বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ দশকের খ্যাতনামা মুসলিম সাহিত্যিক মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১২৯২ হি./ ১৮৭৫ খ্রি.-১৩৬৯ হি./ ১৯৫০ খ্রি.) চট্টগ্রামে একটি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেন। কর্ণফুলি নদীর তীরে সাগর সঙ্গমে এর জন্য স্থানও মনােনীত করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার দরুণ তাঁর লালিত স্বপ্ন বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করে নি। কারাে কারাে মতে তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া থানার দেয়াং পাহাড়ে ৬ শত একর জমি নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। প্রাথমিকভাবে ১০ লক্ষ টাকার তহবিলও গঠন করা হয়। অবশ্য তখন এর নামকরণ করা হয় ‘মওলানা শওকত আলি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’। মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক এর কর্মকাণ্ডে শরিক হন। তবে পরবর্তীতে এই পরিকল্পনাটি স্থায়ী রূপ লাভ করে নি। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন হিন্দুস্থানের সীমান্ত এলাকা কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরিত করা হয় তখন চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনতা, ‘উলামায়ে কিরাম, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবী, আইনজীবী ও শিক্ষাবিদগণ পুনরায় চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রাম-এর তৎকালীন সভাপতি মওলানা মুহাম্মদ শামসুদ্দীন (রহ.)। তবে তাঁদের চিন্তা ছিল মসজিদ কেন্দ্রিক এ প্রতিষ্ঠান The Private Univirsity Act, 1992 জাতীয় সংসদে পাশ হয়, তখন মসজিদ কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান করার পরিবর্তে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পরিষদের সকল সদস্য ও শুভাকাঙ্খী ঐক্যমত পােষণ করেন। তাই মওলানা শামসুদ্দীনের সভাপতিত্বে ১ জুন, ১৯৯২ খ্রি. ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রাম-এর কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। ২২ আগস্ট, ১৯৯২ খ্রি. কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় মুহাম্মদ বদিউল আলিমকে আহবায়ক করে বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়।

আহবায়ক কমিটি গঠনঃ
ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমকে সার্বজনীন ও গতিশীল করার লক্ষ্যে চট্টগ্রামের ‘আলিম-উলামা ও বুদ্ধিজীবীদেরকে সম্পৃক্ত করার প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করে। তাদের ছিল এমন এক ব্যক্তিত্বের সমর্থন যার দেশময় খ্যাতি এবং ব্যাপক গ্রহণযােগ্যতা। তাই উদ্যোক্তাগণ প্রথমেই শাহ্ সুফি মওলানা মােহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ.) সাহেবের শরণাপন্ন হলে সাথে সাথেই তিনি এ মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং সর্বাত্মক সহযােগিতার আশ্বাস দেন। তারই সভাপতিত্বে প্রস্তুতি স্বরূপ ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এক সেমিনারের আয়ােজন করা হয়। সেমিনারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভি. সি প্রফেসর ড. আবদুল করিম (১৩৪৭ হি./ ১৯২৮ খ্রি.-১৪২৮ হি./ ২০০৭ খ্রি.), ইসলামি সমাজ কল্যাণ পরিষদের সাবেক সভাপতি মওলানা শামসুদ্দিন (১৩৫০ হি./ ১৯৩১ খ্রি.-১৪৩২ হি। ২০১০ খ্রি.) অধ্যক্ষ এ. এ. রেজাউল করিম চৌধুরি (১৩৪৫ হি./ ১৯২৬ খ্রি.১৪২২ হি./ ২০০১ খ্রি.), প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলাম (১৩৫৮ হি./ ১৯৩৯ খ্রি.-১৪৩৫ হি./ ২০১৩ খ্রি.) প্রফেসর ড. মুঈনুদ্দিন আহমদ খান (জন্ম ১৩৪৫ হি./ ১৯২৬ খ্রি.) প্রমুখ বরেণ্য শিক্ষাবিদগণ অংশগ্রহণ করেন। সেমিনারে চট্টগ্রামে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। এ সমাবেশে পীর মওলানা মােহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ.) কে আহবায়ক, অধ্যক্ষ এ.এ রেজাউল করিম চৌধুরি এবং মওলানা মুহাম্মদ শামসুদ্দীনকে যুগ্ম আহবায়ক করে একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীকালে আহবায়ক কমিটি ২০ এপ্রিল, ১৯৯৩ খ্রি. এক সভায় মুহাম্মদ বদিউল আলিমকে সেক্রেটারি করে একটি কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণঃ
১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আয়ােজিত সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ নিয়ে আলােচনা হয়। কেউ কেউ ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ করার জন্য জোরালো মতামত পেশ করেন। যেহেতু মওলানা মুনিরুজ্জমান ইসলামাবাদী এ নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন। উপস্থিত অধিকাংশ সদস্যের মতের ভিত্তিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম নামকরণের ব্যাপারে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।

