ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ,

বায়তুল মোকাররম, ঢাকা।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *