আলেমে রব্বানী, আধ্যাত্নিক সাধক ও সমাজ সংস্কারক, বায়তুশ শরফের প্রধান রূপকার হাদীয়ে যামান শাহ্‌ সূফী হযরত আল্লামা শায়খ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার রাহ. ছিলেন বায়তুশ শরফ দরবারের প্রাণ-প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুল আলম শাহ্‌ সূফী হযরত মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতর রাহ.-এর সুযোগ্য খলিফা এবং আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর একজন সফল উত্তরসূরি। তিনি ছিলেন এমন একজন রাহবার, যিনি এ জগতে তাঁর কর্ম-সাধনার ফলস্বরূপ মানব হৃদয়ে ধ্রুবতারার মত উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক রূপে আলো বিতরণ করে চলেছেন।

বানের জলে কাগজের নৌকার দুলুনির ন্যায় বারংবার জনগণ যখন সুদ, ঘুষ ও অশিক্ষা কুশিক্ষায় দিশেহারা তখনই বিংশ শতাব্দীর মোজাদ্দেদ হিসেবে এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে। সুদের মুলোৎপাটনকারী সর্বপ্রথম শরিয়ত ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকের স্বপ্নদ্রষ্টা ও উক্ত ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্টাতা, ইসলামী আকিদা অনুসারে দেশ পরিচালনার অভিপ্রায়ে মাদরাসা, স্কুল ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠা কিংবা ইসলামী স্বর্ণময় যুগের মনীষী আল মামুন কতৃক প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাদপীঠ “দারুল হিকমার” অনুরূপ ইসলামী গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে তাঁর নীরব পদচারণা সত্যিই বিস্ময়কর।

তিনি যে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা তজ্জন্যে ১৯৯১ সালের ৮ জানুয়ারী যুক্তরাষ্ট্রে সফরকালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের কর্মধারা অবগত হয়ে VOA কতৃক তাঁকে “মিনি গভর্নমেন্ট” আখ্যায়িত করা হয়। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্ববরেণ্য ব্যাক্তিদের জীবনালেখ্য প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান “ আমেরিকা বায়োগ্রাফিকেল ইনস্টিটিউট” কতৃক প্রকাশিত “ইন্টারন্যাশনাল ডাইরেক্টরি অব ডিস্টিংগুইশড লিডারশীপ” গ্রন্থে স্থান পায়। এখনো আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে পত্র-পত্রিকায়, স্মরণিকা, স্মরণ সভায়, গুণীজন স্মরণ ও সংবরধণায় প্রতিনিয়ত তাঁর নাম সশ্রদ্ধ উচ্চারিত হচ্ছে। তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ জাতীয় পর্যায়ে সরকারী ব্যবস্থাপনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত “ইসলামী বিশ্বকোষ” –এ তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনীর অন্তর্ভুক্তি।

শাহ আবদুল জব্বার রাহ. -এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

মোহাম্মদ আবদুল জব্বার
পিতা: মাওলভী ওয়াছি উদ্দীন রাহ.
মাতা: মহিয়ষী বেগম ফিরোজা খাতুন রাহ.
জন্ম তারিখ: ১লা ফেব্রুয়ারী, ১৯৩৩ ইং, রাত ৮:৩০ মিনিট।
স্থায়ী নিবাস: মিয়াজী পাড়া, বড়হাতিয়া, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।

প্রাথমিক শিক্ষা:
দাখিল ১৯৪৭, আলিম ১৯৪৯, ফাজিল ১৯৫১।
গারাঙ্গিয়া ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসা, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
কামিল(হাদিস) ১৯৫৩
দারুল উলূম আলিয়া মাদরাসা, চন্দনপুরা, চট্টগ্রাম।
শিক্ষাগত ব্যুৎপত্তি অর্জন:
কুরআন, হাদিস, তাফসীর, ফিকাহ, উসূলে ফিকাহ, বালাগাত, মানতিক, ইলমুল কালাম ও ইলমে তাসাউফ।
সাংস্কৃতিক দক্ষতা অর্জন:
কেরাত, হামদ, না’ত, গজল, বক্তৃতা, অনুবাদ ও প্রবন্ধ।
ভাষাগত দক্ষতা:
বাংলা, উর্দূ, ফার্সী, আরবী, হিন্দী ও ইংরেজী।

পেশা: অধ্যাপনা, পেশ ইমাম, খতীব, অধ্যক্ষ ও রেকট।
ব্যবসা: আতর, মধু ও বই।
পীর-মুর্শিদ: কুতুবুল আলম শাহসূফী হযরত মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতর রাহ.।
বায়াত: আলিম শ্রেণীর ছাত্রকালীন (১৯৪৭)।
পীর মুর্শিদের একান্ত সান্নিধ্য: ১৯৬৮-৭১ ইং।
খেলাফত লাভ: ৫ ফ্রেব্রুয়ারী ১৯৭১, মক্কা শরীফ।

সভাপতি: আনজুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ (১৯৬৪-১৯৯৮)।
প্রতিষ্ঠাতা:
আনজুমনে নওজোয়ান বাংলাদেশ, ১৯ এপ্রিল ১৯৮০।
মজলিসুল উলামা বাংলাদেশ, ১৯৯৫।
মাসিক দ্বীন দুনিয়া, জুন ১৯৮০।

অমর কীর্তি:
মসজিদ বায়তুশ শরফ – ৬৫টি।
বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসা, চট্টগ্রাম, ১৯৮২।
কক্সবাজার বায়তুশ শরফ শিশু হাসপাতাল, ১৯৯৩।
কক্সবাজার বায়তুশ শরফ চক্ষু হাসপাতাল, ১৯৯৫।
বায়তুশ শরফ দারুশ শেফা হাসপাতাল, ঢাকা।
প্রাথমিক বিদ্যালয় – ৫টি, একাডেমী – ১টি।
এতিমখানা – ১৫টি।
ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান – ১টি।

সেমিনার আয়োজন:
সুদবিহীন ইসলামী ব্যাকিং, ১৯৮১।
মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন, ১৯৮২।
বাংলাদেশে ইসলাম – ১৯৮৫।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ১৯৯২।
আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ: মুসলিম নারী শিক্ষার উন্নয়ন, থাইল্যাণ্ড, ১৯৮৮।

আর্তমানবতার পাশে (ত্রাণ তৎপরতা):
রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের পাশে – ১৯৭৮, ১৯৮৮-১৯৮৯।
ঘূর্ণি দুর্গতদের মাঝে – ১৯৮৭, ১৯৯১, ১৯৯৪।
বন্যা দুর্গতদের মাঝে – ১৯৮৭, ১৯৮৮।

ঐতিহাসিক দোআ-মুনাজাত:
ইছালে ছাওয়াব মাহফিল, আখতরাবাদ (কুমিরাঘোনা), লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
ইছালে ছাওয়াব মাহফিল, কক্সবাজার।
শবে বরাত, বায়তুশ শরফ, চট্টগ্রাম।
শবে ক্বদর, বায়তুশ শরফ, চট্টগ্রাম।

আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার:
ইয়াসির আরাফাত, ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট ।
আহমদ দীদাত, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক।
পবিত্র ক্বাবা ও মদীনা শরীফের কতিপয় ইমাম।
সৈয়দ আল্লামা আবুল হাসান আলী হাসানী নদভী রাহ.।
আল্লামা সৈয়দ সালমান হোসাইন নদভী।
ইসলামুল হক, নওমুসলিম।
ইউসুফ ইসলাম, ইংল্যাণ্ডের নওমুসলিম।

যাদের সাথে ছিল তাঁর আন্তরিক বিশেষ হৃদ্যতা:
সৈয়দ আবদুল আহাদ আল মাদানী রাহ.।
শাহ সূফী হযরত মাওলানা আব্দুল মজীদ রাহ.।
শাহ সূফী হযরত মাওলানা আবদুর রশীদ রাহ.।
হযরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান।
হযরত মাওলানা মোহাম্মদ সুলতান যওক নদভী।
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম রাহ.।

তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ:
হিন্দু, খ্রিস্টান, চাকমা, টিপরা, নিগ্রো সহ আনুমানিক ১০০ জন।
পুস্তক রচনা ও অনুবাদ: একুশ (২১) টি।
পবিত্র হজ্ব ও ওমরা পালন: ৩৩ বার।
যিয়ারত:
বাগদা শরীফ, ১৯৭৯।
আজমীর শরীফ (অসংখ্যবার)।
উপমহাদেশের অন্যান্য পীর আউলিয়ার মাজার শরীফ।
বিদেশ সফর:
সোদিআরব, কুয়েত, কাতার, ওমান, আরব আমিররাত, ইরাক, পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যাণ্ড, তুরস্ক, ফ্রান্স, ইংল্যাণ্ড, আমেরিকা।

শিরক বিদআত উচ্ছেদ ও সংস্কার:
শাহপীর আউলিয়ার মাজার, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
ছিদ্দিক মিয়ার বলীখেলা, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
ষাটগম্বুজ মসজিদ ও খানজাহান আলী রাহ. -এর মাজার, বাগেরহাট।

প্রতিবাদ-প্রতিরোধ:
ফিলিস্তিনী মুসলমানদের উপর ইহুদী হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
১৯৭৯ সালে রাশিয়া কর্তৃক আফগানিস্তান আগ্রাসনের প্রতিবাদ।
১৯৮৮ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরের প্রতিবাদ।
ইরাকে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
১৯৯০ সালে সালমান রুশদী ও তসলীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
ভারতীয় অভিধানে রাসূল পাক সা. -এর শানে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদ।
পাঠ্যপুস্তকে সরকারিভাবে ইসলামি শিক্ষা সংকোচনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
১৯৯৫ সালে রাশিয়া কর্তৃক চেচনিয়ার আগ্রাসনের প্রতিবাদ।

অন্যতম উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা:
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
ইত্তেহাদুল উম্মাহ বাংলাদেশ।
মুসলিম মানবাধিকার সংস্থা।
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন।

বৃক্ষরোপন অভিযান: ১৯৯১, ১৯৯২, ১৯৯৭।
প্রিয় সখ: এতিমের লালনপালন, অধ্যয়ন, বাগান পরিচর্যা, মৌমাছি, গবাদিপশু, মুরগীপালন, মৎস্য চাষ।
প্রিয় গ্রন্থ: মসনবী শরীফ – আল্লামা জালাল উদ্দীন রুমী রাহ.।

শহীদি নজরানা পেশ: দ্বিতীয় পুত্র হাফেজ আবদুর রহীম -এর শাহাদাত, ১৯৮৭ সাল।

ইন্তেকাল: ২৫ মার্চ ১৯৯৮, সকাল ৭:১৫ মিনিট।
জানাযা: ২৬ মার্চ, সকাল ১০:৩০ মিনিট, ঐতিহাসিক রেলওয়ে পলোগ্রাউণ্ড ময়দান, চট্টগ্রাম।
জানাযায় ইমামত: জৈষ্ঠ্যপুত্র আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভী।
দাফন: দুপুর ১২টা, চট্টগ্রাম মসজিদ বায়তুশ শরফের দক্ষিণ পার্শ্বে তাঁর স্বহস্তে গড়া নিজ ফুল বাগানে।

হে রাহমানুর রাহীম! দয়া করে, মেহেরবানী করে, আমাদেরকে তুমি আমাদের মহান মুর্শিদের আদর্শ অনুসরণে দৃঢ়চিত্ত রাখ, তাঁর প্রদত্ত কর্মসূচীসমূহ বাস্তবায়নে সক্রিয় রাখ। তুমি তোমার প্রিয় বান্দাকে দান কর জান্নাতুল ফিরদাউস। আমরা তাঁর রূহানী ফয়েয ও বরকতের প্রত্যাশী। আমীন।।