স্বাগত ভাষণে ঈসা শাহেদী

মাননীয় সভাপতি, সম্মানিত প্রধান অতিথি, সম্মানিত আলোচকবৃন্দ, সুধীমন্ডলী ও ছাত্র-ছাত্রী ভাই-বোনেরা।

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।

বায়তুশ শরফের মরহুম পীর সাহেব হযরত মাওলানা আবদুল জব্বার রাহ. এর ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার মধ্যে আমাদের গোটা জাতি পথের দিশা পেতে পারে। তবে সত্য কথা, তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীরতা ও ব্যাপ্তি উপলব্ধি করা খুবই কঠিন। যারা তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে ছিল, তাদের জন্য আরো কঠিন। তাঁকে দেখতে মনে হত একজন মামুলী, সংসারী মানুষ। যাঁর সরলতা ছিল শিশুর মত। কিন্তু তিনি কি অসাধারণ তত্ত্বজ্ঞানী, সংগঠক, চিন্তাবিদ ও জাতীয় জীবনের দিকনির্দেশক ছিলেন তা উপলব্ধি করতে হলে সে পর্যায়ের মেধা ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোকের দরকার। অনেকগুলো কৃতিত্বের মধ্যে যে সংস্কার কর্মটির জন্য তিনি আমাদের কাছে স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে থাকবেন, তা হলো মানুষের দ্বীনি ও দুনিয়াবী জিন্দেগীর মাঝে সমন্বয় সাধন। ইসলামে দ্বীন ও দুনিয়া বলতে পরস্পর বিরোধী কোন জিনিষের ধারণা নেই। কিন্তু দীর্ঘকালের কুসংস্কারের কারণে সমাজে এ ধারণা এখনো বদ্ধমূল যে, ধর্মকর্ম সঠিকভাবে পালন করলে সফলভাবে দুনিয়াদারী করা যাবেনা; কিংবা দুনিয়ার জীবনে সফলতা অর্জন করতে হলে দ্বীনদারী ত্যাগ করতে হবে। ফলে দেখা যায়, সমাজের এক শ্রেণীর বিশেষতঃ বয়স্ক লোক মসজিদ, মাদ্রাসা, তাবলীগ নিয়ে সারা দিনমান ব্যস্ত থাকেন, আরেক শ্রেণী তাদের দেখে মনে করেন যে, এই যদি দ্বীনদারী হয় তাহলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরী গোল্লায় যাবে। বায়তুশ শরফের পীর ছাহেব রাহ. উপলদ্ধি করেন যে, সমাজ ব্যবস্থাকে বিচ্যুতি হতে রক্ষা করতে হলে এই চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। তাঁর সমগ্র জীবন এ সাধনাতেই নিয়োজিত ছিল। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মাসিক পত্রিকা ‘দ্বীন-দুনিয়া’র নামকরণের গূঢ় রহস্য এখান থেকে আঁচ করা যায়। তরীকত সম্পর্কে আবহমান কাল থেকে এ ধ্যান-ধারণাই প্রচার করা হয়েছে যে, তরীকতের সাধনা মানে নিজেকে ভুলে গিয়ে, সংসার ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়ে যেতে হবে। তবেই আল্লাহর মিলন লাভ সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে বায়তুশ শরফের পীর ছাহেব হুজুর ইসলামের এ শিক্ষার পূনরুজ্জীবন ঘটান যে, সংসার ত্যাগ করে বৈরাগ্যবাদ ইসলামের নয়, এটি তাসাওফের সাধনাও নয় বরং তাসাওফের সাধনায় সাধককে একদিকে মহান আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, অন্যদিকে আল্লাহর সৃষ্টি মানুষের সাথে। তিনি আজীবন যে বক্তব্যটির উপর তাগাদা দিয়ে গেছেন তা হলো; আল্লাহর সৃষ্টিকে ভালবাস, তাদের খেদমত কর, তাহলে আল্লাহ রাজী হবেন, আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জিত হবে। তিনি বলতেন, “দাস্ত বকার দিল বয়ার”। অর্থাৎ “হাত ব্যস্ত থাকবে সংসার কর্মের মাঝে আর দিল ব্যস্ত থাকবে আল্লাহর ধ্যানে”

শেখ সাদীর একটি কবিতা পংক্তির মধ্যে তিনি তাঁর তরীকত দর্শন ব্যাখ্যা করতেন। বলতেন- তরীকত বজুয খেদমতে খাল্ক নীস্ত/ বে তাসবীহ ও সাজ্জাদা ও দালক্ব নীস্ত। “তরীকতের সাধনা সৃষ্টির সেবা ছাড়া সম্ভব নয়। তাসবীহ, সাজ্জাদা ও ছেড়া আল-খাল্লার নাম তরীকতের সাধনা নয়”। তাই আনজুমনে ইত্তেহাদের মাধ্যমে সারা দেশব্যাপী জনসেবার কর্মসূচী ছড়িয়ে দিয়ে তাঁর এ যুগান্তকারী চিন্তাধারার বাস্তব নমুনা স্থাপন করতেন। নিশ্চয়ই এক্ষেত্রে তিনি একজন অসাধারণ সংস্কারক। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের আরেকটি সুন্দর দিক ছিল, তিনি প্রচলিত অর্থে বড় পন্ডিত, দার্শনিক বা উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন না; দীর্ঘকাল শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন আলেম ছিলেন। কিন্তু শিক্ষিত লোকদের সাথে সময় কাটাতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। ঘন্টার পর ঘন্টা সেমিনারে জ্ঞানী-মনীষীদের আলোচনা শুনতে তিনি আনন্দ পেতেন। চট্টগ্রাম বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানে দেখেছি, জ্ঞানী পন্ডিতরা শিশু চরিত্রের এই মুরব্বীকে সভাপতির আসনে বসিয়ে আলোচনা করতে তৃপ্তি পেতেন। তাঁর উপস্থিতিতে তাদের বিতর্ক কখনো পরস্পর আক্রমণাত্মক রূপ নিত না। সবশেষে তিনি এমনভাবে সমাধান দিতেন, যাতে সবাই পরিতৃপ্ত হত। একবার এক সেমিনারে দুপক্ষে তুমুল বিতর্ক হয়, দুপক্ষের লোকেরাই সম্মানিত ও পন্ডিত; যুক্তিগুলোও শক্ত। কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ। আমি মনে মনে বললাম, দেখি হুজুর আজ সভাপতির ভাষণে কিভাবে এ বিরোধ নিষ্পত্তি করেন। একটি অন্তরঙ্গ পরিবেশ কিভাবে ফিরাতে পারেন। এশা’র জামাতের মাত্র ৫ মিনিট বাকী। হুজুর সভাপতির ভাষণে ২/৩ মিনিটে কয়েকটি কথা বললেন। বিস্মিত হয়ে দেখলাম যে, তাতে উভয় পক্ষ পরিতৃপ্ত। কারো মধ্যে হার-জিতের মনোভাব নেই। তিনি অতি সরলভাবে বললেন, আমরা এতক্ষণ জ্ঞানের আলোচনা শুনেছি। এ আলোচনায় আমাদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করলেন- আপনারা কি বলেন? সমস্বরে জবার উত্থিত হল, আমরা লাভবান হয়েছি। পীর ছাহেব হুজুরের শেষ উচ্চারণ ছিল, “আমরা আশা করি এ ধরণের আলোচনা সামনেও অব্যাহত থাকবে আর আমরাও উপকৃত হব। আমাদের শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদগণ আগামী সেমিনারগুলোতে এসে আমাদেরকে এভাবে উপকৃত হবার সুযোগ দেবেন। এভাবেই ‘মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন’, ‘সুদবিহীন ব্যাংক ব্যবস্থা’, ‘বাংলাদেশে ইসলাম’ প্রভৃতি সেমিনারের মাধ্যমে তিনি দেশ ও জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল চত্বরে বায়তুশ শরফের মরহুম পীর সাহেব কেবলার স্মরণে আলোচনা অনুষ্ঠানে যারা কষ্ট করে অংশ গ্রহণ করেছেন, তাদের সবাইকে স্বাগত জানিয়ে আমার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করছি।

 

স্বাগত ভাষণে ঈসা শাহেদী

রাহনুমা || ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা সভার স্মারক