ট্রাস্টি বাের্ড গঠনঃ
৬ অক্টোবর, ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে উপরােক্ত মনীষীসহ অন্যান্যদের সমন্বয়ে ৫১ সদস‍্য বিশিষ্ট ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অহোরাত্র কর্ম তৎপরতায় Bangladesh Private Univirsity Act, 1992 অধীনে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম’ প্রতিষ্ঠার অনুমােদন লাভ করে। পরবর্তীতে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে এ আইন সংশােধিত হয়ে Private University Act (Amended) 2010 নামে পরিচিতি লাভ করে। তখন Bangladesh Private Univirsity Act, 1992 & revised Act. 2010 এর ৬/২ নং ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্ট গঠন করার প্রয়ােজনীয়তা দেখা দিলে কার্যনির্বাহী ৫১ জন সদস্যকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্ট গঠন করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। তবে প্রথম হতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যারা বিশেষ অবদান রেখেছিলেন এরূপ ১৭ জনকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে মনােনীত করা হয় এবং ২৩ অক্টোবর, ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ট্রাস্ট রেজিস্ট্রার্ড হয়। শাহ্সুফি মওলানা মােহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ.) বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসেবে আমৃত্যু (১৫/০৫/১৯৯৫ খ্রি. থেকে ২৫/০৩/১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শায়খ মওলানাই একমাত্র সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যিনি নিজ অর্থে একটি কম্পিউটার প্রদানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ক্লাস উদ্বোধন করেন।

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এর পদযাত্রাঃ
মাত্র তিনটি ফ্যাকাল্টির অধীনে তিনটি বিভাগ নিয়ে চট্টগ্রামের চকবাজারস্থ প্যারেড ময়দান সংলগ্ন একটি অস্থায়ী ক্যাম্পাসে আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম পদযাত্রা শুরু করে। ১ আগস্ট, ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মওলানা মােহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ.) এর দু’আ ও মুনাজাতের মাধ্যমে মাত্র ৪৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্ট ২১ এপ্রিল, ১৯৯৪ খ্রি. বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচনের ব্যাপারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অবশেষে সিতাকুন্ড থানার জোড়া আমতল গ্রামে চট্টগ্রাম শহর হতে প্রায় ২২ কিলােমিটার দূরে কুমিরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্যমন্ডিত এই ক্যাম্পাসের এক দিকে চন্দ্রনাথ পর্বত আর অনতিদুরে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান। ক্যাম্পাসের স্বাস্থ্যকর মনােমুগ্ধকর দৃশ্যাবলী সত্যিই মনােরম। ২৮ মার্চ, ২০০২ খি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পসের শুভ যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এ স্থায়ী ক্যাম্পাসে পাঠদান কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে ০৫টি অনুষদের অধীনে ১২টি বিভাগে দেশ-বিদেশের প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।

উচ্চ শিক্ষায় ইছুক দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। এই বিষয়গুলাে দেখার জন্য Staff Development ও Student Welfare Division নামে একটি আলাদা Division রয়েছে। এস, এস, সি, ও এইচ, এস, সি-তে বাের্ড পরীক্ষায় বিশেষ স্থান অর্জনকারীদের জন্য বিনা বেতনে কিংবা বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম ‘Federation of the Universities of the Islamic World’ (FUIW) এবং ‘Association of Commonwealth Universities’ (ACU)- এর সদস্য। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে নিম্ন বর্ণিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলাে সমঝােতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে- (a) International Islamic University Malaysia (IIUM), (b) Univercity of Cape Bretan, Canada, (c) Multimedia University, Malaysia, (d) European Institute for Human Sciences, France, (e) Lough Borough University & Islamic Foundation, U.K., (f) Al-Azhar University, Egypt, (g) Al Imam Muhammad Ibn Saud Islamic University, K.S.A, (h) King Saud University, Riyadh, K.S.A, (i) Asian Institute of Technology (AIT), Bangkok, (j) Thrisakti University, Indonesia, (k) Stirling Unirvesity, U.K. & (1) Portland State University (PSU), USA (m) University Sains Islam Malaysia (USIM). উপরােক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলাে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম-এর ডিগ্রি মূল্যায়ন করে এবং Credit Transfer এর সুবিধাও দিয়েছে। অধিকন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাধর্মী কাজে উৎসাহ দান ও সুযােগ সৃষ্টির জন্য International Institute of Islamic Political Economy Interactive System (IIIPEIS) নামে একটি ইনস্টিটিউট রয়েছে। এই ইনস্টিটিউট-এর অধীনে মাস্টার্স, এম. ফিল ও পি-এইচ. ডি. করার ব্যবস্থা রয়েছে। তিন তলা বিশিষ্ট ভবনে সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। এতে দেশি-বিদেশি লেখকের প্রায় ১,৫০,০০০ হাজার গ্রন্থ রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ইউজিসির নেতৃত্বাধীন সরকারি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন টিমের মূল্যায়নে IIUC দেশের সেরা ৯টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ইতােমধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার হিসেবে দেশ-বিদেশে খ্যাতি লাভ করেছে। এভাবে শাহ্ সুফি মওলানা মােহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ.)-এর আন্তরিক সক্রিয় সহযােগিতায় চট্টগ্রামে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করে। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর যে ত্যাগ তিতীক্ষা তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।