প্রধান অতিথির বক্তৃতা দিচ্ছেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান

সম্মানিত সভাপতি! সুধীমন্ডলী উপস্থিত ছাত্র ভাইয়েরা! আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।

মরহুম মাওলানা আবদুল জব্বার রাহ. এর স্মরণ সভায় দাঁড়িয়ে আমি একটি কথা বলতে চাই। তা হল সত্যিকার অর্থে মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রাহ. ছিলেন একজন নিখাদ মানুষ এবং মানুষ গড়ার সফল কারিগর। বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রাণিত সত্য যে, আমাদের দেশে ইসলাম এসেছে পীর বুজুর্গদের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে যা দেখছি তার অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর নয়। পীর মুরিদীর এই সুন্দর ধারাটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে পীরের যে সিস্টেম চলছে তা বংশানুক্রমিক। ‘পীরের ছেলে পীর হয়’ এটাই বর্তমান প্রচলিত নিয়ম। বায়তুশ শরফের মরহুম মাওলানা আবদুল জব্বার রাহ. প্রচলিত ধারার বিপরীতে এমন একটা চমৎকার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা দুনিয়ায় যেখানেই পীর বায়াত মুনিদের মাধমৈ আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের অনুশীলন হয়, আমি বিশ্বাস করি এ থেকে তাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। এটা মস্ত বড় একটি সিস্টেম, এটা উস্তাদ সাগরেদের প্রশ্ন, ওস্তাদের ছেলে হলে ওস্তাদ হওয়া যায় না, ওস্তাদের ছাত্ররাই ওস্তাদ হয়। ওস্তাদ হতে হলে যোগ্যতার  প্রয়োজন হয়। অনুরূপভাবে পীরের ছেলে পীর হতে হলে তাকেও যোগ্য ও গুণবান হতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা হয় না।

মরহুম মাওলানা আবদুল জব্বার রাহ. দুনিয়া থেকে চলে গেছেন বটে, তবে hereditary system রেখে যান নি। যেভাবে রাসুল-এ-করীম সা. রেখে যান নি। রাসুল সা. যে রকম খেলাফত রেখে গেছেন, তেমনি মাওলানাও রেখে গেছেন খেলাফত। যাতে যোগ্যদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।

মাওলানা শুধুমাত্র আনুষাঙ্গিক ইসলাম যেমন নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত এবং মসজিদ, খানকাহর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ইসলামকে এর বাইরে নিয়ে এসছেন। জীবনে তিনি ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করে ঘেছেন। আমি বলে থাকি, ইসলাম লাশের জন্য আসেনি, ইসলাম জীবনের জন্যই এসেছে। লাশ বলতে বুঝাচ্ছি মানুষের বাত্যিক দেহটাকে। এখন আমার যে দেহটা আপনারা দেখেছেন এটা কিন্তু প্রকৃত অর্থে আমি নই। এটা আমার লাশ। যদি এখনই আমার প্রাণবায়ু, এ দেহটাই আপনারা এখানে দেখবেন এবং বলবেন ‘মোস্তাফিজ নেই, অথচ এখন যা দেখছেন পরেও তাই দেখবেন’। তবুও কেন বলবেন যে মোস্তাফিজ নেই। তাহলে বুঝা গেল, মানুষের প্রকৃত সত্ত্বা তাঁর দেহ নয় বরং রূহ। মাওলানা আবদুল জব্বার রাহ. যে কাজটি করেছেন, উনি রূহের উৎকর্ষ সাধন করেছেন। রূহকে সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখার নিমিত্তে যা প্রয়োজন তার ব্যবস্থা তিনি করেছেন। একই সাথে দেহের জন্য যা দরকার তাও তিনি করেছেন। লাশ হয়ে কবরে যাবার আগে মানুষকে এই বিশ্বচরাচরে বাস করতে হয়। পার্থিব জীবন পরিচালনার জন্য আমরা পথ নির্দেশনা পাই, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা. এর জীবনে। মহানবী সা. সমাজে যে অন্যায় অনাচার, অবিচার ছিল তার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। তারও আগে যুবকদের সংঘটিত করে গঠন করেছিলেন, ‘হিলফুল ফুজুল’ যেমনি গঠন করেছেন হযরত পীর সাহেব কেবলা আনজুমনে নওজোয়ান বাংলাদেশ। যে কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষের জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।

প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষের স্বনির্ভর মুহতাজ বিহীন ও দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মিটানোর জন্য যা দরকার সেগুলোই তিনি করেছেন, তাঁর অসংখ্য প্রতিষ্ঠান সেই সাক্ষ্য প্রদান করে। এগ্রলো সুন্নতে মুহাম্মদীর প্রতিবিম্ব। তাই আমি মরহুম মাওলানা আবদুল জব্বার রাহ. কে সুন্নতে মুহাম্মদীর একজন নির্ভেজাল নমুনা হিসেবে মনে করি।

মাওলানা আবদুল জব্বার রাহ. আমাদের আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর প্রদর্শিত পথ আমাদের রয়ে গেছে। তিনি যে ধারায় জীবন যাপন করেছেন, সে আদর্শ আমাদের কাছে রয়ে গেছে। এগুলো অমলিন থাকবে, যাতে করে আমরা তাঁর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের জীবনকে সার্থক করতে পারি সে চেষ্টায় আমাদের ব্রতী হতে হবে। আমাদের প্রজন্মের জন্য তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো বেগবান ও শক্তিমান করার কাজে প্রত্যেককে সংশ্লিষ্ট করার মাঝেই আমি মনে করি আমরা যথার্থ অর্থে তার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি।

পরিশেষে মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি, আল্লাহ যে তাঁকে মাকামে মাহমুদে স্থান দান করেন। আমীন

 

ড. মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান
অধ্যাপক, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রাহনুমা || ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা সভার স্মারক